img

বিষণ্ণতা, অনিদ্রা ও আত্মবিশ্বাসের সংকট : সাহিত্য ও মনস্তত্ত্বের আলোকে এক নিরাময়ের সন্ধান

প্রকাশিত :  ০৪:৩০, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বিষণ্ণতা, অনিদ্রা ও আত্মবিশ্বাসের সংকট : সাহিত্য ও মনস্তত্ত্বের আলোকে এক নিরাময়ের সন্ধান

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ

আধুনিক জীবনের দ্রুতগতি, যান্ত্রিক ছুটে চলা আর নৈকট্যহীন সম্পর্কের জালে বিষণ্ণতা, অনিদ্রা ও আত্মবিশ্বাসের অভাব এখন আর শুধু ব্যক্তিগত দুঃখ নয়; বরং তা এক ধরনের নীরব মহামারীতে রূপ নিয়েছে। বাঙালির প্রেক্ষাপটে, যেখানে সাহিত্য ও আবেগ পরস্পরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, সেখানে এই মানসিক অসুস্থতার চিকিৎসা শুধু ওষুধের পাতায় কিংবা থেরাপির কক্ষে সীমাবদ্ধ থাকলে চলে না। এই প্রবন্ধে আমি তুলে ধরতে চেয়েছি বিষণ্ণতা ও অনিদ্রার সেই জটিল জৈবিক সম্পর্ক, আত্মবিশ্বাস পুনর্নির্মাণের কৌশল এবং তার পাশাপাশি বাংলা সাহিত্যের দুই উজ্জ্বল নক্ষত্র—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও হুমায়ূন আহমেদের দর্শনকে কেন্দ্র করে এক সমন্বিত নিরাময়ের পথরেখা।

বিষণ্ণতা ও অনিদ্রা : এক বিপজ্জনক সম্পর্কের ক্লিনিকাল ইতিহাস

বিষণ্ণতা ও অনিদ্রা একে অপরের আয়না। চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণা বলছে, যে ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে অনিদ্রায় ভুগছেন, তাঁর বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা সাধারণ মানুষের তুলনায় অন্তত দশ গুণ বেশি। আবার বিষণ্ণতায় ভোগা প্রায় ৭৫ শতাংশ মানুষই কোনো না কোনোভাবে ঘুমের সমস্যায় জর্জরিত। এই দ্বিমুখী সম্পর্কের শিকড় প্রোথিত আমাদের মস্তিষ্কের গভীরে।

ঘুম যখন ব্যাহত হয়, তখন মস্তিষ্কের ভয় ও উদ্বেগের কেন্দ্র অ্যামিগডালা অকারণে সক্রিয় হয়ে ওঠে। অন্যদিকে প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স, যার কাজ যুক্তি ও চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করা, তা হয়ে পড়ে শিথিল। ফলে একটি সামান্য ঘটনাও তখন পাহাড়সম মনে হতে শুরু করে। গভীর ঘুম, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় \'রেস্টোরেটিভ স্লো ওয়েভ স্লিপ\' বলে, তা যখন ব্যাহত হয়, তখন মনের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া থমকে যায়। আস্তে আস্তে আত্মবিশ্বাস ভাঙতে থাকে, আর ব্যক্তি ঢুকে পড়ে এক অন্তহীন দুশ্চিন্তার সর্পিল চক্রে। মনে রাখতে হবে, অনিদ্রা শুধু বিষণ্ণতার একটি উপসর্গ নয়; বরং তা এক স্বাধীন শক্তি, যা বিষণ্ণতাকে আরও গভীর করে তোলে।

আত্মবিশ্বাসের ভাঙন : নেতিবাচক চিন্তার মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি

আত্মবিশ্বাসের অভাব আসলে ক্ষণিকের কোনো অনুভূতি নয়; এটি শৈশব থেকে অর্জিত এক দীর্ঘ অভ্যাস। মনোবিজ্ঞানীরা একে বলেন \'নেতিবাচক স্ব-আলাপ\'। যখন আমরা নিজেদের বারবার \"আমি যথেষ্ট নই\" বা \"আমার দ্বারা কিছু হবে না\" বলে বুঝাই, তখন মস্তিষ্ক সেই ধারণার পক্ষেই তথ্য সংগ্রহ করতে থাকে। আর ইতিবাচক দিকগুলোকে সে যেন ফিল্টার করে বাদ দেয়।

এই নেতিবাচক চিন্তার মূল কাঠামো গড়ে ওঠে তিনটি স্তম্ভের ওপর : ফিল্টারিং, পার্সোনালাইজিং ও ক্যাটাস্ট্রোফাইজিং। কেউ কেবল জীবনের নেতিবাচক দিকগুলো দেখেন, সব খারাপ ঘটনার জন্য নিজেকে দায়ী করেন, আর সবকিছুর সবচেয়ে খারাপ ফলাফলটিই প্রত্যাশা করেন। এই চিন্তাগুলো আস্তে আস্তে মানুষকে সামাজিক বিচ্ছিন্নতার দিকে ঠেলে দেয়। নতুন কিছু করার সাহস থাকে না, আর তাতেই বন্ধ হয়ে যায় সাফল্যের সম্ভাব্য সব পথ। এই দুর্বল চক্র ভাঙতে কার্যকর হতে পারে জ্ঞানীয় আচরণগত থেরাপি বা কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (সিবিটি)। এর মূলমন্ত্রটি খুব সহজ : প্রথমে নেতিবাচক চিন্তাটিকে শনাক্ত করো, তারপর তার সত্যতা যাচাই করো, আর শেষে সেটিকে বদলে ফেলো।

হুমায়ূন আহমেদের গদ্য : সহমর্মিতার এক জাদুকরি ছোঁয়া

বাঙালি মধ্যবিত্তের একাকীত্ব, হতাশা ও আত্মস্বীকৃতির জায়গাটি সম্ভবত হুমায়ূন আহমেদের মতো এত নিবিড়ভাবে আর কেউ চিনতে পারেননি। তাঁর লেখার শক্তি তাঁর সরলতা আর অপার মানবিক সংযোগ। হিমু যেমন নিঃসঙ্গ এক পথচলতি তরুণের প্রতীক, তেমনি মিসির আলি আমাদের মনের অজানা রহস্যের সন্ধানী। হুমায়ূন আহমেদ তাঁর সৃষ্টিতে জাদুবাস্তবতাকে এমনভাবে মিশিয়েছেন যে তা একঘেয়েমি ও বিষণ্ণতা থেকে মুক্তির জানালা খুলে দেয়।

তিনি দেখিয়েছেন, দুঃখের মধ্যেও হাসির খোরাক থাকে। \'অপেক্ষা\' তাঁর দর্শনের একটি বড় শক্তি। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষ বেঁচে থাকে আশার ওপর। \"মানুষের কষ্টের কোনো সীমা নেই, কিন্তু সহ্যের একটা সীমা আছে\"—এই উক্তিটি যেন আমাদের শেখায়, সেই সীমা বাড়িয়ে নেওয়ার জন্যই প্রয়োজন হাস্যরসের। তাঁর লেখার এই সম্মোহনী শক্তি পাঠককে এক ধরনের মানসিক প্রশান্তি দেয়, দেয় নিঃসঙ্গতা ভোলার মন্ত্র।

রবীন্দ্রনাথের দর্শন : ঘুম, আত্মসমর্পণ ও পুনর্জন্ম

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে রাত মানে শুধু আলোর অনুপস্থিতি নয়; তা মহাবিশ্বের সঙ্গে আত্মার পুনর্মিলনের সময়। \'শান্তিনিকেতন\'-এ তিনি বলেছেন, দিনের ক্লান্তি, দুশ্চিন্তা আমাদের স্নায়ুগুলিকে জরাজীর্ণ করে ফেলে, আর রাতের নিঃশব্দ ঘুম সেই জীর্ণতা সারিয়ে তোলার এক ঐশ্বরিক প্রক্রিয়া। তিনি ঘুমকে দেখেছেন এক ধরনের \"শান্ত আত্মসমর্পণ\" হিসেবে।

আধুনিক মনোবিজ্ঞানের \'সারেন্ডার থেরাপি\'র সঙ্গে এই ভাবনা পুরোপুরি মেলে যায়। যখন আমরা নিজের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে প্রকৃতির ওপর আস্থা রাখতে শিখি, তখনই শান্তি আসে। \'চিত্ত যেথা ভয়শূন্য\' উচ্চারিত হয় সেই আত্মবিশ্বাসের জায়গা থেকে, যা বিষণ্ণতার গভীর অন্ধকারেও আলো দেখাতে পারে। যারা হতাশায় নিমজ্জিত, তাদের জন্য রবীন্দ্রনাথের গান ও কবিতা যেন এক বিবলিওথেরাপি—শব্দের মাধ্যমে আত্মার গভীরে লুকিয়ে থাকা ক্ষত সারানোর প্রক্রিয়া।

ভিক্টর ফ্রাঙ্কল ও লোগোথেরাপি : দুঃখের অর্থ খোঁজা

বিষণ্ণতার আরেক বড় কারণ হচ্ছে জীবনের অর্থহীনতা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নাৎসি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের ভয়াবহতা থেকে ফিরে আসা ভিক্টর ফ্রাঙ্কল শিখিয়েছিলেন, মানুষ যদি তার বেঁচে থাকার একটি \'কেন\' খুঁজে পায়, তবে সে যেকোনো \'কীভাবে\' সহ্য করতে পারে। তাঁর লোগোথেরাপি বলে, জীবনের মূল চালিকাশক্তি সুখ নয়, বরং অর্থের সন্ধান। এই অর্থ মিলতে পারে কাজের মাধ্যমে, ভালোবাসার মাধ্যমে, এমনকি কষ্টকে মর্যাদার সঙ্গে গ্রহণের মাধ্যমেও।

ফ্রাঙ্কলের ট্র্যাজিক আশাবাদ আমাদের শেখায়, ভাগ্য যাই লিখুক, তার প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বেছে নেওয়ার অধিকার আমাদেরই থাকে। যখন আমরা নিজেকে কোনো বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখতে পাই, তখন ভেতরের শূন্যতা দূর হতে শুরু করে। আর এই শূন্যতা দূর হওয়াই বিষণ্ণতা কাটিয়ে ওঠার প্রথম ধাপ।

তাৎক্ষণিক প্রশান্তির পথ : শ্বাস ও শরীরের বিজ্ঞান

মনকে বোঝানোর পাশাপাশি শরীরকে শিথিল করাও জরুরি। অনিদ্রার ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর একটি পদ্ধতি হলো \'৪-৭-৮ ব্রিদিং টেকনিক\'। চার সেকেন্ডে নিঃশ্বাস নেওয়া, সাত সেকেন্ড ধরে রাখা, আর আট সেকেন্ডে ধীরে ধীরে নিঃশ্বাস ছাড়া। এই সহজ প্রক্রিয়া হৃদস্পন্দন কমিয়ে মস্তিষ্ককে বিশ্রামের সংকেত দেয়।

আরেকটি পদ্ধতি \'বডি স্ক্যান মেডিটেশন\'—পায়ের পাতা থেকে শুরু করে মাথা পর্যন্ত শরীরের প্রতিটি অংশের ওপর ধীরে ধীরে মনোযোগ দেওয়া। এই অভ্যাস মনকে বর্তমানে ফিরিয়ে আনে, আর শরীরের জমে থাকা টানগুলিকে ধীরে ধীরে মুক্তি দেয়। শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়া মানেই আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার এক শক্ত ভিত তৈরি করা।

নিরাময়ের বাস্তব গল্প ও বাঙালির মানসিক প্রেক্ষাপট

শ্যানন পার্কিন্সের গল্প বারবার মনে করিয়ে দেয়, পুনরুদ্ধারের কোনো বয়স নেই। আত্মহত্যার সাতবার ব্যর্থ চেষ্টার পরও তিনি আজ একজন মানসিক স্বাস্থ্য উকিল হিসেবে কাজ করছেন। রেবেকা খুঁজে পেয়েছেন প্রযুক্তির ছোঁয়ায়—ট্রান্সক্রেনিয়াল ম্যাগনেটিক স্টিমুলেশন (টিএমএস) পদ্ধতি তাঁর ছয় বছরের অনিদ্রা দূর করেছে। আর সংগীতশিল্পী ক্রিস শিখিয়েছেন, সাহায্য চাওয়া দুর্বলতা নয়, বরং সাহসেরই নামান্তর।

বাঙালির মানসিক স্বাস্থ্যচর্চায় সাহিত্যের ভূমিকা অপরিসীম। \'শরম\' বা লজ্জার কারণে আমরা অনেক সময় কথা বলতে চাই না। কিন্তু প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে আসা ট্রমা, যেমন তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষের স্মৃতি, তা আমাদের রক্তে মিশে আছে। সেই ট্রমা মুক্তির পথ দেখাতে পারে বিবলিওথেরাপি। প্রবাসী বাঙালির জন্য ঝুম্পা লাহিড়ী বা চিত্রা বন্দ্যোপাধ্যায় দেবীর গল্প হয়ে ওঠে শেকড়ের সন্ধান—আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার সিঁড়ি।

সমাপ্তি : একটি সমন্বিত নিরাময়ের পথরেখা

পরিশেষে বলতে চাই, অনিদ্রা, বিষণ্ণতা ও আত্মবিশ্বাসের সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে হলে প্রয়োজন এক বহুমুখী দৃষ্টিভঙ্গি। হুমায়ূন আহমেদের গল্পের মতো করে জীবনকে সহজভাবে দেখা, রবীন্দ্রনাথের মতো করে প্রকৃতির কাছে আত্মসমর্পণ করা, আর ভিক্টর ফ্রাঙ্কলের মতো করে কষ্টের মধ্যেও অর্থ খুঁজে নেওয়া—এই সবকিছুর মিশ্রণেই তৈরি হয় আমাদের মানসিক স্থিতি।

অনিদ্রার সমাধান শুধু ঘুমের বড়িতে নেই, আছে মনের গহীনে জমে থাকা দুশ্চিন্তাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মধ্যেও। আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর জন্য নিজের প্রতি দয়ালু হওয়া জরুরি, নিজেকে ভালোবাসতে হবে সেইভাবেই, যেভাবে আমরা আমাদের প্রিয় বন্ধুকে ভালোবাসি।

প্রতিটি রাত শেষে ভোর আসে। জীবনের অন্ধকার অধ্যায়গুলিও অস্থায়ী। বিজ্ঞানের কাঠামো আর সাহিত্যের সংবেদনশীলতা যখন এক সূত্রে গাঁথা যায়, তখনই আমরা পৌঁছাতে পারি এক সুস্থ, সুন্দর ও আত্মবিশ্বাসী জীবনের দোরগোড়ায়। যারা ক্লান্ত, তাদের জন্য বারবার মনে করিয়ে দিতে ইচ্ছে করে—আশা হারাবেন না। প্রতিটি অন্ধকার রজনীর শেষে লুকিয়ে আছে এক সোনালি ভোরের প্রতিশ্রুতি।


বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এর আরও খবর

img

সব আন্তঃনগর ট্রেনে বসছে স্টারলিংক ইন্টারনেট, বাস-ফেরিতেও চালুর পরিকল্পনা

প্রকাশিত :  ১১:০৮, ১৫ এপ্রিল ২০২৬

দেশে প্রথমবারের মতো চলন্ত ট্রেনে স্টারলিংকের ইন্টারনেট সেবার পরীক্ষামূলক ব্যবহার শুরু হয়েছে।   সম্প্রতি বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিএল) ও বাংলাদেশ রেলওয়ের যৌথ উদ্যোগে এই পাইলট প্রকল্প শুরু হয়। বর্তমানে কয়েকটি আন্তঃনগর ট্রেনে ইন্টারনেট সেবা রয়েছে।  এর মাধ্যমে যাত্রীরা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ট্রেনের ভেতরেই ওয়াই-ফাই ব্যবহার করতে পারছেন।

গত ঈদুল ফিতরের আগে দেশের কয়েকটি আন্তঃনগর ট্রেনে পরীক্ষামূলকভাবে স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সংযোগে ব্যাপক সাড়া মিলেছে যাত্রীদের। তাদের দাবি, সব আন্তঃনগর ট্রেনেই এই সেবা চালু হোক। যা আমলে নিয়ে এরইমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকেও ইতিবাচক সাড়া জানানো হয়েছে।

শুধু ট্রেনেই নয়, ভবিষ্যতে বাস ও ফেরির যাত্রীদের জন্যও এই ধরনের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা বাণিজ্যিকভাবে চালুর পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৩ মার্চ দেশে প্রথমবারের মতো চলন্ত ট্রেনে পরীক্ষামূলকভাবে সরাসরি স্যাটেলাইটভিত্তিক উচ্চগতির স্টারলিংক ইন্টারনেট সেবা চালু করা হয়। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার নির্দেশনায় এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হয়। এতে বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে কাজ করছে বিএসসিএল এবং সহযোগিতা দিচ্ছে বাংলাদেশ রেলওয়ে।

প্রাথমিক পর্যায়ে পর্যটক এক্সপ্রেস, কক্সবাজার এক্সপ্রেস, উপবন এক্সপ্রেস ও বনলতা এক্সপ্রেস—এই তিনটি আন্তঃনগর ট্রেনে পরীক্ষামূলকভাবে ফ্রি ওয়াই-ফাই সেবা চালু করা হয়। ট্রেনের প্রতিটি বগিতে কিউআর কোড সংযুক্ত করা হয়, যা স্ক্যান করে যাত্রীরা সহজেই ইন্টারনেট সংযোগে যুক্ত হতে পারেন। পুরো প্রক্রিয়াটি এমনভাবে সাজানো হয় যাতে কোনো জটিলতা ছাড়াই যাত্রীরা দ্রুত সংযোগ পেতে পারেন।

পরীক্ষামূলক এই উদ্যোগে যাত্রীদের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য সাড়া পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, এই তিনটি ট্রেনে ভ্রমণরত যাত্রীরা সম্মিলিতভাবে প্রায় ১১ টেরাবাইট ডেটা ব্যবহার করেছেন। ট্রেনের প্রতিটি বগিতে থাকা কিউআর কোড স্ক্যান করে যাত্রীরা সহজেই ফ্রি ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্কে যুক্ত হতে পেরেছেন। কোনো জটিল সেট-আপ ছাড়াই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সংযোগ পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে। বিশেষ করে যেসব রুটে মোবাইল নেটওয়ার্ক দুর্বল বা অনিয়মিত, সেখানে এই সেবা কার্যকর বিকল্প হিসেবে দেখা দিয়েছে।

যাত্রীদের অভিজ্ঞতাতেও এর প্রতিফলন পাওয়া গেছে। ঢাকা থেকে সিলেটগামী উপবন এক্সপ্রেসের যাত্রী রায়হান আহমেদ বলেন, ট্রেনে সাধারণত ইন্টারনেট ব্যবহারে নানা সমস্যা থাকে এবং সংযোগ অনিয়মিত হয়। তবে এই সেবা চালুর পর পুরো যাত্রাপথে তিনি নিরবচ্ছিন্নভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পেরেছেন।

রাজশাহীগামী বনলতা এক্সপ্রেসের যাত্রী আবু সালেহ জানান, তিনি ট্রেনে বসেই অনলাইনে ভিডিও স্ট্রিমিং করতে পেরেছেন, যা আগে সম্ভব হয়নি। কিউআর কোড স্ক্যান করার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সংযোগ পাওয়া গেছে এবং পুরো যাত্রায় উল্লেখযোগ্য কোনো বাফারিং দেখা যায়নি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

পরীক্ষামূলক পর্যায়ে পাওয়া এই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই এখন সেবাটি বাণিজ্যিকভাবে চালুর বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভবিষ্যতে ট্রেন, বাস ও ফেরিতে একক সাবস্ক্রিপশন ব্যবস্থার মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হতে পারে। অর্থাৎ একজন যাত্রী একবার সাবস্ক্রিপশন নিলে একই অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে বিভিন্ন গণপরিবহনে ইন্টারনেট সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন। এতে ব্যবহারকারীদের জন্য সুবিধা বাড়বে এবং সংযোগ ব্যবস্থাও আরও সমন্বিত হবে।

তবে এই সেবা চালুর ক্ষেত্রে কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জও সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বড় ধরনের প্রযুক্তিগত সমস্যা না থাকলেও চলন্ত ট্রেনে যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ, নির্দিষ্ট বগিতে সাময়িক ত্রুটি এবং দ্রুত মেরামতের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। চলন্ত অবস্থায় এসব যন্ত্রপাতি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা তুলনামূলকভাবে জটিল হওয়ায় এ বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে এসব সমস্যার বেশিরভাগই নন-টেকনিক্যাল এবং সময়ের সঙ্গে সমাধানযোগ্য বলে মনে করা হচ্ছে।

এ ছাড়া ট্রেনের বাইরে গণপরিবহনে এই সেবা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে একটি টেকসই ব্যবসায়িক মডেল তৈরির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে ভর্তুকির ওপর নির্ভর করে এ ধরনের সেবা চালু রাখা কঠিন হওয়ায় বেসরকারি পরিবহন অপারেটরদের জন্যও এই সেবা উন্মুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি হতে পারে এবং সেবার মান উন্নত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. ইমাদুর রহমান বলেন, চলন্ত ট্রেনে স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট সেবা চালুর পরীক্ষামূলক উদ্যোগে যাত্রীদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে। এটি দেশে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগের চাহিদার একটি ইঙ্গিত বহন করে। তিনি জানান, পর্যায়ক্রমে বাস, ফেরি এবং দুর্গম এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এই সেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। একইসঙ্গে একক সাবস্ক্রিপশন ব্যবস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ তৈরির কাজ চলছে।

তিনি আরও জানান, এই সেবা চালুর জন্য ট্রেনের প্রতিটি বগি, বাস বা ফেরিতে বিশেষ স্যাটেলাইট রিসিভার এবং ওয়াই-ফাই রাউটার স্থাপন করা হচ্ছে। এসব যন্ত্র সরাসরি কক্ষপথে থাকা স্যাটেলাইটের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে এবং সেখান থেকে প্রাপ্ত ইন্টারনেট সিগন্যাল ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে যাত্রীদের মধ্যে বিতরণ করা হবে। যাত্রীরা বগিতে থাকা কিউআর কোড স্ক্যান করে সহজেই এই নেটওয়ার্কে যুক্ত হতে পারবেন। ভবিষ্যতে একটি কেন্দ্রীয় সাবস্ক্রিপশন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হলে ব্যবহারকারীরা একটি অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ট্রেন, বাস ও ফেরি—সব ধরনের পরিবহনে একইভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারবেন।

এদিকে বিএসসিএল সূত্রে আরও জানা গেছে, দেশের দুর্গম এলাকাতেও স্যাটেলাইট ইন্টারনেট পৌঁছে দিতে কাজ চলছে। এরইমধ্যে সীমান্তবর্তী অঞ্চল, হাওর এলাকা এবং নেটওয়ার্কবিহীন বিভিন্ন স্থানে মিলিয়ে ১১১টি পয়েন্টে এই সেবা চালু হয়েছে। যেখানে প্রচলিত ফাইবার অপটিক বা মোবাইল নেটওয়ার্ক স্থাপন করা কঠিন, সেখানে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট কার্যকর বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

একইসঙ্গে দেশের নিজস্ব স্যাটেলাইট ‘বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১’-এর ব্যবহারও ধীরে ধীরে বাড়ছে। বর্তমানে এই স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ৬৬টি টেলিভিশন চ্যানেলে সম্প্রচার সেবা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ট্রান্সপন্ডার ভাড়ার মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও সেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে নেপাল ও ফিলিপাইনসহ কয়েকটি দেশে স্যাটেলাইট সেবা রপ্তানির সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এর আরও খবর