img

সময়, সমাজ ও মানুষের গল্পের লেখক রেজুয়ান আহম্মেদ

প্রকাশিত :  ১৮:৫২, ২৪ জুন ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৯:০২, ২৪ জুন ২০২৬

তিন দশকের সাহিত্যচর্চায় গড়ে উঠেছে একটি স্বতন্ত্র চিন্তার জগৎ

সময়, সমাজ ও মানুষের গল্পের লেখক রেজুয়ান আহম্মেদ

✍️ ড. ইমরান ইলাহী 

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রতিটি সময়েই এমন কিছু লেখকের আবির্ভাব ঘটে, যাঁরা কেবল গল্প বা উপন্যাস রচনা করেন না; বরং নিজেদের সময়কে ধারণ করেন, সমাজের পরিবর্তনকে ব্যাখ্যা করেন এবং মানুষের মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেন। সমকালীন বাংলাদেশের সাহিত্যাঙ্গনে রেজুয়ান আহম্মেদ তেমনই একজন লেখক, কবি, গীতিকার, চিন্তাবিদ ও কলামিস্ট, যাঁর সাহিত্যচর্চা, মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এবং সামাজিক-রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ দীর্ঘদিন ধরে পাঠকমহলে আলোচনার বিষয় হয়ে রয়েছে।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগ থেকেই তাঁর লেখালেখির যাত্রা শুরু। সময়ের পরিক্রমায় তিনি বিস্তৃত পাঠকসমাজের কাছে একজন সুপরিচিত সাহিত্যিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। গল্প, উপন্যাস, কবিতা, গান, প্রবন্ধ, গবেষণাধর্মী বিশ্লেষণ এবং সমসাময়িক নানা বিষয়ে কলাম লেখার মাধ্যমে তিনি গড়ে তুলেছেন নিজস্ব সাহিত্যিক পরিচয়।

সাহিত্যসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, রেজুয়ান আহম্মেদের লেখার প্রধান শক্তি হলো মানুষের মনোজগতের সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ। সমাজের পরিবর্তন, ব্যক্তির সংকট, মূল্যবোধের বিবর্তন এবং সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা তাঁর লেখায় এমনভাবে উঠে আসে, যা পাঠককে শুধু বিনোদিতই করে না; বরং গভীরভাবে চিন্তা করতেও উদ্বুদ্ধ করে।

রেজুয়ান আহম্মেদের সাহিত্যচর্চার সূচনা তরুণ বয়সেই। বইপড়া, সমাজপর্যবেক্ষণ এবং মানুষের জীবনসংগ্রামের নানা গল্প তাঁকে লেখালেখির প্রতি আকৃষ্ট করে। প্রথম দিকে তিনি ছোটগল্প, কবিতা ও প্রবন্ধ লিখলেও পরবর্তীকালে উপন্যাস, গবেষণামূলক রচনা এবং বিশ্লেষণধর্মী কলামের মাধ্যমে নিজের সাহিত্যকর্মের পরিধি বিস্তৃত করেন।

তাঁর সমসাময়িকদের মতে, সাহিত্যকে তিনি কখনোই নিছক কল্পনার জগৎ হিসেবে দেখেননি। বরং সাহিত্যকে তিনি বাস্তব জীবনের প্রতিচ্ছবি এবং সামাজিক পরিবর্তনের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করেছেন।

এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন তাঁর প্রায় সব লেখাতেই দেখা যায়। তাঁর গল্পের চরিত্রগুলো বাস্তব জীবনের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে; তাঁদের আনন্দ, বেদনা, স্বপ্ন ও সংগ্রাম বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।

বাংলা সাহিত্যে মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণধর্মী লেখার একটি সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে। তবে সমসাময়িক সময়ে এই ধারাকে নতুন মাত্রায় উপস্থাপনের ক্ষেত্রে রেজুয়ান আহম্মেদের অবদান উল্লেখযোগ্য বলে মনে করেন অনেক সাহিত্যবোদ্ধা।

তাঁর লেখায় মানুষের অদৃশ্য ভয়, আত্মপরিচয়ের সংকট, সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং মানসিক দ্বন্দ্ব গভীরভাবে ফুটে ওঠে। তিনি বিশ্বাস করেন, সমাজকে বোঝার আগে মানুষকে বুঝতে হবে; আর মানুষকে বুঝতে হলে তার মনোজগতকে অনুধাবন করতে হবে।

এ কারণেই তাঁর অনেক গল্প ও উপন্যাসে ঘটনাপ্রবাহের চেয়ে চরিত্রের মানসিক বিবর্তন অধিক গুরুত্ব পেয়েছে।

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অন্যতম বৃহৎ আয়োজন অমর একুশে বইমেলা। বছরের এই একটি মাসকে কেন্দ্র করে লেখক, প্রকাশক ও পাঠকদের মধ্যে এক অনন্য সেতুবন্ধন গড়ে ওঠে।

রেজুয়ান আহম্মেদের নতুন বই প্রকাশের ক্ষেত্রেও বইমেলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রতি বছর তাঁর নতুন বই প্রকাশকে ঘিরে পাঠকদের মধ্যে বিশেষ আগ্রহ লক্ষ করা যায়।

প্রকাশনা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, কথাসাহিত্য, সমাজবিশ্লেষণ এবং মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ভিত্তিক রচনার মাধ্যমে তিনি একটি বিশেষ পাঠকগোষ্ঠী গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। নতুন বই প্রকাশের পর পাঠকদের সঙ্গে মতবিনিময়, আলোচনা এবং সাহিত্য আড্ডায় তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ তাঁকে আরও জনপ্রিয় করে তুলেছে।

শুধু সাহিত্যিক হিসেবেই নয়, একজন চিন্তাবিদ হিসেবেও রেজুয়ান আহম্মেদ সুপরিচিত। সমসাময়িক বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ইস্যু নিয়ে তাঁর বিশ্লেষণধর্মী কলাম পাঠকমহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

অর্থনীতি, শিক্ষা, রাজনীতি, সামাজিক মূল্যবোধ, গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং বিশ্বপরিস্থিতি নিয়ে তাঁর পর্যবেক্ষণ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

তাঁর লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো জটিল বিষয়কে সহজ, সাবলীল ও প্রাঞ্জল ভাষায় ব্যাখ্যা করার দক্ষতা। ফলে সাধারণ পাঠকও গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ঘটনাবলির পটভূমি ও প্রভাব সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করতে পারেন।

বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিশ্বায়ন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের জীবনধারায় আমূল পরিবর্তন এনে দিয়েছে।

রেজুয়ান আহম্মেদ তাঁর লেখায় এসব পরিবর্তনের ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় দিকই বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর মতে, প্রযুক্তির অগ্রগতি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে মানবিক সম্পর্কের ওপর নতুন ধরনের চাপও সৃষ্টি করেছে।

তাঁর বিভিন্ন প্রবন্ধ, কবিতা ও গানে আধুনিক মানুষের একাকিত্ব, মানসিক চাপ এবং মূল্যবোধের পরিবর্তনের বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

বর্তমান সময়ে পাঠকের মনোযোগ ধরে রাখা সহজ নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে দীর্ঘ লেখা পড়ার অভ্যাস ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। তবুও রেজুয়ান আহম্মেদের লেখার পাঠকদের মধ্যে তরুণদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। কারণ তিনি সমসাময়িক প্রজন্মের সমস্যা, সম্ভাবনা ও সংকটকে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন।

শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সামাজিক পরিবর্তন, প্রযুক্তিনির্ভর জীবন এবং ব্যক্তিগত স্বপ্নের সঙ্গে বাস্তবতার সংঘাত—এসব বিষয় তাঁর লেখায় নিয়মিত ভাবে স্থান পায়।

রেজুয়ান আহম্মেদ নামটি নিয়ে অনেক সময় বিভ্রান্তি দেখা যায়। বিশেষ করে সাবেক সংসদ সদস্য রেজওয়ান আহাম্মদ তৌফিক এবং পাকিস্তানি আমলা রিজওয়ান আহমেদের সঙ্গে নামের সাদৃশ্য থাকায় অনেকেই বিভ্রান্ত হন।

তবে সাহিত্য ও চিন্তাচর্চার জগতে রেজুয়ান আহম্মেদের পরিচয় সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। তিনি মূলত লেখক, কবি, গীতিকার, গবেষক, চিন্তাবিদ ও কলামিস্ট হিসেবেই পরিচিত।

বাংলা সাহিত্য ও সমাজচিন্তার জগতে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় থাকা রেজুয়ান আহম্মেদ এখনো নিয়মিত লিখে চলেছেন। নতুন প্রজন্মের পাঠকদের সঙ্গে সংযোগ বজায় রেখে তিনি সাহিত্য ও চিন্তাচর্চাকে আরও সমৃদ্ধ করার প্রয়াস অব্যাহত রেখেছেন।

সাহিত্যবোদ্ধাদের মতে, সময়, সমাজ এবং মানুষের মনোজগতকে একসঙ্গে ধারণ করার যে প্রয়াস তাঁর লেখায় দেখা যায়, সেটিই তাঁকে সমকালীন লেখকদের মধ্যে স্বতন্ত্র মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে।

বাংলা সাহিত্যের দীর্ঘ অভিযাত্রায় রেজুয়ান আহম্মেদের নাম হয়তো এমন একজন সাহিত্যস্রষ্টা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে, যিনি মানুষের জন্য গল্প লিখেছেন, কবিতা রচনা করেছেন, গান সৃষ্টি করেছেন, সমাজকে নিয়ে ভেবেছেন এবং সময়ের সত্যকে ধারণ করার জন্য কলম ধরেছেন।

img

আমি লেখক নই, আমি শব্দের টুকাই

প্রকাশিত :  ১৯:২৭, ১৬ জুন ২০২৬

রেজুয়ান আহম্মেদ

মানুষের কিছু পরিচয় অযাচিত, যা সময় নিজে এসে কাঁধে চাপিয়ে দেয়। আবার কিছু পরিচয় মানুষ বেছে নেয় সম্পূর্ণ নিজের তাগিদে—একেবারে নিভৃতে, কোনো ঢাকঢোল না পিটিয়ে। আমার পরিচয়টা পরের দলের। কেউ যখন অবলীলায় জিজ্ঞেস করে বসেন, \"আপনি কি লেখক?\"—আমি খানিকটা থমকে যাই। \'লেখক\' শব্দটার একটা নিজস্ব ওজন আছে, এক ধরনের গাম্ভীর্য আছে; যা আমার ঠিক আসে না। তাই মৃদু হেসে আলতো করে দায় এড়াতে বলি, \"আমি লেখক নই, বড়জোর শব্দের টুকাই।\"

\'টুকাই\' শব্দটার গায়ে এক চিলতে অনাড়ম্বর সারল্য লেগে থাকে। অলিগলিতে বা চেনা চত্বরে আমরা এমন কিছু মানুষকে দেখি, যারা সবার ফেলে দেওয়া টুকরো জিনিস কুড়িয়ে বেড়ায়। পথচলতি মানুষের চোখে ওগুলো স্রেফ আবর্জনা হলেও, ওই সংগ্রাহকের চোখে তার প্রতিটিই মূল্যবান। সে জানে, এই আপাত-পরিত্যক্ত ভাঙাচোরার বুকেও কোনো না কোনো জীবনের আখ্যান লুকিয়ে থাকে।

আমার কাজটাও আলাদা কিছু নয়; তফাত শুধু আমি কুড়িয়ে নিই ছিটকে পড়া সব শব্দ।

ভিড়ের মধ্যে আচমকা খসে পড়া কোনো অবহেলিত বাক্য, মায়ের বুকের গভীর থেকে আসা এক দীর্ঘশ্বাস, শ্রমিকের চেরা কণ্ঠস্বর, বৃদ্ধ বাবার একা হয়ে যাওয়া বিকেল, শিশুর অকারণ খিলখিল কিংবা নিঝুম রাতে বালিশে মুখ গোঁজা চাপা কান্না—এসবই আমার সঞ্চয়। আমি সেগুলোকে পরম যত্নে মনের কোনো এক গোপন কুঠুরিতে জমিয়ে রাখি। তারপর কোনো এক অলস অবসরে সেই জমা হওয়া উপাদানগুলোই নতুন গল্পের অবয়ব নেয়।

অনেকের ধারণা, গল্প মানেই জাদুকরী কল্পনা। আমার তা মনে হয় না। বিশ্বাস করি, এই মহাবিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর গল্পকার হলো স্বয়ং \'জীবন\'। আমরা যারা লিখতে বসি, তারা আসলে সেই প্রবহমান জীবনের এক-একজন সামান্য অনুবাদক মাত্র। জীবন যা আড়ালে বলে যায়, আমরা তাকেই অক্ষরে বাঁধি; সময় যা দেখিয়ে যায়, আমরা তাকেই বাক্যের সুতোয় বুনে রাখি।

দিনকয়েক আগে বাজারের এক কোণে এক বৃদ্ধকে দেখেছিলাম। হাতে জীর্ণ একটা বাটন ফোন, যার রঙ চটে গেছে বহু আগে। শার্টের পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করে তিনি বারবার কী যেন মিলিয়ে দেখছিলেন। কৌতূহল সামলাতে না পেরে কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, \"কী খুঁজছেন, চাচা?\"

তিনি ম্লান হেসে বললেন, \"ছেলেদের মোবাইল নম্বরগুলো লিখে রাখছি বাবা। ফোনটা তো বুড়ো হয়েছে, কখন নষ্ট হয়ে যায় ঠিক নেই। কাগজটা থাকলে নম্বরগুলো অন্তত হারাবে না।\"

কথাটা শোনার পর মনে হলো, ওটা তো কেবল কিছু সংখ্যার খতিয়ান নয়, ওটা আসলে এক বাবার বুকপকেটে আগলে রাখা ভালোবাসার দলিল। এই ডিজিটাল যুগে, যেখানে আঙুলের ডগায় হাজারো নম্বর নিমেষে সংরক্ষিত থাকে, সেখানে একজন বাবা সন্তানদের সঙ্গে যোগাযোগের শেষ সূত্রটুকু কাগজের টুকরোতে বাঁচিয়ে রাখছেন। কারণ নম্বর হারালে যে বড্ড একলা হয়ে যেতে হবে!

সেদিন ডায়েরির পাতায় কোনো গল্প উঠেনি, শুধু দৃশ্যটা বুকের ভেতর গেঁথে গিয়েছিল। পরে বুঝেছি, গল্পের আসল বীজ তো ওখানেই ছড়ানো ছিল।

পথ হাঁটতে হাঁটতে এইটুকু বুঝেছি, মানুষের আসল সম্পদ তার অনুভূতি। ক্ষমতা, দাপট, ধনদৌলত—সবই একসময় ধুলোয় মেশে, কেবল অনুভূতিটুকুই অমর। সন্তানের পথ চেয়ে থাকা মায়ের ব্যাকুলতা, প্রেমিকের আজন্ম ব্যর্থতা, চাতক পাখির মতো বৃষ্টির অপেক্ষায় থাকা কৃষকের চশমাহীন চোখ কিংবা প্রবাসে বসে ঈদের দিনে ঘরের জন্য হাহাকার—এসব অনুভূতির কোনো মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার তারিখ থাকে না।

আমি নিজেকে সেই অনুভূতির এক সামান্য ফেরিওয়ালা ভাবতেই পছন্দ করি।

ভোরের ঘাসে জমে থাকা শিশিরের মতো ছোট ছোট অনুভূতি কুড়িয়ে এনে আমি শব্দের মালায় গাঁথি, তারপর তুলে দিই পাঠকের হাতে। কেউ সেখানে নিজের ফেলে আসা ছায়া দেখতে পান, কেউ খুঁজে পান চেনা স্মৃতি, আবার কেউ হয়তো নতুন করে বাঁচার একটুখানি রসদ পান।

অনেকে লেখালেখিকে পেশা বলেন, কারও কাছে এটা সাধনা কিংবা শুদ্ধ শিল্প। আমার কাছে এর চেয়ে বড় সত্য হলো—এটি এক মানুষের বুক থেকে অন্য মানুষের বুকে পৌঁছানোর সেতু। যখন সাদা পাতায় কলম ঘষি, তখন নিজেকে আর একলা মনে হয় না। মনে হয় আমার চারপাশের অজস্র মানুষ, তাঁদের অধরা স্বপ্ন, ক্লান্তি, আশা আর গোপন দীর্ঘশ্বাসগুলো এসে মিশে যাচ্ছে আমার কালির স্রোতে।

এই চেনা পৃথিবীতে প্রতিটি মানুষের বুকেই একটা না বলা উপাখ্যান থাকে। কেউ তা প্রকাশ করতে পারে, কেউ পারে না। কেউ অপবাদে জড়ানোর ভয়ে কুঁকড়ে থাকে, কেউ আবার সুযোগের অভাবে নীরব হয়ে যায়। আমি সেই স্তব্ধ অধ্যায়গুলোর একনিষ্ঠ শ্রোতা হতে চাই। জীবনের সবচেয়ে দামি পাতাগুলো তো আসলে নিঃশব্দেই ওল্টায়।

একজন রিকশাচালক যখন সারাদিন রোদে পুড়ে ঘরে ফেরেন, তাঁর সেই ক্লান্তির বিবরণ সংবাদপত্রের মূল শিরোনাম হয় না। একজন গৃহিণী যখন নিজের চাওয়া-পাওয়া বিসর্জন দিয়ে সংসার টানেন, তাঁর জন্য কোনো পুরস্কার বরাদ্দ থাকে না। নামমাত্র বেতনে যে শিক্ষক শত শত ভবিষ্যৎ গড়ে দিচ্ছেন, ইতিহাসের পাতায় তাঁর নাম খোদাই করা থাকে না।

অথচ প্রকৃত গল্পগুলো তো ঠিক এই অন্তরালেই লুকিয়ে থাকে। আমি শুধু সেই আড়ালের আখ্যানগুলো খুঁজে বেড়াই।

সময়ের ধুলোবালির নিচে চাপা পড়া জীবনগুলো এত বেশি সাধারণ যে, সাধারণ চোখে তা অলক্ষ্যেই থেকে যায়। অথচ ওই সাদামাটা যাপনের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে মহাকাব্যের সৌন্দর্য। একটা গ্রামের শেষ সীমানায় দাঁড়িয়ে থাকা নিঃসঙ্গ কদমগাছ, একটা জরাজীর্ণ সাঁকো, পুরোনো স্কুলঘর কিংবা উদাস হয়ে থাকা কোনো পার্কের বেঞ্চ—দুনিয়ার কোনো কিছুই গল্পহীন নয়। শুধু তা শোনার মতো কান আর ছোঁয়ার মতো একটা সংবেদনশীল হৃদয় থাকতে হয়। আমি কেবল সেই হৃদয়টুকুকে মরে যেতে দিই না।

চারপাশে যখন ইঁদুরদৌড়, ক্ষোভ আর তীব্র কোলাহল দেখি, তখন আমি মানুষের চোখের দিকে তাকাই। প্রতিটি চোখেই একটা করে অসমাপ্ত উপন্যাস বোনা থাকে। কেউ সেখানে সুখের পরিচ্ছেদ লিখছেন, কেউ দুঃখের; কেউ নতুন স্বপ্নের প্রাক্কথন সাজাচ্ছেন, কেউ বা বিদায়ের শেষ লাইনটি টেনে চলে যাচ্ছেন।

আমি তাঁদের পাশে একটু বসি। শুনি। অনুভব করি। তারপর মনের অজান্তেই শব্দগুলো কুড়িয়ে নিই।

আমার এই ঝুলির শব্দগুলো খুব দামি বা অলংকৃত নয়। কোনো রাজকীয় বিপণি থেকে এগুলো সংগৃহীত হয়নি। এগুলো উঠে এসেছে পথের ধুলোবালি থেকে, মানুষের আটপৌরে যাপন আর বুকফাটা দীর্ঘশ্বাস থেকে। হয়তো সে কারণেই সাধারণ মানুষ আমার লেখার লাইনে নিজেদের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পায়।

যখন কোনো পাঠক এসে বলেন, \"আপনার লেখাটা পড়ার পর মনে হলো, এটা তো আমারই ভেতরের কথা\"—তখন মনে হয়, এই ধুলো ঘেঁটে শব্দ কুড়ানোর ক্লান্তিটুকু এক নিমেষে সার্থক হলো। সাহিত্য তো শেষ পর্যন্ত মানুষের বুকেই আশ্রয় খোঁজে; কোনো বইয়ের মধ্যে তাকে বন্দী করে রাখা তার নিয়তি নয়।

আমি বিশ্বাস করি, সমাজ বা মনস্তত্ত্ব বদলে দেওয়ার চাবিকাঠি সবসময় দীর্ঘ বক্তৃতার মঞ্চে থাকে না। কখনো কখনো একটা ছোট গল্প, একটা সহজ সরল বাক্য কিংবা এক চিলতে আন্তরিক অনুভূতিও মানুষের ভেতরের নিভে যাওয়া আলোটাকে নতুন করে জ্বালিয়ে দিতে পারে। যে আলো মানুষকে একটু বেশি মানবিক হতে শেখায়, অন্যের ক্ষতটাকে নিজের বলে চিনতে শেখায়, আর মানুষকে ভালোবাসতে বাধ্য করে।

তাই বুক ফুলিয়ে লেখক হওয়ার কোনো দাবি আমার নেই। তেমন কোনো মহৎ কৃতিত্বও আমি অর্জন করিনি। আমি কেবল মানুষের চলার পথে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অনুভূতির কণাগুলো কুড়িয়ে আনি। কারও ফেলে যাওয়া ভাঙা স্মৃতি, কারও ভুলে যাওয়া আবেগ, কারও অবহেলিত স্বপ্ন—এসব দিয়েই নিজের মতো করে মালা গাঁথি।

হয়তো কোনো এক সময় মানুষ আমার নামটা ভুলে যাবে, আমার লেখাগুলোও মহাকালের স্রোতে ভেসে যাবে। কিন্তু যদি কোনো একটি লাইনও কোনো এক উদাসীন পাঠকের চোখে এক ফোঁটা জল এনে দিতে পারে, কোনো এক ভগ্নহৃদয় মানুষকে নতুন করে দাঁড়ানোর সাহস দেয়—তবেই বুঝব আমার এই জীবন বৃথা যায়নি।

আমি তো যশের ক্যানভাসার নই। আমি অনুভূতির বাহক, সময়ের ধুলোয় লুকিয়ে থাকা গল্পের এক সামান্য অন্বেষী।

আমি লেখক নই, আমি শব্দের টুকাই।

আজও পথ চলতে চলতে আমি মানুষের হাসি, কান্না, মান-অভিমান আর অন্তহীন অপেক্ষা থেকে শব্দ কুড়িয়ে চলি। প্রতিটি দিন আমাকে নতুন করে বাঁচতে শেখায়, নতুন কিছু অনুভব করায়। আর আমি সেই অনুভূতিগুলো যত্ন করে পকেটে পুরে রাখি।

হয়তো কোনো এক নিঝুম রাতে, যখন চরাচর নিস্তব্ধ হয়ে যাবে, তখন ওই কুড়িয়ে আনা শব্দগুলো আবার ডানা মেলবে। তারা গল্প হবে, স্মৃতি হবে, আর ঠাঁই করে নেবে কোনো এক মানুষের নিভৃত হৃদয়ে।

সেদিনও যদি কেউ শুধায়, আমি একই উত্তর দেব—

আমি লেখক নই, আমি শব্দের টুকাই; মানুষের জীবনের রাজপথে ছড়িয়ে থাকা অনুভূতির কণা কুড়িয়ে বেড়ানো এক নামহীন পথিক।

সাহিত্য-সংস্কৃতি এর আরও খবর