img

একসময় লেবার পার্টিতে উপেক্ষিত অ্যান্ডি বার্নহাম এখন ব্রিটিশ রাজনীতির কেন্দ্রে

প্রকাশিত :  ১৪:৪৬, ২৫ জুন ২০২৬

 একসময় লেবার পার্টিতে উপেক্ষিত অ্যান্ডি বার্নহাম এখন ব্রিটিশ রাজনীতির কেন্দ্রে

অ্যান্ডি বার্নহামকে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত দলীয় কাউন্সিলের মূল মঞ্চে বক্তব্য দেওয়া থেকে বারবার বঞ্চিত করা হয়েছিল। গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র হিসেবে এটি ছিল তাঁর পদের প্রতি চরম অসম্মান।

লেবার পার্টির অন্যতম জনপ্রিয় এই রাজনীতিকের প্রতি তখন অনেকেরই সহানুভূতি ছিল। তবে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে থাকা বার্নহামকে এখন প্রমাণ করতে হবে, তিনি সত্যিই মূল মঞ্চের যোগ্য। একই সঙ্গে ক্ষুব্ধ ভোটারদের মন জয় করা এবং অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে ওঠার বড় চ্যালেঞ্জও এখন তাঁর সামনে।

যুক্তরাজ্যে গত এক দশকের মধ্যে সপ্তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিতে চলেছেন নতুন নেতা। আর এই দৌড়ে এগিয়ে আছেন অ্যান্ডি বার্নহাম।

বার্নহামের দাবি, লেবার পার্টির মধ্যে একমাত্র তাঁরই ভোটারদের মন জয় করে রিফর্ম ইউকে পার্টিকে পরাজিত করার দূরদর্শিতা রয়েছে। নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন জনতুষ্টিবাদী ও অভিবাসনবিরোধী রিফর্ম ইউকে পার্টি গত বছরের শুরু থেকেই প্রতিটি জনমত জরিপেই এগিয়ে আছে।

গত সপ্তাহে পার্লামেন্টের মেকারফিল্ড আসনের উপনির্বাচন অ্যান্ডি বার্নহাম নিরঙ্কুশ জয়লাভ করেন। এই জয় লেবার পার্টির অনেক আইনপ্রণেতাকে তাঁর পক্ষে নিয়ে এসেছে। অথচ ওই এলাকায় সাম্প্রতিক স্থানীয় নির্বাচনে রিফর্ম ইউ পার্টি বেশ শক্তিশালী অবস্থানে ছিল। গতকাল সোমবার স্টারমার পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার পর দলের ভেতরে বার্নহামের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে।

লেবার পার্টির পার্লামেন্ট সদস্য অ্যালেক্স সোবেল বলেন, ভোটারদের সামনে লেবার পার্টির ভবিষ্যৎ ভাবনা তুলে ধরার ক্ষেত্রে বার্নহাম নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছেন।

সমর্থকদের প্রশংসা, সমালোচকদের প্রশ্ন

কোভিড-১৯ মহামারির সময়ে নিজ এলাকার স্বার্থ রক্ষায় জোরালো ভূমিকা রেখে ‘কিং অব দ্য নর্থ’ (উত্তরাঞ্চলের রাজা) উপাধি পেয়েছিলেন বার্নহাম। তাঁর সমর্থকেরা মনে করেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় যুক্তরাজ্যের কয়েকটি আঞ্চলিক সাফল্যের নেপথ্যে ছিলেন এই নেতা।

তবে সমালোচকদের চোখে বার্নহাম এমন এক ব্যক্তি, যিনি বারবার নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ও নীতি পরিবর্তন করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, বার্নহাম একজন উচ্চশিক্ষিত পেশাদার রাজনীতিক হওয়া সত্ত্বেও নিজেকে সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেন।

যুক্তরাজ্যের সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং দলীয় নেতৃত্বের লড়াই থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেওয়ায় এখন বার্নহামেরই স্টারমারের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।

স্ট্রিটিং বলেছেন, সাম্প্রতিক দিনগুলোয় বার্নহামের সঙ্গে তাঁর লম্বা আলোচনা হয়েছে। এতে রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন ছড়িয়েছে যে পরবর্তী সরকারে বড় কোনো পদের প্রতিশ্রুতি পেয়েই হয়তো স্ট্রিটিং প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। তবে এ গুঞ্জন অস্বীকার করেছেন স্ট্রিটিং।

গতকাল পার্লামেন্টে লেবার পার্টির ১০০ জনের বেশি আইনপ্রণেতার সঙ্গে ক্যামেরার সামনে পোজ দিলেও সেখানে অপেক্ষায় থাকা সাংবাদিকদের সঙ্গে কোনো কথা বলেননি বার্নহাম।

অ্যান্ডি বার্নহাম যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী হলে তাঁর মূল কর্মপরিকল্পনা কী হবে, সে বিষয়ে তিনি এখন পর্যন্ত খুব অল্প আভাস দিয়েছেন।

লন্ডনকেন্দ্রিক রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে ২০১৭ সালে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়রের দায়িত্ব নিয়েছিলেন বার্নহাম। মেয়র হিসেবে তাঁর কর্মকাণ্ড দেখলেই মূলত এই রাজনীতিকের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো ধারণা পাওয়া যাবে।

২০২০ সালে কঠোর করোনা মহামারির বিধিনিষেধ নিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের বিরুদ্ধে বার্নহামের রাজনৈতিক লড়াই ম্যানচেস্টারের বাইরেও দেশজুড়ে তাঁর জনপ্রিয়তা ও পরিচিতি অনেক বাড়িয়ে দিয়েছিল।

কোভিড-১৯ বিধিনিষেধ নিয়ে বিরোধের সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ক্ষতিপূরণ হিসেবে ২ কোটি ২০ লাখ পাউন্ড দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু বার্নহাম তা প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর দাবি ছিল, এই অর্থ তাঁর চাওয়া ন্যূনতম অঙ্কের এক-তৃতীয়াংশ।

টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারিত সেই বিরোধ বার্নহামকে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে নিজের অঞ্চলের পক্ষে দাঁড়ানো একজন নেতার ভাবমূর্তি এনে দেয়।

বার্নহাম দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের পক্ষে। তিনি মনে করেন, লন্ডনের হাতে কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর হাতে আরও বেশি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া উচিত।

অ্যান্ডি বার্নহামের মতে, এতে পরিবহন, জনসেবা এবং স্থানীয় উন্নয়নসংক্রান্ত বিষয়ে অঞ্চলগুলো নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।

লিভারপুলে জন্ম নেওয়া বার্নহামের বাবা ছিলেন একজন টেলিফোন প্রকৌশলী। তাঁর মা কাজ করতেন রিসেপশনিস্ট হিসেবে।

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে পড়াশোনা করেন বার্নহাম। স্নাতক শেষ করে প্রথমে গবেষক এবং পরে পার্লামেন্টে উপদেষ্টা হিসেবে কাজ শুরু করেন।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের সরকারের সময় তিনি জুনিয়র মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে গর্ডন ব্রাউনের মন্ত্রিসভায় সংস্কৃতিবিষয়ক ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।

২০১০ ও ২০১৫ সালে লেবার পার্টির নেতৃত্বের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন বার্নহাম। তবে দুবারই পরাজিত হন।

সমালোচকদের অভিযোগ, রাজনৈতিক জীবনে বার্নহাম একাধিকবার নিজের অবস্থান পরিবর্তন করেছেন।

গত বছর বার্নহাম অভিযোগ করেছিলেন, সরকার কার্যত বন্ডবাজারের নির্দেশনায় পরিচালিত হচ্ছে। পরে অবশ্য দাবি করেন, তাঁর বক্তব্য ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

অতীতে বার্নহাম গুরুত্বপূর্ণ শিল্প খাত রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। একই সঙ্গে যুক্তরাজ্যের আবার ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেওয়ার পক্ষেও মত দিয়েছিলেন।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে বার্নহাম তুলনামূলক মধ্যমপন্থী অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর মতে, দেশের বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতিতে বড় পরিসরে জাতীয়করণ সম্ভব নয়। একইভাবে অদূর ভবিষ্যতে ইউরোপীয় ইউনিয়নে আবার যোগ দেওয়ারও বাস্তব সম্ভাবনা নেই।

২০২২ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের সময় কিয়ার স্টারমার মজা করে বলেছিলেন, বার্নহামের রাজনৈতিক অবস্থান বদলানোর প্রবণতা অনেকটা বিশ্বকাপে জিততে থাকা দলের সমর্থক হওয়ার মতো।

স্টারমার বলেছিলেন, ‘বার্নহাম তাঁর শৈশবের দল আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জিততে দেখেছেন। আবার তাঁর শৈশবের দল ফ্রান্সকে ফাইনালে হারতেও দেখেছেন। এমনকি তাঁর শৈশবের দল মরক্কো ও ক্রোয়েশিয়াকেও সেমিফাইনালে বিদায় নিতে দেখেছেন।’

তবে সমর্থকদের আস্থা ধরে রাখতে এবং সমালোচকদের ভুল প্রমাণ করতে হলে বার্নহামকে দেখাতে হবে, তিনি সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং স্টারমারের চেয়ে ভিন্নধর্মী নেতৃত্ব দিতে সক্ষম।

অন্যথায় দুই বছরের মধ্যেই অ্যান্ডি বার্নহামকে ক্ষমতা থেকে বিদায় নিতে হতে পারে বলে মনে করছেন লেবার পার্টির এক আইনপ্রণেতা।

যুক্তরাজ্য এর আরও খবর

ইংলিশ চ্যানেলে নৌকা ডুবে শিশুসহ নিহত ৫ | JANOMOT | জনমত

ব্রিটেনের সতর্কতা

img

‘অজান্তে’ চীনের গোয়েন্দা সংস্থাকে সহযোগিতা করছেন শতাধিক ব্রিটিশ শিক্ষাবিদ

প্রকাশিত :  ০৬:৫৬, ০১ অক্টোবর ২০২৬

ব্রিটেনের  অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা এমআই৫ জনসতর্কবার্তা দিয়ে জানিয়েছে, দেশটির শতাধিক শিক্ষাবিদ ও গবেষক অজান্তেই চীনের গোয়েন্দা সংস্থাকে সহযোগিতা করেছেন। এমআই৫-এর দাবি, ‘চায়না জেনারেল টেকনোলজি রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ নামে একটি ভুয়া বা ‘ফ্রন্ট’ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে চীনা গোয়েন্দা সংস্থা এসব গবেষণায় অর্থায়ন করেছিল।

এমআই৫ জানিয়েছে, এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চীনের পররাষ্ট্র ও জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

এই ভুয়া প্রতিষ্ঠানের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, গোপন যোগাযোগ এবং স্টেগানোগ্রাফির (বার্তার ভেতর গোপন তথ্য লুকিয়ে রাখা) মতো সংবেদনশীল প্রযুক্তিভিত্তিক গবেষণায় অর্থায়ন করা। এসব গবেষণা পরবর্তীতে চীনের সামরিক ও প্রযুক্তিগত গুপ্তচরবৃত্তির কাজে ব্যবহার করা হতো। বিবিসি জানিয়েছে, বেশির ভাগ ব্রিটিশ গবেষকই সৎ উদ্দেশ্যে যুক্ত ছিলেন, কারণ এর পেছনে চীনা সরকারের সরাসরি যোগসূত্রটি অস্পষ্ট রাখা হয়েছিল।

ব্রিটেনের নিরাপত্তামন্ত্রী ড্যান জার্ভিস জানিয়েছেন, জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় দেশটির সব বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের চিঠি দেওয়া হয়েছে, যাতে তারা অবিলম্বে এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করেন। (এমআই৫) স্পষ্ট সতর্ক করে দিয়ে জানিয়েছে, ২০২৩ সালের নতুন ‘জাতীয় নিরাপত্তা আইন’ অনুযায়ী, এই বার্তার পরও যদি কোনো শিক্ষাবিদ বা প্রতিষ্ঠান চীনের এই সংস্থার সঙ্গে কাজ চালিয়ে যায়, তবে তাদের বিরুদ্ধে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাকে সহায়তার অভিযোগে ফৌজদারি মামলা করা হতে পারে।

যুক্তরাজ্যের ১৪০টিরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিত্বকারী সংস্থা ‘ইউনিভার্সিটিজ ইউকে’ জানিয়েছে, তারা সতর্কতাটি খতিয়ে দেখছে এবং গবেষণার ঝুঁকি এড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে। অন্যদিকে, লন্ডনে অবস্থিত চীনা দূতাবাস এই সমস্ত অভিযোগকে ‘কাল্পনিক ও সম্পূর্ণ বানোয়াট’ বলে দাবি করেছে।

তাদের মতে, শিক্ষাগত বিনিময় সব সময় দুই দেশের মধ্যে আইনি নিয়ম মেনেই হয়ে আসছে।

যুক্তরাজ্য এর আরও খবর