সিএনএনের প্রতিবেদন

img

ইরান যুদ্ধ থেকে সরে আসার উপায় খুঁজছেন ট্রাম্পের শীর্ষ জেনারেল

প্রকাশিত :  ০৬:১০, ০৮ আগষ্ট ২০২৬

ইরান যুদ্ধ থেকে সরে আসার উপায় খুঁজছেন ট্রাম্পের শীর্ষ জেনারেল

ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার একটি কূটনৈতিক পথ খুঁজে বের করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন। মার্কিন সামরিক বাহিনীর হাতে যুদ্ধ আরও বিস্তৃত করার যে বিকল্পগুলো রয়েছে, সেগুলো শেষ পর্যন্ত উল্টো ক্ষতি ডেকে আনতে পারে বলে ট্রাম্প প্রশাসনের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে ব্যক্তিগতভাবে সতর্ক করেছেন তিনি।

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত তিনটি সূত্রের বরাতে সিএনএন জানিয়েছে, গত কয়েক সপ্তাহে কেইন স্পষ্ট করে বলেছেন, ইরান যুদ্ধ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ‘বের হওয়ার পথ’ বা অফ-র‍্যাম্প খুঁজে বের করা প্রয়োজন। তার আশঙ্কা, শুধু বিমান হামলা চালিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নাও হতে পারে।

একটি সূত্র সরাসরি বলেছে, ‘কেইন একটি বের হওয়ার পথ খুঁজছেন।’

জেনারেল কেইন একা নন। সিআইএর পরিচালক জন র‍্যাটক্লিফ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সসহ ট্রাম্প প্রশাসনের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তার সঙ্গেও তিনি যুদ্ধের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করেছেন।

সূত্রগুলোর মতে, এসব আলোচনার উদ্দেশ্য ছিল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের আগে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার অবস্থান সমন্বয় করা এবং সামরিক বিকল্পগুলোর সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাব্য ঝুঁকি তুলে ধরা।

এক সূত্রের ভাষ্য, কেইনের এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সামরিক বাহিনীকে রক্ষা করা।

‘বিমান শক্তিরও সীমাবদ্ধতা আছে’

ট্রাম্প বারবার ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানে স্থলবাহিনী পাঠানোর বদলে বিমান হামলার মাধ্যমে তেহরানকে তার শর্তে চুক্তিতে বাধ্য করা সম্ভব। তবে কেইনসহ প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা ব্যক্তিগত আলোচনায় মনে করছেন, এমন ফলাফল পাওয়ার সম্ভাবনা কম।

গত মাসের শেষ দিকে আইনপ্রণেতাদের সামনে এক শুনানিতে কেইন নিজেই বলেছিলেন, ‘বিমান শক্তির সীমাবদ্ধতা রয়েছে।’

সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাইয়ের শেষ দিকে ইরানে আরও বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হলেও কেইন ও প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা এর সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। ওই পরিকল্পনায় বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর কথা বিবেচনা করা হয়েছিল।

একটি সূত্রের দাবি, ওই অভিযানের পক্ষে মূলত সেন্ট্রাল কমান্ডের কিছু অংশ ছিল। ইসরাইলও সামগ্রিকভাবে সংঘাত আরও বাড়ানোর পক্ষে ছিল বলে সূত্রটি জানায়।

শেষ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনার পর ট্রাম্প হামলা থেকে সরে আসেন। এসব দেশ ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা হামলা, বিশেষ করে তাদের জ্বালানি অবকাঠামোয় আঘাতের আশঙ্কা জানিয়েছিল।

তবে ট্রাম্প ভবিষ্যতে হামলার পরিকল্পনা পুরোপুরি বাতিল করেননি।

অস্ত্রের মজুত নিয়েও উদ্বেগ

যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ গোলাবারুদের মজুত কমে যাওয়ার বিষয়টিও বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে। সিএনএনের একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন অস্ত্রের মজুত এখন বিপজ্জনকভাবে কমে এসেছে।

ইরানের বিরুদ্ধে আরও হামলার বিকল্প নিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে অন্তত দুটি বৈঠকে কেইন গোলাবারুদের মজুত কমে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেছেন বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।

একই সময়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর কর্মকর্তারাও মার্কিন কর্মকর্তাদের সতর্ক করেছেন যে, উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ঘাটতি থাকলে ইরানের পাল্টা হামলা ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা নিয়েও সংশয়

ট্রাম্প একাধিকবার ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার হুমকি দিয়েছেন। তবে সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, এতে ইরান আত্মসমর্পণ করবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং এর প্রতিক্রিয়ায় উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোতে ইরানের পাল্টা হামলার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

একইভাবে ইরানের সেতুতে হামলার বিষয়টিও বিবেচনা করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে এমন হামলা খুব বেশি কার্যকর ফল দেবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

‘নতুন ও অপ্রচলিত’ কৌশলের খোঁজ

যুদ্ধ শুরুর প্রায় ছয় মাস পরও যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন কৌশল খুঁজতে হচ্ছে। সম্প্রতি সেন্ট্রাল কমান্ডের এক জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা সামরিক বিশ্লেষকদের কাছে ই-মেইল পাঠিয়ে ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি ও শাস্তি দেওয়ার ‘নতুন, সৃজনশীল ও অপ্রচলিত’ উপায় জানতে চেয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, যুদ্ধ শুরুর এতদিন পর এভাবে নতুন ধারণা চাওয়া থেকে বোঝা যায়, বর্তমান কৌশল কাঙ্ক্ষিত ফল দিচ্ছে না।

এক সূত্র বলেন, যুদ্ধ শুরুর আগে এসব বিকল্প নিয়ে ভাবা এক বিষয়, কিন্তু যুদ্ধের মাঝপথে এসে নতুন বিকল্প খুঁজতে হওয়া পরিস্থিতির কঠিন বাস্তবতাকে প্রকাশ করে।

ট্রাম্পকে সরাসরি বিরোধিতা না করে সতর্ক করছেন কেইন

তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট না করে নিজের অবস্থান তুলে ধরতে সতর্কভাবে এগোচ্ছেন কেইন। সূত্রগুলো বলছে, তিনি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকে সামরিক অভিযানের ঝুঁকি তুলে ধরলেও একই সঙ্গে স্পষ্ট করেছেন, ট্রাম্প যদি হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে মার্কিন বাহিনী ইরানের ওপর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করতে সক্ষম।

অর্থাৎ প্রকাশ্যে তিনি সামরিক সক্ষমতার বিষয়টি তুলে ধরছেন, আর ব্যক্তিগত আলোচনায় বিমান হামলার সীমাবদ্ধতা এবং যুদ্ধ আরও বাড়ানোর সম্ভাব্য বিপদ নিয়ে বেশি সরাসরি কথা বলছেন।

স্থল অভিযানই কি শেষ বিকল্প?

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ইরানকে সামরিকভাবে পুরোপুরি পরাজিত করতে হলে বড় ধরনের স্থল অভিযান প্রয়োজন হতে পারে। তবে এতে হাজার হাজার মার্কিন সেনার প্রাণহানির ঝুঁকি রয়েছে। তাই প্রশাসনের কেউই বর্তমানে এমন বড় পদক্ষেপের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন না।

এ কারণে ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে এখন এমন একটি সমাধানের খোঁজ চলছে, যাতে প্রেসিডেন্ট অন্তত একটি প্রতীকী বিজয় দাবি করতে পারেন এবং একই সঙ্গে কূটনৈতিক সমঝোতার পথও খোলা থাকে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এর সম্ভাব্য শুরু হতে পারে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে একটি সমঝোতার মাধ্যমে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ছয় মাসের এই যুদ্ধ এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে ট্রাম্পের সামনে বড় সামরিক অভিযান, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত কিংবা কূটনৈতিক সমঝোতা—এই তিনটির মধ্যে একটি বেছে নেওয়ার চাপ তৈরি হয়েছে। আর তার শীর্ষ সামরিক উপদেষ্টা জেনারেল ড্যান কেইন মনে করছেন, যুদ্ধ আরও বাড়ানোর আগে বের হওয়ার একটি বাস্তবসম্মত পথ খুঁজে বের করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।


আন্তর্জাতিক এর আরও খবর

আল জাজিরার বিশ্লেষণ

img

সৌদি-পাকিস্তান-তুরস্কের ঐতিহাসিক ‘মক্কা চুক্তি’, মার্কিন আধিপত্যের বিদায়ঘণ্টা?

প্রকাশিত :  ০৯:০৬, ০৮ আগষ্ট ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ ঘিরে উত্তেজনা বৃদ্ধির মধ্যে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করেছে। ‘মক্কা জয়েন্ট ডিটারেন্স এগ্রিমেন্ট’ নামের এই চুক্তি অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপরই হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। চুক্তির মাধ্যমে তিন দেশ পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও জোরদার করার অঙ্গীকার করেছে।

শুক্রবার (৭ আগস্ট) সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মক্কায় চুক্তিতে সই করেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, তিন দেশের ‘দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক সম্পর্ক, ভ্রাতৃত্ববোধ ও ইসলামী সংহতির স্থায়ী বন্ধন, অভিন্ন কৌশলগত স্বার্থ এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা সহযোগিতার’ ভিত্তিতে এই যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি হয়েছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা জোরদার এবং ‘নিরাপদ ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ’ গড়ার লক্ষ্যে তিন দেশের যৌথ অঙ্গীকারের প্রতিফলন এই সমঝোতা।

চুক্তির এক দিন আগে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ, সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে সঙ্গে নিয়ে সৌদি আরবে পৌঁছান এবং মক্কায় ওমরাহ পালন করেন। শুক্রবার তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানও সৌদি আরবে গিয়ে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে বৈঠক করেন।

এই চুক্তিটি এখন কেন করা হয়েছে?

রিয়াদ ও ইসলামাবাদের মধ্যে এ ধরনের সমঝোতার আলোচনা কিছুদিন ধরেই চলছিল। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েল হামলা এবং এরপর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের পর আলোচনা শুরু হয়। পরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ চলার মধ্যে বিষয়টি গতি পায়।

তুরস্ক ও পাকিস্তান সরাসরি এ আঞ্চলিক উত্তেজনায় ক্ষতিগ্রস্ত না হলেও, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা ও অবকাঠামো থাকা সৌদি আরব ইরান ও ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর হামলার মুখে পড়েছে। একইভাবে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি থাকা উপসাগরীয় অন্য দেশ ও জর্ডানও ইরানের হামলার শিকার হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

তিন দেশই বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন ইরান যুদ্ধের প্রভাব এবং অঞ্চলজুড়ে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও হামলা নিয়ে। প্রতিবেদনে বলা হয়, লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর ঘাঁটি লক্ষ্য করার কথা বলে ইসরায়েল দেশটির প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এলাকা দখলে নিয়েছে। এদিকে, ইরান-সমর্থিত ইরাকি গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সৌদি আরবে ড্রোন হামলার অভিযোগ রয়েছে। একই সময়ে, এসব গোষ্ঠীও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মুখে পড়েছে।

তুরস্কের আঙ্কারা থেকে আল জাজিরার রেসুল সেরদার জানান, দেশটির কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক উত্তেজনাই তিন দেশকে কাছাকাছি এনেছে। তার ভাষায়, ‘৭ অক্টোবরের পর ইসরায়েলের পদক্ষেপ ও সম্প্রসারণবাদ অঞ্চলটিকে আমূল বদলে দিয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে হরমুজ প্রণালির সংকট, ইরানের ওপর চলমান হামলা এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর বিরুদ্ধে ইরানের প্রতিক্রিয়া।’ তার মতে, প্রয়োজনের একাধিক স্তর একসঙ্গে কাজ করায় এই তিন দেশ বাধ্যতামূলক প্রকৃতির একটি চুক্তিতে পৌঁছেছে।

চলতি বছরের ১৯ মার্চ ইসলামী সম্মেলনের ফাঁকে রিয়াদে তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৈঠক করেন। সেখানে সম্ভাব্য যৌথ নিরাপত্তা চুক্তির কাঠামো নিয়ে আলোচনা হয়। এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তান ও সৌদি আরবও একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছিল। সেটি হয় ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর কাতারের রাজধানী দোহায় ইসরায়েলের হামলার পর।

যুক্তরাষ্ট্রের জার্মান মার্শাল ফান্ডের সাউথ অ্যান্ড ওয়াইডার ইউরোপ অফিসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং তুরস্কবিষয়ক আঞ্চলিক পরিচালক ওজগুর উনলুহিসারচিকলি আল জাজিরাকে বলেন, বিদ্যমান নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর আস্থা কমে যাওয়ার সময়ে এ চুক্তি বৃহত্তর আঞ্চলিক কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। তার মতে, তিন দেশই সাধারণভাবে রাষ্ট্রকেন্দ্রিক স্থিতিশীলতার ধারণা পোষণ করে। মতপার্থক্য থাকলেও তারা শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকার, ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং কার্যকর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে শৃঙ্খলার ভিত্তি হিসেবে দেখে। বিপরীতে, রাষ্ট্র ভেঙে পড়া, গৃহসংঘাত এবং অরাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীর ক্ষমতায়নকে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতার উৎস হিসেবে বিবেচনা করে।

এই চুক্তির ফলাফল কী হবে?

এটি আঙ্কারা ও ইসলামাবাদের মধ্যে আগে থেকেই থাকা সমঝোতার ওপর দাঁড়িয়ে আরও বিস্তৃত হবে। তাদের মতে, তিন দেশের সামরিক ও আর্থিক সক্ষমতাকে একত্রে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হবে। তুরস্কের হাতে ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনী রয়েছে, সৌদি আরব বিশ্বের শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক, আর পাকিস্তান একমাত্র মুসলিম-অধ্যুষিত পারমাণবিক শক্তিধর দেশ।

উনলুহিসারচিকলি বলেন, তিন অংশীদার একে অন্যকে পরিপূরক শক্তি দিচ্ছে—‘তুরস্কের প্রতিরক্ষা-শিল্প সক্ষমতা, সৌদির আর্থিক প্রভাব ও সামর্থ্য, এবং পাকিস্তানের সামরিক অভিজ্ঞতা ও কৌশলগত প্রতিরোধক্ষমতা’। তবে তিনি এটিও বলেন, এটিকে ন্যাটোর সঙ্গে তুলনীয় পূর্ণাঙ্গ পারস্পরিক প্রতিরক্ষা জোট হিসেবে দেখা ঠিক হবে না; বরং এটি তিনটি প্রভাবশালী আঞ্চলিক শক্তির মধ্যে কৌশলগত, সামরিক এবং প্রতিরক্ষা-শিল্প সমন্বয় বাড়ানোর একটি কাঠামো।

তুরস্কের গাজিয়ানতেপের হাসান কালিওনচু বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মুরাত আসলান মনে করেন, এই চুক্তির আওতায় ‘ক্যাপাসিটি বিল্ডিং’ বা সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ও থাকবে। তার ভাষ্য, সৌদি আরব বহু দশক ধরে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে, প্রতিরক্ষা পণ্য, অস্ত্র ও সরঞ্জাম আমদানির ওপর নির্ভরশীল। এটি ব্যয়-সাশ্রয়ী নয় এবং দেশটির নিজস্ব প্রতিরক্ষা খাত গড়ে তোলার প্রয়োজন আছে। তিনি আরও বলেন, তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে ইরানকে ঘিরে একটি অভিন্ন নিরাপত্তা-উদ্বেগ রয়েছে। পাকিস্তানের সঙ্গে ইরানের সীমান্ত রয়েছে, আর সৌদিদের মানসে ইরান তাদের নিরাপত্তায় প্রভাব ফেলতে পারে—এমন আশঙ্কা প্রবল। এই চুক্তি সেই নিরাপত্তা কাঠামোকে কোনো না কোনোভাবে বিস্তৃত করবে।

দোহা থেকে আল জাজিরার ওসামা বিন জাভাইদ বলেন, এই সমঝোতা মূলত বিশ্বের বৃহৎ মুসলিম জনসংখ্যার তিনটি দেশকে যৌথ শান্তি-নিরাপত্তার এক রূপরেখায় এনেছে। এর লক্ষ্য আক্রমণ প্রতিহত করা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ে সমন্বয় রাখা এবং জ্বালানি, প্রতিরক্ষা ব্যয় ও উৎপাদনসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা বাড়ানো। তার মতে, ইরান যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে এই তিন দেশের সম্মিলিত অবস্থান অঞ্চলটিকে গত কয়েক দশকের নিরাপত্তা কাঠামো থেকে ভিন্ন এক ব্যবস্থার দিকে নিতে পারে।

এই চুক্তির বিষয়ে ইরান কী প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে?

চুক্তি নিয়ে ইরানের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি। তবে ইরানের সংসদ সদস্য ইব্রাহিম রেজাই শুক্রবার এক্সে দেওয়া পোস্টে সমালোচনা করেন। তিনি লেখেন, ‘সৌদিদের জানা উচিত, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে কাগুজে চুক্তি তাদের নিরাপত্তা দেবে না, যেমন বছরের পর বছর একতরফাভাবে আমেরিকানদের ওপর নির্ভরশীলতাও নিরাপত্তা দেয়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘নিজেদের নীতি সংশোধন করুন, যাতে অন্যের কাছে নিরাপত্তা ভিক্ষা চাইতে না হয়।’

ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া

চুক্তিটি ইসরায়েলের জন্য কী বার্তা বহন করে, সে বিষয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় বা দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখনো কোনো মন্তব্য করেনি। তবে শুক্রবার রয়টার্সকে এক তুর্কি কর্মকর্তা বলেন, এই চুক্তি প্রতিরক্ষামূলক প্রকৃতির, কোনো নির্দিষ্ট পক্ষকে লক্ষ্য করে নয়। তিনি আরও বলেন, এটি অন্য আঞ্চলিক দেশগুলোর জন্যও উন্মুক্ত।

তার পরও তিন দেশ যে ইসরায়েলের আঞ্চলিক প্রভাব ও সাম্প্রতিক হামলা নিয়ে উদ্বিগ্ন—তা গোপন নয়। জুলাইয়ের শুরুতে ইস্তাম্বুলে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের পাশে দাঁড়িয়ে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান বলেছিলেন, আঞ্চলিক সমর্থন ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ সফল হবে না। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতাকে ইসরায়েলকে ‘ধ্বংস’ করতে দেওয়া যাবে না। তার ভাষায়, ‘যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি নস্যাৎ করার ইসরায়েলি প্রশাসনের চেষ্টা আমরা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। বর্তমান যুদ্ধাসক্ত ইসরায়েলি সরকারকে আবারও আমাদের ভৌগোলিক অঞ্চলকে বারুদ ও রক্তের গন্ধে ডুবিয়ে দিতে দেওয়া যায় না।’

এরদোয়ান একাধিকবার অভিযোগ করেছেন, ১৭ জুন স্বাক্ষরিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারক—যার লক্ষ্য ছিল যুদ্ধবিরতি এবং আলোচনার সুযোগ তৈরি করা—তা ভেস্তে দিতে ইসরায়েল চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে তিনি গাজা, লেবানন ও সিরিয়ায় ইসরায়েলের হামলার নিন্দাও বারবার করেছেন।

পাকিস্তানও গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধের নিন্দা জানিয়ে আসছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া হামলায় সেখানে ৭১ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ঘোষিত যুদ্ধবিরতির পরও এক হাজারের বেশি নিহত হন। পাকিস্তান কথিত ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ ধারণারও বিরোধিতা করেছে। তবে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতে পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় থাকার চেষ্টা করছে, যাতে আঞ্চলিক যুদ্ধ না ছড়ায়।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবকে তথাকথিত আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যুক্ত করতে চাইছেন, যাতে ইসরায়েল ও মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়। কিন্তু সৌদি আরব গাজা ও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের পদক্ষেপের নিন্দা পুনর্ব্যক্ত করে বলে আসছে, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সুস্পষ্ট পথ তৈরি না হলে তারা এ পথে যাবে না। ইসরায়েলের বর্তমান সরকার সে অবস্থানের ঘোর বিরোধী।

২০ জুলাই আন্তর্জাতিক সংকট নিরসন সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের গালফ ও অ্যারাবিয়ান পেনিনসুলা অঞ্চলের প্রকল্প পরিচালক ইয়াসমিন ফারুক এক প্রতিবেদনে লেখেন, তুরস্ক, পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং মিসরের মধ্যে ঘনিষ্ঠতর প্রতিরক্ষা সম্পর্ক এ উপলব্ধির প্রতিফলন যে, তাদের আশপাশের নিরাপত্তা আর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল এক পক্ষে এবং ইরান অন্য পক্ষে—এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার করুণার ওপর ছেড়ে রাখা যায় না।

তার ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের ওপর হামলা চালানোর আগেই এসব দেশের অনেক কর্মকর্তা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন। কিন্তু যুদ্ধ এবং এর পর উপসাগরীয় আরব দেশগুলোতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা, সেই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনায় বিষয়টি নতুন ও জরুরি গতি পায়।

তবে ইয়াসমিন ফারুক এ-ও উল্লেখ করেন, কয়েকজন ইসরায়েলি ও মার্কিন ভাষ্যকার এবং কর্মকর্তা এই যৌথ নিরাপত্তা-প্রক্রিয়াকে ‘ইসরায়েলবিরোধী’ বা ‘ইসরায়েল/সংযুক্ত আরব আমিরাতবিরোধী’ সুন্নি রাষ্ট্রগুলোর একটি বলয় হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জেরুজালেমে এক সম্মেলনে সাবেক ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট অভিযোগ করেন, তুরস্ক ‘নতুন ইরান’ হয়ে উঠছে। তার দাবি, আঙ্কারা সৌদি আরবকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে উৎসাহিত করছে এবং পাকিস্তানকে নিয়ে একটি বৈরী সুন্নি অক্ষ গড়ে তুলতে চাইছে।

মক্কার এই চুক্তি এমন এক সময়ে হলো, যখন মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামো দ্রুত বদলে যাচ্ছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে সংঘাত, অন্যদিকে আঞ্চলিক দেশগুলোর নিরাপত্তা-নির্ভরতা পুনর্বিন্যাস—এই দুই বাস্তবতার মাঝেই সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক তাদের সমন্বয়কে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিল।

আন্তর্জাতিক এর আরও খবর