img

মোবাইল দিয়ে সুন্দর প্রফেশনাল ফটোগ্রাফি: সবার জন্য সহজ গাইডলাইন

প্রকাশিত :  ০৯:৪৫, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৪
সর্বশেষ আপডেট: ১০:৩২, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৪

মোবাইল দিয়ে সুন্দর প্রফেশনাল ফটোগ্রাফি: সবার জন্য সহজ গাইডলাইন

রেজুয়ান আহম্মেদ


বর্তমানে প্রায় সবার হাতে মোবাইল ফোন রয়েছে, আর স্মার্টফোনের ক্যামেরার মান এতটাই উন্নত হয়েছে যে সঠিক কৌশল জানলে প্রফেশনাল মানের ছবি তোলা সম্ভব। যারা মোবাইল দিয়ে ভালো ছবি তুলতে চান, তাদের জন্য নিচে কিছু গুরুত্বপূর্ণ টিপস ও গাইডলাইন তুলে ধরা হলো, যা অনুসরণ করলে যে কেউ সহজেই প্রফেশনাল মানের ফটোগ্রাফি করতে পারবেন।

১. আলোকে সঠিকভাবে কাজে লাগান

ফটোগ্রাফির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো আলো। প্রাকৃতিক আলোর মধ্যে ছবি তুললে সবসময় ভালো মানের ছবি পাওয়া যায়। সকালে বা বিকেলে সূর্যের নরম আলো (golden hour) ছবি তোলার জন্য খুবই আদর্শ। সরাসরি আলো নয়, ছায়াময় জায়গায় ছবি তুলুন যাতে আলোর বৈপরীত্য ঠিক থাকে। কৃত্রিম আলোর ক্ষেত্রে লাইটের উজ্জ্বলতা এবং উৎসের দিকে মনোযোগ দিন।

২. ক্যামেরার সেটিংস বুঝে নিন

প্রফেশনাল ফটোগ্রাফির জন্য ফোনের ক্যামেরা সেটিংস সম্পর্কে জানা জরুরি। ক্যামেরার 'প্রো মোড' ব্যবহার করে ম্যানুয়াল ফোকাস, ISO, শাটার স্পিড, এবং হোয়াইট ব্যালান্স নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

ISO: ISO কমালে ছবি কম গ্রেনি হবে, কিন্তু আলো কম থাকলে বাড়াতে হবে।

শাটার স্পিড: দ্রুত মুভমেন্টের ছবি তুলতে চাইলে শাটার স্পিড বাড়িয়ে নিতে হবে। স্ট্যাটিক ছবি তুলতে কম শাটার স্পিড ভালো।

৩. ফ্রেমিং এবং কম্পোজিশন

একটি ভালো ফটো তোলার ক্ষেত্রে সঠিক ফ্রেমিং খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

Rule of Thirds: ছবির বিষয়বস্তুকে ফ্রেমের কেন্দ্রে না রেখে তৃতীয়াংশ অংশে রাখুন। এর জন্য ক্যামেরার গ্রিডলাইন ব্যবহার করতে পারেন।

Leading Lines: এমন কিছু খুঁজুন যা দর্শকের চোখকে ছবির মূল অংশে নিয়ে যায়, যেমন রাস্তা, রেললাইন, বা নদীর ধারা।

Symmetry: ছবিতে সিমেট্রি ব্যবহার করলে সুন্দর এবং সুষম ছবি তোলা সম্ভব।

৪. ফোকাস এবং গভীরতা

আপনার মোবাইল ফোনের অটোফোকাস ফিচার ঠিকমতো ব্যবহার করুন। সঠিক বিষয়বস্তুকে ফোকাস করতে স্ক্রিনে স্পর্শ করুন। গভীরতার (depth of field) ক্ষেত্রে ব্যাকগ্রাউন্ড ঝাপসা করার জন্য 'portrait mode' বা 'aperture' সেটিং ব্যবহার করুন। এতে বিষয়বস্তু আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

৫. স্টেবিলিটি নিশ্চিত করুন

ফোনের ক্যামেরা স্থিতিশীল না থাকলে ছবি ঝাপসা হয়ে যেতে পারে। তাই ছবি তোলার সময় হাতকে স্থির রাখুন বা ট্রাইপড ব্যবহার করুন। ফোনের ভলিউম বাটন বা ইয়ারফোনের শাটার বাটন ব্যবহার করে ছবি তুলতে পারেন, যা কম্পন কমাবে।

৬. প্রয়োজনীয় অ্যাপ ব্যবহার করুন

মোবাইল ক্যামেরার প্রাথমিক অ্যাপের বাইরে আরও কিছু উন্নতমানের ফটোগ্রাফি অ্যাপ ব্যবহার করতে পারেন যা শাটার স্পিড, ISO এবং এক্সপোজার নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হবে। যেমন:

Adobe Lightroom

Snapseed

VSCO এই অ্যাপগুলোতে ছবি এডিটিং করে পেশাদার মানের ছবি তৈরি করা সম্ভব।

৭. প্রাকৃতিক দৃশ্য বা পোর্ট্রেটের ক্ষেত্রে পরিপূরক ব্যাকগ্রাউন্ড ব্যবহার

যদি পোর্ট্রেট ফটোগ্রাফি করতে চান, তাহলে ব্যাকগ্রাউন্ডের দিকে বিশেষ মনোযোগ দিন। ব্যাকগ্রাউন্ডের সাথে বিষয়বস্তু যেন বৈপরীত্য তৈরি করে তোলা উচিত, যাতে মূল বিষয়বস্তু আরও ফুটে ওঠে।

৮. Zoom এড়িয়ে চলুন

ডিজিটাল জুম করলে ছবির মান অনেক কমে যায়। তাই ক্যামেরা জুম না করে বরং সাবজেক্টের কাছে গিয়ে ছবি তুলুন। এতে ছবির মান অপরিবর্তিত থাকবে।

৯. ছবির গল্প বলুন

প্রতিটি ছবির পেছনে একটি গল্প থাকা উচিত। ছবির কম্পোজিশন, আলো, এবং বিষয়বস্তু এমনভাবে সাজান যেন ছবি দেখেই দর্শক মুগ্ধ হয় এবং এর পেছনের গল্পটি অনুভব করতে পারে।

১০. এডিটিংয়ে সতর্কতা

এডিটিংয়ের সময় ছবির প্রাকৃতিকতা বজায় রাখুন। অতিরিক্ত ফিল্টার বা কৃত্রিম কালার ব্যবহার না করাই ভালো। Adobe Lightroom বা Snapseed-এর মতো অ্যাপের মাধ্যমে ব্যালেন্সড এডিটিং করতে পারেন। শুধু উজ্জ্বলতা (brightness), কন্ট্রাস্ট, এবং স্যাচুরেশন সামান্য বাড়িয়ে ছবি আরও আকর্ষণীয় করা যায়।

১১. বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল পরীক্ষা করুন

একই ফ্রেম থেকে ভিন্ন অ্যাঙ্গেল বা ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ছবি তুলতে পারেন। অনেক সময় নিচ থেকে উপরে তোলা ছবি, বা তির্যকভাবে তোলা ছবি আরও আকর্ষণীয় হয়। সৃজনশীলতা কাজে লাগান এবং নতুন কিছু চেষ্টা করতে ভয় পাবেন না।

১২. সময়মতো ক্যাপচার করুন

একটি ভালো ছবি তুলতে সঠিক মুহূর্তটি ধরতে জানতে হবে। বিশেষ করে মোবাইল ক্যামেরায় দ্রুত গতির ছবি তুলতে 'burst mode' ব্যবহার করতে পারেন। এতে মুহূর্তগুলো মিস করার আশঙ্কা কমে যায়।

শেষ কথা

মোবাইল দিয়ে প্রফেশনাল মানের ফটোগ্রাফি করতে কোনো দামী ক্যামেরা বা কঠিন কৌশল প্রয়োজন নেই। শুধু উপরের নির্দেশনাগুলো মেনে সঠিক সময়ে সঠিক ফ্রেমে ছবি তুললেই আপনি পেশাদার ফটোগ্রাফারের মতো ছবি তুলতে পারবেন। সর্বোপরি, প্রতিনিয়ত চর্চা করুন, কারণ ফটোগ্রাফি একটি দক্ষতা, যা সময়ের সাথে আরও উন্নত হয়।

আশা করা যায়, এই গাইডলাইনটি অনুসরণ করে আপনার মোবাইল দিয়ে তোলা ছবিগুলোতে প্রফেশনাল ফটোগ্রাফির ছোঁয়া পেতে সক্ষম হবেন।




রেজুয়ান আহম্মেদ: কলামিস্ট, বিশ্লেষক; সম্পাদক অর্থনীতি ডটকম

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এর আরও খবর

img

ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ এল নিনোর আশঙ্কা

প্রকাশিত :  ০৬:০৬, ২৩ জুন ২০২৬

নীল প্রশান্ত মহাসাগরের শান্ত বুকে নিঃশব্দে জেগে উঠছে এক রুদ্র প্রকৃতির মহাকাব্য। যে সমুদ্রের ঢেউয়ে একদিন পেরুর জেলেরা বড়দিনের রাতে পরম মায়া আর বিস্ময়ে নাম রেখেছিল ‘এল নিনো’ বা ‘শিশু যিশু’, সেই এল নিনোই এবার রূপ নিতে যাচ্ছে পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম প্রলয়ঙ্করী এক জলবায়ু খ্যাপামিতে।    

বিশ্ব জুড়ে আবহাওয়া ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে সক্ষম জলবায়ুগত ঘটনা এল নিনো আবারও শুরু হয়েছে । সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এনওএএ) নতুন এল নিনোর সূচনার ঘোষণা দিয়েছে।

বিজ্ঞানীদের পূর্বাভাস বলছে, এবারের এল নিনো অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিতে পারে। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা, খরা, তাপপ্রবাহ, দাবানল ও খাদ্যসংকটের ঝুঁকি বাড়তে পারে।আবহাওয়াবিদদের মতে, এবারের এল নিনো যদি পূর্বাভাস অনুযায়ী শক্তিশালী হয়, তাহলে এটি গত ৭৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর এল নিনো হতে পারে । বিশেষ করে আফ্রিকা, মধ্য আমেরিকা, ক্যারিবীয় অঞ্চল এবং এশিয়ার কিছু অংশে খরা ও বন্যা পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ আকার নিতে পারে । শত শত বছর আগে পেরুর জেলেরা লক্ষ্য করেছিলেন, কয়েক বছর পরপর বড়দিনের সময় প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলে অ্যাঙ্কোভি মাছ হঠাৎ কমে যায় । তারা এ ঘটনাকে ‘এল নিনো\' নামে অভিহিত করেন, যার অর্থ ‘শিশু যিশু\'।

বর্তমানে এল নিনোকে একটি বৈশ্বিক জলবায়ুগত চক্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি নিরক্ষীয় প্ৰশান্ত মহাসাগরের ওপর দিয়ে প্রবাহিত বায়ুর গতিপথ পরিবর্তনের ফলে সৃষ্টি হয়। এতে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যায় এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়ার ধরন বদলে যায়। এল নিনোর শক্তি নির্ধারণ করা হয় সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা কতটা বেড়েছে তার ওপর। সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি গড়ের তুলনায় দুই ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে সেটিকে শক্তিশালী এল নিনো ধরা হয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আবহাওয়া মডেলের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের বাকি সময় এবং ২০২৭ সালের শুরুর দিকে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা গড়ে ২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি, এমনকি ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও ওপরে উঠতে পারে ।

এখন পর্যন্ত সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো ছিল ১৯৮২-৮৩ সালের, যখন তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছিল ২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এবারের এল নিনো সেই রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এল নিনো নিজে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্টি হয় না। তবে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সঙ্গে মিলিত হয়ে এর প্রভাব আরো তীব্র হয়ে ওঠে। ১৯৯৭-৯৮ সালের শক্তিশালী এল নিনোর পর ১৯৯৮ সাল সে সময়ের সবচেয়ে উষ্ণ বছর হিসেবে রেকর্ড গড়েছিল। একইভাবে ২০১৫-১৬ সালের এল নিনোর পর ২০১৬ সালে নতুন রেকর্ড তৈরি হয়। বর্তমানে ২০২৪ সাল সবচেয়ে উষ্ণ বছর হিসেবে রেকর্ডধারী। সে বছর বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের তুলনায় ১ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। জলবায়ু মডেল অনুযায়ী, ২০২৭ সাল আরো উষ্ণ হতে পারে। এল নিনোর প্রভাব সব অঞ্চলে এক রকম হয় না। কোথাও খরা দেখা দেয়, আবার কোথাও অতিবৃষ্টি ও বন্যা হয়।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) গত ৯ জুন সতর্ক করে বলেছে, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং সাহেল অঞ্চলের মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। এর আগে ২০২৩-২৪ সালের এল নিনোর সময় দক্ষিণ আফ্রিকায় এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ খরা দেখা গিয়েছিল। এফএওর মতে, সোমালিয়ায় অক্টোবর পর্যন্ত খরা চলতে পারে। এরপর ডিসেম্বর পর্যন্ত ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। তবে দীর্ঘ খরার পর অতিবৃষ্টি পরিস্থিতি আরো খারাপ করতে পারে । কারণ শুকিয়ে যাওয়া মাটিতে বৃষ্টির পানি সহজে শোষিত হয় না, ফলে আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়। মধ্য আমেরিকা, ক্যারিবীয় অঞ্চল এবং এশিয়ার বিভিন্ন এলাকাও খরার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে সতর্ক করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক অঞ্চল এরই মধ্যে যুদ্ধ, খাদ্যসংকট ও অর্থনৈতিক সংকটে ভুগছে। এমন পরিস্থিতিতে শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলতে পারে। ইরানকে ঘিরে সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জটিলতার কারণে সার সরবরাহেও চাপ তৈরি হয়েছে। এতে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে ।

ইউরোপীয় কমিশন সতর্ক করেছে, সুদান, সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদান, চাদ, ইকুয়েডর, ভেনেজুয়েলা ও হাইতির মতো দেশগুলো মানবিক সংকটের মুখে পড়তে পারে। এল নিনো বিশ্বের প্রভাবশালী জলবায়ুগত ঘটনাগুলোর একটি। ১৯৯৭-৯৮ এবং ২০১৫-১৬ সালের শক্তিশালী এল নিনো বিশ্বের বহু অঞ্চলে ভয়াবহ খরা, বন্যা এবং খাদ্যসংকট সৃষ্টি করেছিল । এবারও বিজ্ঞানীরা একই ধরনের ঝুঁকির কথা বলছেন। পূর্বাভাস সত্যি হলে ২০২৭ সালে বৈশ্বিক তাপমাত্রা নতুন রেকর্ড গড়তে পারে এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা-খরা পরিস্থিতি আরো তীব্র হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এল নিনোর প্রভাব পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব না হলেও ক্ষতির পরিমাণ কমানো যায় । খরাসহিষ্ণু বীজ ব্যবহার, গবাদিপশুর জন্য খাদ্য ও পানি সংরক্ষণ এবং আগাম দুর্যোগ প্রস্তুতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে ।


বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এর আরও খবর