কয়েক যুগ পর আসেন যাঁরা
ড. নাজমুল ইসলাম
বাংলা সাহিত্যের বর্তমান সময়টা বেশ বিচিত্র। এখানে শব্দের চেয়ে কোলাহল বেশি, সৃষ্টির চেয়ে প্রচারণার দাপট প্রবল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্রুতগতির ভিড়ে অনেক লেখকই যখন আত্মপ্রচারে ব্যস্ত, তখন কিছু নিভৃতচারী মানুষ কেবল অন্তরের দায়বদ্ধতা থেকে লিখে যান। কথাসাহিত্যিক রেজুয়ান আহম্মেদ তাঁদেরই একজন।
প্রথম দেখায় তাঁকে খুব সাধারণ মনে হতে পারে; কিন্তু তাঁর সৃষ্টির গহিন অরণ্যে প্রবেশ করলে বোঝা যায়, এই মানুষটি সমাজের ভাঙা আয়নায় মানুষের প্রকৃত মুখচ্ছবি পাঠ করতে জানেন। তিনি শুধু গল্প লেখেন না, গল্পের আবরণে সময়কে জীবন্ত করে রাখেন। তাঁর কবিতার চরণে চরণে জমা থাকে মানুষের অব্যক্ত হাহাকার। গান, নাটক কিংবা প্রবন্ধ—যাই লিখুন না কেন, তাঁর লেখনীর কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে ব্রাত্য মানুষ।
রেজুয়ান আহম্মেদের লেখার প্রধান শক্তি হলো তাঁর সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা। ব্যস্ত রাজপথের শ্রমিকের জীবন যেমন তাঁর দৃষ্টি এড়ায় না, তেমনি হাসপাতালের করিডরে অপেক্ষমাণ ক্লান্ত চিকিৎসকের ভেতরের অস্থিরতাও তিনি নিখুঁতভাবে ধরতে পারেন। ‘এক মুঠো গল্প’, ‘মায়াবী মুহূর্ত’ কিংবা ‘সাদা অ্যাপ্রনের আড়ালে’-র মতো সৃষ্টিগুলো পাঠ করলে মনে হয়, তিনি কেবল কথাসাহিত্যিক নন, বরং মানুষের জীবনের এক নিপুণ ও নীরব প্রতিবেদক।
তাঁর অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো দ্বিভাষিক দক্ষতা। বাংলা ও ইংরেজি—উভয় ভাষাতেই সমান সাবলীলভাবে সাহিত্যচর্চা করা দুরূহ কাজ। কিন্তু \'The Days of Gaza\' কিংবা \'Love of the Forest Bird\' পাঠ করলে বোঝা যায়, তিনি কেবল ভাষা পরিবর্তন করেন না, বরং পাঠকের অনুভূতির জগৎকেও স্পর্শ করেন। বাংলার আবেগ আর ইংরেজি ভাষার বৈশ্বিক বোধের মধ্যে তিনি এক অনন্য সেতুবন্ধ তৈরি করেছেন।
রেজুয়ানের গদ্যে কোনো আস্ফালন নেই, আছে এক ধরনের স্নিগ্ধ বিনয়। তিনি নিজেকে “লেখার টোকাই” বলতে পছন্দ করেন। এই পরিচয়ের মধ্যেই লুকিয়ে আছে তাঁর সাহিত্যদর্শন। জীবনের কুড়িয়ে নেওয়া শব্দ আর অবহেলিত মানুষের আখ্যান তিনি এমনভাবে সাজান, যেখানে পাঠক নিজের জীবনকেই নতুন দর্পণে দেখার সুযোগ পান।
বর্তমান যুগে যখন লেখকেরা প্রচারের আলো খোঁজেন, রেজুয়ান আহম্মেদ তখন সেই আলো থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকেন। সস্তা খ্যাতির মোহ ত্যাগ করে তিনি বেছে নিয়েছেন সৃজনের নিভৃত পথ। এ কারণেই হয়তো তাঁকে নিয়ে উচ্চকিত আলোচনা কম, কিন্তু যাঁরা একবার তাঁর লেখার স্বাদ পেয়েছেন, তাঁরা তাঁকে সহজে বিস্মৃত হতে পারেন না।
২০২৫ সালে কথাসাহিত্যে ‘এসবিএসপি সাহিত্য পুরস্কার’ অর্জনের পরও তাঁর মাঝে কোনো আতিশয্য দেখা যায়নি। বরং তাঁর অভিব্যক্তিতে এটিই প্রতীয়মান হয়েছে যে—পুরস্কার তাঁর কাছে কোনো গন্তব্য নয়, বরং দায়বদ্ধতা বৃদ্ধির এক স্মারক মাত্র।
বাংলা সাহিত্যে বহুমাত্রিক লেখকের আকাল সব সময়ই ছিল। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল কিংবা সৈয়দ শামসুল হকের উত্তরকালে এমন বিস্তৃত ক্যানভাসের লেখক খুব কমই চোখে পড়ে। রেজুয়ান আহম্মেদকে সেই ঐতিহ্যের একজন যোগ্য উত্তরসূরি বললে অত্যুক্তি হবে না। কারণ তাঁর লেখনীতে যেমন প্রেম আছে, তেমনি আছে যুদ্ধের ভয়াবহতা; যেমন প্রকৃতি আছে, তেমনি আছে নাগরিক নিঃসঙ্গতা; যেমন ব্যক্তিগত হাহাকার আছে, তেমনি আছে রূঢ় সামাজিক বাস্তবতা।
পরিশেষে বলা যায়—রেজুয়ান আহম্মেদ কেবল একজন লেখক নন, তিনি সময়কে শব্দে বন্দি করার এক নিভৃত কারিগর। এমন স্রষ্টারা বারবার আসেন না; তাঁরা আসেন কয়েক যুগ পর পর। আর যখন আসেন, তখন তাঁদের সৃষ্টি অবিনশ্বর হয়ে পাঠকের হৃদয়ে শেকড় গেড়ে বসে।
সময় হয়তো এখনো তাঁকে পুরোপুরি উন্মোচন করেনি, কিন্তু বাংলা সাহিত্য একদিন নিশ্চয়ই তাঁকে তাঁর প্রাপ্য মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করবে।

















