img

ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা : মাদক শুধু ব্যক্তি নয়, পুরো পরিবার ও সমাজকে ধ্বংস করে

প্রকাশিত :  ১৯:১৮, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা : মাদক শুধু ব্যক্তি নয়, পুরো পরিবার ও সমাজকে ধ্বংস করে

শায়খ আনিসুল হক

মাদক শুধু একজন ব্যক্তির জীবন ধ্বংস করে না, এটি পরিবার, সমাজ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপরও ভয়াবহ প্রভাব ফেলে। তাই তরুণদের মাদকের ফাঁদ থেকে রক্ষায় পরিবার, মসজিদ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গোটা কমিউনিটিকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

১১ সেপ্টেম্বর শুক্রবার জুমার খুতবায় এসব কথা বলেন ইস্ট লন্ডন মসজিদের সিনিয়র ইমাম শায়খ আনিসুল হক।

তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে মাদকের ব্যবহার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। মাদক গ্রহণ, কেনাবেচা এবং এর সঙ্গে জড়িত অপরাধ বহু তরুণের জীবন নষ্ট করছে, পরিবার ভেঙে দিচ্ছে এবং অনেককে অকাল মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে ২০২৪ সালে মাদকের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু নিবন্ধিত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর মধ্যে তিন হাজার সাতশর বেশি মৃত্যু মাদকের অপব্যবহারের সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, যারা সেই শোক বহন করে।

শায়খ আনিসুল হক বলেন, মাদকের পথে যাত্রা অনেক সময় কৌতূহল, বন্ধুদের সঙ্গে মানিয়ে চলার চেষ্টা, একাকিত্ব, পারিবারিক সমস্যা কিংবা মানসিক চাপ থেকে শুরু হয় । কিন্তু কৌতূহল ধীরে ধীরে আসক্তি এবং অপরাধের দিকে নিয়ে যেতে পারে।

তিনি বলেন, মাদক ব্যবসার সঙ্গে গ্যাং, শোষণ ও সহিংসতার সম্পর্কও উপেক্ষা করা যায় না। অনেক তরুণকে প্রথমে বন্ধুত্বের নামে খাবার, দামি জুতা বা পোশাক দিয়ে কাছে টানা হয় । পরে ছোট কোনো কাজের অনুরোধ করা হয়—যেমন একটি ব্যাগ নির্দিষ্ট ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়া। এভাবেই বন্ধুত্ব একসময় বাধ্যবাধকতা ও শোষণে পরিণত হয়।

তিনি বলেন, এসব তরুণ আমাদের অচেনা কেউ নয় । তারা আমাদের মসজিদে আসে, স্কুল-কলেজে পড়ে, আমাদের রাস্তায় চলাফেরা করে এবং অনেক সময় আমাদের নিজেদের ঘরের সন্তান।

পরিবারের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, তরুণরা বিপদে পড়ার আগেই তাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। কোনো তরুণ যদি বাবা-মা, শিক্ষক বা ইমামের কাছে গিয়ে বলে, “আমি সমস্যায় আছি”, তাহলে তাকে রাগ বা অপমানের পরিবর্তে সহানুভূতি ও সহায়তা দিতে হবে।

শায়খ আনিসুল হক বলেন, ইসলাম বিপদ ঘটার পর শুধু শোক করতে বলে না, বরং আগেই মানুষকে ধ্বংস থেকে রক্ষা করতে শিক্ষা দেয়। পবিত্র কুরআনের সূরা আল-বাকারার ১৯৫ নম্বর আয়াত উল্লেখ করে তিনি বলেন, আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “নিজেদেরকে নিজেদের হাতে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করো না।”

তিনি বলেন, মাদক শুধু শরীরের ক্ষতি করে না; এটি মানুষের বিচারবুদ্ধি দুর্বল করে, পারিবারিক সম্পর্ক নষ্ট করে এবং একসময় জীবনের ওপরই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। শিশু-কিশোরদের শুধু “মাদক হারাম” বললেই দায়িত্ব শেষ হয় না। তাদের বুঝাতে হবে কেন আল্লাহ এটি হারাম করেছেন এবং তাদের জীবন, শরীর, মেধা, পরিবার ও ঈমান আল্লাহর দেওয়া আমানত।

মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কেউ ভুল পথে চলে গেলে তাকে অপমান করা বা মসজিদ থেকে দূরে ঠেলে দেওয়া উচিত নয়। পাপকে ঘৃণা করতে হবে, কিন্তু মানুষকে নয়।

আল্লাহর রহমতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি সূরা জুমারের ৫৩ নম্বর আয়াত উদৃত করেন: “হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর সীমালঙ্ঘন করেছ, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।”

মাদক ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে শায়খ আনিসুল হক বলেন, “আল্লাহকে ভয় করুন। মাদক ব্যবসার মাধ্যমে অর্জিত অর্থ তথাকথিত হালাল ব্যবসার মাধ্যমে বৈধ দেখানোর চেষ্টা করলেও আল্লাহর কাছ থেকে কিছুই গোপন নয়।”

তিনি বলেন, দামি গাড়ি, পোশাক, বড় বাড়ি কিংবা বিলাসবহুল জীবন সাময়িক আনন্দ দিতে পারে, কিন্তু অপরাধের জীবন প্রকৃত শান্তি দেয় না।

খুতবার শেষদিকে তিনি বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু পুলিশের দায়িত্ব নয়। পরিবার, মসজিদ, স্কুল, শিক্ষক, ইমাম এবং গোটা কমিউনিটিকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তরুণদের সময়, ভালোবাসা, দিকনির্দেশনা ও নিরাপদ পরিবেশ দিতে হবে, যাতে ভুল মানুষ তাদের জীবনে জায়গা করে নিতে না পারে।

শায়খ আনিসুল হক : সিনিয়র ইমাম, ইস্ট লন্ডন মস্ক এন্ড লন্ডন মুসলিম সেন্টার।

কমিউনিটি এর আরও খবর

img

লন্ডন মহানগর জমিয়তের উদ্যোগে শায়খ ইমদাদুল্লাহ রহ.-এর জীবন ও কর্ম শীর্ষক ভার্চুয়াল আলোচনা ও দোয়া মাহফিল

প্রকাশিত :  ১৯:৩০, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ইউকে, লন্ডন মহানগর শাখার উদ্যোগে শায়খে কাতিয়া রহ.-এর জ্যেষ্ঠ পুত্র, হযরত ফেদায়ে মিল্লাত রহ.-এর খলিফা, জগন্নাথপুর উপজেলা জমিয়তের সাবেক সহ-সভাপতি এবং কাতিয়া মাদ্রাসার মুহতামিম হাফিজ মাওলানা শায়খ ইমদাদুল্লাহ রহ.-এর জীবন, ইলমি ও দ্বীনি খেদমত এবং বহুমুখী কর্মময় জীবন নিয়ে এক ভার্চুয়াল আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) অনুষ্ঠিত এ ভার্চুয়াল আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলে সভাপতিত্ব করেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ইউকে, লন্ডন মহানগর শাখার সভাপতি মাওলানা আশফাকুর রহমান। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন লন্ডন মহানগর জমিয়তের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ রিয়াজ আহমদ।

আলোচনা সভায় বক্তারা মরহুম হাফিজ মাওলানা শায়খ ইমদাদুল্লাহ রহ.-এর বর্ণাঢ্য জীবন, ইলমি মেহনত, দ্বীনি খেদমত, আখলাক, আমল, বিনয়, ইখলাস এবং মানুষের কল্যাণে তাঁর অবদানের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।

বক্তারা বলেন, হাফিজ মাওলানা শায়খ ইমদাদুল্লাহ রহ. ছিলেন পদ-পদবির প্রতি সম্পূর্ণ অনাসক্ত, অত্যন্ত মুখলিস, পরহেজগার ও আল্লাহওয়ালা একজন বুযুর্গ। ইলম ও আমলের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা তাঁর জীবন ছিল সুন্নাতের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও পাবন্দির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি তাঁর পিতা, আশিকে মাদানি রহ. মাওলানা আমিন উদ্দীন শায়খে কাতিয়া রহ.-এর সুন্নতি আমল, আদর্শ ও দ্বীনি মেজাজকে নিজের জীবনে ধারণ করেন এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেন।

বক্তারা আরও বলেন, শায়খ ইমদাদুল্লাহ রহ.-এর জীবন ছিল নীরব দ্বীনি খেদমত, ইখলাস ও আত্মত্যাগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনি ব্যক্তিগত জীবনের পাশাপাশি মাদরাসা, তালিম-তরবিয়ত ও দ্বীনি কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দীর্ঘ সময় মানুষের মাঝে দ্বীনের খেদমত করে গেছেন। তাঁর ইন্তেকালে পরিবার, আত্মীয়স্বজন, ছাত্র-শিষ্য এবং বৃহত্তর উলামায়ে কেরাম ও জমিয়তের অঙ্গনে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।

আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন—জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ও ইউকে জমিয়তের প্রধান উপদেষ্টা মাওলানা শায়খ আসগর হোসাইন; জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও জামিয়া ইসলামিয়া হুসাইনিয়া আরজাবাদ মাদ্রাসার মুহতামিম মাওলানা বাহাউদ্দীন যাকারিয়া; কেন্দ্রীয় জমিয়তের যুগ্ম মহাসচিব ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ইউকের সভাপতি ড. মাওলানা শুয়াইব আহমদ; শায়খে কাতিয়া রহ.-এর সুযোগ্য উত্তরসূরি মাওলানা ইউসুফ আমিনী; জগন্নাথপুর উপজেলা জমিয়তের সভাপতি মাওলানা সৈয়দ মাসরুর আহমদ ক্বাসেমী; কেন্দ্রীয় জমিয়তের সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মাওলানা সৈয়দ তামীম আহমদ; ইউকে জমিয়তের সহ-সভাপতি হাফিজ হোসাইন আহমদ বিশ্বনাথী; ইউকে জমিয়তের জেনারেল সেক্রেটারি মাওলানা সৈয়দ নাঈম আহমদ; জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ওমান শাখার সভাপতি মাওলানা রশীদ আহমদ; সাবেক সেক্রেটারি মাওলানা আব্দুল হালীম সাতবাকী এবং সেক্রেটারি মাওলানা জাহেদ নাসির।

এছাড়াও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন লন্ডন মহানগর জমিয়তের উপদেষ্টা মাস্টার আব্দুর রউফ, সহ-সভাপতি হাফিজ জিয়াউদ্দীন, সহ-সভাপতি হাফিজ রশীদ আহমদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাওলানা নাজমুল হাসান, তাফসিরুল কুরআন বিষয়ক সম্পাদক মুফতি ওলিউর রহমান, প্রচার সম্পাদক হাফিজ মাওলানা আব্দুল হাই, সহ-প্রচার সম্পাদক মাওলানা জাবির হুসাইন, ওয়েলফেয়ার সম্পাদক মাওলানা দিলওয়ার হোসাইন, সৈয়দ আল আমীন, হাফিজ মাওলানা সৈয়দ সোহাইল, মাওলানা আমিনুল ইসলাম রাজু, শায়খে কাতিয়ার সুযোগ্য নাতি মাওলানা নোমান আহমদ, মরহুম হাফিজ মাওলানা শায়খ ইমদাদুল্লাহ রহ.-এর জ্যেষ্ঠ পুত্র মাওলানা মুবাশ্বির আহমদ ও মেঝো পুত্র মাওলানা মুদ্দাসসির আহমদসহ জমিয়তের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ, উলামায়ে কেরাম ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে মরহুম হাফিজ মাওলানা শায়খ ইমদাদুল্লাহ রহ.-এর রূহের মাগফিরাত, মর্যাদা বৃদ্ধি এবং তাঁর সকল দ্বীনি খেদমত কবুলের জন্য বিশেষ দোয়া করা হয়। একই সঙ্গে তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবার, আত্মীয়স্বজন, ছাত্র-শিষ্য ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের জন্যও সবর ও উত্তম প্রতিদানের দোয়া করা হয়।


কমিউনিটি এর আরও খবর