img

এসবিএসপি সাহিত্য সম্মাননা ও পুরস্কার পাচ্ছেন যাঁরা

প্রকাশিত :  ১৮:১৬, ০১ মে ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ২০:৪৪, ০১ মে ২০২৬

এসবিএসপি সাহিত্য সম্মাননা ও পুরস্কার পাচ্ছেন যাঁরা

বাংলা সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য ‌‘সোনার বাংলা সাহিত্য পরিষদ (এসবিএসপি) সাহিত্য সম্মাননা ও পুরস্কার -২০২৫’ পাচ্ছেন ১০ কবি ও লেখক।

আবহমান বাংলা সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য ‘এসবিএসপি সাহিত্য পুরস্কার ২০২৫’ পাচ্ছেন-

১. কবিতায় বিশেষ অবদানের জন্য মতিন বৈরাগী,

২ কবিতায় বিশেষ অবদানের জন্য দুখু বাঙাল,

৩. কবিতায় বিশেষ অবদানের জন্য মজিদ মাহমুদ,

৪. শিশুসাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য হাসনাত আমজাদ,

৫. কথাসাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য সমীর আহমেদ,

৬. কথাসাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য রেজুয়ান আহম্মেদ,

৭, কথাসাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য একেএম সুলতান মাহামুদ,

৮. কবিতায় বিশেষ অবদানের জন্য ড. হাফিজ রহমান,

৯. কথাসাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য শাহানাজ ইয়াসমিন, 

১০. কথাসাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য নুসরাত সুলতানা।

কথাসাহিত্যিক ও গল্পকার রেজুয়ান আহম্মেদের প্রতিক্রিয়া

এসবিএসপি সাহিত্য পুরস্কার ও সম্মাননা প্রপ্তদের তালিকায় নিজের নাম ঘোষিত হওয়ার অব্যবহিত পরে জনমতকে দেয়া এক প্রতিক্রিয়ায় বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক ও গল্পকার রেজুয়ান আহম্মেদ বলেন,

“আমি লেখক নই—এই স্বীকারোক্তিটি দীর্ঘকাল ধরে নীরবে লালন করছি। নিজেকে ‘কবি’ বলে পরিচয় দেওয়ার সাহসও হয় না; কারণ এই শব্দের অন্তর্নিহিত যে দায় ও দীপ্তি, তার সঙ্গে নিজেকে ঠিক মেলাতে পারি না। তাই নিজের জন্য এক বিচিত্র পরিচয় বেছে নিয়েছি—‘লেখার ফেরিওয়ালা’। শহরের ব্যস্ত মোড়ে কেউ যেমন পুরোনো বই সাজিয়ে বসে, কেউবা বিক্রি করে স্বপ্নের টুকরো, আমিও তেমনি মানুষের না-বলা কথাগুলো কুড়িয়ে আনি। ধুলো ঝেড়ে সেগুলোকে সাজাই, আর একসময় সেই কথাগুলোই কাগজের বুকে গল্প হয়ে জেগে ওঠে।

আমি মূলত শব্দের একজন টোকাই। পথের ধারে পড়ে থাকা ভাঙা বাক্য, চায়ের কাপে ভেসে ওঠা ক্লান্ত দীর্ঘশ্বাস কিংবা গোধূলির আলোয় ঝিমিয়ে পড়া কোনো বিষণ্ণ মুখ—এসবের মাঝেই আমি আমার রচনার উপাদান খুঁজি। যে মানুষগুলো নিজের যাতনাকে ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না, তাদের নীরবতা আমি ধার করি এবং তা বাক্যে বুনে দিই। তাদের হাসি-কান্না আর অপূর্ণতার ক্ষীণ প্রতিধ্বনিগুলো আমার কলমে আশ্রয় খোঁজে। আমি কেবল একজন বাহক মাত্র; প্রকৃত গল্পকার তো সেই মানুষগুলোই, যাদের জীবন নিঃশব্দে বয়ে চলে।

গল্পগুলোকে সযতনে গুছিয়ে আমি ফেরিওয়ালার মতোই প্রকাশকদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াই। কেউ হয়তো দু-দণ্ড সময় দেয়, কেউবা নিঃসঙ্কোচে ফিরিয়ে দেয়। এর মাঝে যে কয়টি গল্প আলোর মুখ দেখে, তা থেকে অর্জিত যৎসামান্য প্রাপ্তিতেই আমি সন্তুষ্ট। বড় কোনো স্বপ্নের বিলাস কিংবা নাম-যশের মোহ আমার নেই; এ কেবল টিকে থাকার এক শান্ত ও অনাড়ম্বর লড়াই।

তবুও মাঝে মাঝে মনে হয়, এই নামহীন ফেরিওয়ালা সত্তাই আমার সবচেয়ে বড় সত্য। কারণ আমি কেবল গল্প কেনাবেচা করি না; আমি একজনের অদেখা সত্য আর অশ্রুত কণ্ঠস্বর পৌঁছে দিই অন্যজনের কাছে। মানুষের হৃদয়ের মাঝে সেই অদৃশ্য সেতুবন্ধন তৈরির মাধ্যমেই হয়তো আমার অস্তিত্ব প্রকৃত অর্থে সার্থক হয়।”

উল্লেখ্য, সোনার বাংলা সাহিত্য পরিষদ (এসবিএসপি) গত ১০ বছর ধরে বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য কবি-লেখকদের পুরস্কৃত করে আসছে। প্রতি বছর বিশেষ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এ পুরস্কার দেওয়া হয়।

সাহিত্য-সংস্কৃতি এর আরও খবর

img

মানুষ, সময় ও সীমান্তের ওপারে: রেজুয়ান আহম্মেদের সাহিত্যভুবনের পাঠ

প্রকাশিত :  ১৮:১২, ০৩ আগষ্ট ২০২৬

✍️ ড. সৈয়দ আনিসুর রহমান 

সমকালীন বাংলা সাহিত্যের পরিসরে এমন কিছু লেখক আছেন, যাঁরা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে না থেকেও দীর্ঘ সময় ধরে নিজস্ব সাহিত্যভাষা নির্মাণ করে চলেছেন। রেজুয়ান আহম্মেদ সেই ধারারই একজন। তাঁর সাহিত্যিক যাত্রার বিশেষত্ব কেবল বিষয় নির্বাচনে নয়, মানুষের অন্তর্জগতের গভীর উপলব্ধির আন্তরিক চেষ্টাতেও দৃশ্যমান। তাঁর গল্প, উপন্যাস ও নিবন্ধ সবকিছুর কেন্দ্রেই শেষ পর্যন্ত ফিরে আসে মানুষ; উঠে আসে তার ভয়, ভাঙন, আশা, স্মৃতি এবং টিকে থাকার অবিরাম সংগ্রাম।

রেজুয়ান আহম্মেদের লেখায় প্রাত্যহিক জীবনের দৃশ্যমান ঘটনাগুলোর চেয়ে অদৃশ্য মানসিক অভিঘাতই বেশি গুরুত্ব পায়। তিনি বাহ্যিক সংঘাতের বর্ণনার চেয়ে মানুষের অন্তর্লোকের নীরব আলোড়নকে ধরতে আগ্রহী। তাঁর কাছে যুদ্ধ কেবল গোলাবারুদ বা রণক্ষেত্রের ইতিহাস নয়; যুদ্ধ মানে পরিবার হারানোর বেদনা, শৈশবের বিচ্ছেদ, দীর্ঘ নির্বাসনের ছায়া কিংবা মানুষের গভীরে জন্ম নেওয়া তীব্র অনিরাপত্তাবোধ। এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁর আখ্যানকে কেবল ঘটনানির্ভর না রেখে মানবিক অভিজ্ঞতার বিস্তৃত পরিসরে উন্নীত করে।

বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় তাঁর লেখালেখির প্রবণতা লক্ষণীয়। বাংলা রচনায় দেশীয় সমাজ, প্রান্তিক মানুষের জীবন, লোকজ বাস্তবতা ও সামাজিক বৈপরীত্য বারবার ফিরে আসে। অন্যদিকে, ইংরেজি আখ্যানগুলোতে প্রাধান্য পায় যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি, অভিবাসন, মানসিক স্বাস্থ্য এবং বৈশ্বিক মানবিক সংকটের মতো বিষয়। বিষয়ের ভিন্নতা থাকলেও উভয় ধারার লেখার ভেতরেই একটি অভিন্ন সুর স্পষ্ট মানুষের মর্যাদা, সহমর্মিতা ও অস্তিত্বের প্রশ্ন।

তাঁর গদ্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য সংযম। অপ্রয়োজনীয় অলংকারে তিনি আখ্যানকে ভারাক্রান্ত করেন না, আবার অতিরিক্ত নাটকীয়তার আশ্রয়ও নেন না। বরং দৃশ্য, সংলাপ ও চরিত্রের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই তিনি পাঠকের গভীরে পৌঁছাতে চান। তাঁর চরিত্রগুলো প্রায়ই সমাজের প্রান্তিক বাস্তবতা থেকে উঠে আসা। তাদের জীবনে বড় কোনো বীরত্ব নেই; আছে ক্ষুদ্র অথচ গভীর মানবিক মুহূর্ত, যা পাঠ শেষ হওয়ার পরও দীর্ঘ সময় পাঠকের মনে অনুরণিত হয়।

রেজুয়ান আহম্মেদের সাহিত্যে নৈতিক বোধ সুস্পষ্ট। তিনি নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়াতে চান, যুদ্ধের বিরুদ্ধে কথা বলতে চান এবং সামাজিক বৈষম্যের প্রশ্ন উত্থাপন করতে চান। এই অবস্থান তাঁর সাহিত্যিক পরিচয়েরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে সাহিত্যের নিজস্ব একটি নিয়ম রয়েছে চরিত্র যখন নিজ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে কথা বলে, তখন আখ্যান আরও বহুমাত্রিক হয়ে ওঠে। ভবিষ্যতের লেখায় চরিত্রের অন্তর্দ্বন্দ্ব ও অনিশ্চয়তার গভীরতা আরও বৃদ্ধি পেলে তাঁর সাহিত্য নতুন শিল্পসম্ভাবনার দিকে অগ্রসর হবে।

পেশাগত জীবনে অর্থনীতি ও পুঁজিবাজার-সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা তাঁর চিন্তার কাঠামোকে প্রভাবিত করেছে। ফলে সমাজ, রাষ্ট্র ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার আন্তঃসম্পর্ক তিনি অত্যন্ত সচেতনভাবে উপলব্ধি করেন। এই অভিজ্ঞতা তাঁর গদ্যকে অনেক সময় বিশ্লেষণধর্মী ভিত্তি দেয়, যা সমকালীন বাংলা কথাসাহিত্যে সচরাচর দেখা যায় না। তবে সাহিত্য তখনই সবচেয়ে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে, যখন বিশ্লেষণ চরিত্রের অভিজ্ঞতার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে মিশে যায়। রেজুয়ান আহম্মেদের সাম্প্রতিক লেখায় সেই ভারসাম্যের অনুসন্ধানই লক্ষ করা যায়।

সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে প্রকাশনাজগতেও বদল এসেছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, ই-বুক এবং প্রিন্ট-অন-ডিমান্ড প্রযুক্তি লেখকদের সামনে নতুন পাঠকসমাজের দ্বার উন্মুক্ত করেছে। রেজুয়ান আহম্মেদ এই পরিবর্তিত বাস্তবতাকে গ্রহণ করেছেন। ফলে তাঁর রচনা দেশীয় পাঠকের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পাঠকমহলেও পৌঁছে যাচ্ছে। তবে সাহিত্যে দীর্ঘস্থায়ী গ্রহণযোগ্যতার প্রকৃত ভিত্তি বিপণন নয়; বরং পাঠকের মনে গল্পের দীর্ঘস্থায়ী অনুরণন সৃষ্টির ক্ষমতা। সেই পরীক্ষা প্রতিটি লেখকের মতো তাঁর সামনেও উন্মুক্ত।

সবশেষে বলা যায়, রেজুয়ান আহম্মেদের সাহিত্যকে এক কথায় সংজ্ঞায়িত করা সহজ নয়। তিনি যেমন প্রান্তিক জীবনের কথক, তেমনি বৈশ্বিক মানবিক সংকটেরও নিবিড় পর্যবেক্ষক। তাঁর লেখায় দেশীয় বাস্তবতা ও বিশ্বজনীন অভিজ্ঞতা একে অপরের সঙ্গে প্রাঞ্জল সংলাপে যুক্ত হয়েছে। নিজের স্বরকে আরও শাণিত করা, চরিত্রের অন্তর্জীবনকে গভীরভাবে অন্বেষণ করা এবং ভাষার সংযমকে পরিণত করে তোলার মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা কথাসাহিত্যে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান নির্মাণের সম্ভাবনা ধারণ করেন। একজন লেখকের প্রকৃত পরিচয় তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যায় নয়, বরং সময়ের সঙ্গে তাঁর সাহিত্য কতটা নতুন পাঠ ও ভাবনার জন্ম দিতে পারছে তার মধ্যেই। সেই বিবেচনায় রেজুয়ান আহম্মেদের সাহিত্যভুবন আরও মনোযোগী পাঠ ও গভীর আলোচনার দাবি রাখে।