img

সন্তান নিতে সহকর্মীকে শুক্রাণু দানের প্রস্তাব দেন ইলন

প্রকাশিত :  ১১:১৬, ০৭ মে ২০২৬

সন্তান নিতে সহকর্মীকে শুক্রাণু দানের প্রস্তাব দেন ইলন

ওপেনএআইয়ের সাবেক বোর্ড সদস্য শিবন জিলিস ইলন মাস্ক ও স্যাম অল্টম্যানের একটি মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন । তিনি ইলন মাস্কের চার সন্তানের মা। কোম্পানির আদর্শিক বিচ্যুতি সংক্রান্ত এ মামলায় ক্যালিফোর্নিয়ার স্থানীয় সময় বুধবার তিনি সাক্ষ্য দেন।

মাস্কের অভিযোগ, আদর্শিক বিচ্যুতির মাধ্যমে স্যাম অল্টম্যান ওপেনএআইকে একটি লাভজনক কোম্পানিতে রূপান্তর করেছেন। ওকল্যান্ডের ফেডারেল আদালতে এ মামলায় সাক্ষ্য দেওয়ার সময় জিলিস ওপেনএআইকে লাভজনক কোম্পানি করার প্রাথমিক আলোচনায় নিজের সম্পৃক্ততা এবং ইলন মাস্কের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের কথা তুলে ধরেন। একইসঙ্গে জানান, মাস্কের প্রস্তাবে রাজি হয়ে কীভাবে তিনি চার সন্তানের মা হয়েছেন।

আদালতকে জিলিস জানান, তিনি সবসময়ই মা হতে চেয়েছিলেন। ঠিক সে সময়ই ইলন মাস্ক তাঁকে একটি প্রস্তাব দেন। ২০২০ সালে মাস্ক তাঁকে স্পার্ম ডোনেশন বা শুক্রাণু দান করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। জিলিস আরও বলেন, ‘মাস্ক লক্ষ্য করেছিলেন, পরিচিতদের মধ্যে কেবল আমার কোনো সন্তান নেই। তাই তিনি নিজেই এই প্রস্তাবটি দিয়েছিলেন।’

জিলিস গত ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে সিলিকন ভ্যালিতে ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট হিসেবে কাজ করছেন। এর পাশাপাশি তিনি মাস্কের বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলা এবং নিউরোটেকনোলজি প্রতিষ্ঠান নিউরালিঙ্ক-এর উচ্চপদস্থ নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৬ সালে ওপেনএআই প্রতিষ্ঠার অল্প সময় পরই জিলিস এতে উপদেষ্টা হিসেবে যোগ দেন। বুধবার তিনি আদালতকে জানান, এই কাজের মাধ্যমেই মাস্কের সঙ্গে তাঁর প্রথম পরিচয় হয়। 

মাস্কের বিভিন্ন কোম্পানি এবং ওপেনএআইতে জিলিসের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। বিশেষ করে ২০২০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত তিনি ওপেনএআই-এর পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ কারণে বর্তমান বিচার প্রক্রিয়ায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী।

ওপেনএআই-এর আইনজীবীরা জানান, এই কোম্পানি প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মাস্ক। তিনি বড় ধরনের অনুদান দিয়েছিলেন। কিন্তু ২০১৮ সালে কোম্পানি থেকে পদত্যাগ করেন। অভিযোগ উঠেছে, ওই সময় জিলিস কোম্পানির গোপন তথ্য মাস্কের কাছে পাচার করেছিলেন। ২০২৩ সালের মার্চ মাসে জিলিস ওপেনএআইয়ের বোর্ড থেকে পদত্যাগ করেন। ঠিক সে সময় মাস্ক তাঁর নতুন এআই কোম্পানি এক্সএআই চালু করেন। পরে এর চ্যাটবট (গ্রোক) বাজারে চ্যাটজিপিটির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামে।

ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয়ে জিলিস জানান, প্রায় এক দশক আগে মাস্কের সঙ্গে তাঁর একবার ‘রোমান্টিক’ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। তবে ২০২০ সালে, যখন মাস্ক তাঁকে সন্তান নেওয়ার প্রস্তাব দেন, তখন তাঁদের মধ্যে কোনো রোমান্টিক সম্পর্ক ছিল না। স্বাস্থ্যগত কিছু জটিলতার কারণে তিনি বিয়ে করে সন্তান নেওয়ার চিন্তা এক সময় বাদ দিয়েছিলেন। কিন্তু মাস্ক শুক্রাণু দানের প্রস্তাব দিলে সেটি গ্রহণ করেন।

মামলা কী নিয়ে 

ইলন মাস্কের অভিযোগ অনুযায়ী, ওপেনএআইকে অলাভজনক সংস্থা থেকে বাণিজ্যিক কোম্পানিতে রূপান্তর করেছেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট গ্রেগ ব্রকম্যান ও সিইও স্যাম অল্টম্যান। এর মাধ্যমে তারা দুজন মিলে একটি ‘চ্যারিটি’ চুরি করেছেন। কারণ, প্রতিষ্ঠার সময় এটিকে লাভজনক না করার অঙ্গীকার ছিল। বাণিজ্যিক করে তারা মানবজাতির কল্যাণে কাজ করার মৌলিক অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছেন।

এ মামলায় গত মঙ্গলবার সাক্ষ্য দেন মাস্ক। তখন তিনি অল্টম্যানের বিরুদ্ধে করপোরেট প্রতারণার অভিযোগ আনেন। তিনি দাবি করেন, মুনাফার পেছনে ছুটতে গিয়ে অল্টম্যান মানবজাতিকে ঝুঁকির মুখে ফেলছেন।

মামলার বিচার চলাকালে জিলিস, অল্টম্যান, মাস্ক এবং ওপেনএআইয়ের আরেক সহপ্রতিষ্ঠাতা গ্রেগ ব্রকম্যানের মধ্যে আদান-প্রদান করা ইমেল ও টেক্সট মেসেজ আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে। ওপেনএআই-এর আইনজীবীরা এই তথ্যগুলো ব্যবহার করে দেখানোর চেষ্টা করছেন, কোম্পানিটির করপোরেট কাঠামো পরিবর্তনের আলোচনা অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছিল।

আদালতে দেখানো নথিপত্র অনুযায়ী, ২০১৭ সালের প্রথম দিকে একটি পূর্ণাঙ্গ অলাভজনক সংস্থা হিসেবে টিকে থাকা অসম্ভব মনে হতে থাকে। বিনিয়োগকারীদের কাছে থেকে শত শত কোটি ডলার সংগ্রহের প্রয়োজনে কাঠামো পরিবর্তন অপরিহার্য হয়ে পড়ে। এ সম্পর্কিত আলোচনায় মাস্ক নিজেও যুক্ত ছিলেন।

ব্রকম্যান এবং ওপেনএআই-এর আরেক সহপ্রতিষ্ঠাতা ইলিয়া সুতস্কেভার তখন সংস্থাটিকে একটি ‘বি কর্প’-এ রূপান্তরের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। বি কর্প হলো এমন এক ধরনের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান যা মুনাফার পাশাপাশি নির্দিষ্ট কোনো সামাজিক বা সেবামূলক লক্ষ্য পূরণে দায়বদ্ধ থাকে।

জিলিসের পাঠানো কিছু ইমেল থেকে জানা যায়, মাস্ক ওপেনএআই-এর ওপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ চেয়েছিলেন। তিনি বোর্ডে আরও সদস্য বাড়াতে এবং এমনকি ওপেনএআইকে টেসলার অধীনে একটি ‘বি কর্প’ সাবসিডিয়ারি কোম্পানি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। একটি লিখিত বার্তায় জিলিস জানিয়েছিলেন, ওপেনএআই যদি টেসলার অংশ হয়, তবে অর্থায়ন সংকটের তাৎক্ষণিক সমাধান হতো।


বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এর আরও খবর

img

ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ এল নিনোর আশঙ্কা

প্রকাশিত :  ০৬:০৬, ২৩ জুন ২০২৬

নীল প্রশান্ত মহাসাগরের শান্ত বুকে নিঃশব্দে জেগে উঠছে এক রুদ্র প্রকৃতির মহাকাব্য। যে সমুদ্রের ঢেউয়ে একদিন পেরুর জেলেরা বড়দিনের রাতে পরম মায়া আর বিস্ময়ে নাম রেখেছিল ‘এল নিনো’ বা ‘শিশু যিশু’, সেই এল নিনোই এবার রূপ নিতে যাচ্ছে পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম প্রলয়ঙ্করী এক জলবায়ু খ্যাপামিতে।    

বিশ্ব জুড়ে আবহাওয়া ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে সক্ষম জলবায়ুগত ঘটনা এল নিনো আবারও শুরু হয়েছে । সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এনওএএ) নতুন এল নিনোর সূচনার ঘোষণা দিয়েছে।

বিজ্ঞানীদের পূর্বাভাস বলছে, এবারের এল নিনো অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিতে পারে। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা, খরা, তাপপ্রবাহ, দাবানল ও খাদ্যসংকটের ঝুঁকি বাড়তে পারে।আবহাওয়াবিদদের মতে, এবারের এল নিনো যদি পূর্বাভাস অনুযায়ী শক্তিশালী হয়, তাহলে এটি গত ৭৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর এল নিনো হতে পারে । বিশেষ করে আফ্রিকা, মধ্য আমেরিকা, ক্যারিবীয় অঞ্চল এবং এশিয়ার কিছু অংশে খরা ও বন্যা পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ আকার নিতে পারে । শত শত বছর আগে পেরুর জেলেরা লক্ষ্য করেছিলেন, কয়েক বছর পরপর বড়দিনের সময় প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলে অ্যাঙ্কোভি মাছ হঠাৎ কমে যায় । তারা এ ঘটনাকে ‘এল নিনো\' নামে অভিহিত করেন, যার অর্থ ‘শিশু যিশু\'।

বর্তমানে এল নিনোকে একটি বৈশ্বিক জলবায়ুগত চক্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি নিরক্ষীয় প্ৰশান্ত মহাসাগরের ওপর দিয়ে প্রবাহিত বায়ুর গতিপথ পরিবর্তনের ফলে সৃষ্টি হয়। এতে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যায় এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়ার ধরন বদলে যায়। এল নিনোর শক্তি নির্ধারণ করা হয় সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা কতটা বেড়েছে তার ওপর। সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি গড়ের তুলনায় দুই ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে সেটিকে শক্তিশালী এল নিনো ধরা হয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আবহাওয়া মডেলের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের বাকি সময় এবং ২০২৭ সালের শুরুর দিকে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা গড়ে ২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি, এমনকি ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও ওপরে উঠতে পারে ।

এখন পর্যন্ত সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো ছিল ১৯৮২-৮৩ সালের, যখন তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছিল ২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এবারের এল নিনো সেই রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এল নিনো নিজে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্টি হয় না। তবে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সঙ্গে মিলিত হয়ে এর প্রভাব আরো তীব্র হয়ে ওঠে। ১৯৯৭-৯৮ সালের শক্তিশালী এল নিনোর পর ১৯৯৮ সাল সে সময়ের সবচেয়ে উষ্ণ বছর হিসেবে রেকর্ড গড়েছিল। একইভাবে ২০১৫-১৬ সালের এল নিনোর পর ২০১৬ সালে নতুন রেকর্ড তৈরি হয়। বর্তমানে ২০২৪ সাল সবচেয়ে উষ্ণ বছর হিসেবে রেকর্ডধারী। সে বছর বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের তুলনায় ১ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। জলবায়ু মডেল অনুযায়ী, ২০২৭ সাল আরো উষ্ণ হতে পারে। এল নিনোর প্রভাব সব অঞ্চলে এক রকম হয় না। কোথাও খরা দেখা দেয়, আবার কোথাও অতিবৃষ্টি ও বন্যা হয়।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) গত ৯ জুন সতর্ক করে বলেছে, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং সাহেল অঞ্চলের মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। এর আগে ২০২৩-২৪ সালের এল নিনোর সময় দক্ষিণ আফ্রিকায় এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ খরা দেখা গিয়েছিল। এফএওর মতে, সোমালিয়ায় অক্টোবর পর্যন্ত খরা চলতে পারে। এরপর ডিসেম্বর পর্যন্ত ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। তবে দীর্ঘ খরার পর অতিবৃষ্টি পরিস্থিতি আরো খারাপ করতে পারে । কারণ শুকিয়ে যাওয়া মাটিতে বৃষ্টির পানি সহজে শোষিত হয় না, ফলে আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়। মধ্য আমেরিকা, ক্যারিবীয় অঞ্চল এবং এশিয়ার বিভিন্ন এলাকাও খরার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে সতর্ক করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক অঞ্চল এরই মধ্যে যুদ্ধ, খাদ্যসংকট ও অর্থনৈতিক সংকটে ভুগছে। এমন পরিস্থিতিতে শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলতে পারে। ইরানকে ঘিরে সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জটিলতার কারণে সার সরবরাহেও চাপ তৈরি হয়েছে। এতে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে ।

ইউরোপীয় কমিশন সতর্ক করেছে, সুদান, সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদান, চাদ, ইকুয়েডর, ভেনেজুয়েলা ও হাইতির মতো দেশগুলো মানবিক সংকটের মুখে পড়তে পারে। এল নিনো বিশ্বের প্রভাবশালী জলবায়ুগত ঘটনাগুলোর একটি। ১৯৯৭-৯৮ এবং ২০১৫-১৬ সালের শক্তিশালী এল নিনো বিশ্বের বহু অঞ্চলে ভয়াবহ খরা, বন্যা এবং খাদ্যসংকট সৃষ্টি করেছিল । এবারও বিজ্ঞানীরা একই ধরনের ঝুঁকির কথা বলছেন। পূর্বাভাস সত্যি হলে ২০২৭ সালে বৈশ্বিক তাপমাত্রা নতুন রেকর্ড গড়তে পারে এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা-খরা পরিস্থিতি আরো তীব্র হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এল নিনোর প্রভাব পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব না হলেও ক্ষতির পরিমাণ কমানো যায় । খরাসহিষ্ণু বীজ ব্যবহার, গবাদিপশুর জন্য খাদ্য ও পানি সংরক্ষণ এবং আগাম দুর্যোগ প্রস্তুতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে ।


বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এর আরও খবর