ব্রিটেনে প্রতি আট মিনিটে একজন পুরুষের প্রোস্টেট ক্যানসার শনাক্ত
প্রকাশিত :
০৭:০৪, ২৫ আগষ্ট ২০২৬
ব্রিটেনে আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে প্রোস্টেট ক্যানসারের নতুন রোগী শনাক্তের সংখ্যা। ম্যাকমিলান ক্যানসার সাপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে প্রতি বছর ৬৮ হাজারের বেশি পুরুষের প্রোস্টেট ক্যানসার ধরা পড়ছে—অর্থাৎ গড়ে প্রতি আট মিনিটে একজন নতুন রোগী শনাক্ত হচ্ছেন।
সংস্থাটির সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২০ সালের পর থেকে যুক্তরাজ্যে প্রোস্টেট ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে জীবনযাপন করা মোট পুরুষের সংখ্যা এক লাফে ১ লাখ বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৬ লাখে পৌঁছেছে; যেখানে ২০২০ সালে এই সংখ্যাটি ছিল প্রায় ৫ লাখ। বর্তমানে প্রোস্টেট ক্যানসার যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে সাধারণ এবং ঘনঘন শনাক্ত হওয়া ক্যানসার হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
রোগটি ঘিরে সমাজে নানা ধরনের ‘ভুল ধারণার’ কারণে বহু পুরুষ সময়মতো স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে বাধা পাচ্ছেন বলে সতর্ক করেছে চ্যারিটি প্রতিষ্ঠানটি। ম্যাকমিলান ক্যানসার সাপোর্টের প্রধান চিকিৎসা উপদেষ্টা ড. অ্যান্থনি কানলিফ জানান, ‘সবচেয়ে বড় ভুল ধারণাগুলোর একটি হলো—দৈহিকভাবে সুস্থবোধ করার মানেই প্রোস্টেট ক্যানসার না থাকা। বাস্তবতা হলো, প্রাথমিক অবস্থায় রোগটির কোনো স্পষ্ট উপসর্গ থাকে না।’
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রোস্টেট গ্রন্থিটি আকারে যথেষ্ট বড় হয়ে যখন মূত্রনালীতে চাপ সৃষ্টি করে, তখনই মূলত এর উপসর্গ প্রকাশ পায়। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে বছরের পর বছর আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে কোনো লক্ষণ প্রকাশ নাও পেতে পারে। ৫০ বছরের বেশি বয়সি পুরুষদের ক্ষেত্রে এর ঝুঁকি বেশি থাকলেও কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষ এবং পরিবারে ক্যানসারের ইতিহাস রয়েছে এমন ব্যক্তিদের তুলনামূলক কম বয়সেই এটি হতে পারে।
রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে প্রাথমিক ধাপ হিসেবে সাধারণত ‘পিএসএ’ নামক রক্তের পরীক্ষা করানো হয়। চিকিৎসকরা শারীরিক পরীক্ষার প্রস্তাব দিতে পারেন, তবে রক্ত পরীক্ষার জন্য তা বাধ্যতামূলক নয়।
তবে চলতি বছরের শুরুর দিকে যুক্তরাজ্যের ‘ন্যাশনাল স্ক্রিনিং কমিটি’ ঢালাওভাবে সকল পুরুষের জন্য পিএসএ স্ক্রিনিংয়ের সুপারিশ করেনি।
তাদের মতে, কোনো উপসর্গ ছাড়া সাধারণ সবার ক্ষেত্রে এই পরীক্ষা অপকারের কারণও হতে পারে। তবে উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তি, নির্দিষ্ট জিনগত পরিবর্তন বহনকারী পুরুষ এবং কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষদের ওপর বিশেষ স্ক্রিনিং ট্রায়াল সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ক্যানসার রোগীর সংখ্যা লাফিয়ে বাড়ার পেছনে ড. কানলিফ নির্দিষ্ট কোনো একক কারণ চিহ্নিত না করে মূলত বয়োবৃদ্ধ জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়াকে অন্যতম বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
অবৈধ ইসরায়েলি বসতি নিয়ে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রনীতির জড়তা ভেঙেছেন মিলিব্যান্ড
প্রকাশিত :
০৬:৩৯, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
দখলকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে কয়েক দশক ধরে উদ্বেগ জানিয়ে এলেও এতদিন কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি যুক্তরাজ্য। তবে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড দীর্ঘদিনের এই নীতিগত জড়তা কাটিয়ে অবৈধ ইসরায়েলি বসতির বিরুদ্ধে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপের উদ্যোগ নিয়েছেন বলে মনে করছে দেশটির প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান।
গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বছরের পর বছর পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে প্রায় একই ধরনের উদ্বেগ ও নিন্দা জানিয়ে আসছিলেন। এমনকি কয়েকজন সাবেক কনজারভেটিভ মন্ত্রীও পরে স্বীকার করেছেন, এসব বিবৃতি বাস্তবে কোনো পরিবর্তন আনেনি।
সাবেক মন্ত্রী অ্যালান ডানকান একসময় বসতি প্রশ্নে যুক্তরাজ্যের অবস্থানকে দুর্বল ও সরল বলে মন্তব্য করেছিলেন। আরেক সাবেক মন্ত্রী অ্যালিস্টেয়ার বার্ট বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন, কীভাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ না নিয়েই নিন্দা জানানোর নতুন নতুন কূটনৈতিক ভাষা খুঁজে বের করে।
দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের প্রতি ইসরায়েলের অনাগ্রহ বাড়তে থাকলেও বসতি সম্প্রসারণ ঠেকাতে ব্রিটেন এত দিন কার্যকর নীতি নিতে পারেনি। ১৯৬৭ সালের পর ইসরায়েলি প্রশাসনের অধীনে চলে যাওয়া ভূখণ্ড থেকে আসা পণ্যে যুক্তরাজ্য-ইসরায়েল বাণিজ্য চুক্তির আওতায় অগ্রাধিকারমূলক শুল্ক সুবিধা ছিল না। ব্যবসায়ীদেরও বসতি এলাকায় বাণিজ্য না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অনেক প্রতিষ্ঠান তা উপেক্ষা করেছে।
এসব বিষয়ে আইনি জটিলতাও ছিল। যুক্তরাজ্যের প্রচলিত নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থায় বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার সঙ্গে যুক্ত কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হলেও শুধু ইসরায়েলি বসতি নির্মাণে কাজ করার কারণে কোনো ঠিকাদারকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা যেত না।
এই নৈতিক ও আইনি জটিলতার মধ্যেই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন মিলিব্যান্ড, যিনি নিজেও একজন ইহুদি। দায়িত্ব নেওয়ার পরই তিনি বলেন, আরও মানুষের দুর্ভোগ এবং দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান ধ্বংসের প্রক্রিয়ার সামনে যুক্তরাজ্য নীরব দর্শক হয়ে থাকতে পারে না।
মিলিব্যান্ডের অবস্থানের পেছনে তার ব্যক্তিগত ইতিহাসও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে ক করা হচ্ছে। তার মা ম্যারিয়ন কোজাক ছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হলোকাস্ট তথা ইহুদি নিধন থেকে বেঁচে যাওয়া একজন নারী, যিনি পরে ইসরায়েলে চলে যান। ফলে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন প্রশ্নে বেড়ে ওঠা এবং ইহুদিবিদ্বেষের শিকার মানুষের প্রতি সহমর্মিতা মিলিব্যান্ডকে ইসরায়েলের একজন ‘সমালোচনামূলক বন্ধু’ হিসেবে কথা বলার বিশেষ অবস্থান দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি ব্রিটিশ লেবার সরকারের বিরুদ্ধে ‘ইহুদিবিদ্বেষে আক্রান্ত’ হওয়ার অভিযোগ তুললেও মিলিব্যান্ডের অবস্থান ভিন্ন। তার যুক্তি, ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং পূর্ণাঙ্গ দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান।
মিলিব্যান্ড আরও বলেছেন, ইসরায়েলি সরকারের কর্মকাণ্ডের জন্য পুরো ইহুদি জনগোষ্ঠীকে দায়ী করা ইহুদিবিদ্বেষেরই একটি রূপ।
পশ্চিম তীরে চলমান পরিস্থিতিকে ‘জাতিগত নিধন’ হিসেবে বর্ণনা করা প্রথম ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিলিব্যান্ড। একই সঙ্গে তিনি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের পর্যায়ে পড়তে পারে এমন কর্মকাণ্ডে চোখ বন্ধ রাখার অভিযোগও তুলেছেন।
২০২৪ সালের জুনে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) ইসরায়েলের দখলদারিত্বকে বেআইনি বলে যে পরামর্শমূলক মতামত দিয়েছিল, সেটির বিষয়ে ব্রিটিশ সরকারের দীর্ঘ বিলম্বেরও অবসান ঘটান মিলিব্যান্ড। তিনি স্বীকার করেন, শুধু বসতি নয়, পুরো দখলদারিত্বই আইসিজের মতামতে বেআইনি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
এই অবস্থান যুক্তরাজ্যের ওপর দখলদারিত্বে সহায়তা না করার আরও শক্তিশালী দায় তৈরি করতে পারে। এ কারণেই নিষেধাজ্ঞার আওতায় অবৈধ বসতিগুলোর জন্য বিমা সরবরাহের মতো কিছু সেবাও রাখা হয়েছে।
সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দ্য গার্ডিয়ান দেখছে ফ্রান্স ও কানাডাকে একই ধরনের বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞায় যুক্ত করার উদ্যোগকে। এতে ইসরায়েলের পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হতে পারে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির বিচ্ছিন্নতাও আরও স্পষ্ট হতে পারে।
তবে মিলিব্যান্ডের উদ্যোগের কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে বলে মনে করে দ্য গার্ডিয়ান। গাজায় গণহত্যা হয়েছে কি না, সে সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক আদালতের ওপরই ছেড়ে দিয়েছে ব্রিটিশ সরকার। একইভাবে গাজায় জাতিগত নিধনের বিষয়ে প্রমাণ বাড়লেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালতের ওপর নির্ভর করছে।
ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস ও ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্টকে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ থেকে রক্ষার জন্যও ব্রিটেন কোনো সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেয়নি।
এ ছাড়া ইসরায়েলের কাছে ব্রিটিশ অস্ত্র বিক্রির ক্ষেত্রেও পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়নি। এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের যন্ত্রাংশ বিক্রির ক্ষেত্রে একটি ছাড় বহাল রয়েছে। মিলিব্যান্ডের যুক্তি, এসব যুদ্ধবিমান দখলদারিত্বে উল্লেখযোগ্যভাবে সহায়তা করে ন।
মিলিব্যান্ড বয়কট, ডাইভেস্টমেন্ট অ্যান্ড স্যাংশনস বা বিডিএস আন্দোলনেরও সমালোচনা করেছেন। তার মতে, এই আন্দোলন পুরো ইসরায়েলি অর্থনীতিকে লক্ষ্য করে, শুধু দখলকৃত অঞ্চলকে নয়।
দ্য গার্ডিয়ানের মতে, নতুন নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়নে প্রায় নয় মাস সময় লাগতে পারে। রাশিয়ার ক্রিমিয়া দখলের পর নিষেধাজ্ঞা আরোপের তুলনায় এটিও ধীরগতির।
তবু সাবেক মন্ত্রী অ্যালান ডানকান ভলেন, অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সন্ত্রাসের মুখে ব্রিটিশ সরকারের এমন পদক্ষেপ নজিরবিহীন নৈতিক সাহসের পরিচয় দিয়েছে।
দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণ, এই নীতির কারণে হোয়াইট হাউস থেকে পাল্টা চাপ আসার ঝুঁকি রয়েছে। তবে ইরানকে ঘিরে যুদ্ধের পর ট্রাম্প প্রশাসন নিজেই রাজনৈতিক জটিলতায় আটকে থাকায় ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর পাশে কতটা দৃঢ়ভাবে দাঁড়াবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। দীর্ঘদিনের নিষ্ক্রিয়তার পর মিলিব্যান্ড ঝুঁকি নিয়েছেন। যখন গাজায় বিপুল প্রাণহানি ও দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান যখন চরম সংকটে, তখন এমন ঝুঁকি নেওয়ার সময়ই হয়তো এসেছে।