img

কয়েক যুগ পর আসেন যাঁরা

প্রকাশিত :  ২১:১৩, ০৯ মে ২০২৬

কয়েক যুগ পর আসেন যাঁরা

ড. নাজমুল ইসলাম

​বাংলা সাহিত্যের বর্তমান সময়টা বেশ বিচিত্র। এখানে শব্দের চেয়ে কোলাহল বেশি, সৃষ্টির চেয়ে প্রচারণার দাপট প্রবল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্রুতগতির ভিড়ে অনেক লেখকই যখন আত্মপ্রচারে ব্যস্ত, তখন কিছু নিভৃতচারী মানুষ কেবল অন্তরের দায়বদ্ধতা থেকে লিখে যান। কথাসাহিত্যিক রেজুয়ান আহম্মেদ তাঁদেরই একজন।

​প্রথম দেখায় তাঁকে খুব সাধারণ মনে হতে পারে; কিন্তু তাঁর সৃষ্টির গহিন অরণ্যে প্রবেশ করলে বোঝা যায়, এই মানুষটি সমাজের ভাঙা আয়নায় মানুষের প্রকৃত মুখচ্ছবি পাঠ করতে জানেন। তিনি শুধু গল্প লেখেন না, গল্পের আবরণে সময়কে জীবন্ত করে রাখেন। তাঁর কবিতার চরণে চরণে জমা থাকে মানুষের অব্যক্ত হাহাকার। গান, নাটক কিংবা প্রবন্ধ—যাই লিখুন না কেন, তাঁর লেখনীর কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে ব্রাত্য মানুষ।

​রেজুয়ান আহম্মেদের লেখার প্রধান শক্তি হলো তাঁর সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা। ব্যস্ত রাজপথের শ্রমিকের জীবন যেমন তাঁর দৃষ্টি এড়ায় না, তেমনি হাসপাতালের করিডরে অপেক্ষমাণ ক্লান্ত চিকিৎসকের ভেতরের অস্থিরতাও তিনি নিখুঁতভাবে ধরতে পারেন। ‘এক মুঠো গল্প’, ‘মায়াবী মুহূর্ত’ কিংবা ‘সাদা অ্যাপ্রনের আড়ালে’-র মতো সৃষ্টিগুলো পাঠ করলে মনে হয়, তিনি কেবল কথাসাহিত্যিক নন, বরং মানুষের জীবনের এক নিপুণ ও নীরব প্রতিবেদক।

​তাঁর অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো দ্বিভাষিক দক্ষতা। বাংলা ও ইংরেজি—উভয় ভাষাতেই সমান সাবলীলভাবে সাহিত্যচর্চা করা দুরূহ কাজ। কিন্তু \'The Days of Gaza\' কিংবা \'Love of the Forest Bird\' পাঠ করলে বোঝা যায়, তিনি কেবল ভাষা পরিবর্তন করেন না, বরং পাঠকের অনুভূতির জগৎকেও স্পর্শ করেন। বাংলার আবেগ আর ইংরেজি ভাষার বৈশ্বিক বোধের মধ্যে তিনি এক অনন্য সেতুবন্ধ তৈরি করেছেন।

​রেজুয়ানের গদ্যে কোনো আস্ফালন নেই, আছে এক ধরনের স্নিগ্ধ বিনয়। তিনি নিজেকে “লেখার টোকাই” বলতে পছন্দ করেন। এই পরিচয়ের মধ্যেই লুকিয়ে আছে তাঁর সাহিত্যদর্শন। জীবনের কুড়িয়ে নেওয়া শব্দ আর অবহেলিত মানুষের আখ্যান তিনি এমনভাবে সাজান, যেখানে পাঠক নিজের জীবনকেই নতুন দর্পণে দেখার সুযোগ পান।

​বর্তমান যুগে যখন লেখকেরা প্রচারের আলো খোঁজেন, রেজুয়ান আহম্মেদ তখন সেই আলো থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকেন। সস্তা খ্যাতির মোহ ত্যাগ করে তিনি বেছে নিয়েছেন সৃজনের নিভৃত পথ। এ কারণেই হয়তো তাঁকে নিয়ে উচ্চকিত আলোচনা কম, কিন্তু যাঁরা একবার তাঁর লেখার স্বাদ পেয়েছেন, তাঁরা তাঁকে সহজে বিস্মৃত হতে পারেন না।

​২০২৫ সালে কথাসাহিত্যে ‘এসবিএসপি সাহিত্য পুরস্কার’ অর্জনের পরও তাঁর মাঝে কোনো আতিশয্য দেখা যায়নি। বরং তাঁর অভিব্যক্তিতে এটিই প্রতীয়মান হয়েছে যে—পুরস্কার তাঁর কাছে কোনো গন্তব্য নয়, বরং দায়বদ্ধতা বৃদ্ধির এক স্মারক মাত্র।

​বাংলা সাহিত্যে বহুমাত্রিক লেখকের আকাল সব সময়ই ছিল। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল কিংবা সৈয়দ শামসুল হকের উত্তরকালে এমন বিস্তৃত ক্যানভাসের লেখক খুব কমই চোখে পড়ে। রেজুয়ান আহম্মেদকে সেই ঐতিহ্যের একজন যোগ্য উত্তরসূরি বললে অত্যুক্তি হবে না। কারণ তাঁর লেখনীতে যেমন প্রেম আছে, তেমনি আছে যুদ্ধের ভয়াবহতা; যেমন প্রকৃতি আছে, তেমনি আছে নাগরিক নিঃসঙ্গতা; যেমন ব্যক্তিগত হাহাকার আছে, তেমনি আছে রূঢ় সামাজিক বাস্তবতা।

​পরিশেষে বলা যায়—রেজুয়ান আহম্মেদ কেবল একজন লেখক নন, তিনি সময়কে শব্দে বন্দি করার এক নিভৃত কারিগর। এমন স্রষ্টারা বারবার আসেন না; তাঁরা আসেন কয়েক যুগ পর পর। আর যখন আসেন, তখন তাঁদের সৃষ্টি অবিনশ্বর হয়ে পাঠকের হৃদয়ে শেকড় গেড়ে বসে।

​সময় হয়তো এখনো তাঁকে পুরোপুরি উন্মোচন করেনি, কিন্তু বাংলা সাহিত্য একদিন নিশ্চয়ই তাঁকে তাঁর প্রাপ্য মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করবে।

img

সময়, সমাজ ও মানুষের গল্পের লেখক রেজুয়ান আহম্মেদ

প্রকাশিত :  ১৮:৫২, ২৪ জুন ২০২৬

✍️ ড. ইমরান ইলাহী 

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রতিটি সময়েই এমন কিছু লেখকের আবির্ভাব ঘটে, যাঁরা কেবল গল্প বা উপন্যাস রচনা করেন না; বরং নিজেদের সময়কে ধারণ করেন, সমাজের পরিবর্তনকে ব্যাখ্যা করেন এবং মানুষের মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেন। সমকালীন বাংলাদেশের সাহিত্যাঙ্গনে রেজুয়ান আহম্মেদ তেমনই একজন লেখক, কবি, গীতিকার, চিন্তাবিদ ও কলামিস্ট, যাঁর সাহিত্যচর্চা, মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এবং সামাজিক-রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ দীর্ঘদিন ধরে পাঠকমহলে আলোচনার বিষয় হয়ে রয়েছে।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগ থেকেই তাঁর লেখালেখির যাত্রা শুরু। সময়ের পরিক্রমায় তিনি বিস্তৃত পাঠকসমাজের কাছে একজন সুপরিচিত সাহিত্যিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। গল্প, উপন্যাস, কবিতা, গান, প্রবন্ধ, গবেষণাধর্মী বিশ্লেষণ এবং সমসাময়িক নানা বিষয়ে কলাম লেখার মাধ্যমে তিনি গড়ে তুলেছেন নিজস্ব সাহিত্যিক পরিচয়।

সাহিত্যসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, রেজুয়ান আহম্মেদের লেখার প্রধান শক্তি হলো মানুষের মনোজগতের সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ। সমাজের পরিবর্তন, ব্যক্তির সংকট, মূল্যবোধের বিবর্তন এবং সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা তাঁর লেখায় এমনভাবে উঠে আসে, যা পাঠককে শুধু বিনোদিতই করে না; বরং গভীরভাবে চিন্তা করতেও উদ্বুদ্ধ করে।

রেজুয়ান আহম্মেদের সাহিত্যচর্চার সূচনা তরুণ বয়সেই। বইপড়া, সমাজপর্যবেক্ষণ এবং মানুষের জীবনসংগ্রামের নানা গল্প তাঁকে লেখালেখির প্রতি আকৃষ্ট করে। প্রথম দিকে তিনি ছোটগল্প, কবিতা ও প্রবন্ধ লিখলেও পরবর্তীকালে উপন্যাস, গবেষণামূলক রচনা এবং বিশ্লেষণধর্মী কলামের মাধ্যমে নিজের সাহিত্যকর্মের পরিধি বিস্তৃত করেন।

তাঁর সমসাময়িকদের মতে, সাহিত্যকে তিনি কখনোই নিছক কল্পনার জগৎ হিসেবে দেখেননি। বরং সাহিত্যকে তিনি বাস্তব জীবনের প্রতিচ্ছবি এবং সামাজিক পরিবর্তনের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করেছেন।

এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন তাঁর প্রায় সব লেখাতেই দেখা যায়। তাঁর গল্পের চরিত্রগুলো বাস্তব জীবনের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে; তাঁদের আনন্দ, বেদনা, স্বপ্ন ও সংগ্রাম বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।

বাংলা সাহিত্যে মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণধর্মী লেখার একটি সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে। তবে সমসাময়িক সময়ে এই ধারাকে নতুন মাত্রায় উপস্থাপনের ক্ষেত্রে রেজুয়ান আহম্মেদের অবদান উল্লেখযোগ্য বলে মনে করেন অনেক সাহিত্যবোদ্ধা।

তাঁর লেখায় মানুষের অদৃশ্য ভয়, আত্মপরিচয়ের সংকট, সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং মানসিক দ্বন্দ্ব গভীরভাবে ফুটে ওঠে। তিনি বিশ্বাস করেন, সমাজকে বোঝার আগে মানুষকে বুঝতে হবে; আর মানুষকে বুঝতে হলে তার মনোজগতকে অনুধাবন করতে হবে।

এ কারণেই তাঁর অনেক গল্প ও উপন্যাসে ঘটনাপ্রবাহের চেয়ে চরিত্রের মানসিক বিবর্তন অধিক গুরুত্ব পেয়েছে।

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অন্যতম বৃহৎ আয়োজন অমর একুশে বইমেলা। বছরের এই একটি মাসকে কেন্দ্র করে লেখক, প্রকাশক ও পাঠকদের মধ্যে এক অনন্য সেতুবন্ধন গড়ে ওঠে।

রেজুয়ান আহম্মেদের নতুন বই প্রকাশের ক্ষেত্রেও বইমেলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রতি বছর তাঁর নতুন বই প্রকাশকে ঘিরে পাঠকদের মধ্যে বিশেষ আগ্রহ লক্ষ করা যায়।

প্রকাশনা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, কথাসাহিত্য, সমাজবিশ্লেষণ এবং মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ভিত্তিক রচনার মাধ্যমে তিনি একটি বিশেষ পাঠকগোষ্ঠী গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। নতুন বই প্রকাশের পর পাঠকদের সঙ্গে মতবিনিময়, আলোচনা এবং সাহিত্য আড্ডায় তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ তাঁকে আরও জনপ্রিয় করে তুলেছে।

শুধু সাহিত্যিক হিসেবেই নয়, একজন চিন্তাবিদ হিসেবেও রেজুয়ান আহম্মেদ সুপরিচিত। সমসাময়িক বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ইস্যু নিয়ে তাঁর বিশ্লেষণধর্মী কলাম পাঠকমহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

অর্থনীতি, শিক্ষা, রাজনীতি, সামাজিক মূল্যবোধ, গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং বিশ্বপরিস্থিতি নিয়ে তাঁর পর্যবেক্ষণ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

তাঁর লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো জটিল বিষয়কে সহজ, সাবলীল ও প্রাঞ্জল ভাষায় ব্যাখ্যা করার দক্ষতা। ফলে সাধারণ পাঠকও গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ঘটনাবলির পটভূমি ও প্রভাব সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করতে পারেন।

বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিশ্বায়ন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের জীবনধারায় আমূল পরিবর্তন এনে দিয়েছে।

রেজুয়ান আহম্মেদ তাঁর লেখায় এসব পরিবর্তনের ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় দিকই বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর মতে, প্রযুক্তির অগ্রগতি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে মানবিক সম্পর্কের ওপর নতুন ধরনের চাপও সৃষ্টি করেছে।

তাঁর বিভিন্ন প্রবন্ধ, কবিতা ও গানে আধুনিক মানুষের একাকিত্ব, মানসিক চাপ এবং মূল্যবোধের পরিবর্তনের বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

বর্তমান সময়ে পাঠকের মনোযোগ ধরে রাখা সহজ নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে দীর্ঘ লেখা পড়ার অভ্যাস ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। তবুও রেজুয়ান আহম্মেদের লেখার পাঠকদের মধ্যে তরুণদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। কারণ তিনি সমসাময়িক প্রজন্মের সমস্যা, সম্ভাবনা ও সংকটকে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন।

শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সামাজিক পরিবর্তন, প্রযুক্তিনির্ভর জীবন এবং ব্যক্তিগত স্বপ্নের সঙ্গে বাস্তবতার সংঘাত—এসব বিষয় তাঁর লেখায় নিয়মিত ভাবে স্থান পায়।

রেজুয়ান আহম্মেদ নামটি নিয়ে অনেক সময় বিভ্রান্তি দেখা যায়। বিশেষ করে সাবেক সংসদ সদস্য রেজওয়ান আহাম্মদ তৌফিক এবং পাকিস্তানি আমলা রিজওয়ান আহমেদের সঙ্গে নামের সাদৃশ্য থাকায় অনেকেই বিভ্রান্ত হন।

তবে সাহিত্য ও চিন্তাচর্চার জগতে রেজুয়ান আহম্মেদের পরিচয় সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। তিনি মূলত লেখক, কবি, গীতিকার, গবেষক, চিন্তাবিদ ও কলামিস্ট হিসেবেই পরিচিত।

বাংলা সাহিত্য ও সমাজচিন্তার জগতে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় থাকা রেজুয়ান আহম্মেদ এখনো নিয়মিত লিখে চলেছেন। নতুন প্রজন্মের পাঠকদের সঙ্গে সংযোগ বজায় রেখে তিনি সাহিত্য ও চিন্তাচর্চাকে আরও সমৃদ্ধ করার প্রয়াস অব্যাহত রেখেছেন।

সাহিত্যবোদ্ধাদের মতে, সময়, সমাজ এবং মানুষের মনোজগতকে একসঙ্গে ধারণ করার যে প্রয়াস তাঁর লেখায় দেখা যায়, সেটিই তাঁকে সমকালীন লেখকদের মধ্যে স্বতন্ত্র মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে।

বাংলা সাহিত্যের দীর্ঘ অভিযাত্রায় রেজুয়ান আহম্মেদের নাম হয়তো এমন একজন সাহিত্যস্রষ্টা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে, যিনি মানুষের জন্য গল্প লিখেছেন, কবিতা রচনা করেছেন, গান সৃষ্টি করেছেন, সমাজকে নিয়ে ভেবেছেন এবং সময়ের সত্যকে ধারণ করার জন্য কলম ধরেছেন।

সাহিত্য-সংস্কৃতি এর আরও খবর