img

বিষণ্ণতা, অনিদ্রা ও আত্মবিশ্বাসের সংকট : সাহিত্য ও মনস্তত্ত্বের আলোকে এক নিরাময়ের সন্ধান

প্রকাশিত :  ০৪:৩০, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বিষণ্ণতা, অনিদ্রা ও আত্মবিশ্বাসের সংকট : সাহিত্য ও মনস্তত্ত্বের আলোকে এক নিরাময়ের সন্ধান

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ

আধুনিক জীবনের দ্রুতগতি, যান্ত্রিক ছুটে চলা আর নৈকট্যহীন সম্পর্কের জালে বিষণ্ণতা, অনিদ্রা ও আত্মবিশ্বাসের অভাব এখন আর শুধু ব্যক্তিগত দুঃখ নয়; বরং তা এক ধরনের নীরব মহামারীতে রূপ নিয়েছে। বাঙালির প্রেক্ষাপটে, যেখানে সাহিত্য ও আবেগ পরস্পরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, সেখানে এই মানসিক অসুস্থতার চিকিৎসা শুধু ওষুধের পাতায় কিংবা থেরাপির কক্ষে সীমাবদ্ধ থাকলে চলে না। এই প্রবন্ধে আমি তুলে ধরতে চেয়েছি বিষণ্ণতা ও অনিদ্রার সেই জটিল জৈবিক সম্পর্ক, আত্মবিশ্বাস পুনর্নির্মাণের কৌশল এবং তার পাশাপাশি বাংলা সাহিত্যের দুই উজ্জ্বল নক্ষত্র—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও হুমায়ূন আহমেদের দর্শনকে কেন্দ্র করে এক সমন্বিত নিরাময়ের পথরেখা।

বিষণ্ণতা ও অনিদ্রা : এক বিপজ্জনক সম্পর্কের ক্লিনিকাল ইতিহাস

বিষণ্ণতা ও অনিদ্রা একে অপরের আয়না। চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণা বলছে, যে ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে অনিদ্রায় ভুগছেন, তাঁর বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা সাধারণ মানুষের তুলনায় অন্তত দশ গুণ বেশি। আবার বিষণ্ণতায় ভোগা প্রায় ৭৫ শতাংশ মানুষই কোনো না কোনোভাবে ঘুমের সমস্যায় জর্জরিত। এই দ্বিমুখী সম্পর্কের শিকড় প্রোথিত আমাদের মস্তিষ্কের গভীরে।

ঘুম যখন ব্যাহত হয়, তখন মস্তিষ্কের ভয় ও উদ্বেগের কেন্দ্র অ্যামিগডালা অকারণে সক্রিয় হয়ে ওঠে। অন্যদিকে প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স, যার কাজ যুক্তি ও চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করা, তা হয়ে পড়ে শিথিল। ফলে একটি সামান্য ঘটনাও তখন পাহাড়সম মনে হতে শুরু করে। গভীর ঘুম, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় \'রেস্টোরেটিভ স্লো ওয়েভ স্লিপ\' বলে, তা যখন ব্যাহত হয়, তখন মনের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া থমকে যায়। আস্তে আস্তে আত্মবিশ্বাস ভাঙতে থাকে, আর ব্যক্তি ঢুকে পড়ে এক অন্তহীন দুশ্চিন্তার সর্পিল চক্রে। মনে রাখতে হবে, অনিদ্রা শুধু বিষণ্ণতার একটি উপসর্গ নয়; বরং তা এক স্বাধীন শক্তি, যা বিষণ্ণতাকে আরও গভীর করে তোলে।

আত্মবিশ্বাসের ভাঙন : নেতিবাচক চিন্তার মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি

আত্মবিশ্বাসের অভাব আসলে ক্ষণিকের কোনো অনুভূতি নয়; এটি শৈশব থেকে অর্জিত এক দীর্ঘ অভ্যাস। মনোবিজ্ঞানীরা একে বলেন \'নেতিবাচক স্ব-আলাপ\'। যখন আমরা নিজেদের বারবার \"আমি যথেষ্ট নই\" বা \"আমার দ্বারা কিছু হবে না\" বলে বুঝাই, তখন মস্তিষ্ক সেই ধারণার পক্ষেই তথ্য সংগ্রহ করতে থাকে। আর ইতিবাচক দিকগুলোকে সে যেন ফিল্টার করে বাদ দেয়।

এই নেতিবাচক চিন্তার মূল কাঠামো গড়ে ওঠে তিনটি স্তম্ভের ওপর : ফিল্টারিং, পার্সোনালাইজিং ও ক্যাটাস্ট্রোফাইজিং। কেউ কেবল জীবনের নেতিবাচক দিকগুলো দেখেন, সব খারাপ ঘটনার জন্য নিজেকে দায়ী করেন, আর সবকিছুর সবচেয়ে খারাপ ফলাফলটিই প্রত্যাশা করেন। এই চিন্তাগুলো আস্তে আস্তে মানুষকে সামাজিক বিচ্ছিন্নতার দিকে ঠেলে দেয়। নতুন কিছু করার সাহস থাকে না, আর তাতেই বন্ধ হয়ে যায় সাফল্যের সম্ভাব্য সব পথ। এই দুর্বল চক্র ভাঙতে কার্যকর হতে পারে জ্ঞানীয় আচরণগত থেরাপি বা কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (সিবিটি)। এর মূলমন্ত্রটি খুব সহজ : প্রথমে নেতিবাচক চিন্তাটিকে শনাক্ত করো, তারপর তার সত্যতা যাচাই করো, আর শেষে সেটিকে বদলে ফেলো।

হুমায়ূন আহমেদের গদ্য : সহমর্মিতার এক জাদুকরি ছোঁয়া

বাঙালি মধ্যবিত্তের একাকীত্ব, হতাশা ও আত্মস্বীকৃতির জায়গাটি সম্ভবত হুমায়ূন আহমেদের মতো এত নিবিড়ভাবে আর কেউ চিনতে পারেননি। তাঁর লেখার শক্তি তাঁর সরলতা আর অপার মানবিক সংযোগ। হিমু যেমন নিঃসঙ্গ এক পথচলতি তরুণের প্রতীক, তেমনি মিসির আলি আমাদের মনের অজানা রহস্যের সন্ধানী। হুমায়ূন আহমেদ তাঁর সৃষ্টিতে জাদুবাস্তবতাকে এমনভাবে মিশিয়েছেন যে তা একঘেয়েমি ও বিষণ্ণতা থেকে মুক্তির জানালা খুলে দেয়।

তিনি দেখিয়েছেন, দুঃখের মধ্যেও হাসির খোরাক থাকে। \'অপেক্ষা\' তাঁর দর্শনের একটি বড় শক্তি। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষ বেঁচে থাকে আশার ওপর। \"মানুষের কষ্টের কোনো সীমা নেই, কিন্তু সহ্যের একটা সীমা আছে\"—এই উক্তিটি যেন আমাদের শেখায়, সেই সীমা বাড়িয়ে নেওয়ার জন্যই প্রয়োজন হাস্যরসের। তাঁর লেখার এই সম্মোহনী শক্তি পাঠককে এক ধরনের মানসিক প্রশান্তি দেয়, দেয় নিঃসঙ্গতা ভোলার মন্ত্র।

রবীন্দ্রনাথের দর্শন : ঘুম, আত্মসমর্পণ ও পুনর্জন্ম

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে রাত মানে শুধু আলোর অনুপস্থিতি নয়; তা মহাবিশ্বের সঙ্গে আত্মার পুনর্মিলনের সময়। \'শান্তিনিকেতন\'-এ তিনি বলেছেন, দিনের ক্লান্তি, দুশ্চিন্তা আমাদের স্নায়ুগুলিকে জরাজীর্ণ করে ফেলে, আর রাতের নিঃশব্দ ঘুম সেই জীর্ণতা সারিয়ে তোলার এক ঐশ্বরিক প্রক্রিয়া। তিনি ঘুমকে দেখেছেন এক ধরনের \"শান্ত আত্মসমর্পণ\" হিসেবে।

আধুনিক মনোবিজ্ঞানের \'সারেন্ডার থেরাপি\'র সঙ্গে এই ভাবনা পুরোপুরি মেলে যায়। যখন আমরা নিজের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে প্রকৃতির ওপর আস্থা রাখতে শিখি, তখনই শান্তি আসে। \'চিত্ত যেথা ভয়শূন্য\' উচ্চারিত হয় সেই আত্মবিশ্বাসের জায়গা থেকে, যা বিষণ্ণতার গভীর অন্ধকারেও আলো দেখাতে পারে। যারা হতাশায় নিমজ্জিত, তাদের জন্য রবীন্দ্রনাথের গান ও কবিতা যেন এক বিবলিওথেরাপি—শব্দের মাধ্যমে আত্মার গভীরে লুকিয়ে থাকা ক্ষত সারানোর প্রক্রিয়া।

ভিক্টর ফ্রাঙ্কল ও লোগোথেরাপি : দুঃখের অর্থ খোঁজা

বিষণ্ণতার আরেক বড় কারণ হচ্ছে জীবনের অর্থহীনতা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নাৎসি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের ভয়াবহতা থেকে ফিরে আসা ভিক্টর ফ্রাঙ্কল শিখিয়েছিলেন, মানুষ যদি তার বেঁচে থাকার একটি \'কেন\' খুঁজে পায়, তবে সে যেকোনো \'কীভাবে\' সহ্য করতে পারে। তাঁর লোগোথেরাপি বলে, জীবনের মূল চালিকাশক্তি সুখ নয়, বরং অর্থের সন্ধান। এই অর্থ মিলতে পারে কাজের মাধ্যমে, ভালোবাসার মাধ্যমে, এমনকি কষ্টকে মর্যাদার সঙ্গে গ্রহণের মাধ্যমেও।

ফ্রাঙ্কলের ট্র্যাজিক আশাবাদ আমাদের শেখায়, ভাগ্য যাই লিখুক, তার প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বেছে নেওয়ার অধিকার আমাদেরই থাকে। যখন আমরা নিজেকে কোনো বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখতে পাই, তখন ভেতরের শূন্যতা দূর হতে শুরু করে। আর এই শূন্যতা দূর হওয়াই বিষণ্ণতা কাটিয়ে ওঠার প্রথম ধাপ।

তাৎক্ষণিক প্রশান্তির পথ : শ্বাস ও শরীরের বিজ্ঞান

মনকে বোঝানোর পাশাপাশি শরীরকে শিথিল করাও জরুরি। অনিদ্রার ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর একটি পদ্ধতি হলো \'৪-৭-৮ ব্রিদিং টেকনিক\'। চার সেকেন্ডে নিঃশ্বাস নেওয়া, সাত সেকেন্ড ধরে রাখা, আর আট সেকেন্ডে ধীরে ধীরে নিঃশ্বাস ছাড়া। এই সহজ প্রক্রিয়া হৃদস্পন্দন কমিয়ে মস্তিষ্ককে বিশ্রামের সংকেত দেয়।

আরেকটি পদ্ধতি \'বডি স্ক্যান মেডিটেশন\'—পায়ের পাতা থেকে শুরু করে মাথা পর্যন্ত শরীরের প্রতিটি অংশের ওপর ধীরে ধীরে মনোযোগ দেওয়া। এই অভ্যাস মনকে বর্তমানে ফিরিয়ে আনে, আর শরীরের জমে থাকা টানগুলিকে ধীরে ধীরে মুক্তি দেয়। শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়া মানেই আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার এক শক্ত ভিত তৈরি করা।

নিরাময়ের বাস্তব গল্প ও বাঙালির মানসিক প্রেক্ষাপট

শ্যানন পার্কিন্সের গল্প বারবার মনে করিয়ে দেয়, পুনরুদ্ধারের কোনো বয়স নেই। আত্মহত্যার সাতবার ব্যর্থ চেষ্টার পরও তিনি আজ একজন মানসিক স্বাস্থ্য উকিল হিসেবে কাজ করছেন। রেবেকা খুঁজে পেয়েছেন প্রযুক্তির ছোঁয়ায়—ট্রান্সক্রেনিয়াল ম্যাগনেটিক স্টিমুলেশন (টিএমএস) পদ্ধতি তাঁর ছয় বছরের অনিদ্রা দূর করেছে। আর সংগীতশিল্পী ক্রিস শিখিয়েছেন, সাহায্য চাওয়া দুর্বলতা নয়, বরং সাহসেরই নামান্তর।

বাঙালির মানসিক স্বাস্থ্যচর্চায় সাহিত্যের ভূমিকা অপরিসীম। \'শরম\' বা লজ্জার কারণে আমরা অনেক সময় কথা বলতে চাই না। কিন্তু প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে আসা ট্রমা, যেমন তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষের স্মৃতি, তা আমাদের রক্তে মিশে আছে। সেই ট্রমা মুক্তির পথ দেখাতে পারে বিবলিওথেরাপি। প্রবাসী বাঙালির জন্য ঝুম্পা লাহিড়ী বা চিত্রা বন্দ্যোপাধ্যায় দেবীর গল্প হয়ে ওঠে শেকড়ের সন্ধান—আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার সিঁড়ি।

সমাপ্তি : একটি সমন্বিত নিরাময়ের পথরেখা

পরিশেষে বলতে চাই, অনিদ্রা, বিষণ্ণতা ও আত্মবিশ্বাসের সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে হলে প্রয়োজন এক বহুমুখী দৃষ্টিভঙ্গি। হুমায়ূন আহমেদের গল্পের মতো করে জীবনকে সহজভাবে দেখা, রবীন্দ্রনাথের মতো করে প্রকৃতির কাছে আত্মসমর্পণ করা, আর ভিক্টর ফ্রাঙ্কলের মতো করে কষ্টের মধ্যেও অর্থ খুঁজে নেওয়া—এই সবকিছুর মিশ্রণেই তৈরি হয় আমাদের মানসিক স্থিতি।

অনিদ্রার সমাধান শুধু ঘুমের বড়িতে নেই, আছে মনের গহীনে জমে থাকা দুশ্চিন্তাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মধ্যেও। আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর জন্য নিজের প্রতি দয়ালু হওয়া জরুরি, নিজেকে ভালোবাসতে হবে সেইভাবেই, যেভাবে আমরা আমাদের প্রিয় বন্ধুকে ভালোবাসি।

প্রতিটি রাত শেষে ভোর আসে। জীবনের অন্ধকার অধ্যায়গুলিও অস্থায়ী। বিজ্ঞানের কাঠামো আর সাহিত্যের সংবেদনশীলতা যখন এক সূত্রে গাঁথা যায়, তখনই আমরা পৌঁছাতে পারি এক সুস্থ, সুন্দর ও আত্মবিশ্বাসী জীবনের দোরগোড়ায়। যারা ক্লান্ত, তাদের জন্য বারবার মনে করিয়ে দিতে ইচ্ছে করে—আশা হারাবেন না। প্রতিটি অন্ধকার রজনীর শেষে লুকিয়ে আছে এক সোনালি ভোরের প্রতিশ্রুতি।


বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এর আরও খবর

img

কিডনি রোগীদের জন্য সুখবর, জেলা-উপজেলায় মিলবে ডায়ালাইসিস সেবা

প্রকাশিত :  ০৬:০২, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সরকার বড় পরিসরে দেশের কিডনি রোগীদের জন্য ডায়ালাইসিস সেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে । দ্রুততম সময়ের মধ্যেই দেশের সকল জেলা-উপজেলা পর্যায়ে কিডনি রোগীদের জন্য ডায়ালাইসিস সেবা চালু করতে যাচ্ছে বর্তমান সরকার।

এ লক্ষ্যে ৫ হাজার নার্স ও মেডিকেল টেকনোলজিস্টকে তিন মাসের ডায়ালাইসিস বিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রদান শুরু করা হয়েছে। এ ছাড়া নার্স ও মেডিকেল টেকনোলজিস্ট উভয় ক্যাটাগরিতেই ২ হাজার ৫০০টি নতুন পদ সৃষ্টির সিদ্ধান্তও নিয়েছে সরকার।

এ বিষয়ে নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক দিল আফরোজা বাসস’কে বলেন, আমরা এরই মধ্যে ১২০ জনকে নিয়ে এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করেছি। এর মধ্যে ন্যাশনাল কিডনি ফাউন্ডেশনে ৯০ জন, পাবনায় ২০ জন এবং রাজশাহীতে ১০ জনকে ডায়ালাইসিস সেবাসংক্রান্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। অল্প দিনের মধ্যেই আমার সিলেটসহ কয়েকটি জায়গায় ব্যাপকভাবে এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করবো। এ ছাড়া দ্রুত সময়ের মধ্যে সারা দেশের কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিস সেবা নিশ্চিত করতে আরও নার্স নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, দেশের প্রতিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫০ শয্যাবিশিষ্ট কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টার এবং প্রতিটি জেলা সদর হাসপাতালে ১০ শয্যাবিশিষ্ট ডায়ালাইসিস সেন্টার স্থাপন করা হবে।

৫ হাজার নার্স-টেকনোলজিস্টকে প্রশিক্ষণ

ইতোমধ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের আওতায় সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বিশেষায়িত হাসপাতাল ও জেলা সদর হাসপাতালে কর্মরত নার্সদের থেকে এ প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের জন্য আবেদন সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের জন্য আবেদনকারীকে সরকারি চাকরিতে ন্যূনতম দুই বছর পূর্ণ করতে হবে। পাশাপাশি প্রার্থীর বয়স সর্বোচ্চ ৪০ বছর হতে হবে।

১২ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের এক বৈঠকে এই সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়। সংসদ সদস্যদের প্রতিশ্রুতি ও প্রত্যাশিত কর্মসূচিসমূহ বাস্তবায়নের দায়িত্বে নিয়োজিত সমন্বয় সেলের পক্ষ থেকে এ সভার আয়োজন করা হয়।

বৈঠকের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে গত ২৪ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবের কাছে সভার কার্যবিবরণী ে(রেকর্ড অব নোটস) পাঠানো হয়।

প্রতি জেলায় ১০ শয্যার ডায়ালাইসিস সেন্টার

চলতি বছরের ২০ জুলাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পরিদর্শন করেন। এদিন অনুষ্ঠিত এক সভায় দেশের প্রতিটি জেলায় ১০ শয্যাবিশিষ্ট কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টার গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

কিডনি অ্যাওয়ারনেস মনিটরিং অ্যান্ড প্রিভেনশন সোসাইটির (ক্যাম্পস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ মানুষ কোনো না কোনো কিডনি রোগে আক্রান্ত। এর মধ্যে প্রতিবছর প্রায় ৪০ হাজার রোগী ডায়ালাইসিসনির্ভর হয়ে পড়েন। তবে এ সেবা মূলত ঢাকা ও বড় শহরকেন্দ্রিক হওয়ায় প্রান্তিক এলাকার বহু রোগী চিকিৎসার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। এ পরিস্থিতিতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালে ডায়ালাইসিস সেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে সরকার।

বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ১৪৬টি ডায়ালাইসিস সেন্টার রয়েছে। এর ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশই ঢাকায়। ফলে প্রান্তিক পর্যায়ে এ সেবা এখনো অপ্রতুল।

জেলা কেন্দ্র চালুর তিন বছর পর উপজেলা পর্যায়ে সেবা

নথি অনুযায়ী, জেলা পর্যায়ের কেন্দ্রগুলো পুরোদমে চালু হওয়ার তিন বছর পর উপজেলা পর্যায়ে ডায়ালাইসিস সুবিধা স্থাপনের জন্য একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরির সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।

১২ আগস্টের সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আড়াই হাজার নার্সসহ মোট পাঁচ হাজার প্রশিক্ষণার্থীর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে, যেখানে প্রতি ব্যাচে থাকবে ৫০ থেকে ১০০ জন। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি (নিকডু) এবং ন্যাশনাল কিডনি ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে এই প্রশিক্ষণ পরিচালনা করা হবে।

তৃণমূলে চিকিৎসক সংকট দূর করার উদ্যোগ

সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, তৃণমূল পর্যায়ে চিকিৎসকের অভাব দূর করতে প্রবেশনারি চিকিৎসকদের নিজ নিজ উপজেলায় পদায়ন করা হবে। যদি কোনো উপজেলায় উপযুক্ত চিকিৎসক না পাওয়া যায়, তবে পাশের উপজেলা বা জেলা থেকে চিকিৎসক সেখানে নিয়োগ দেওয়া হবে।

এ ছাড়াও আগামী ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক, প্রভাষক এবং কনসালট্যান্টদের স্বয়ংক্রিয় পদায়ন নিশ্চিত করা; এক মাসের মধ্যে সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার প্রকল্পটি একনেকে উপস্থাপন করা এবং মিরপুরে মেডিকেল কলেজের পরিবর্তে একটি ৬০০ শয্যার জেনারেল হাসপাতাল স্থাপন করার সিদ্ধান্তও গ্রহণ করা হয়।

সূত্র: বাসস