img

পথশিশু নয়ন

প্রকাশিত :  ০৮:৫৯, ১৩ জুন ২০২৬

পথশিশু নয়ন

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

ঢাকার রাতের বাতাস নিস্পৃহ ও ভারী। সেই বাতাসে কোনো বসন্তের সুবাস থাকে না, বরং তা এক জটিল জৈব-রাসায়নিক যৌগের মতো মানুষের নাসিকায় আঘাত করে। মৌচাকের মোড়ে থিতু হওয়া ধুলোবালি, মালিবাগের কাঁচাবাজারে পচে যাওয়া ফলের খোসা, আর দিনভর খাটাখাটনি করা মানুষের শরীরের তপ্ত, নোনতা ঘামের বাষ্প—সব মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। এই গন্ধের গভীরে লুকিয়ে থাকে আরও একটি সূক্ষ্ম উপাদান—অপূর্ণ স্বপ্নের গন্ধ, যা জন্ম নেয় কিন্তু পুষ্ট হওয়ার আগেই ফুটপাতের ধুলোয় পিষ্ট হয়ে মরে যায়।

ফুটপাতের কঠিন ও অসমান কংক্রিটের ওপর শুয়ে আছে নয়ন।

তার বয়স মাত্র এগারো। কিন্তু অপুষ্টি আর ধুলোবালি তার কপালে এমন কিছু অকালবার্ধক্যের রেখা টেনে দিয়েছে, যা দেখে তাকে বয়সের চেয়ে অনেক প্রবীণ মনে হয়। নয়নের শরীরটি শুকনো, বুকের পাঁজরগুলো যেন চামড়ার পাতলা আবরণের নিচ থেকে গণনা করা যায়। তার বড় বড় কোটরাগত চোখ দুটোতে জমে আছে এক আদিম জিজ্ঞাসা, যার উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন এই মহানগরের দ্রুতগামী চাকাগুলো কোনোদিন অনুভব করেনি।

নয়নের কোনো মা নেই। মা মারা গেছে অনেক বছর আগে।

তার কোনো বাবা নেই। সেও মারা গেছে।

তার কোনো বাস্তু বা ঘর নেই, যা তাকে এই শহরের হিংস্র থাবা থেকে রক্ষা করতে পারে।

মালিবাগের এই ফুটপাতই তার সংসার, তার ঠিকানা। একটি জীর্ণ, ছেঁড়া চটের টুকরো তার একমাত্র সম্পত্তি। বৃষ্টি এলে সে চটের এক কোণ দিয়ে শরীর ঢাকতে চেষ্টা করে, শীতে কাঁপে, গরমে নিজের ঘামে নিজেই ভিজে ওঠে। তবু তাকে ঘুমাতে হয়। কারণ জাগ্রত থাকার চেয়ে ঘুম এই ফুটপাতে অনেক সাশ্রয়ী। জেগে থাকলেই পাকস্থলীর পাচক রসগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে; ক্ষুধার যে আদিম ও হিংস্র জানোয়ারটি পেটের ভেতর নখ-দাঁত বের করে, তাকে শান্ত করার মতো কোনো অন্ন নয়নের ঝুলিতে থাকে না।

সেদিন রাতেও নয়ন ফ্যাকাশে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল।

ঢাকার আকাশে তারা দেখা যায় না। মহানগরের বহুতল দালানের কৃত্রিম আলো আর নিয়ন সাইনের তীব্রতা আকাশের নিজস্ব অন্ধকারের মুখখানিকে ঢেকে রেখেছে। নয়ন হঠাৎ পাশের একটি বিশাল বিলবোর্ডের দিকে তাকাল। সেখানে একটি সুপুষ্ট শিশুর ছবি বিজ্ঞাপনের খাতিরে হাসছে। তার পরিধানে পরিপাটি স্কুল ড্রেস, কাঁধে নতুন ব্যাগ।

নয়ন একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার অবচেতন মন এক মুহূর্তের জন্য সেই ছবির মাঝে নিজের অস্তিত্ব খুঁজতে চেষ্টা করল। সে ফিসফিস করে বলল:

—আমিও স্কুলে যেতে চাই...

তার এই মৃদু কণ্ঠস্বর মালিবাগের নৈশব্দ্য বা মালিবাগের নর্দমার জলের কলতানের ওপর দিয়ে যেতে পারল না। রাত কোনো উত্তর করল না, কারণ প্রকৃতির মতোই এই শহরের হৃদয় অত্যন্ত নিস্পৃহ ও বধির।

নয়নের ইতিহাস কোনো মহাকাব্যিক ট্র্যাজেডি নয়, বরং তা নিম্নবর্গের অতি সাধারণ ও স্থূল এক ধ্বংসের খতিয়ান। সে যখন পাঁচ বছরের শিশু, তখন তার মা জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। কোনো জটিল রোগ নয়, সাধারণ এক জ্বর, যা সামান্য চিকিৎসার অভাবে তার ফুসফুস ও মস্তিষ্ক অবশ করে দিয়েছিল। হাসপাতালে নেওয়ার মতো টাকা বা কোনো চিকিৎসকের কাছে হাত পাতার মতো সামাজিক পুঁজি তাদের ছিল না। এই শহরে দরিদ্রের রোগভোগ কোনো মানবিক বেদনা সৃষ্টি করে না, বরং তা অর্থনৈতিক হিসাবের এক ক্ষতিকারক দিক মাত্র। একদিন সকালে তার মা আর চোখ মেললেন না। নয়নের মনে আছে, মায়ের সেই মৃত চোখের পাতা দুটো কীভাবে ঢাকা শহরের ধুলোয় ধূসর হয়ে গিয়েছিল।

তার বাবা ছিলেন একজন সাধারণ রিকশাচালক। স্ত্রীর মৃত্যুর পর মানুষটার ভেতরের চালিকাশক্তি কেমন যেন নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। রিকশার প্যাডেল ঘোরানোর চেয়ে তালের রস গেঁজে তৈরি সস্তা দেশি মদে নিজেকে ডুবিয়ে রাখতেই তিনি বেশি পছন্দ করতেন। ক্ষুধা ও একাকিত্ব ভুলতে মানুষ যে কৃত্রিম অবদমনের আশ্রয় নেয়, তা নৈতিকতার বিচারে যতই নিন্দনীয় হোক, ক্ষুধার বাস্তবতায় তা অত্যন্ত স্বাভাবিক। কিছুদিন পর এক অন্ধকার রাতে এক বেপরোয়া মোটরগাড়ির চাকার নিচে পিষ্ট হয়ে তিনিও মারা গেলেন। এই শহরে রিকশাচালকের মৃত্যু কোনো সংবাদ নয়, কেবল ট্রাফিক জ্যামের একটি সাময়িক কারণ মাত্র।

বাবার মৃত্যুর পর নয়নের আত্মীয়স্বজনেরা তাকে মালিবাগের রাস্তায় ছেড়ে দিল।

দরিদ্র মানুষের আত্মীয়তা বড় অদ্ভুত এবং নিষ্ঠুর। সচ্ছল পরিবারের আত্মীয়তায় যে সামাজিক সৌজন্য ও মেকি ভালোবাসার প্রলেপ থাকে, দরিদ্রের ঘরে তা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। সেখানে সম্পর্ক নির্ধারিত হয় সম্পূর্ণ উপযোগিতাবাদ এবং অর্থনৈতিক আদান-প্রদানের মাধ্যমে। নয়ন যতদিন ছোট ছিল, তার দ্বারা কোনো উদ্বৃত্ত মূল্য তৈরি করা সম্ভব ছিল না; তাই সে তাদের কাছে ছিল এক বাড়তি বোঝা। আর দরিদ্রের ঘরে বোঝার কোনো স্থান নেই। যে শরীর নিজে রোজগার করতে পারে না, তাকে খাওয়ানোর অর্থ হলো নিজের থালার অন্ন কেটে দেওয়া। ফলে অত্যন্ত স্বাভাবিক নিয়মেই নয়ন একদিন ফুটপাতের বাসিন্দা হয়ে গেল। রক্তসম্পর্কের সেই তথাকথিত পবিত্রতা ক্ষুধার তীব্রতার কাছে কর্পূরের মতো উবে গেল।

নয়ন এখন নিজের পথ নিজেই খুঁজে নিয়েছে। ভোর হলে সে একটা চটের বস্তা কাঁধে নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ে।

সে বোতল কুড়ায়, কাগজ কুড়ায়, প্লাস্টিকের ভাঙা টুকরো কুড়ায়। এই শহরের মানুষেরা যা কিছু বর্জন করে, নয়ন সেই বর্জ্যের মাঝেই নিজের বেঁচে থাকার রসদ খোঁজে। ধনিক শ্রেণির অপচয়ই নয়নের মতো পথশিশুদের টিকে থাকার প্রধান উৎস। সারাদিন মালিবাগ, মৌচাক আর শান্তিনগরের অলিগলিতে ঘুরে ঘুরে যা পায়, তা মালিবাগের এক ভাঙারি দোকানে বিক্রি করে।

ভাঙারি দোকানের মালিক হাবিব মিয়া একজন অত্যন্ত চতুর ব্যবসায়ী। সে নয়নের সংগৃহীত বোতল ও প্লাস্টিকগুলো ওজন করার সময় দাঁড়িপাল্লায় আঙুল দিয়ে চাপ দেয়। নয়ন তা বোঝে, কিন্তু তার প্রতিবাদ করার ক্ষমতা নেই। ক্ষমতার এই অসমতা এবং শ্রমের এই শোষণই নয়নের জীবনের চরম সত্য।

—আজকে কুড়ানি কম হয়েছে রে নয়ন। সাকুল্যে পঞ্চাশ টাকা পাবি, হাবিব মিয়া কুটিল হেসে বলে।

নয়ন কোনো কথা বলে না। সে নীরবে ছেঁড়া টাকাটা হাত বাড়িয়ে নেয়। কখনো পঞ্চাশ টাকা, কখনো একশো টাকা, আবার কখনো বৃষ্টির দিনে কিছুই জোটে না। তবু তার বুকের ভেতর স্বপ্নের যে সুপ্ত বীজটি লুকিয়ে আছে, তা অত্যন্ত জেদি। হাজারো নোংরা ধূলিকণার মাঝেও তা মরতে চায় না।

এক দুপুরে রোদ যখন মাথার ওপর আগুন ঢালছে, নয়ন তখন দাঁড়িয়ে ছিল শান্তিনগরের একটি স্বনামধন্য ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের সামনে।

স্কুল ছুটি হয়েছে। গেট পেরিয়ে দলে দলে শিশুরা বের হয়ে আসছে। তাদের গায়ে ধবধবে সাদা শার্ট, চমৎকার ইস্ত্রি করা প্যান্ট, পায়ে পালিশ করা কালো জুতো। তাদের মায়েরা বা বাবারা কেউ হাত ধরে এগিয়ে যাচ্ছেন দামি গাড়ির দিকে, কেউ বা রিকশায় চড়ছেন। শিশুদের মুখে হাসির হুল্লোড়, তারা একে অপরকে টিফিন বক্সের উদ্বৃত্ত খাবার ছুড়ে মারছে।

নয়ন রাস্তার ওপারে এক নোংরা ডাস্টবিনের পাশে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখছিল। তার কাঁধে ঝুলছে বর্জ্যভর্তি চটের বস্তা, গা দিয়ে বের হচ্ছে ঘাম আর আবর্জনার মিশ্রিত গন্ধ। তার চোখে তখন এক অদ্ভুত, মোহময় আলো। সে অবচেতনভাবেই নিজের ছেঁড়া প্যান্ট আর অপরিচ্ছন্ন গায়ের দিকে তাকাল। তার মনে হলো, ওপারে যে পৃথিবীটা চলছে, তা যেন কোনো ভিন্ন গ্রহের চিত্র, যেখানে পৌঁছানোর কোনো সেতু এই মালিবাগের ফুটপাতে নির্মিত হয়নি।

একটি স্কুলপড়ুয়া ছেলে, যার গায়ে দামি পারফিউমের গন্ধ, সে নয়নের দিকে তাকিয়ে ভ্রূ কুঁচকে বলল:

—তুই এভাবে তাকিয়ে আছিস কেন রে টোকাই? চুরি করবি নাকি?

নয়ন থতমত খেয়ে গেল। তার ভেতরের আত্মসম্মানবোধ—যা দরিদ্রের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত সূক্ষ্ম আকারে বিদ্যমান থাকে—তা আহত হলো। সে মাথা নিচু করে লজ্জা পেয়ে বলল:

—কিছু না ভাইজান। আমি এমনি দেখছিলাম।

সেখান থেকে সে ধীর পায়ে হেঁটে চলে গেল। কিন্তু তার মনের গহীনে যে ভাবনার বুদবুদ উঠছিল, তা কোনো অপরাধবোধের নয়, বরং তা ছিল এক তীব্র সামাজিক আকাঙ্ক্ষা: “আমিও তো তোমাদের মতোই একটা মানুষ। আমার শরীরটাও তো রক্তমাংস দিয়েই গড়া। তবে কেন এই কাঁটাতারের ব্যবধান?”

নয়ন মালিবাগের দিকে ফিরতে ফিরতে ভাবল, এই শহরের উঁচু দালানগুলোর কাঁচের দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে তার মতো শত শত শিশুর শৈশব প্রতিদিন কীভাবে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই বৈষম্য কোনো দৈব ঘটনা নয়, বরং তা মানবসৃষ্ট এক সুপরিকল্পিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ফল, যা নয়ন তার এগারো বছরের জীবনে তাত্ত্বিকভাবে না বুঝলেও প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতায় সম্পূর্ণ উপলব্ধি করেছে।

রাতে ক্ষুধা নিয়ে ঘুমানো যে কী কষ্টের, তা এই শহরের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বাস করা বিত্তবানদের পক্ষে বোঝা অসম্ভব। ক্ষুধা কোনো বিমূর্ত চেতনা বা আধ্যাত্মিক অনুভূতি নয়; তা সম্পূর্ণ এক রাসায়নিক ও শারীরিক প্রক্রিয়া, যা মানুষের পাকস্থলীর দেওয়ালগুলোকে একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত করে। সেদিন নয়নের কপালে মাত্র একটি শক্ত, বাসি রুটি জুটেছিল, যা সে ডাস্টবিনের পাশ থেকে কুড়িয়ে পেয়েছিল। রাতের গভীরতা যত বাড়ছিল, তার পেটের কামড় ততই তীব্র হচ্ছিল। নয়ন চটের ওপর কুঁকড়ে শুয়ে দুই হাত দিয়ে পেটটা চেপে ধরল।

সে চোখ বন্ধ করল। মানুষের মন যখন বাস্তবে পরাস্ত হয়, তখন তার অবচেতন মন এক অলীক প্রতিরক্ষামূলক জগৎ তৈরি করে। নয়ন অবচেতনের সেই মায়াবী জগতে প্রবেশ করল।

সে দেখল, সে শান্তিনগরের সেই জমকালো স্কুলটিতে যাচ্ছে। তার গায়ে ধবধবে সাদা শার্ট, নীল রঙের প্যান্ট, পায়ে নতুন জুতো। কাঁধে ভারী একটি ব্যাগ, যার ভেতর সুদৃশ্য নতুন বই-খাতার সুবাস। সে ক্লাসরুমে গিয়ে বেঞ্চে বসেছে। চারদিকের দেওয়ালগুলো রঙিন পোস্টারে সাজানো। একজন স্নেহশীল শিক্ষক ক্লাসে ঢুকে চশমাটা ঠিক করে নয়নের দিকে তাকিয়ে হাসলেন। তিনি বললেন:

—নয়ন, তুমি বড় হয়ে কী হতে চাও?

নয়ন অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উঠে দাঁড়াল। ক্লাসের সমস্ত ছাত্র তার দিকে তাকিয়ে আছে। সে বুক ফুলিয়ে বলল:

—আমি মানুষ হতে চাই স্যার।

তার এই কথায় পুরো ক্লাসরুম হাততালিতে ফেটে পড়ল। শিক্ষকের চোখে স্নেহের অশ্রু। নয়ন এক পরম তৃপ্তি বোধ করল, যা তার অভুক্ত শরীরে এক অদ্ভুত প্রশান্তি এনে দিল।

ঠিক তখনই রাস্তার এক নেড়ি কুকুরের তীক্ষ্ণ ঘেউ ঘেউ ডাকে নয়নের ঘুম ভেঙে গেল।

সে চোখ মেলে তাকাল। চারদিক অন্ধকার। মালিবাগের ফ্লাইওভারের নিচ দিয়ে একটি দ্রুতগামী ট্রাক বিকট শব্দে চলে গেল। নয়ন চটের ওপর উঠে বসল। তার মুখ দিয়ে লালা ঝরছে, পেটের ভেতর আগের মতোই তীব্র ব্যথা। সে বুঝল, ওই সাদা শার্ট আর করতালির জগৎটা কেবলই এক অবাস্তব স্বপ্ন ছিল। কুকুরটি পাশের আবর্জনার স্তূপ থেকে একটি হাড় খুঁজে পেয়ে অন্য কুকুরের সঙ্গে কামড়াকামড়িতে মেতেছে। নয়নের মনে হলো, এই কুকুরের লড়াই আর সভ্য মানুষের জীবনসংগ্রামের মধ্যে কোনো মৌলিক তফাত নেই; দুই পক্ষই টিকে থাকার আদিম জৈবিক তাড়নায় হিংস্র হয়ে উঠেছে।

মানুষের এই শহরে মানুষের অভাব নেই। বড় বড় দালান উঠছে, আকাশে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে নতুন নতুন শপিং মল। রাজপথ কাঁপিয়ে ছুটে চলছে চকচকে বিলাসবহুল গাড়ি। কোটি কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে প্রতিদিন। তবুও নয়নের মতো হাজার হাজার শিশু এই ফুটপাতে ধুলোবালি মেখে ঘুমায়। এই তীব্র বৈপরীত্যের কারণ কী? রাষ্ট্র কি তার দায়িত্ব পালন করতে পারে না? নিশ্চয়ই পারে। কিন্তু পুঁজিবাদী রাষ্ট্রকাঠামোয় প্রান্তিক মানুষের অধিকার রক্ষা করার চেয়ে বিত্তশালীদের পুঁজি রক্ষা করাই প্রশাসনের অলিখিত মূল নীতি হয়ে দাঁড়ায়। একটি পথশিশুর পুনর্বাসনের জন্য খুব বেশি সম্পদের প্রয়োজন হয় না—একটু নিরাপদ আশ্রয়, দৈনিক অন্তত দুবেলা পুষ্টিকর খাদ্য, একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং একটুখানি মানবিক স্নেহ। কিন্তু এই ন্যূনতম চাওয়াটুকুই এই শহরে সবচেয়ে দুষ্প্রাপ্য বস্তু।

একদিন সন্ধ্যায় নয়ন দাঁড়িয়ে ছিল মালিবাগের এক অভিজাত চাইনিজ রেস্তোরাঁর কাঁচের দরজার বাইরে।

ভেতরটা রঙিন বেলুন, জরি আর নানা রঙের আলোয় ঝলমল করছে। টেবিলের ওপর বিশাল এক চকোলেট কেক। কেকের চারপাশে মোমবাতি জ্বলছে। সুন্দর সুন্দর জামা পরা একদল শিশু হাসিমুখে গান গাইছে। জন্মদিনের শিশুটি মোমবাতি নিভিয়ে সবাইকে কেক খাইয়ে দিচ্ছে, তার মা-বাবা তাকে জড়িয়ে ধরে আদর করছেন।

নয়ন কাঁচের ওপাশে দাঁড়িয়ে অপলক দৃষ্টিতে এই দৃশ্য দেখছিল। কাঁচের দেওয়ালটি কেবল একটি জড় বস্তু নয়, এটি আসলে দুটি ভিন্ন শ্রেণির মধ্যকার এক অলঙ্ঘনীয় প্রাচীর, যা নয়নের মতো নিম্নবর্গের মানুষদের বিত্তশালীদের উৎসব থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। দেখতে দেখতে নয়নের চোখ বেয়ে এক ফোঁটা তপ্ত জল গড়িয়ে পড়ল।

সে মনে মনে ভাবল: “আমার জন্মদিন কবে? মা তো কোনোদিন বলেনি। নাকি আমার মতো ফুটপাতের জঞ্জালের কোনো জন্মদিন থাকে না?”

তাকে কোনোদিন কেউ জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানায়নি। কেউ তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেনি—শুভ জন্মদিন, নয়ন। এই বিশাল পৃথিবীতে তার জন্ম যেন এক অবাঞ্ছিত ঘটনা, যার কোনো কৈফিয়ত সমাজের কাছে নেই। রেস্তোরাঁর দারোয়ানটি হঠাৎ নয়নকে কাঁচের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তেড়ে এল।

—এই টোকাই! ভাগ এখান থেকে! ভেতরে কাস্টমাররা বিরক্ত হচ্ছে। নোংরা গন্ধ বেরোচ্ছে তোর শরীর থেকে, দারোয়ানটি ধমক দিয়ে বলল।

নয়ন ভয় পেয়ে পিছিয়ে গেল। সে বুঝল, বিত্তশালীদের উৎসবের আলোতে তার মতো নোংরা শরীরের কোনো প্রবেশাধিকার নেই। সে আবার তার অন্ধকার ফুটপাতের চটের দিকে পা বাড়াল।

সেই রাতে ঢাকার আকাশে মেঘের গর্জন শুরু হলো। কিছুক্ষণ পরই শুরু হলো প্রবল বৃষ্টি।

মালিবাগের ফুটপাত মুহূর্তের মধ্যে ভেসে গেল নোংরা কালো জলে। নয়নের ছেঁড়া চটটি ভিজে সপসপে হয়ে গেল। তার শোয়ার কোনো জায়গা রইল না। সে ফ্লাইওভারের পিলারের আড়ালে একটু শুকনো জায়গার খোঁজে কুঁকড়ে বসে রইল, কিন্তু বৃষ্টির ছাঁট আর ঠান্ডা বাতাস তাকে রেহাই দিল না। তার জীর্ণ শরীরটা ঠান্ডায় কাঁপতে লাগল।

ভোরের দিকে নয়নের কপাল তপ্ত লোহার মতো গরম হয়ে উঠল। তার শরীরে তীব্র জ্বর এল।

পরের দুই দিন সে ফুটপাত থেকে উঠতে পারল না। কাজে যাওয়া হলো না, ফলে তার ঝুলিতে একটি পয়সাও জোটেনি। ভাঙারি দোকানের হাবিব মিয়া তাকে দেখতে আসেনি, কারণ নিষ্ক্রিয় শ্রমিকের প্রতি পুঁজিবাদের কোনো দায়বদ্ধতা থাকে না। ক্ষুধা আর জ্বর একসঙ্গে মিলে নয়নের এগারো বছরের শরীরটিকে এক জরাজীর্ণ বৃদ্ধের শরীরে পরিণত করল। তার কোটরাগত চোখ দুটো আরও বসে গেল, ঠোঁট দুটো ফেটে রক্ত বের হতে লাগল।

নয়ন ফুটপাতে শুয়ে শুয়ে আকাশের মেঘে ঢাকা ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকাল। তার মনে নিয়তিবাদের এক গভীর ছায়া নেমে এল। সে মনে মনে বলল:

“আল্লাহ, আমি কি এতই খারাপ? আমি তো কারও ক্ষতি করিনি। আমি শুধু একটু ভালোভাবে বাঁচতে চেয়েছিলাম। একটু স্কুলে যেতে চেয়েছিলাম, এইটাই কি আমার অপরাধ?”

তার চোখের কোণ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল, যা বৃষ্টির নোংরা জলের সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে গেল। এই শহরের কেউ সেই জল দেখল না, কারণ মালিবাগের ব্যস্ত মানুষগুলোর চোখে ফুটপাতের ধুলোবালি ছাড়া আর কিছু ধরা পড়ে না।

তবুও এই নিষ্ঠুর শহরের চোরাগলিতেও মাঝে মাঝে কিছু শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের আনাগোনা দেখা যায়, যারা চাইলে নয়নের মতো শিশুদের ভাগ্য বদলে দিতে পারেন। একজন হৃদয়বান ব্যবসায়ী যদি নিজের মুনাফার সামান্য অংশ একটি শিশুর পেছনে ব্যয় করেন, একজন শিক্ষক যদি অবৈতনিকভাবে তাকে শিক্ষা দেন, কিংবা রাষ্ট্র যদি তার সম্পদ বণ্টনে একটু ন্যায়পরায়ণ হয়—তবেই নয়নের স্বপ্ন বাস্তব রূপ পেতে পারে। কিন্তু সেই শুভদিনের অপেক্ষা যেন এক অন্তহীন প্রতীক্ষা, যা ফুটপাতের ধুলোয় প্রতিনিয়ত মার খায়।

রাত এখন গভীর। ঢাকা শহর এখন ঘুমাচ্ছে।

নয়ন তার ভেজা চটের ওপর শুয়ে এক বুক কাঁপানো স্বপ্ন বুকে জড়িয়ে ধরে নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে। সে এখনও বিশ্বাস করে, একদিন হয়তো কোনো এক দরদি মানুষ তার হাত ধরবে, তাকে বলবে—চল নয়ন, তোকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিই। নয়ন জানে না সেই দিন আদৌ আসবে কি না, কিন্তু মানুষের অস্তিত্বের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি ও বিস্ময় হলো এই ‘স্বপ্ন’। সবকিছু হারিয়ে গেলেও মানুষ এই স্বপ্নের মায়াজাল ত্যাগ করতে পারে না।

নয়নের এই শৈল্পিক পুনর্নির্মাণ ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ থেকে এটি স্পষ্ট হয় যে, পথশিশুদের সমস্যা কেবল কোনো ব্যক্তিগত নিয়তি বা ভাগ্যের লিখন নয়। এটি আসলে একটি পুঁজিবাদী সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অবধারিত ফল, যেখানে সম্পদের অসম বণ্টন ও সামাজিক উদাসীনতা দরিদ্রের শৈশবকে ডাস্টবিনের বর্জ্যে পরিণত করে।

কেবল সস্তা সহানুভূতি বা মেকি দাতব্য অনুদান দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। নয়নের মতো হাজার হাজার শিশুকে মানুষের মতো গড়ে তুলতে হলে প্রয়োজন এক বৈপ্লবিক সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোগত পরিবর্তন। যতক্ষণ পর্যন্ত রাষ্ট্র ও সমাজ তাদের এই মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে না পারবে, ততক্ষণ পর্যন্ত মালিবাগের ফুটপাতের নোংরা ধুলোয় নয়নের মতো হাজারো শৈশব প্রতিদিন নিভে যাবে, আর তাদের অবদমিত দীর্ঘশ্বাস এই মহানগরের বাতাসকে ভারী করে তুলবে। নয়নের চোখের সেই অনুচ্চারিত প্রশ্নটি আসলে আমাদের তথাকথিত সভ্য সমাজের মুখোশের ওপর এক গভীর চপেটাঘাত।

img

মানুষ মানুষের জন্য

প্রকাশিত :  ০৭:২০, ০৬ জুন ২০২৬

রেজুয়ান আহম্মেদ
“সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।”
— চণ্ডীদাস
মানবসভ্যতার ইতিহাসের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত যে মূলমন্ত্রটি সমাজকে টিকিয়ে রেখেছে, তা হলো ‘মনুষ্যত্ব’। সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে মানুষের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তার সহমর্মিতা ও ভালোবাসার ক্ষমতা। কবি চণ্ডীদাস বহু বছর আগে মানুষের এই শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু আধুনিক যুগে এসে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির সমান্তরালে মানুষের আত্মিক জগতে এক অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি হয়েছে। মানুষ আজ যান্ত্রিক গতিশীলতায় অন্ধ হয়ে নিজের ভেতরের দয়া ও সহানুভূতি হারিয়ে ফেলছে। অথচ ইতিহাসের প্রতিটি সংকটে বারবার প্রমাণিত হয়েছে যে, সভ্যতার শেষ আশ্রয় কোনো ইট-পাথরের প্রাসাদে নয়, বরং তা লুকিয়ে আছে মানুষের বাড়িয়ে দেওয়া উষ্ণ হাতটির ভেতর।
সময়ের আবর্তনে শহরের পিচঢালা রাজপথ, বহুতল ভবন আর নিয়ন আলোর ঝলকানিতে মানুষের জীবন সহজ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আত্মিক দূরত্ব বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। আজকের মানুষ ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে চলেছে এক ক্লান্তিকর ইঁদুর-দৌড়ে। প্রযুক্তি মানুষকে ভৌগোলিক দূরত্বে কাছাকাছি আনলেও হৃদয়ের বন্ধনগুলোকে এক অদৃশ্য প্রাচীরের আড়ালে বন্দি করে ফেলেছে।
এই মানবিক দেউলিয়াত্বের চরম রূপ দেখা যায় যখন মানুষের তীব্রতম কষ্ট অন্য মানুষের বিনোদনের খোরাক হয়ে ওঠে। নরসিংদী রেলস্টেশনের এক মর্মন্তুদ দুর্ঘটনায় যখন চলন্ত ট্রেনের ধাক্কায় এক রক্তাক্ত মা ও শিশু প্ল্যাটফর্মে কাতরাচ্ছিল, তখন শত শত মানুষ এগিয়ে না এসে ব্যস্ত ছিল মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় সেই মৃত্যুর দৃশ্য ধারণ করতে। মানুষের আর্তনাদ আজ স্ক্রিনের ‘কনটেন্ট’ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের লাইক-শেয়ারের উপাদানে পরিণত হয়েছে। যখন মানুষের জীবনের চেয়ে ভার্চুয়াল দুনিয়ার প্রসার বড় হয়ে ওঠে, তখন সমাজের আত্মিক মৃত্যু ঘটে। এই স্বার্থপরতা ও উদাসীনতা প্রমাণ করে যে, বাহ্যিক সভ্যতার মুখোশের আড়ালে মানুষ আজ একেকজন স্বার্থপর পশুতে পরিণত হচ্ছে।
শহুরে জীবনের এই যান্ত্রিক নরক ও মানসিক অবসাদ থেকে মুক্তির পথ দেখায় বাংলার চিরন্তন গ্রামীণ প্রকৃতি ও মাটির কাছাকাছি থাকা সাধারণ মানুষ। বাংলার লোকজ সংস্কৃতি ও দর্শনের মূল ভিত্তিই হলো মানবতাবাদ। লালন শাহের জাত-পাতহীন দর্শন, শ্রীচৈতন্যদেবের প্রেমধর্ম কিংবা রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের “শিবজ্ঞানে জীবসেবা”—সবই মানুষকে এক পরম সত্যের দিকে আহ্বান করে।
এই পরম সত্যের সন্ধান কোনো বিলাসবহুল প্রাসাদে নয়, বরং পাওয়া যায় প্রত্যন্ত গ্রামের কোনো এক দরিদ্র রিকশাচালকের মাটির কুঁড়েঘরে। জীবিকার তাগিদে যে মানুষটি দিনে রিকশা চালায়, অথচ রাতে হারিকেনের আলোয় লিও টলস্টয়, ম্যাক্সিম গোর্কি, রবীন্দ্রনাথ কিংবা নজরুলের সাহিত্যসাধনায় মগ্ন থাকে, সেই-ই প্রকৃত মানুষ। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায়, তাঁর বেড়ে ওঠার পেছনেও ছিল জাত-ধর্মের ঊর্ধ্বে ওঠা কিছু মানুষের মানবিক হাত। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্যও আমাদের শেখায়—ছোট হোক বা বড় হোক, মানুষ চরম মুহূর্তে নিজের স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দাঁড়াতে পারে। মানুষের এই দেবত্বকে বিশ্বাস করাই বেঁচে থাকার আসল পাঠ।
প্রকৃতির রুদ্ররূপ মানুষের অহংকার ও সংকীর্ণতাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়। জলবায়ু পরিবর্তন ও মানুষের দুর্নীতির কারণে নদীভাঙন আজ এক নির্মম সত্য। মহেশপুর গ্রামের দক্ষিণ পাড়ার জীর্ণ বাঁধটি যখন ধনী ব্যবসায়ী হরিহর ঘোষের মতো প্রভাবশালী মানুষের অর্থ আত্মসাতের কারণে ভেঙে পড়ে, তখন প্রকৃতি ধনী-দরিদ্রের কোনো ভেদ রাখে না। আষাঢ়ের প্রলয়ংকরী বন্যায় যখন তাসের ঘরের মতো ভেসে যায় গরিবের কুঁড়েঘর, তখন জল কিন্তু ধনীর পাকা দালানকেও রেহাই দেয় না।
কিন্তু এই প্রলয়ের মাঝেই ঘটে মানুষের আত্মিক রূপান্তর। যে রিকশাচালক রশিদুলকে সমাজ ‘ছোটলোক’ বলে অবহেলা করত, সে নিজের একমাত্র সম্বল—প্রিয় বইয়ের তাকের মায়া ত্যাগ করে নৌকার হাল ধরে মানুষের জান বাঁচাতে। অন্যদিকে, যে হরিহর ঘোষ অহংকারে অন্ধ হয়ে মানুষকে উপহাস করেছিলেন, বন্যার তীব্র স্রোতে দালান ভেঙে পড়ার মুহূর্তে তাঁর সব অর্থ-সম্পদ অর্থহীন হয়ে যায়। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন:
“নারীর কোমলতা আর পুরুষের সহমর্মিতাই এই ভঙ্গুর সমাজকে টিকিয়ে রাখে।”
বিপদের মুখে শত্রুর প্রতি ক্ষোভ ভুলে নিজের জীবন বাজি রেখে মানুষকে বাঁচানোই মানুষের পরম ধর্ম। বন্যার জলে নামলে যেমন ধনী-দরিদ্রের ভেদাভেদ থাকে না, তেমনই মানুষের মনুষ্যত্ব সমস্ত কুসংস্কার ও স্বার্থপরতার দেয়াল ধুলোয় মিশিয়ে একাকার করে দেয়।
সংকট কেটে যাওয়ার পর মানুষের বুকের ভেতরের সংকীর্ণতাও ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে যায়। বিপর্যয়ের পর তৈরি হয় এক নতুন সমবায় চেতনা। অর্থের পেছনে অন্ধের মতো ছোটা মানুষও বুঝতে পারে যে, মানুষের আসল সম্পদ তার অর্থ নয়, বরং তার চরিত্র ও মানবিকতা। ধনীর অর্থ আর শ্রমিকের আদর্শ যখন মিলেমিশে একাকার হয়, তখন সমাজে এক নতুন যুগের সূচনা ঘটে। নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত ভূমিহীন মানুষের যৌথ চাষাবাদ ও শিশুদের অবৈতনিক পাঠশালা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যে নতুন কর্মযজ্ঞ শুরু হয়, তা-ই হলো প্রকৃত সমাজসংস্কার।
ভূপেন হাজারিকার সেই অমর বাণী— “মানুষ মানুষের জন্যে, জীবন জীবনের জন্যে, একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না... ও বন্ধু?” —কেবল একটি গান নয়, এটি আমাদের জীবনের শেষ ধ্রুবতারা। আধুনিক যান্ত্রিক সভ্যতার মুখে মহেশপুরের গল্প এক জ্বলন্ত চপেটাঘাত। আমরা যখন নিজের স্বার্থের গণ্ডিতে আবদ্ধ হয়ে পড়ি, তখন প্রলয়ের রাতগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের চেয়ে বড় এই মহাবিশ্বে আর কিছু নেই। আসুন, আমরা আমাদের ভেতরের স্বার্থপরতার মুখোশটি ছিঁড়ে ফেলি। বিপদে পড়া মানুষের দিকে ফোনের ক্যামেরা না বাড়িয়ে সাহায্যের হাতটি বাড়িয়ে দিই। আসুন, আমরা আবার প্রকৃত অর্থে মানুষ হয়ে উঠি।

সাহিত্য-সংস্কৃতি এর আরও খবর