লোহিত সাগর দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের কাছ থেকে টোল আদায়ের দাবি নাকচ করেছে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা। গোষ্ঠীটি জানিয়েছে, এ নৌপথ ব্যবহারকারী কোনো জাহাজের কাছ থেকে তারা কোনো ধরনের টোল আদায় করবে না। সৌদি আরবের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যে লোহিত সাগরে টোল আদায়ের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ার পর এ বিষয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে হুথিরা।
আজ শনিবার (০১ আগস্ট) জেরুজালেম পোস্টের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইয়েমেনের হুথি-পরিচালিত সামুদ্রিক সমন্বয়কারী সংস্থা বাব এল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর শুল্ক আরোপের পরিকল্পনার কথা অস্বীকার করেছে। সংস্থাটি বলেছে, এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি এবং এই কৌশলগত জলপথ উন্মুক্ত রয়েছে।
গত সপ্তাহে সৌদি আরবের ওপর সামুদ্রিক অবরোধ আরোপ করেছে হুথিরা। এ ঘটনার পর লোহিত সাগর দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর শুল্ক আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে বলে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে নিজেদের অবস্থান জানিয়ে এই বিবৃতি দিয়েছে গোষ্ঠীটি।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লিখিত সূত্রগুলো জানিয়েছে, জুলাই মাসে হুথি কর্মকর্তাদের তেহরান সফরের সময় ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে ফি-সংক্রান্ত প্রস্তাবটি নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। তবে তা বাস্তবায়নের জন্য কোনো সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়নি।
হুথি-পরিচালিত মানবিক কার্যক্রম সমন্বয় কেন্দ্র (এইচওসিসি) বলেছে, তাদের নিরাপদ পরিবহন পরিষেবাটি একটি স্বেচ্ছামূলক উদ্যোগ। এটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সেবা দিয়ে আসছে।
এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানিয়েছে, এইচওসিসি দ্ব্যর্থহীনভাবে নিশ্চিত করছে যে, বাব এল-মান্দেব প্রণালি পারাপারের বিনিময়ে অর্থ প্রদানের অনুরোধকারী কোনো ব্যক্তি বা সংস্থা কোনোভাবেই ইয়েমেন প্রজাতন্ত্র বা এইচওসিসির প্রতিনিধিত্ব করে না।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, এইচওসিসি শিপিং কোম্পানিগুলোকে অননুমোদিত ব্যক্তি বা সংস্থাকে কোনো অর্থ প্রদান বা কোনো তথ্য সরবরাহ না করার আহ্বান জানিয়েছে।
মরক্কো থেকে স্পেনে ২৪ ঘণ্টায় ঢুকল ৫০ হাজার মানুষ, কেন আলোচনায় সেউতা-মেলিলা
প্রকাশিত :
০৬:৪৯, ০১ আগষ্ট ২০২৬
উত্তর আফ্রিকায় মরক্কো সীমান্তঘেঁষা স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত শহর সেউতায় নজিরবিহীন অভিবাসী সংকট দেখা দিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার সকাল থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় মরক্কো থেকে ৫০ হাজারের বেশি অভিবাসনপ্রত্যাশী স্থল ও সমুদ্রপথে শহরটিতে প্রবেশের চেষ্টা করেছেন। এ সময় সীমান্ত অতিক্রম করতে গিয়ে বহু হতাহতের ঘটনা ঘটে। স্পেনের অংশে এখন পর্যন্ত ৫৭টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া মরক্কোর দিকেও প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে।
স্পেন সরকার জানিয়েছে, শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রায় ৩৭ হাজার ৩০০ জনকে মরক্কোতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে অথবা তারা স্বেচ্ছায় ফিরে গেছেন।
কী ঘটছে
সাম্প্রতিক কয়েক দিনে মরক্কো ও সেউতার মধ্যকার সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ কার্যত ভেঙে পড়ে। এর সুযোগে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে হাজারো মানুষ বিশৃঙ্খল ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে সীমান্ত অতিক্রম করে স্পেনের ভূখণ্ডে প্রবেশের চেষ্টা করেন।
প্রবেশের চেষ্টা করা মানুষের সংখ্যা সেউতার মোট জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি। ফলে ছোট্ট এই শহরে দ্রুত মানবিক সংকট দেখা দেয়।
উত্তর আফ্রিকার ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে অবস্থিত স্পেনের আরেকটি স্বায়ত্তশাসিত শহর মেলিলা, যা সেউতা থেকে প্রায় ২৫০ মাইল পূর্বে। সেউতা ও মেলিলা-এই দুটি শহরই আফ্রিকার সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একমাত্র স্থলসীমান্ত। উন্নত জীবনের আশায় কিংবা সংঘাত ও দারিদ্র্য থেকে পালিয়ে ইউরোপে যেতে চাওয়া অভিবাসীদের কাছে তাই অঞ্চল দুটি দীর্ঘদিন ধরেই অন্যতম প্রবেশদ্বার।
১৫৮০ সাল থেকে স্পেনের নিয়ন্ত্রণে থাকা সেউতায় খ্রিষ্টান ও মুসলিম-উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করেন। স্থানীয় স্প্যানিশ ও মরক্কোর বাসিন্দাদের পাশাপাশি সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিদিন কর্মস্থলে আসা হাজারো শ্রমিকও সেখানে কাজ করেন। দীর্ঘদিন ধরে সীমান্তের দুই পাশের মানুষের মধ্যে তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রয়েছে।
তবে চার শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে স্পেনের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও মরক্কো এখনো সেউতা ও মেলিলাকে স্পেনের ভূখণ্ড হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয় না। দেশটি অঞ্চল দুটিকে নিজেদের ‘অধিকৃত ভূখণ্ড’ বলে দাবি করে।
কেন অভিবাসীদের জন্য ‘হটস্পট’?
আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে উন্নত জীবনের আশায় কিংবা যুদ্ধ-সংঘাত ও দারিদ্র্য থেকে পালিয়ে ইউরোপে যেতে চাওয়া মানুষের অন্যতম প্রবেশপথ স্পেন। সেই পথের গুরুত্বপূর্ণ দুটি দরজা সেউতা ও মেলিলা।
অনেক অভিবাসী মরক্কোর ফনিদেক শহর থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার সাঁতরে সেউতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। কেউ আবার কাছের বেলিউনেশ এলাকা থেকে সীমান্ত অতিক্রম করেন। সীমান্তজুড়ে উঁচু বেড়া, কাঁটাতার ও কঠোর নিরাপত্তা থাকলেও সুযোগ পেলেই অনেকে এই ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নেন। সেউতা বা মেলিলায় পৌঁছানোর পর অনেককে তাৎক্ষণিকভাবে মরক্কোতে ফেরত পাঠানো হয়। তবে কেউ কেউ আশ্রয়কেন্দ্রে থেকে স্পেনে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করার সুযোগ পান।
এই সীমান্তে প্রাণহানির ঘটনাও নতুন নয়। ২০২২ সালে মেলিলায় প্রবেশের সময় অন্তত ২৩ জন নিহত হন। এর আগে ২০১৪ সালে সেউতার সীমান্তে বেড়া টপকাতে বা সমুদ্রপথে প্রবেশের চেষ্টায় অন্তত ১৪ জনের মৃত্যু হয়।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ২০১৪ সাল থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে ৩৫ হাজারের বেশি অভিবাসী নিহত বা নিখোঁজ হয়েছেন। চলতি বছরের প্রথম সাত মাসেই এ সংখ্যা প্রায় দেড় হাজার।
এবার কীভাবে একসঙ্গে ৫০ হাজার মানুষ ঢুকে পড়লেন?
এত বড় সংখ্যক মানুষের একযোগে সীমান্ত পার হওয়ার কারণ এখনো স্পষ্ট নয়। মরক্কো সরকার এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেয়নি। তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, এর পেছনে কেবল মানবপাচারকারী চক্র নয়, রাজনৈতিক বার্তাও কাজ করেছে।
সম্প্রতি স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ চার বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো আলজেরিয়া সফর করেন। এর পরপরই সেউতা সীমান্তে এই নজিরবিহীন পরিস্থিতি তৈরি হয়।
উত্তর আফ্রিকায় মরক্কো ও আলজেরিয়ার দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রে রয়েছে ওয়েস্টার্ন সাহারা। অঞ্চলটির স্বাধীনতাকামী পলিসারিও ফ্রন্টকে সমর্থন করে আলজেরিয়া, আর পশ্চিম সাহারাকে নিজেদের অংশ বলে দাবি করে মরক্কো। ২০২১ সালেও স্পেন ও মরক্কোর কূটনৈতিক টানাপোড়েনের সময় সেউতায় হাজারো মানুষ প্রবেশ করেছিলেন। তখন মরক্কো সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ শিথিল করেছিল বলে অভিযোগ ওঠে।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এবার দাবি করেছেন, মানবপাচারকারী চক্র গুজব ছড়িয়েছিল যে স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক এক রায়ের কারণে সমুদ্রপথে পৌঁছানো অনিয়মিত অভিবাসীদের আর তাৎক্ষণিকভাবে ফেরত পাঠানো যাবে না। সেই গুজবে উৎসাহিত হয়ে বহু মানুষ সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টা করেছেন।
তবে ইতালির ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্যাল স্টাডিজের অভিবাসন গবেষক মাত্তেও ভিলার মতে, এক রাতে ৫০ হাজার মানুষের সীমান্ত পার হওয়া কেবল গুজবের ফল হতে পারে না। তার মতে, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে মরক্কোর শিথিলতাই এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে, যা ইউরোপের ওপর নিজেদের প্রভাব প্রদর্শনের একটি রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
ইউরোপের প্রতিক্রিয়া
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্পেন অতিরিক্ত সেনা ও পুলিশ মোতায়েন করেছে। প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ঘটনাটিকে স্পেনের ভৌগোলিক অখণ্ডতার লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছেন।
ঘটনাটি ইউরোপীয় রাজনীতিতেও তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন ডানপন্থী রাজনৈতিক দল স্পেনের অভিবাসন নীতির সমালোচনা করেছে। ইতালির কট্টর ডানপন্থী সরকার স্পেনকে শেনজেন অঞ্চল থেকে সাময়িকভাবে স্থগিত করার দাবি তুলেছে, যদিও সেউতা ও মেলিলা প্রচলিত শেনজেন ব্যবস্থার আওতায় পড়ে না। একই সময়ে ফ্রান্সও স্পেন সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করেছে।