img

ক্যানসারের চিকিৎসায় আশার আলো: নতুন ইনজেকশনে সম্পূর্ণ টিউমার নির্মূল সম্ভব

প্রকাশিত :  ০৭:৪১, ০১ জুন ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৭:৫১, ০১ জুন ২০২৬

ক্যানসারের চিকিৎসায় আশার আলো: নতুন ইনজেকশনে সম্পূর্ণ টিউমার নির্মূল সম্ভব

চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা ক্যানসারবিরোধী নতুন এক ইনজেকশনের পরীক্ষা চালিয়েছেন, যা রোগীর শরীরে থাকা সম্পূর্ণ টিউমার নির্মূল করে দিতে পারে। চিকিৎসকরা এই ফলাফলকে ‘অভূতপূর্ব’ এবং গবেষকরা একে ‘নজিরবিহীন’ বলে অভিহিত করেছেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বের ১১টি দেশে আন্তর্জাতিক ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় (ট্রায়াল) এমন রোগীর শরীরে এই ইনজেকশন দেওয়া হয়, যাদের ক্যানসার ছড়িয়ে পড়েছে বা পুনরায় ফিরে এসেছে এবং অন্যান্য চিকিৎসায় যাদের কোনো সুফল পাওয়া যায়নি। ফলাফলে দেখা গেছে, ‘অ্যামিভ্যান্টাম্যাব’ নামের এই ইনজেকশন এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি রোগীর টিউমার ছোট করতে পেরেছে। অনেকের ক্ষেত্রে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা গেছে এবং ১৫ জন রোগীর টিউমার সম্পূর্ণভাবে গলে গেছে।

লন্ডনের ইনস্টিটিউট অব ক্যানসার রিসার্চের (আইসিআর) জৈবিক ক্যানসার চিকিৎসাবিষয়ক অধ্যাপক কেভিন হ্যারিংটন বলেন, যেসব রোগীর ক্যানসার কেমোথেরাপি ও ইমিউনোথেরাপি—উভয় চিকিৎসারই প্রতিরোধী (রেজিস্ট্যান্ট) হয়ে উঠেছে, তাদের ক্ষেত্রে এটি নজিরবিহীন ও শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া। এ ধরনের রোগীর জন্য চিকিৎসার বিকল্প খুবই সীমিত। তাই এই উপকারিতা দেখা সত্যিই আশাব্যঞ্জক।

রয়্যাল মার্সডেন এনএইচএস ফাউন্ডেশন ট্রাস্টের কনসালট্যান্ট অনকোলজিস্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করা কেভিন হ্যারিংটন জানান, এই চিকিৎসার মাধ্যমে প্রতি বছর হাজার হাজার ক্যানসার রোগী উপকৃত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্যানসার সম্মেলন ‘আমেরিকান সোসাইটি অব ক্লিনিক্যাল অনকোলজি’র (অ্যাসকো) বার্ষিক সভায় এই ফলাফল উপস্থাপন করার কথা রয়েছে।

বিশ্বের ষষ্ঠ সর্বাধিক প্রচলিত ক্যানসার মাথা ও ঘাড়ের ক্যানসার। এই ট্রায়ালে মাথা ও ঘাড়ের ক্যানসারে আক্রান্ত ১০২ জন রোগীকে অ্যামিভ্যান্টাম্যাব ইনজেকশন দেওয়া হয়েছিল। তাদের মধ্যে ৪৩ জনের টিউমার ছোট হয়ে গেছে বা সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে। আর ২৮ জনের টিউমার উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়েছে এবং ১৫ জনের টিউমার পুরোপুরি নির্মূল হয়েছে।

গবেষকরা বলেছেন, ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রেও এই ইনজেকশন একই ধরনের ফলাফল দেখিয়েছে। জনসন অ্যান্ড জনসনের আবিষ্কৃত অ্যামিভ্যান্টাম্যাব বর্তমানে প্রায় ৬০টি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। ফুসফুসের ক্যানসারের পাশাপাশি মলাশয় (কোলোরেক্টাল), মস্তিষ্ক ও পাকস্থলীর ক্যানসারের ক্ষেত্রেও এর কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হচ্ছে।

এই ‘স্মার্ট’ ইনজেকশন তিনটি ভিন্ন উপায়ে ক্যানসারের বিরুদ্ধে কাজ করে—প্রথমত, এটি ইজিএফআর (এপিডার্মাল গ্রোথ ফ্যাক্টর রিসেপ্টর) নামের এমন একটি প্রোটিনকে বাধা দেয়, যা টিউমারের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে। দ্বিতীয়ত, এটি এমইটি নামের একটি পথও বন্ধ করে দেয়, যেটি ব্যবহার করে ক্যানসারের কোষগুলো প্রচলিত চিকিৎসাকে ফাঁকি দিতে পারে। তৃতীয়ত, এটি রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সক্রিয় করে টিউমারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সহায়তা করে।

অন্যান্য ক্যানসার চিকিৎসার মতো অ্যামিভ্যান্টাম্যাব শিরায় স্যালাইনের মাধ্যমে না দিয়ে ত্বকের নিচে ছোট একটি ইনজেকশনের মাধ্যমে দেওয়া হয়। ফলে এর চিকিৎসা দ্রুত, সহজ এবং বহির্বিভাগে পরিচালনা করাও সুবিধাজনক। প্রতি তিন সপ্তাহে একবার দেওয়া এই চিকিৎসার বেশির ভাগ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াই ছিল মৃদু বা মাঝারি মাত্রার। ১০ জনের মধ্যে একজনেরও কম রোগীকে এই চিকিৎসা বন্ধ করতে হয়েছে।

এই চিকিৎসায় প্রথম দিকে সুফল পান ৫৬ বছর বয়সী কার্ল ওয়ালশ। ২০২৪ সালের মে মাসে তার জিবে ক্যানসার ধরা পড়ে। এরপর ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তিনি রয়্যাল মার্সডেনে ‘অরিগ্যামি-৪’ নামের ওই ট্রায়ালে যোগ দেন। ইংল্যান্ডের বার্মিংহামের বাসিন্দা ওয়ালশ বলেন, আমি এখন প্রায় স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছি। ট্রায়াল শুরু করার আগে ফোলা ও ব্যথার কারণে ঠিকমতো কথা বলতে পারতাম না, খেতেও অনেক কষ্ট হতো। চিকিৎসা শুরুর পর ফোলা অনেক কমে গেছে এবং ব্যথাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। চিকিৎসার মাত্র দুই চক্রের পর থেকেই আমার খাদ্যাভ্যাস স্বাভাবিক হতে শুরু করে এবং ছয় মাসের মধ্যে আমি সব ধরনের খাবার খেতে পারছিলাম। আমার কথাবার্তাও এখন পুরোপুরি স্বাভাবিক।

গবেষকরা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক ক্লিনিক্যাল পরীক্ষাটি মূলত মাথা ও ঘাড়ের ক্যানসারে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ওপর পরিচালিত হয়েছিল। তবে এ পরীক্ষায় হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস (এইচপিভি) পজিটিভ ওরোফ্যারিন্জিয়াল স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমার রোগীরা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। তারা বলছেন, এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ; কারণ এ ধরনের ক্যানসারের চিকিৎসা করা আরও কঠিন। প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো কাজ করা বন্ধ করে দেওয়ার পর এই ধরনের ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের বাঁচার সম্ভাবনা যেখানে খুবই কম, সেখানে অ্যামিভান্টাম্যাব নেওয়া রোগীরা চিকিৎসা শুরুর পর গড়ে সাড়ে ১২ মাস বেঁচে ছিলেন।

আইসিআরের প্রধান নির্বাহী অধ্যাপক ক্রিস্টিয়ান হেলিন বলেন, এই গবেষণা দেখিয়েছে যে, কীভাবে কঠোর বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি তৈরি করা সম্ভব, যা সীমিত চিকিৎসার সুযোগ থাকা রোগীদের ক্ষেত্রেও অর্থপূর্ণ অগ্রগতি এনে দিতে পারে। এর মধ্যে এই মাত্রার প্রতিক্রিয়া এবং বেঁচে থাকার আশাব্যঞ্জক হার অর্জন করা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।


img

সামরিক কৌশল বদলে যে অস্ত্রের দিকে ঝুঁকছে ইউরোপীয় দেশগুলো

প্রকাশিত :  ১১:১৭, ১৬ জুলাই ২০২৬

ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে পাওয়া বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে নিজেদের সামরিক ও প্রতিরক্ষা কৌশল নতুন করে সাজিয়ে তুলছে ইউরোপ। মহাদেশটির ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ব্যবস্থার কেন্দ্রে এখন স্থান করে নিয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)–চালিত ড্রোন এবং স্বয়ংক্রিয় যুদ্ধপ্রযুক্তি।

প্রতিরক্ষা খাতে ইউরোপীয় দেশগুলোর বিপুল বিনিয়োগ এখন এ প্রযুক্তিতেই গিয়ে মিশছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে আমেরিকান সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি।

সামরিক কৌশলের এই দ্রুত পরিবর্তনের গতিকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে দুই সপ্তাহের বেশ কিছু বড় ঘোষণা। ড্রোনের সুরক্ষায় নতুন উদ্যোগের ঘোষণা দিয়েছে উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোট ন্যাটো, যেখানে যুক্তরাজ্য ড্রোন ও ড্রোন-বিধ্বংসী ব্যবস্থার জন্য শত কোটি পাউন্ড বরাদ্দ করেছে।

ইউক্রেনের জন্য জার্মানি ৫০ হাজার ড্রোন সংগ্রহের পদক্ষেপ নিয়েছে এবং প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি খাতের স্টার্টআপ ‘হেলসিং’ এক হাজার ৮০০ কোটি ডলার পেয়েছে।

এসব ঘটনা সামরিক পরিকল্পনার বড় ধরনের পটপরিবর্তনেরই ইঙ্গিত করে। যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন ও স্বয়ংক্রিয় বিভিন্ন ব্যবস্থা একসময় কেবল বিশেষ কিছু প্রয়োজনে ব্যবহৃত হলেও এখন তা আধুনিক যুদ্ধকৌশলের মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হচ্ছে। এ নতুন ধারা কেবল ড্রোন নির্মাতাদের জন্যই নয়, বরং এআই, সফটওয়্যার, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার ও সুরক্ষিত যোগাযোগ ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন কোম্পানির জন্যও নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছে।

বাজার গবেষণা কোম্পানি ‘মর্নিংস্টার’-এর বিশ্লেষক লোরেদানা মুহাররেমি বলেছেন, ভবিষ্যতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বহুমাত্রিক যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। যেমন, একটি ট্যাংক এখন কেবল গোলাবারুদই ছুড়বে না, একইসঙ্গে ড্রোন উৎক্ষেপণ করবে, স্যাটেলাইট ও চালকহীন আকাশযান থেকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তুর লাইভ ডেটা গ্রহণ করবে, পুরো যুদ্ধক্ষেত্রে তথ্য আদান-প্রদান করবে এবং সমন্বিত নেটওয়ার্ক ফোর্সের অংশ হিসেবে কাজ করবে।

ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের তৈরি কম খরচের ‘শাহেদ’ ড্রোনের ব্যবহার প্রমাণ করেছে, তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী এআই ড্রোন কতটা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এগুলো নিখুঁতভাবে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করতে, প্রচলিত অস্ত্রের আক্রমণ সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে এবং দিন দিন মানুষের নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করতে পারে।

ড্রোন কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে আধুনিক যুদ্ধে ?

ইউক্রেন ও রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তব অভিজ্ঞতা এখন আমূল বদলে দিচ্ছে পুরো ইউরোপের সামরিক কেনাকাটা ও প্রতিরক্ষা কৌশল। আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন কীভাবে যুদ্ধের গতিপথ নির্ধারণ করছে তা মাথায় রেখেই সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে শত কোটি ডলারের নতুন সব মহাপরিকল্পনা হাতে নিচ্ছে পশ্চিমা দেশগুলো।

ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে জোটের সামরিক বাহিনীকে ‘ড্রোন-রেডি’ বা ড্রোনের মুখে পড়ার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুতের ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ন্যাটোর বিভিন্ন সদস্য দেশ আগামী পাঁচ বছরে ড্রোন-বিধ্বংসী সক্ষমতা বাড়াতে ৪ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ করবে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের উদাহরণ টেনে মার্ক রুত্ত বলেছেন, আধুনিক সমর কৌশলের চরিত্রকে মৌলিকভাবে বদলে দেওয়া ও যুদ্ধক্ষেত্রে প্রধান উপাদান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ড্রোন।

একই পথে হাঁটছে যুক্তরাজ্যও। গত জুনের শেষদিকে প্রকাশিত প্রতিরক্ষা বিনিয়োগ পরিকল্পনার আওতায় নিজেদের সশস্ত্র বাহিনীকে আরও শক্তিশালী করতে ও ড্রোনের রূপান্তরের লক্ষ্যে প্রায় ৬৭০ কোটি ডলার বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ব্রিটিশ সরকার।

এদিকে, ইউক্রেনের জন্য সহায়তার হাত আরও বাড়িয়েছে জার্মানি। প্রতিরক্ষা বিষয়ক সফটওয়্যার নির্মাতা কোম্পানি ‘অটেরিয়ন’ ও ইউক্রেনীয় ড্রোন নির্মাতা ‘স্কাইফল’ যৌথভাবে ৫০ হাজার ড্রোনের বড় ক্রয়াদেশ পেয়েছে, যার মূল্য প্রায় ৯ কোটি ইউরো।

ইউরোপীয় ন্যাটো সদস্য দেশ হিসেবে জার্মানি এ বিপুল পরিমাণ ড্রোনের অর্ডার দিয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে একটি সূত্র। এসব ড্রোনে অটেরিয়নের বিশেষ স্বয়ংক্রিয় অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহৃত হবে।

অটেরিয়নের প্রধান নির্বাহী লরেঞ্জ মেয়ার বলেছেন, মানব ইতিহাসে ড্রোন প্রযুক্তি যথেষ্ট সহজলভ্য হওয়ার পর এটাই প্রথম যুদ্ধ, যেখানে সামরিক ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির এত বড় প্রভাব দেখা যাচ্ছে।

মেয়ার বলেছেন, বর্তমান যুদ্ধক্ষেত্রের সমীকরণ এখন দিন দিন সফটওয়্যারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। অটেরিয়নের অপারেটিং সিস্টেমের কারণে শত্রুপক্ষের ‘ইলেকট্রনিক জ্যামিং’ বা যোগাযোগ বিচ্ছিন্নের চেষ্টার মুখেও এসব ড্রোন নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারবে।

তিনি বলেন, ‘শত্রুপক্ষের জ্যামার সক্রিয় থাকলে যেখানে আগে ভিডিও সিগনাল হারিয়ে যেত এবং ড্রোনের লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকত, আমাদের প্রযুক্তির কারণে এখন জ্যামার থাকার পরও ড্রোন সরাসরি লক্ষ্যবস্তুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারবে।’

পাহাড় বা উপত্যকার নিচে যেখানে রেডিও তরঙ্গ পৌঁছায় না, সেখানেও এ সফটওয়্যারের মাধ্যমে ড্রোন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কোম্পানিটি এমন আধুনিক সফটওয়্যার নিয়েও কাজ করছে, যা দিয়ে একজন অপারেটর আলাদা আলাদা ড্রোন চালনার পরিবর্তে একসঙ্গে এক ঝাঁক ড্রোনের পুরো দলকে সমন্বিতভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন।

জার্মানির দেওয়া বড় অর্ডারটি সরাসরি ইউক্রেনীয় বাহিনীর জন্য তৈরি করা হলেও মেয়ার বলেছেন, এ অত্যাধুনিক প্রযুক্তির প্রতি জার্মানি, নরওয়ে, ব্রিটেন ও ফ্রান্সের নিজস্ব সশস্ত্র বাহিনীও গভীর আগ্রহ দেখাচ্ছে।

বর্তমানে যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত ও পর্যুদস্ত করতে কম খরচের সাধারণ ড্রোনের সঙ্গে উচ্চ প্রযুক্তির দামি অস্ত্রের সমন্বয় ঘটিয়ে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা আধুনিক যুদ্ধের ময়দানে ড্রোনকে আরও বেশি মারাত্মক ও কার্যকর করে তুলছে।

ড্রোন ছাড়িয়ে যুদ্ধকৌশলে যখন প্রযুক্তির রাজত্ব

আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার ক্রমাগত ব্যবহার কেবল ড্রোন নির্মাতাদের ভাগ্যই বদলাচ্ছে না, বরং এর পেছনে থাকা নিয়ন্ত্রণকারী মূল প্রযুক্তির চাহিদাও বহুগুণ বাড়িয়েছে।

‘মর্নিংস্টার’-এর বিশ্লেষক লোরেদানা মুহাররেমি বলেছেন, যুদ্ধক্ষেত্রে রিয়াল-টাইম বা তাৎক্ষণিকভাবে শত শত ড্রোনের মধ্যে সমন্বয় ঘটানোর জন্য এখন অত্যাধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে সুরক্ষিত যোগাযোগ ব্যবস্থা, ব্যাটল ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার বা যুদ্ধ পরিচালনাকারী সফটওয়্যার, এআই, স্যাটেলাইটভিত্তিক গোয়েন্দা তথ্য, সেন্সর ও ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম।

এর ফলে, যেসব কোম্পানির স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সেন্সর, ইলেকট্রনিক যুদ্ধকৌশল, সফটওয়্যার ও মহাকাশ প্রযুক্তির মতো ক্ষেত্রে বড় আকারের কাজের অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা রয়েছে, ভবিষ্যতের প্রতিরক্ষা বাজেটের সিংহভাগ তাদের পকেটেই যাবে।

‘ম্যাককিনসে’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালের পর থেকে ইউরোপের মূল প্রতিরক্ষা ব্যয় এরইমধ্যে দ্বিগুণ হয়েছে। ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রতিরক্ষা খাতে জিডিপির ৩ দশমিক ৫ শতাংশ ব্যয়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নেটো নির্ধারণ করেছে তার ওপর ভিত্তি করে ২০৩০ সালের মধ্যে ইউরোপের সামরিক বাজেট প্রায় ৮০ হাজার কোটি ইউরোতে পৌঁছাতে পারে, যা মহাদেশটির মোট জিডিপির প্রায় ২ দশমিক ৯ শতাংশ।

ইউরোপ ও আমেরিকা উভয় অঞ্চলেই ২০২৫ সালে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বিনিয়োগ উল্কার গতিতে বেড়েছে।

ম্যাককিনসে বলেছে, আগের বছরের তুলনায় এই খাতে বিনিয়োগের চুক্তি বা ডিলের পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে, বিশেষ করে ইউরোপে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির অর্থায়ন ২০২১ সালের ২০ কোটি ইউরো থেকে এক লাফে ২০২৫ সালে ২৬০ কোটি ইউরোতে গিয়ে ঠেকেছে।

এ মেটা অংকের বিনিয়োগের অন্যতম বড় সুবিধাভোগী জার্মানির মিউনিখভিত্তিক ‘হেলসিং’। সম্প্রতি কোম্পানিটি নতুন তহবিল সংগ্রহের ঘোষণা দিয়েছে, যার মাধ্যমে তাদের বাজার মূল্য দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৮০০ কোটি ডলারে।

এ বিপুল মূল্যায়নের পর ইউরোপের সবচেয়ে ধনী প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি স্টার্টআপগুলোর মধ্যে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করল হেলসিং। ড্রোন ও পানির নিচের নজরদারি সংক্রান্ত যুদ্ধাস্ত্র তৈরি করে কোম্পানিটি। পাশাপাশি সামরিক খাতে পরিচালনার জন্য এআই ও স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার তৈরি করে।

কোম্পানিটির এ অভাবনীয় উত্থানেই প্রমাণ মেলে, ইউরোপের প্রতিরক্ষা শিল্প এখন প্রচলিত ভারি সামরিক সরঞ্জাম বা হার্ডওয়্যারের চেয়ে সফটওয়্যার ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ওপরই তাদের ভবিষ্যতের বাজি ধরছে।

সূত্র: সিএনবিসি, ডয়চে ভেলে


বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এর আরও খবর