img

বাংলাদেশে নতুন প্রজাতির মুরগি উদ্ভাবন

প্রকাশিত :  ১৬:১৭, ০৮ আগষ্ট ২০২১
সর্বশেষ আপডেট: ১৬:২৩, ০৮ আগষ্ট ২০২১

বাংলাদেশে নতুন প্রজাতির মুরগি উদ্ভাবন

জনমত ডেস্ক: খামারে পালন করা হলেও দেখতে আর স্বাদে- গুণে প্রায় দেশি মুরগির মতোই - এমন এক মুরগির প্রজাতি উদ্ভাবনও করেছেন বাংলাদেশের একদল গবেষক। আর তা করা হয়েছে দেশি মুরগির জাত থেকেই। এ নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিবিসি বাংলা।

'বাউ ব্রো মুরগি' বা 'বাউ মুরগি' নাম দিয়ে নতুন জাতের এই মুরগির দুটি স্ট্রেইন বা জাত উদ্ভাবন করেছেন বাংলাদেশের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক ।

এই গবেষণা দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পোলট্রি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আশরাফ আলী (অবসরপ্রাপ্ত) ও অধ্যাপক ড. বজলুর রহমান মোল্যা।

অধ্যাপক ড. বজলুর রহমান মোল্যা বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, ''অনেকগুলো স্থানীয় জাতের জার্মপল্গাজম ব্যবহার করে আমরা দুইটা জাত উদ্ভাবন করতে পেরেছি, যেগুলো ফার্মে পালন করা সম্ভব। এগুলোর স্বাদ প্রায় দেশি মুরগির মতোই, সুস্বাদু।''

পাকিস্তানি কক বা সোনালী মুরগীর চাহিদা দ্রুত বাড়ছে বাংলাদেশে

ঔষধি গুণের কালো মুরগির চাষ করছেন বাংলাদেশের যে খামারিরা

প্রচলিত ব্রয়লার মুরগির মতোই ঘরে এগুলো লালন-পালন করা যাবে। ছয় সপ্তাহ বা দেড়মাস বয়স হলেই সেগুলো বাজারজাত করা যাবে।

বর্তমানে সীমিত আকারে বাণিজ্যিকভাবে এই মুরগি বাজারজাত করা শুরুও হয়েছে।

বাউ সাদা ও বাউ রঙিন

গবেষকরা যে দুইটি জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে, তার নাম দেয়া হয়েছে 'বাউ সাদা' আর 'বাউ রঙিন'। অর্থাৎ একটি মুরগি সাদা রঙের হয়ে থাকে, আরেকটা রঙিন। সাদা বাউ প্রচলিত ব্রয়লার মুরগির চেয়ে একটু শক্ত। তবে রঙিন জাতটির স্বাদ একেবারে দেশি মুরগির মতো।

দেড় মাস সময়ে একেকটা মুরগির ওজন হয়ে থাকে গড়ে ৯০০ গ্রাম থেকে এক কেজি পর্যন্ত।

অধ্যাপক ড. বজলুর রহমান মোল্যা বলছেন, ''দেশি মুরগির জাত থেকে এগুলো উদ্ভাবন হওয়ায় আমাদের দেশের আলো বাতাসে এরা সহজেই খাপ খাইয়ে নিতে পারে। এদের রোগ-বালাই কম হয়। অতিরিক্ত টিকা বা অ্যান্টিবায়োটিক দিতে হয় না।''

ঢাকার ধানমণ্ডির একজন বাসিন্দা, নাজমা আক্তার অনলাইন ভিত্তিক একটি ওয়েবসাইট থেকে এই মুরগি কিনে খেয়েছেন।

তিনি বলেন, মাংসটা দেশি মুরগির মতোই কিছুটা শক্ত, অনেকটা একই রকম স্বাদ। তবে বাজারে দেশি মুরগির যেরকম দাম, তারে চেয়ে দামে বেশ কম পড়ে। 

তিনি জানান, পরিবারের যেসব সদস্যরা ব্রয়লার মুরগি খেতে পছন্দ করেন না, তারাও এই মুরগির মাংস বেশ মজা করে খেয়েছেন।

যেভাবে গবেষণার শুরু

গবেষক অধ্যাপক ড. বজলুর রহমান মোল্লা জানান,২০০২ সালে তারা বিকল্প এই জাতের উদ্ভাবনের কাজ শুরু করেন ।

তিনি বলেন, অনেকে ব্রয়লার মুরগি খেতে পছন্দ করেন না। কিন্তু দেশি মুরগির যোগান তো কম। তখন আমরা চিন্তা করলাম, আমাদের স্থানীয় মোরগ-মুরগি থেকে যদি এমন একটা স্ট্রেইন উদ্ভাবন করা যায়, যেটি ফার্মে লালনপালন করা যাবে, তাহলে আমিষের বিকল্প একটা উৎস তৈরি হবে। 

বিদেশি জাতের সংমিশ্রণে 'সোনালি' নামের একটি জাত এর আগে উদ্ভাবিত হলেও, সেটির স্বাদ দেশি মুরগির মতো নয়।

ফলে গবেষকরা চাইছিলেন এমন একটি জাত উদ্ভাবন করতে, যা দেশীয় মুরগির প্রজাতি থেকে আসবে। ফলে সেখানে দেশি মুরগির স্বাদ যেমন পাওয়া যাবে, তেমনি বাংলাদেশি আবহাওয়ায় তাদের টিকে থাকার ক্ষমতা হবে বেশি।

২০০৯ সালে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএনআরসি) সহায়তায় একটি প্রকল্পের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে তারা গবেষণা কার্যক্রম শুরু করেন। ২০১৪ সালে এসে তারা ঘোষণা করেন যে, স্থানীয় মুরগির জাত থেকে তারা খামারে লালনপালনের উপযোগী দুইটি জাত উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়েছেন।

বর্তমনে প্রতি মাসে এই জাতের মুরগির ৩০ হাজার বাচ্চা উৎপাদন করা হচ্ছে। তবে করোনাভাইরাস পরিস্থিতি কেটে গেলে তারা মাসে দুই লাখ বাচ্চা উৎপাদন করতে সক্ষম হবেন বলে আশা করছেন।

তবে এই জাত দুইটি ব্রয়লার মুরগির মতোই - যা শুধুমাত্র মাংসের জন্যই উৎপাদন করা যাবে, এবং এসব মুরগি থেকে ডিম হবে না।

এই জাত দুইটি বাণিজ্যিকভাবে ছড়িয়ে দিতে এই বছরের শুরুতে একটি প্রকল্পও নেয়া হয়েছে।

এসব জাতের আরেকটি সুবিধা হচ্ছে, ব্রয়লারের মতো বিদেশ থেকে মুরগির বাচ্চা আমদানি করতে হয় না। রোগে মৃত্যুর হারও অনেক কম।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এর আরও খবর

img

দেশে প্রায় ২ কোটি মানুষ থ্যালাসেমিয়ার বাহক

প্রকাশিত :  ০৭:৪০, ০৮ মে ২০২৬

থ্যালাসেমিয়া বংশগত রক্তের মারাত্মক রোগ। এ রোগের আজীবন চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হয়। থ্যালাসেমিয়া রোগীদের এখনো রক্তের জন্য হাহাকার করতে হয়। প্রতি মাসে রক্তের জোগান ও ওষুধ কিনতে একজন রোগীর সর্বনিম্ন ১৩ হাজার টাকা খরচ হয়। এতে অনেক পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে। কারণ, রোগীর অনুপাতে এখনো রক্তদাতা গড়ে ওঠেনি। একই সঙ্গে প্রতিনিয়ত বাড়ছে রোগীর সংখ্যা। দেশের প্রায় ১ কোটি ৮২ লাখ মানুষ থ্যালাসেমিয়ার বাহক। এটি মোট জনসংখ্যার ১১ দশমিক ৪ শতাংশ।

রক্তরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ রোগ নিয়ে তেমন জনসচেতনতা না থাকায় রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। দুই বাহকের মধ্যে বিয়ে হলে সন্তানদের ২৫ শতাংশ সুস্থ হয়। ৫০ শতাংশ বাহক হয় এবং বাকি ২৫ শতাংশ থ্যালাসেমিয়া রোগী হয়ে জন্ম নেয়। অন্যদিকে একজন বাহক ও একজন বাহক নন—এমন স্বামী ও স্ত্রীর সন্তানদের মধ্যে ৫০ শতাংশ বাহক না হয়ে বাকি ৫০ শতাংশ বাহক হয়ে জন্ম নেয়। থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে দুই বাহকের মধ্যে বিয়ে বন্ধ করা গুরুত্বপূর্ণ। থ্যালাসেমিয়া রোগ এবং এর প্রতিকার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রতি বছর ৮ মে ‘বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস’ পালন করা হয়। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘আর নয় আড়ালে, শনাক্ত হোক অজানা রোগী, পাশে দাঁড়াই অবহেলিতদের’।

রক্তরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রক্তের রোগ। এই রোগ হলে রক্তে হিমোগ্লোবিন উৎপাদন প্রয়োজনের চেয়ে কম পরিমাণে হয় বা একেবারেই হয় না। এই হিমোগ্লোবিন ব্যবহার করে লোহিত রক্তকণিকা দেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে অক্সিজেন সরবরাহ করে। শরীরের ভেতরে অক্সিজেন চলাচল কম হওয়ায় থ্যালাসেমিয়া আক্রান্তরা শারীরিকভাবে দুর্বল বোধ করে। তাদের ত্বক ফ্যাকাশে দেখায় এবং শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা হয়। এ ছাড়া অরুচি, জন্ডিস, বারবার সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়া, পেট ব্যথা এবং শারীরিক বৃদ্ধিতে ধীরগতির মতো উপসর্গও দেখা যায়।

বিশ্বের ১ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ থ্যালাসেমিয়া বহন করছে। অর্থাৎ ৮ থেকে ৯ কোটি মানুষ এই রোগের বাহক। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় থ্যালাসেমিয়ার প্রাদুর্ভাব ৩ থেকে ১০ শতাংশ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য মতে, দেশের প্রায় ১ কোটি ৮২ লাখ মানুষ থ্যালাসেমিয়ার বাহক। এটি মোট জনসংখ্যার ১১ দশমিক ৪ শতাংশ। গ্রামাঞ্চলে থ্যালাসেমিয়ার বাহক ১১ দশমিক ৬ শতাংশ এবং শহরে ১১ দশমিক ০ শতাংশ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, থ্যালাসেমিয়া বাহকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি রংপুরে ২৭ দশমিক ৭ শতাংশ। দ্বিতীয় স্থানে থাকা রাজশাহীতে ১১ দশমিক ৩ শতাংশ। তৃতীয় স্থানে থাকা চট্টগ্রামে ১১ দশমিক ২ শতাংশ। এ ছাড়া ময়মনসিংহে ৯ দশমিক ৮ শতাংশ, খুলনায় ৮ দশমিক ৬ শতাংশ, ঢাকায় ৮ দশমিক ৬ শতাংশ, বরিশালে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ এবং সিলেটে সবচেয়ে কম ৪ দশমিক ৮ শতাংশ। ১৪ থেকে ১৯ বছর বয়সীদের মধ্যে এই বাহক রয়েছে ১১ দশমিক ৯ শতাংশ, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে ১২ শতাংশ, ২৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে ১০ দশমিক ৩ শতাংশ এবং ৩০ থেকে ৩৫ বছর বয়সীদের মধ্যে ১১ দশমিক ৩ শতাংশ।

ব্লাড ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও সহকারী অধ্যাপক ডা. আশরাফুল হক বলেন, থ্যালাসেমিয়া নির্ণয়ের পদ্ধতি নিয়ে তার আপত্তি আছে। আমরা বলি যে, বিয়ের আগে থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষা করতে। থ্যালাসেমিয়ার বাহক নির্ণয় হলে বিয়ে ভেঙে যেতে পারে। তাই কেউ এটা করতে চাইবে না। যদি কোনো কারণে বর-কনের থ্যালাসেমিয়া ধরা পড়ে, তাহলে তাকে বোঝা হিসেবে দেখা হতে পারে। একজন থ্যালাসেমিয়া বাহক আরেকজন বাহককে বিয়ে করলেই শিশু থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে। সেক্ষেত্রে শনাক্তকরণের পদ্ধতিটি এসএসসি কিংবা এইচএসসি পরীক্ষার সময় বাধ্যতামূলক বা উৎসাহ দিয়ে করা যায়। অথবা প্রসূতি নারীদের অ্যান্টিনেটাল কেয়ারের (এএনসি) সময় মা থ্যালাসেমিয়ার বাহক কি না, সেটা জানা যাবে। এতে গর্ভের সন্তানের বিষয়ে আগেই ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। আর এসএসসি কিংবা এইচএসসির সময় কেউ বাহক হিসেবে শনাক্ত হলে তাকে সচেতন করে দেওয়া হবে যে, তুমি থ্যালাসেমিয়ার বাহক কাউকে বিয়ে না করলে তুমি ও তোমার পরবর্তী প্রজন্ম নিরাপদ থাকবে।

তিনি বলেন, আরেকটি বিষয় হলো, থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্য সরকারি হাসপাতালে এখন পর্যন্ত ট্রান্সপ্লান্ট ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি। সবকিছু করা হচ্ছে অটোলোগাস। মানে নিজে আক্রান্ত, নিজেরই বোনম্যারো দিয়ে নিজেরটা সারানোর চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু ট্রান্সপ্লান্টের মূল সাফল্য হলো অ্যালোজেনিক ট্রান্সপ্লান্ট। সেটা বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত থ্যালাসেমিয়া রোগীদের ক্ষেত্রে করতে পারিনি। এই ধরনের রোগীদের বেঁচে থাকার সুযোগ কম। একই সঙ্গে থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুরা সরকারি হাসপাতালে ডে-কেয়ার ভিত্তিতে ট্রান্সফিউশন নিতে পারে। এই সেবা দিনের বেলায় দেওয়া হয়। ফলে এসব শিশু স্কুল থেকে ঝরে পড়ে। সরকারি ডে-কেয়ারে থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্য ২৪ ঘণ্টা ট্রান্সফিউশন সেবা রাখা জরুরি। তিনি বলেন, বেশিরভাগ সরকারি মেডিকেল কলেজে থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্য আলাদা কর্নার নেই। কর্নার না থাকায় রোগীদের ব্লাড দেওয়ার জন্য অনেক বড় সিরিয়ালে পড়তে হয়। সিরিয়াল থেকে বাঁচতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে গিয়ে তাদের প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয়।

কর্মসূচি হিসেবে দিবসটি উপলক্ষে বরাবরের মতো এবারও দিনব্যাপী নানাবিধ কর্মসূচির আয়োজন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশন। আয়োজনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউছুফ ও বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কালাম আজাদ। এ ছাড়া থ্যালাসেমিয়া রোগী, অভিভাবক, রক্তদাতা, শুভানুধ্যায়ী, গণমাধ্যম প্রতিনিধিসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এই আয়োজনে অংশ নেবেন।


বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এর আরও খবর