ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা : দুশ্চিন্তা বিভ্রান্তি অশান্তিতে আল্লাহর ওপর ভরসা
শায়খ আবদুল কাইয়ুম
আমরা অনেক সময় দুশ্চিন্তা, ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়, নিজের ব্যর্থতার অনুভূতি এবং মনের অশান্তির মধ্যে থাকি । কখনো কখনো ইবাদতের সময়ও আমরা কষ্ট পাই। নামাজে দাঁড়াই, কিন্তু মন বসে না। কুরআন খুলি, কিন্তু হৃদয় দূরে থাকে। তবুও আমরা অনেক সময় শান্তি খুঁজি আল্লাহ ছাড়া অন্য কোথাও, আর ভুলে যাই সেই সত্তাকে, যিনি আসল শক্তি, সাহায্য এবং পথনির্দেশের মালিক।
রাসূলুল্লাহ (সা:) আমাদের এই উম্মাহকে কোনো দিকনির্দেশনা ছাড়া রেখে যাননি। তিনি হৃদয়ের রোগগুলো চিনিয়ে দিয়েছেন এবং তার স্পষ্ট ও বাস্তব সমাধানও শিখিয়েছেন । সেই সমাধান হলো—আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া, তাঁর ওপর পুরোপুরি ভরসা করা এবং তাঁর ফয়সালার কাছে নিজেকে সঁপে দেওয়া।
কিন্তু আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়ার মানে কী? এর মানে হলো—পুরো বিশ্বাস রাখা যে, আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কোনো উপকার বা ক্ষতি আমাদের কাছে আসতে পারে না। জীবনের প্রতিটি বিষয়—সফলতা, ব্যর্থতা, সুখ, কষ্ট—সবই আল্লাহর হাতে । শুধু কষ্টের সময় নয়, সুখের সময়েও তাঁর দিকে ফিরে যাওয়া। নিজের দুর্বলতা বুঝে তাঁর ইবাদত করা।
এ কারণেই আমরা প্রতিদিন নামাজের প্রতিটি রাকাতে এই দোআ পড়ি।
“আমরা শুধু তোমারই ইবাদত করি, এবং শুধু তোমার কাছেই সাহায্য চাই।”
(কুরআন ১:৫)
একবার চিন্তা করুন—আমরা দিনে বহুবার স্বীকার করছি যে, আল্লাহর সাহায্য ছাড়া আমরা ঠিকভাবে ইবাদতও করতে পারি না। আমরা বলছি: “হে আল্লাহ, তোমার সাহায্য ছাড়া আমি ভালোভাবে নামাজও পড়তে পারি না।”
একজন আলেম বলেছেন: “যাকে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে অনুপ্রাণিত করা হয়েছে, সে ইতিমধ্যেই সফল হয়েছে। আরেকজন বলেছেন: “আমি অবাক হই সেই ব্যক্তির ওপর, যে আল্লাহর কাছে সাহায্য চায় না, কিন্তু মুক্তি আশা করে।
আমাদের বুঝতে হবে—আমরা দুর্বল । আল্লাহ নিজেই বলেছেন, মানুষকে দুর্বল করে সৃষ্টি করা হয়েছে।” (কুরআন ৪:২৮)
আপনি আপনাকে যতই শক্তিশালী ভাবুন না কেন—আপনার সম্পদ, স্বাস্থ্য, অবস্থান—সবকিছু এক মুহূর্তে বদলে যেতে পারে।
তাহলে আমরা কোথায় ফিরব? আল্লাহ তায়ালা বলেন: “যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে—তিনিই তার জন্য যথেষ্ট।” (কুরআন ৬৫:৩)। আমাদের আসল শক্তি নিজের আত্মবিশ্বাসে নয়, বরং আল্লাহর ওপর সম্পূর্ণ ভরসায়।
রাসূল (সা:) বলেছেন: শক্তিশালী মুমিন দুর্বল মুমিনের চেয়ে উত্তম ও আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয়, তবে উভয়ের মধ্যেই কল্যাণ আছে।
তিনি আমাদের একটি সুন্দর পথনির্দেশ দিয়েছেন। যা উপকারী, তা অর্জনের চেষ্টা করো, আল্লাহর সাহায্য চাও, এবং হাল ছেড়ো না। যদি কিছু হয়ে যায়, তাহলে “যদি এমন করতাম…” এসব বলো না। বরং বলো: আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন, তাই হয়েছে।”
কারণ “যদি” শব্দটি শয়তানের দরজা খুলে দেয় । অনুশোচনা আর দুঃখ বাড়ায়। কিন্তু মুমিন সেই দরজা বন্ধ করে দেয় আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থেকে।
আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া শুধু বড় বিষয় নয়—ছোট বিষয়েও। রাসূল (সা:) মুআয (রা:)-এর হাত ধরে বলেছিলেন: “আমি তোমাকে ভালোবাসি।” তারপর একটি দোআ শিখিয়েছিলেন: “হে আল্লাহ, আমাকে সাহায্য করো যেন আমি তোমাকে স্মরণ করতে পারি, তোমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারি, এবং সুন্দরভাবে তোমার ইবাদত করতে পারি।”
এমনকি আমাদের ইবাদতেও আল্লাহর সাহায্য প্রয়োজন। রাসূল (সা:) আরও বলেছেন, তোমাদের কেউ যেন তার সব প্রয়োজনে আল্লাহর কাছে চায়-এমনকি জুতার ফিতা ছিঁড়ে গেলেও। কিছুই ছোট নয়। প্রতিটি প্রয়োজনের জন্য আল্লাহর দিকে ফিরে যেতে হবে।
কারণ আল্লাহর ওপর ভরসা শুধু একটি কাজ নয়—এটি একটি সম্পর্ক। বলা হয়েছে, আল্লাহর ওপর ভরসা করা দ্বীনের অর্ধেক, আর বাকি অর্ধেক হলো তাঁর দিকে ফিরে আসা।
তাই আসুন, প্রতিটি দুশ্চিন্তায়, প্রতিটি বিভ্রান্তিতে আমরা আল্লাহর দিকে ফিরে আসি । চারদিকে সমাধান খোঁজার আগে তাঁর সাথে সম্পর্ক ঠিক করি।
আমরা সব জায়গায় সমাধান খুঁজি, কিন্তু ভুলে যাই সেই সত্তাকে, যিনি সবকিছুর নিয়ন্ত্রক।
হে আল্লাহ, আমাদেরকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করুন যারা সত্যিকারভাবে আপনার ওপর ভরসা করে। আমাদের অন্তরকে ঈমান দিয়ে শক্তিশালী করুন।
আমাদেরকে সাহায্য করুন যেন আমরা আপনাকে স্মরণ করতে পারি, কৃতজ্ঞ হতে পারি, এবং সুন্দরভাবে ইবাদত করতে পারি।
হে আল্লাহ, আমাদের অন্তরে শান্তি দিন এবং আপনার যেকোনো সিন্ধান্তে সন্তুষ্টি দান করুন। আমীন।



















