img

অসমাপ্ত ক্যানভাস

প্রকাশিত :  ০৮:১৪, ১৪ আগষ্ট ২০২৬

অসমাপ্ত ক্যানভাস

রেজুয়ান আহম্মেদ

মানুষের সবচেয়ে বড় রহস্য তার জীবন নয়, তার চেতনা। জন্মের মুহূর্তে একটি শিশু জানে না সে কে। তার কোনো পদবি নেই, সামাজিক পরিচয় নেই, ব্যাংক হিসাব নেই, সাফল্যের ইতিহাসও নেই। অথচ তার চোখে এমন এক বিস্ময় থাকে, যার সামনে পৃথিবীর সমস্ত অর্জন কখনো কখনো খুব ছোট মনে হয়।

ধীরে ধীরে সমাজ তাকে একটি নাম দেয়। নামের সঙ্গে আসে পরিবার, পরিবারের সঙ্গে প্রত্যাশা, প্রত্যাশার সঙ্গে শিক্ষা, শিক্ষার সঙ্গে প্রতিযোগিতা, আর প্রতিযোগিতার সঙ্গে সাফল্য ও ব্যর্থতা। একদিন মানুষ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারে, যে মানুষটি হওয়ার স্বপ্ন সে দেখেছিল, সে আর সেই মানুষটি নেই। সে হয়ে উঠেছে অন্যদের প্রত্যাশার সমষ্টি।

কেউ তাকে সফল বলেছে, তাই সে সফল হতে চেয়েছে। কেউ তাকে ব্যর্থ বলেছে, তাই নিজের চোখেও সে ব্যর্থ হয়ে উঠেছে। কেউ তাকে ভালোবাসেনি, তাই নিজের মধ্যে ভালোবাসার যোগ্যতা খুঁজে পায়নি। কেউ তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে, তাই একসময় সে নিজের অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে।

অথচ মানুষের ভেতরে এমন একটি অঞ্চল আছে, যেখানে পৃথিবীর কোনো প্রশংসা পৌঁছায় না এবং কোনো অপমান স্থায়ী হতে পারে না। সেই অঞ্চলটির নাম চেতনা। সেখানে মানুষ একা। কিন্তু সেই একাকিত্বই তার প্রথম স্বাধীনতা।

অর্ক সেই স্বাধীনতার অর্থ বুঝেছিল জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার সময়ে। তার আগে সে ভাবত, মানুষের মূল্য নির্ধারিত হয় তার অর্জনে। পরে বুঝেছিল, মানুষকে বড় করে তার অর্জন নয়, বরং পতনের পর আবার উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতা।

অর্কের শহরটির নাম ছিল শৈলপুর। শহর বলা হয়তো একটু বাড়িয়ে বলা। পাহাড়ের পাদদেশে কয়েক হাজার মানুষের বসতি, একটি পুরোনো বাজার, একটি সরকারি কলেজ, দুটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, একটি হাসপাতাল এবং পাহাড়ের গায়ে ছড়িয়ে থাকা কয়েকটি গ্রাম নিয়েই শৈলপুরের অস্তিত্ব।

শীতকালে এখানে সকাল নামে ধীরে। পাহাড় থেকে নেমে আসা কুয়াশা রাস্তা ঢেকে রাখে। বিকেলে সূর্য খুব দ্রুত পশ্চিমে চলে যায়। রাতে আকাশে এত তারা দেখা যায় যে শহরের মানুষ মাঝে মাঝে ভুলে যায়, পৃথিবী আসলে কত বড়।

অর্ক এই শহরেই বড় হয়েছিল। তার বাবা ছিলেন উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক, মা ছিলেন গৃহিণী। পরিবারটি দরিদ্র ছিল না, আবার স্বচ্ছলও ছিল না।

অর্ক ছোটবেলা থেকেই বই পড়ত। তার বাবা বলতেন, জীবনে বড় হতে চাইলে শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করলেই হবে না, মানুষের ভেতরটা পড়তে শিখতে হবে।

অর্ক তখন কথাটির অর্থ বুঝত না। তার কাছে বড় হওয়া মানেই ছিল বড় চাকরি।

শেষ পর্যন্ত তার সেই বড় চাকরি হলো। এল বড় পদ, বড় বাড়ি, বড় গাড়ি, সম্মান এবং আন্তর্জাতিক পরিচিতি। কিন্তু ততদিনে তার বাবা আর বেঁচে নেই।

মৃত্যুর কয়েক দিন আগে বাবা অর্ককে বলেছিলেন,

“তুই অনেক দূর যাবি। শুধু একটা কথা মনে রাখিস। মানুষের হাততালি যেন তোর নিজের কণ্ঠস্বরকে ঢেকে না দেয়।”

অর্ক হেসে বলেছিল,

“বাবা, তুমি এত চিন্তা করছ কেন?”

বাবা জানালার বাইরে তাকিয়ে ধীরে বলেছিলেন,

“কারণ মানুষ যখন নিজের কণ্ঠস্বর শুনতে পায় না, তখন সে অন্যের কণ্ঠে নিজের জীবন চালাতে শুরু করে।”

অর্ক তখনও কথাটির গভীরতা বুঝতে পারেনি। বহু বছর পরে বুঝেছিল। কিন্তু তখন তার বাবা আর ছিলেন না।

চল্লিশ বছর বয়সে অর্ক দেশের অন্যতম পরিচিত গবেষক ছিলেন। তার গবেষণার বিষয় ছিল মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সামাজিক আচরণ এবং সংকটের সময় মানসিক প্রতিক্রিয়া। বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানিত করেছিল। বিদেশের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। তার লেখা বই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যতালিকায় স্থান পেয়েছিল।

সংবাদপত্রে তার সাক্ষাৎকার ছাপা হতো, টেলিভিশনে অনুষ্ঠান হতো। কেউ তাকে চিন্তাবিদ বলত, কেউ মনোবিজ্ঞানী, কেউ দার্শনিক।

অর্ক এসব শুনে আনন্দ পেত। কেন পেত, তা সে নিজেও জানত না। মানুষ যখন একটি পরিচয় পায়, তখন ধীরে ধীরে সেই পরিচয়টিকেই নিজের বলে মনে করতে শুরু করে।

অর্কের ঘরও তার পরিচয়ের সাক্ষী হয়ে উঠেছিল। পুরস্কারে ভরে গিয়েছিল দেয়াল, আলমারিতে জমেছিল সম্মাননা, ডেস্কের ওপর সাজানো ছিল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের স্মারক। একটি বড় কাঠের তাক জুড়ে ছিল বই।

একদিন মেঘলা বলেছিল,

“তোমার ঘরটা এখন তোমার চেয়ে তোমার পুরস্কারগুলোকে বেশি চেনে।”

অর্ক হেসেছিল।

“তুমি ঈর্ষা করছ?”

“না। ভয় পাচ্ছি।”

“কিসের?”

মেঘলা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলেছিল,

“তুমি যদি কোনোদিন এগুলো হারাও, তখন নিজেকে কী দিয়ে চিনবে?”

অর্ক হেসে উঠেছিল।

“মানুষ কি এত সহজে ভেঙে পড়ে?”

মেঘলা উত্তর দেয়নি। শুধু তার দিকে তাকিয়ে ছিল। সেই দৃষ্টির অর্থ অর্ক তখন বুঝতে পারেনি।

কিছু মানুষ ভবিষ্যৎ দেখতে পায় না। তারা কেবল বর্তমানের মধ্যে ভবিষ্যতের ছায়া অনুভব করে।

সেদিন সকালটিও অন্য দিনের মতোই ছিল। অর্ক ঘুম থেকে উঠে জানালা খুলেছিল। পাহাড়ের ওপর হালকা কুয়াশা। দূরে কয়েকটি পাখি উড়ছিল। মেঘলা তখন রান্নাঘরে। অর্ক কফির কাপ হাতে গবেষণাকক্ষের দিকে যাচ্ছিল।

ঠিক তখন ফোন বেজে উঠল।

সে ফোন তুলল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তার মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল।

“আপনি নিশ্চিত?”

ওপাশ থেকে উত্তর এল।

“আমি এখনই আসছি।”

ফোন রেখে অর্ক স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

মেঘলা দূর থেকে জিজ্ঞেস করল,

“কী হয়েছে?”

কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর অর্ক বলল,

“প্রতিষ্ঠানে বড় সমস্যা হয়েছে।”

“কী ধরনের?”

“অর্থনৈতিক।”

“তুমি কি জড়িত?”

অর্ক তার দিকে তাকাল।

“আমি জানি না।”

সেই একটি বাক্যের মধ্যেই তার জীবনে প্রথম ফাটল তৈরি হয়েছিল।

অফিসে পৌঁছে অর্ক বুঝল, পরিস্থিতি তার ধারণার চেয়েও ভয়াবহ। বহু বছরের আর্থিক অনিয়ম সামনে এসেছে। প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা তদন্তের আওতায়। অর্কের স্বাক্ষর রয়েছে এমন কয়েকটি নথিও প্রশ্নের মুখে।

সে বলল,

“আমি এসব অনুমোদন করিনি।”

কেউ উত্তর দিল না।

একজন সহকর্মী চোখ নামিয়ে রাখল। অর্ক তার দিকে তাকিয়ে বলল,

“তুমি তো জানো আমি কীভাবে কাজ করি।”

লোকটি ধীরে বলল,

“এখন কিছু বলা ঠিক হবে না।”

অর্ক তখন বুঝল, বিপদের সময় মানুষ প্রথমে সত্যকে ভয় পায়, তারপর সম্পর্ককে, তারপর নিজের নিরাপত্তাকে।

পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে সংবাদমাধ্যমে তার নাম উঠে এল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা শুরু হলো। কেউ বলল, সে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। কেউ বলল, সবকিছু সে জানত। কেউ বলল, এতদিন সে সৎ মানুষের মুখোশ পরে ছিল।

অর্ক প্রতিবাদ করল। ব্যাখ্যা দিল। নথি দেখাল। আইনি প্রক্রিয়া শুরু হলো।

কিন্তু জনমতের আদালত কখনো ধীর নয়। সেখানে বিচার দ্রুত হয়, আর প্রমাণের প্রয়োজন খুব কম। একটি গল্পই যথেষ্ট।

অর্কের বিরুদ্ধে একটি গল্প তৈরি হয়ে গেল।

তার বহু বছরের অর্জন কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সন্দেহের মধ্যে পড়ে গেল। যারা একসময় তাকে ঘিরে থাকত, তারা দূরে সরে গেল। যে সাংবাদিকরা সাক্ষাৎকার নিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করত, তারা ফোন ধরল না। যে সহকর্মীরা তার সঙ্গে ছবি তুলতে গর্ব অনুভব করত, তারা এখন তার নাম উচ্চারণ করত সতর্কভাবে।

একদিন অর্ক অফিসে গিয়ে দেখল, তার কক্ষের দরজায় কোনো নাম নেই।

নামফলকটি সরিয়ে ফেলা হয়েছে।

সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। কাঠের ছোট্ট ফলকটি সরানোর সঙ্গে সঙ্গে যেন তার জীবনের একটি অধ্যায়ও মুছে গেল।

অর্কের সবচেয়ে বড় আঘাত অর্থনৈতিক ক্ষতি ছিল না। ছিল মানুষের পরিবর্তন।

একজন মানুষ ধনী হলে তার চারপাশে মানুষের সংখ্যা বাড়ে। কিন্তু সে পড়ে গেলে বোঝা যায়, সেই মানুষগুলো আসলে কতটা তার ছিল।

অর্কের ফোন ধীরে ধীরে নীরব হয়ে গেল। আগে প্রতিদিন অসংখ্য বার্তা আসত। এখন ফোনে কেবল সরকারি নোটিশ, আইনজীবীর খবর, ব্যাংকের সতর্কতা এবং অপরিচিত মানুষের কটু মন্তব্য।

মেঘলা তার পাশে থাকার চেষ্টা করছিল। কিন্তু অর্ক ক্রমশ অসহিষ্ণু হয়ে উঠছিল।

এক রাতে মেঘলা বলল,

“তুমি কার ওপর রাগ করছ?”

“সবার ওপর।”

“সবাই কী করেছে?”

“আমাকে ছেড়ে গেছে।”

“সবাই?”

অর্ক চুপ করে রইল।

মেঘলা বলল,

“আমি তো আছি।”

অর্ক তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল,

“তুমিও একদিন চলে যাবে।”

মেঘলা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে বলল,

“তুমি কি জানো, সবচেয়ে কষ্টের বিষয় কী?”

অর্ক নীরব।

“তুমি এখন অন্যদের হারানোর ভয়েই এমন আচরণ করছ, যাতে যারা তোমার পাশে থাকতে চায়, তারাও একদিন চলে যেতে বাধ্য হয়।”

অর্ক কোনো উত্তর দিল না।

মেঘলা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

সেদিন রাতে অর্ক প্রথমবার নিজের আচরণকে যেন বাইরে থেকে দেখল। সে বুঝতে পারল না তার ভেতরে কী ঘটছে। শুধু অনুভব করল, নিজের চারপাশে সে অদৃশ্য একটি দেয়াল তুলছে।

তিন মাসের মধ্যে অর্কের জীবন বদলে গেল।

গাড়ি বিক্রি হলো। বাড়ির একটি অংশ বন্ধক পড়ল। গবেষণাকেন্দ্র থেকে সে সাময়িকভাবে দূরে সরে গেল। বই প্রকাশের কাজ বন্ধ হলো। কয়েকটি বক্তৃতা বাতিল হলো।

মানুষ তাকে ভুলতে শুরু করল।

একসময় যে অর্ককে ঘিরে ক্যামেরার আলো জ্বলত, সে এখন সন্ধ্যার পর একা বসে থাকত। দেয়ালে ঝোলানো পুরস্কারগুলোকে তার মনে হতো, সেগুলো যেন তাকে বিদ্রূপ করছে।

এক রাতে সে একটি পুরস্কার হাতে তুলে নিল। ধাতব ফলকের ওপর তার নাম, তারিখ এবং সম্মাননার কারণ লেখা।

অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে সে ফিসফিস করে বলল,

“তুমি কি এখনও আমাকে চেনো?”

কোনো উত্তর এল না।

সে পুরস্কারটি টেবিলে রেখে আরেকটি ছবি হাতে নিল। ছবিতে সে হাসছে। পাশে মেঘলা। পেছনে অনেক মানুষ।

অর্ক ভাবল, ছবির মানুষটি কি সত্যিই সে ছিল? নাকি সে ছিল কেবল সেই সময়ের একটি সামাজিক সংস্করণ?

মানুষের জীবনে এক ভয়ংকর মুহূর্ত আসে, যখন সে বুঝতে পারে, নিজের সম্পর্কে যে গল্পটি সে এতদিন বিশ্বাস করেছে, সেটি হয়তো পুরোপুরি সত্য নয়।

অর্ক সেই মুহূর্তে পৌঁছে গিয়েছিল।

শীতের এক রাতে অর্ক বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। কাউকে কিছু বলল না।

হাঁটতে হাঁটতে সে পাহাড়ের দিকে এগোল। শৈলপুরের মানুষ জানত, রাতের পর পাহাড়ে যাওয়া নিরাপদ নয়। কিন্তু অর্কের তখন নিরাপত্তার প্রতি কোনো আগ্রহ ছিল না। সে শুধু দূরে যেতে চেয়েছিল, নিজের কাছ থেকে, শহর থেকে, স্মৃতি থেকে, অপমান থেকে, মানুষের চোখ থেকে।

পাহাড়ি পথে উঠতে উঠতে কুয়াশা ঘন হয়ে এল। শ্বাস থেকে সাদা ধোঁয়া বের হচ্ছিল।

একসময় সে থেমে আকাশের দিকে তাকাল।

অসংখ্য তারা।

“আমি কোথায় ভুল করেছি?”

নীরবতা।

“আমি কি সত্যিই ব্যর্থ?”

শুধু বাতাসের শব্দ।

“আমার এত বছরের কাজ কি তাহলে অর্থহীন?”

দূরে কোথাও একটি পাথর গড়িয়ে পড়ার শব্দ হলো।

অর্ক চোখ বন্ধ করল।

তার মনে হলো, মহাবিশ্বের কাছে মানুষের দুঃখের কোনো বিশেষ মর্যাদা নেই। একটি মানুষের হৃদয় ভেঙে গেলে নক্ষত্রের গতি বদলায় না। কেউ চাকরি হারালে চাঁদ তার আলো কমায় না। কেউ প্রিয় মানুষ হারালে নদীর স্রোত থেমে যায় না।

প্রকৃতি নির্বিকার।

এই নির্বিকারতা প্রথমে তাকে আতঙ্কিত করেছিল। পরে সে বুঝতে শুরু করল, এই নীরবতার মধ্যেই এক ধরনের মুক্তি আছে।

মহাবিশ্ব যদি তার জীবনের অর্থ নির্ধারণ না করে, তবে সেই অর্থ তাকে নিজেকেই নির্মাণ করতে হবে।

উপলব্ধিটি তখনও সম্পূর্ণ হয়নি। কিন্তু বীজটি সেদিনই মাটিতে পড়েছিল।

পাহাড়ের ভেতরে আরও কিছুদূর যাওয়ার পর অর্ক একটি শব্দ শুনল।

টক।

তারপর বিরতি।

টক।

আবার বিরতি।

টক।

সে থেমে গেল।

এত রাতে পাহাড়ে কেউ পাথর কাটছে?

শব্দের দিকে এগোতেই কুয়াশার মধ্যে ক্ষীণ একটি আলো দেখা গেল। আগুনের পাশে বসে ছিলেন একজন বৃদ্ধ। চুল সাদা, দাড়ি লম্বা, গায়ে পুরোনো পশমি চাদর। সামনে বিশাল কালো ব্যাসল্ট শিলা। এক হাতে হাতুড়ি, অন্য হাতে ছেনি।

অর্ক কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখল।

বৃদ্ধ তার দিকে তাকালেন। চোখে বিস্ময় নেই, প্রশ্নও নেই।

শুধু বললেন,

“এসো।”

অর্ক এগিয়ে গেল।

“আপনি এখানে একা থাকেন?”

“হ্যাঁ।”

“কতদিন?”

“যতদিন প্রয়োজন।”

“কার প্রয়োজন?”

বৃদ্ধ মৃদু হাসলেন।

“যে প্রশ্নের উত্তর নিজের কাছে নেই, সে প্রশ্নের উত্তর অন্যের কাছে খুঁজতে গেলে মানুষ আরও দূরে চলে যায়।”

অর্ক চুপ করে রইল।

বৃদ্ধ আবার পাথরে আঘাত করলেন।

টক।

অর্ক বলল,

“আপনি কী বানাচ্ছেন?”

“একজন মানুষ।”

অর্ক অবাক হলো।

“পাথর দিয়ে মানুষ?”

“হ্যাঁ।”

“কোথায় মানুষ?”

বৃদ্ধ পাথরের দিকে তাকালেন।

“এখনও বের হয়নি।”

অর্ক বসে পড়ল।

“আপনি কি ভাস্কর?”

“ছিলাম।”

“এখন?”

“এখন আমি পাথরের সঙ্গে কথা বলি।”

“পাথর কথা বলে?”

“মানুষের মতো নয়।”

“তাহলে?”

“সে প্রতিরোধ করে।”

অর্ক বুঝতে পারল না।

বৃদ্ধ বললেন,

“যে জায়গায় আঘাত করলে পাথর সাড়া দেয়, সেখানে সে জানায়, তুমি সঠিক জায়গায় এসেছ। আর যেখানে আঘাত করলে শুধু শব্দ হয়, সেখানে সে বলে, তুমি এখনও তাকে বোঝোনি।”

অর্ক পাথরের দিকে তাকাল।

“এটার ভেতরে কী আছে?”

বৃদ্ধ বললেন,

“আমি জানি না।”

“তাহলে কীভাবে বানাবেন?”

“আমি বানাচ্ছি না।”

“তাহলে?”

“আমি সরাচ্ছি।”

“কী?”

বৃদ্ধ তার দিকে তাকিয়ে বললেন,

“যা প্রয়োজন নেই।”

অর্কের বুকের মধ্যে অদ্ভুত এক অনুভূতি হলো।

বৃদ্ধ বললেন,

“মানুষও পাথরের মতো।”

অর্ক মৃদু হাসল।

“আমার বর্তমান অবস্থার সঙ্গে এই তুলনাটা বেশ মানানসই।”

বৃদ্ধ তার দিকে তাকালেন।

“তোমার জীবনে কী ঘটেছে?”

অর্ক অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল,

“আমি সব হারিয়েছি।”

“সব?”

“প্রায়।”

“কী কী?”

অর্ক একে একে বলতে লাগল, “কাজ, সম্মান, অর্থ, বন্ধু, পরিচিতি, ভবিষ্যৎ।”

তারপর ধীরে বলল,

“নিজেকেও।”

বৃদ্ধ হাতুড়ি নামিয়ে রাখলেন।

“এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা।”

অর্ক তাকাল।

“কী?”

“তুমি যা হারিয়েছ, তার তালিকায় নিজেকেও রেখেছ।”

“আমি নিজেকে হারিয়েছি।”

“না।”

“কীভাবে?”

“যে মানুষ হারিয়ে যায়, সে এই প্রশ্ন করতে পারে না।”

অর্ক স্তব্ধ হয়ে রইল।

বৃদ্ধ বললেন,

“তোমার পরিচয়ের একটি সংস্করণ ভেঙেছে। তুমি পুরোপুরি ভাঙোনি।”

বৃদ্ধের নাম ছিল নিরঞ্জন।

তিনি অর্ককে কোনো ধর্মের কথা বললেন না, কোনো দর্শনের বইয়ের নাম করলেন না, কোনো মতবাদও চাপিয়ে দিলেন না। তিনি শুধু প্রশ্ন করতেন।

“তুমি কেন দুঃখী?”

“কারণ আমি সব হারিয়েছি।”

“কী হারিয়েছ?”

“যা আমার ছিল।”

“সত্যিই তোমার কী ছিল?”

অর্ক থেমে গেল।

“আমার কাজ।”

“কাজ কি তোমার জন্মের সময় তোমার সঙ্গে এসেছিল?”

“না।”

“তাহলে?”

“আমি অর্জন করেছি।”

“অর্জন করা জিনিস হারানো সম্ভব?”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে তুমি হারিয়েছ অর্জন, নিজেকে নয়।”

অর্ক বিরক্ত হলো।

“আপনি শব্দ নিয়ে খেলছেন।”

নিরঞ্জন হাসলেন।

“শব্দ মানুষকে বাঁচায়ও, আবার মারেও।”

“কীভাবে?”

“তুমি যদি বলো, আমি ব্যর্থ হয়েছি, তাহলে ব্যর্থতা একটি ঘটনা। আর যদি বলো, আমি একজন ব্যর্থ মানুষ, তাহলে তুমি ঘটনাকে পরিচয়ে পরিণত করেছ।”

অর্ক চুপ করে রইল।

নিরঞ্জন বললেন,

“জীবনের প্রথম কাজ হলো ঘটনাকে নিজের সত্তা থেকে আলাদা করতে শেখা।”

সেই রাতে অর্ক অনেকক্ষণ ঘুমাতে পারেনি। নিজের জীবনের ঘটনাগুলোকে সে আলাদা করে দেখতে শুরু করল।

সে চাকরি হারিয়েছে, কিন্তু জ্ঞান হারায়নি।

সে সম্মান হারিয়েছে, কিন্তু বিবেক হারায়নি।

সে অর্থ হারিয়েছে, কিন্তু শ্রম করার ক্ষমতা এখনও আছে।

সে কিছু সম্পর্ক হারিয়েছে, কিন্তু ভালোবাসার ক্ষমতা পুরোপুরি শেষ হয়নি।

সে একটি পরিচয় হারিয়েছে, কিন্তু নতুন পরিচয় তৈরি করার সম্ভাবনা এখনও রয়েছে।

তার ভেতরে যেন একটি অদৃশ্য দরজা খুলতে শুরু করল।

পরদিন ভোরে নিরঞ্জন মাটিতে পাঁচটি বৃত্ত আঁকলেন।

অর্ক জিজ্ঞেস করল,

“এগুলো কী?”

“মানুষের রূপান্তরের পাঁচটি দরজা।”

প্রথমটির নিচে লিখলেন, বিনাশ।

দ্বিতীয়টির নিচে, শূন্যতা।

তৃতীয়টির নিচে, স্বাধীনতা।

চতুর্থটির নিচে, সৃষ্টি।

পঞ্চমটির নিচে, সেবা।

অর্ক বলল,

“সব মানুষ কি এই পথ দিয়ে যায়?”

“না।”

“তাহলে?”

“যে মানুষ নিজের গভীরে নামতে সাহস করে, সে কোনো না কোনোভাবে এই দরজাগুলোর সামনে দাঁড়ায়।”

নিরঞ্জন প্রথম বৃত্তটির দিকে ইঙ্গিত করলেন।

“বিনাশ মানে সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাওয়া নয়। পুরোনো ধারণার পতনও বিনাশ।”

তারপর দ্বিতীয়টির দিকে তাকিয়ে বললেন,

“শূন্যতা হলো সেই সময়, যখন পুরোনো পরিচয় চলে গেছে, কিন্তু নতুন পরিচয় এখনও জন্ম নেয়নি।”

তৃতীয়টির দিকে তাকিয়ে বললেন,

“স্বাধীনতা আসে যখন মানুষ বুঝতে পারে, পরিস্থিতি তার সব সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করতে পারে না।”

চতুর্থটি দেখিয়ে বললেন,

“সৃষ্টি তখনই শুরু হয়, যখন সে নিজের যন্ত্রণা থেকে নতুন কিছু তৈরি করতে শেখে।”

শেষ বৃত্তটির দিকে তাকিয়ে বললেন,

“সেবা আসে যখন সে বুঝতে পারে, নিজের মুক্তি কেবল নিজের জন্য নয়।”

অর্ক জিজ্ঞেস করল,

“আমি এখন কোথায়?”

নিরঞ্জন বললেন,

“তুমি শূন্যতার দরজায়।”

“তৃতীয় দরজা কখন খুলবে?”

“যখন তুমি একটি কঠিন সত্য স্বীকার করবে।”

“কোন সত্য?”

নিরঞ্জন ধীরে বললেন,

“তোমার জীবনের সব ঘটনার জন্য তুমি দায়ী নও। কিন্তু এখন থেকে সেই ঘটনাগুলোর সঙ্গে তুমি কীভাবে বাঁচবে, তার দায়িত্ব তোমার।”

অর্কের কাছে কথাটি সহজ মনে হলো। কিন্তু তার ভেতরে ছিল অসীম ভার।

অন্যকে দোষ দেওয়া মানুষকে সাময়িক শান্তি দেয়। নিজের দায়িত্ব গ্রহণ তাকে স্বাধীন করে। আর স্বাধীনতা কখনো হালকা বোঝা নয়।

কয়েক সপ্তাহ পর নিরঞ্জন অর্ককে বললেন,

“তোমাকে যেতে হবে।”

“কোথায়?”

“কালাচলে।”

অর্ক পাহাড়ের দিকে তাকাল। কালাচলের চূড়া মেঘে ঢাকা।

“আমি কেন যাব?”

“কারণ কথার সীমা আছে।”

“সেখানে কী আছে?”

“তোমার জন্য যে উত্তর অপেক্ষা করছে, তার কোনো নাম নেই।”

“আপনি কি আমার সঙ্গে যাবেন?”

নিরঞ্জন মাথা নাড়লেন।

“না।”

“কেন?”

“জীবনের কিছু পথ অন্য কেউ তোমার হয়ে হাঁটতে পারে না।”

অর্ক বলল,

“যদি আমি না পারি?”

“তাহলে পড়ে যাবে।”

“আর যদি পড়ে যাই?”

“উঠবে।”

“যদি আর উঠতে না পারি?”

নিরঞ্জন তার দিকে তাকালেন।

“তাহলে অন্তত জানতে পারবে, কোথায় পর্যন্ত গিয়েছিলে।”

অর্ক হেসে ফেলল।

সেদিন সন্ধ্যায় সে যাত্রা শুরু করল। ব্যাগে খুব বেশি কিছু ছিল না। কিছু শুকনো খাবার, একটি পানির বোতল, একটি কম্বল এবং নিরঞ্জনের দেওয়া ছোট ছেনি।

পাহাড়ের পথ যত ওপরে উঠছিল, অর্কের অতীত তত কাছে আসছিল।

সে ভেবেছিল, পাহাড়ে উঠলে হয়তো সবকিছু ভুলে যাবে। কিন্তু মানুষ নিজের কাছ থেকে পালাতে পারে না।

একটি বাঁকের পর সে থেমে গেল।

তার সামনে যেন নিজের তরুণ বয়সের ছবি দাঁড়িয়ে আছে।

সেই তরুণ অর্ক, যার চোখে স্বপ্ন। যে বিশ্বাস করত, পরিশ্রম করলে পৃথিবী অবশ্যই তাকে পুরস্কৃত করবে। ভালো কাজ করলে ভালো ফল আসবে। মানুষের প্রশংসা তার যোগ্যতার প্রমাণ।

বর্তমানের অর্ক সেই তরুণটির দিকে তাকাল।

তার মনে হলো, সে ছেলেটিকে ঘৃণা করতে পারে না। সে শুধু জানে, ছেলেটি অনেক কিছু জানত না।

জীবন তাকে শেখানোর জন্য অপেক্ষা করছিল।

অর্ক ধীরে বলল,

“তুমি ভুল করেছিলে।”

তরুণ অর্ক যেন হাসল।

“তুমিও করেছ।”

অর্ক চুপ করে রইল।

“তাহলে তুমি আমাকে কেন বিচার করছ?”

অর্কের বুক কেঁপে উঠল।

সে বুঝল, মানুষ নিজের অতীতকে বিচার করতে গিয়ে নিজেরই একটি অংশকে হত্যা করে।

চোখ বন্ধ করে সে বলল,

“আমি তোমাকে ক্ষমা করছি।”

চোখ খুললে সেখানে কেউ ছিল না। শুধু পাহাড়।

কিন্তু তার বুকের ভেতরের একটি ভার যেন কিছুটা কমে গিয়েছিল।

কালাচলের চূড়ার কাছে পৌঁছাতে পথ আরও সরু হয়ে গেল। এক পাশে পাথরের দেয়াল, অন্য পাশে গভীর খাদ।

অর্ক নিচে তাকাল না।

সে জানত, ভয়কে যত বেশি চোখে জায়গা দেওয়া হয়, ভয় তত বড় হয়ে ওঠে। কিন্তু ভয়কে অস্বীকার করাও বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

সে নিজের কাছে বলল,

“আমি ভয় পাচ্ছি।”

কথাটি স্বীকার করার পর আশ্চর্যভাবে শরীর কিছুটা শিথিল হলো।

ভয়কে অস্বীকার করলে সে শক্তি পায়। স্বীকার করলে তাকে পর্যবেক্ষণ করা যায়।

অর্ক সামনে তাকাল।

একটি পাথরের ফাঁক। তার ওপারে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ একটি জায়গা।

লাফ দিতে হবে।

সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর হঠাৎ বুঝল, জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের আগে এমন একটি মুহূর্ত আসে। সেখানে কেউ আপনার হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। কেউ নিশ্চয়তা দিতে পারে না। কেউ বলতে পারে না, আপনি ঠিক করছেন কি না।

সেই একাকিত্বই স্বাধীনতার মূল্য।

অর্ক গভীর শ্বাস নিল।

দৌড়ে লাফ দিল।

কয়েক মুহূর্ত তার শরীর বাতাসে ভাসল। তারপর পা পড়ল পাথরের ওপর। সে পড়ে গেল, হাত দিয়ে মাটি আঁকড়ে ধরল।

কিছুক্ষণ পর উঠে বসে হেসে ফেলল।

সে বুঝল, সাহস ভয়কে হত্যা করে না। সাহস হলো ভয়কে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত।

চূড়ায় পৌঁছানোর সময় রাত শেষ হয়ে আসছিল। আকাশ এখনও অন্ধকার, কিন্তু পূর্বদিকে হালকা নীল রেখা ফুটে উঠেছে।

অর্ক একটি পাথরের ওপর বসে পড়ল। শরীর ক্লান্ত, মুখে তুষারের দাগ, হাত কাঁপছিল। তবু মনে কোনো অভিযোগ ছিল না।

নিচে তাকালে শৈলপুর শহরটিকে ছোট্ট একটি বিন্দুর মতো মনে হলো।

সেই শহরে তার অপমান ছিল, সাফল্য ছিল, ভালোবাসা ছিল, ব্যর্থতা ছিল। সবকিছু এত ছোট দেখাচ্ছিল যে অর্কের মনে হলো, মানুষের অহংকার কত অদ্ভুত।

আমরা যে ঘটনাগুলোকে মহাবিশ্বের কেন্দ্র মনে করি, মহাবিশ্বের দৃষ্টিতে সেগুলো হয়তো এক মুহূর্তেরও কম।

সে চোখ বন্ধ করল।

তার মনে হলো, তার ভেতরের ‘আমি’ ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে।

সে আর শুধু অর্ক নয়।

সে একটি শ্বাস, একটি জীবন, একটি ক্ষণস্থায়ী চেতনা, বৃহৎ অস্তিত্বের একটি ক্ষুদ্র অংশ।

ঠিক তখন সূর্য উঠল।

পূর্ব আকাশের অন্ধকার ধীরে ধীরে সরে গেল। প্রথম আলো পাহাড়ের গায়ে পড়ল। তুষারের ওপর আলো জ্বলে উঠল।

অর্কের চোখে জল এসে গেল।

সে বুঝল, সূর্যোদয় তাকে কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি। তবু আলো এসেছে।

জীবনও তেমন। ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা না থাকলেও মানুষ এগিয়ে যায়। আর সেই এগিয়ে যাওয়ার মধ্যেই জীবনের অর্থ জন্ম নেয়।

চূড়া থেকে নেমে আসার সময় অর্ক বুঝল, পাহাড়ে ওঠার চেয়ে নিচে নামা কঠিন।

ওপরে মানুষ নিজের সত্য দেখতে পারে। নিচে ফিরে এসে সেই সত্যকে কাজে পরিণত করতে হয়।

শৈলপুরে ফিরে সে দেখল, পৃথিবী তার জন্য অপেক্ষা করেনি।

এটাই তাকে সবচেয়ে বেশি স্বস্তি দিল।

তার অনুপস্থিতিতে বাজার খুলেছে, শিশুরা স্কুলে গেছে, মানুষ প্রেম করেছে, বিয়ে হয়েছে, কেউ মারা গেছে, নতুন শিশু জন্মেছে। শহর নিজের গতিতেই চলেছে।

অর্ক বুঝল, সে এতদিন নিজের গুরুত্বকে অতিরঞ্জিত করেছিল।

এই উপলব্ধির মধ্যে অপমান ছিল না।

ছিল মুক্তি।

অর্ক একটি ছোট ঘর ভাড়া নিল। কোনো সাইনবোর্ড লাগাল না, কোনো বিজ্ঞাপনও দিল না। শুধু দরজা খোলা রাখল।

প্রথম দিন একজন যুবক এল।

সে চাকরি হারিয়েছে।

বলল,

“আমি শেষ।”

অর্ক জিজ্ঞেস করল,

“কী শেষ হয়েছে?”

“আমার চাকরি।”

“তাহলে তুমি কেন বলছ, তুমি শেষ?”

যুবক চুপ করে রইল।

অর্ক বলল,

“একটি ঘটনা আর একটি পরিচয়কে এক করে ফেলো না।”

পরের দিন এক নারী এল। তার বিবাহ ভেঙে গেছে।

সে বলল,

“আমি আর কাউকে বিশ্বাস করতে পারব না।”

অর্ক বলল,

“তুমি একজন মানুষকে হারিয়েছ। বিশ্বাস করার ক্ষমতা হারাওনি।”

এক বৃদ্ধ এলেন। বললেন,

“আমার জীবনে আর কোনো উদ্দেশ্য নেই।”

অর্ক জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,

“আপনি কি আজ কারও জন্য কিছু করতে পারেন?”

বৃদ্ধ কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,

“হয়তো।”

“তাহলে আজকের জন্য আপনার উদ্দেশ্য আছে।”

ধীরে ধীরে মানুষ আসতে লাগল।

অর্ক বুঝতে পারল, মানুষ সবসময় উপদেশ চায় না। অনেক সময় সে শুধু চায়, কেউ তার কথা শেষ পর্যন্ত শুনুক।

এক বছর পর অর্ক একটি ছোট শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করল।

নাম দিল, ভাঙা মানুষের বিদ্যালয়।

নামটি শুনে অনেকে হাসল।

অর্ক বলল,

“ভাঙা মানুষ মানে পরাজিত মানুষ নয়। ভাঙা মানুষ মানে এমন একজন, যার পুরোনো কাঠামো আর আগের মতো নেই।”

এই বিদ্যালয়ে পরীক্ষার নম্বর ছিল না, সনদ ছিল না, প্রতিযোগিতাও ছিল না।

ছিল আত্মপর্যবেক্ষণ।

মানুষ সেখানে শিখত কীভাবে নিজের ব্যর্থতার দিকে তাকাতে হয়, কীভাবে নিজের ভয়কে চিনতে হয়, কীভাবে ক্ষোভকে কাজে রূপ দিতে হয়, কীভাবে প্রতিকূলতার মধ্যেও চরিত্র রক্ষা করতে হয় এবং সাফল্যের পর নিজেকে হারিয়ে না ফেলতে হয়।

অর্ক বলত,

“প্রেরণা সবসময় তোমার পাশে থাকবে না। তাই চরিত্র তৈরি করো। উৎসাহ কমে যাবে, অভ্যাস তোমাকে এগিয়ে নেবে।

মানুষ তোমাকে প্রত্যাখ্যান করতে পারে। নিজের মূল্যবোধকে প্রত্যাখ্যান করো না।

তুমি ব্যর্থ হতে পারো। কিন্তু ব্যর্থতাকে তোমার নাম বানিয়ে দিও না।

অন্যায় তোমার সঙ্গে ঘটতে পারে। কিন্তু অন্যায়ের মতো মানুষ হয়ে ওঠা তোমার হাতে।”

অনেক বছর পর এক বিকেলে মেঘলা শৈলপুরে ফিরে এল।

অর্ক তখন বিদ্যালয়ের উঠোনে কয়েকজন শিশুর সঙ্গে বসে ছিল।

মেঘলাকে দেখে সে উঠে দাঁড়াল।

দুজনেই কিছুক্ষণ নীরব রইল।

তারপর মেঘলা বলল,

“তুমি বদলে গেছ।”

অর্ক মৃদু হাসল।

“তুমিও।”

“আমি তোমাকে অনেকবার মনে করেছি।”

“আমিও।”

“রাগ ছিল?”

“ছিল।”

“এখন?”

“কমেছে।”

“কীভাবে?”

অর্ক কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

“আমি বুঝেছি, মানুষ কখনো কখনো নিজের যন্ত্রণার মধ্যে এমনভাবে আটকে যায় যে অন্যের যন্ত্রণাও দেখতে পায় না।”

মেঘলা চোখ নামিয়ে বলল,

“তুমি কি আমাকে ক্ষমা করেছ?”

অর্ক উত্তর দিল,

“আমি তোমাকে বিচার করার অধিকার নিজের কাছ থেকে সরিয়ে নিয়েছি।”

মেঘলা তার দিকে তাকাল।

“এটা কি ক্ষমা?”

“হয়তো।”

“আর তুমি?”

“আমি এখনও নিজের প্রতি কঠোর।”

মেঘলা হেসে বলল,

“সেটা বদলাও।”

অর্কও হাসল।

“শিখছি।”

অর্কের বয়স বাড়ছিল। চুল সাদা হয়ে গিয়েছিল, হাঁটার গতি ধীর হয়েছিল। কিন্তু তার চারপাশে মানুষের সংখ্যা বাড়ছিল।

কেউ তাকে গুরু বলত। সে বিরক্ত হতো।

“আমি গুরু নই।”

কেউ তাকে দার্শনিক বলত।

সে বলত,

“আমি শুধু অনেক ভুল করেছি এবং কিছু ভুল থেকে শিখেছি।”

কেউ বলত,

“আপনি আমাদের জীবন বদলে দিয়েছেন।”

অর্ক উত্তর দিত,

“আমি শুধু দরজা দেখিয়েছি। হাঁটতে হয়েছে তোমাকেই।”

একদিন এক তরুণ তাকে জিজ্ঞেস করল,

“জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা কী?”

অর্ক দীর্ঘক্ষণ চুপ থেকে বলল,

“তুমি সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না।”

তরুণ অপেক্ষা করল।

অর্ক বলল,

“কিন্তু নিজের সততা, শ্রম, মনোভাব এবং পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর কাজ করতে পারো।”

“সবচেয়ে বড় শক্তি?”

“নিজেকে হারিয়ে না ফেলা।”

“সবচেয়ে বড় ভয়?”

“নিজের জীবন অন্যের হাতে তুলে দেওয়া।”

“সবচেয়ে বড় স্বাধীনতা?”

“নিজের সিদ্ধান্তের দায়িত্ব নেওয়া।”

“সবচেয়ে বড় সাফল্য?”

অর্ক দূরের পাহাড়ের দিকে তাকাল।

“এমন মানুষ হওয়া, যার সঙ্গে একা থাকলেও নিজের কাছে লজ্জা লাগে না।”

অর্ক আর কখনো কালাচলে ওঠেনি।

মানুষ জিজ্ঞেস করত,

“আবার যাবেন না?”

সে বলত,

“প্রয়োজন নেই।”

“কেন?”

অর্ক পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসত।

“আমি যে পাহাড়ে উঠতে গিয়েছিলাম, সেটি এখন আমার ভেতরে।”

এক সন্ধ্যায় অর্ক বিদ্যালয়ের উঠোনে বসে ছিল।

আকাশে সূর্য অস্ত যাচ্ছিল। শিশুরা খেলছিল। একজন বৃদ্ধ বই পড়ছিলেন। এক তরুণ নিজের ব্যবসার পরিকল্পনা লিখছিল। এক নারী তার মেয়েকে পড়াচ্ছিল।

অর্ক চারপাশে তাকাল।

তার মনে হলো, জীবনের সবচেয়ে গভীর পরিবর্তন কখনো প্রচারের মাধ্যমে ঘটে না।

একজন মানুষ একটু বেশি সাহসী হলে, একজন বাবা সন্তানের কথা একটু বেশি মন দিয়ে শুনলে, একজন ব্যর্থ তরুণ আবার চেষ্টা করলে, একজন বিধবা নিজের জীবন নতুন করে গড়ে তুললে, কেউ নিজের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাইলে, একজন ক্ষমতাবান মানুষ দুর্বল মানুষের প্রতি একটু বেশি মানবিক হলে, সমাজের ভেতরে অদৃশ্য পরিবর্তন শুরু হয়।

এই ছোট ছোট পরিবর্তনগুলো মিলেই একদিন সমাজ বদলে দেয়।

অর্ক বুঝেছিল, চূড়ায় পাওয়া জ্ঞান তখনই সত্য হয়, যখন তা উপত্যকার মানুষের জীবনে কাজে লাগে।

মানুষ নিজের জীবনকে একটি সম্পূর্ণ ছবি মনে করতে ভালোবাসে।

সে বলে, আমি এমন। আমি সফল। আমি ব্যর্থ। আমি সুখী। আমি অসুখী। আমি এই পরিবারের মানুষ। আমি এই পেশার মানুষ। আমি এই পরিচয়ের মানুষ।

কিন্তু জীবন কোনো স্থির প্রতিকৃতি নয়।

এটি একটি চলমান ক্যানভাস।

আজকের রেখা আগামীকাল বদলে যেতে পারে। আজ যে ক্ষত অসহনীয় মনে হচ্ছে, আগামীকাল তার পাশে নতুন কোনো অর্থ জন্ম নিতে পারে। আজ যে ব্যর্থতা জীবনকে শেষ করে দিয়েছে বলে মনে হচ্ছে, বহু বছর পর ফিরে তাকিয়ে মানুষ বুঝতে পারে, সেখান থেকেই তার অন্য জীবনের শুরু।

অর্কের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল।

তার পতন তাকে শেষ করেনি। শূন্যতা তাকে গ্রাস করেনি। ভয় তাকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। অতীত তাকে বন্দী করে রাখতে পারেনি।

কারণ একদিন সে বুঝেছিল, মানুষ পরিস্থিতির সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রক নয়। কিন্তু পরিস্থিতির সঙ্গে নিজের সম্পর্ক পুনর্নির্মাণের ক্ষমতা তার আছে।

এই ক্ষমতাই স্বাধীনতা।

স্বাধীনতার সঙ্গে আসে দায়িত্ব। দায়িত্ব থেকে শৃঙ্খলা। শৃঙ্খলা থেকে সৃষ্টি। সৃষ্টি থেকে অর্থ।

আর সেই অর্থ যখন নিজের সীমানা অতিক্রম করে অন্য মানুষের জীবনে আলো ছড়ায়, তখন ব্যক্তিগত মুক্তি মানবিক পূর্ণতায় পৌঁছায়।

অর্ক শেষ জীবনে একটি বাক্য প্রায়ই বলত,

“মানুষের সবচেয়ে বড় জয় পৃথিবীকে জয় করা নয়। নিজের ভেতরের সেই জায়গাটিকে জয় করা, যেখানে ভয় তাকে বলে, তুমি পারবে না।”

একদিন তার এক ছাত্র জিজ্ঞেস করেছিল,

“স্যার, তাহলে কি ভয় একদিন পুরোপুরি চলে যায়?”

অর্ক মাথা নাড়ল।

“না।”

“তাহলে?”

“একদিন তুমি ভয়কে সঙ্গে নিয়ে হাঁটতে শিখবে।”

“দুঃখ?”

“সেটিও থাকবে।”

“ব্যর্থতা?”

“সেটিও আসবে।”

“তাহলে মুক্তি কোথায়?”

অর্ক হেসে বলেছিল,

“মুক্তি হলো এগুলো না থাকার মধ্যে নয়। এগুলো থাকা সত্ত্বেও নিজের পথ বেছে নিতে পারার মধ্যে।”

সন্ধ্যা নেমে আসছিল।

পাহাড়ের গায়ে শেষ আলো।

অর্ক দূরে তাকিয়ে রইল।

কালাচল আগের মতোই দাঁড়িয়ে আছে। তার চূড়ায় আবার তুষার পড়বে, ঝড় আসবে, কুয়াশা নামবে, সূর্য উঠবে। কেউ পাহাড়ে উঠবে, কেউ মাঝপথে ফিরে আসবে, কেউ চূড়ায় পৌঁছাবে।

কিন্তু পাহাড় কাউকে বিজয়ী ঘোষণা করবে না।

কারণ পাহাড়ের কোনো বিচার নেই।

বিচার মানুষ নিজেই করে, নিজের কাছে, নিজের জীবনের সামনে, নিজের বিবেকের সামনে।

অর্ক ধীরে উঠে দাঁড়াল।

তার সামনে অন্ধকার পথ।

কিন্তু সে আর অন্ধকারকে ভয় পেল না।

কারণ সে জানত, আলো সবসময় সামনে থাকে না। কখনো আলো মানুষের ভেতরেই জন্ম নেয়।

যে মানুষ নিজের ভেতরে একটি ছোট আলো জ্বালাতে পারে, সে হয়তো পুরো পৃথিবীকে আলোকিত করতে পারবে না। কিন্তু তার পাশে দাঁড়ানো একজন মানুষের জন্য রাতটি একটু কম অন্ধকার হয়ে উঠতে পারে।

মানুষের ইতিহাসে সব বিপ্লব বড় শব্দে শুরু হয় না।

কিছু বিপ্লব শুরু হয় একটি নীরব সিদ্ধান্ত দিয়ে।

আজ আমি আবার চেষ্টা করব।

আজ আমি নিজের ভুল স্বীকার করব।

আজ আমি কাউকে ক্ষমা করব।

আজ আমি নিজের ওপর বিশ্বাস রাখব।

আজ আমি ভয় পেয়েও এগোব।

আজ আমি আমার যন্ত্রণাকে অর্থহীন হতে দেব না।

আজ আমি নিজের জীবনের ক্যানভাসে নতুন একটি রেখা আঁকব।

অর্ক সেই রেখাটি বহু বছর আগে এঁকেছিল।

তারপর একের পর এক রেখা।

কখনো কাঁপা হাতে, কখনো অশ্রুসিক্ত চোখে, কখনো একা, কখনো মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে।

ছবিটি কখনো সম্পূর্ণ হয়নি। হয়তো কোনোদিন হবে না।

কারণ মানুষ যতদিন বেঁচে থাকে, তার ক্যানভাস ততদিন অসমাপ্ত থাকে।

আর অসমাপ্ত থাকার মধ্যেই জীবনের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা।

শেষ হয়ে যাওয়া ছবির আর কোনো ভবিষ্যৎ নেই। কিন্তু অসমাপ্ত ছবির সামনে এখনও শিল্পীর হাত খোলা থাকে।

মহাকালের সেই বিশাল ক্যানভাসে অর্কের জীবনও একটি ক্ষুদ্র রেখা।

কিন্তু সেই রেখা তাকে একটি সত্য শিখিয়েছিল।

মানুষ তার সবকিছু বেছে নিতে পারে না।

সে নিজের জন্ম বেছে নিতে পারে না। সব হারানো ঠেকাতে পারে না। সব মানুষকে ধরে রাখতে পারে না। সব অন্যায় থামাতে পারে না। সব স্বপ্ন পূরণ করতে পারে না।

তবু সে তার পরবর্তী পদক্ষেপ বেছে নিতে পারে।

সেখানেই তার মর্যাদা।

সেখানেই তার স্বাধীনতা।

সেখানেই তার সৃষ্টিশক্তি।

আর সেখানেই তার অস্তিত্বের পরম অন্বেষণ।

অর্ক পাহাড়ের দিকে শেষবার তাকাল।

তারপর মানুষের দিকে ফিরে হাঁটল।

পাহাড় পেছনে রইল।

কিন্তু কালাচল আর পেছনে ছিল না।

কারণ যে পাহাড় একদিন তাকে ভয় দেখিয়েছিল, সেটিই এখন তার চেতনার ভেতরে এক নীরব প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

একটি স্মৃতি।

একটি শিক্ষা।

একটি আয়না।

একটি অসমাপ্ত প্রশ্ন।

আর একটি উত্তর।

মানুষ ভেঙে যেতে পারে।

কিন্তু ভাঙনের পর সে কী হয়ে উঠবে, সেই গল্পটি এখনও লেখা হয়নি।

কলমটি তার নিজের হাতে।

সাহিত্য-সংস্কৃতি এর আরও খবর

img

পিলারে বাঁধা আলো

প্রকাশিত :  ১৮:৫৫, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৯:৩২, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ

উজিরপুরের পশ্চিম বামরাইল গ্রামকে দূর থেকে দেখলে আর দশটা গ্রামের সঙ্গে আলাদা করা যায় না। কয়েকটি পাকা বাড়ি, বেশির ভাগই টিনের চালা। পুকুরপাড়ে কলাগাছের ঝাড়, সীমানা ধরে সুপারিগাছের সরু সারি। বর্ষায় উঠোনের মাটি নরম হয়ে এলে সেখানে মানুষের পায়ের ছাপ পড়ে থাকে অনেকক্ষণ।

তবু প্রতিটি গ্রামেই দু-একটি বাড়ি থাকে, যার দরজার সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় মানুষ অকারণেই পা ধীর করে ফেলে। শিকদারদের বাড়িটি ছিল তেমনই।

সামনে বড় উঠোন। এক পাশে পুরোনো আমগাছ, অন্য পাশে নারিকেলগাছের সারি। গাছগুলো এত উঁচু যে ঝড়ের দিনে মনে হতো, পাতারা আকাশের সঙ্গে কথা বলছে। পেছনে পুকুর, তার উত্তর পাড়ে বাঁশঝাড়। বর্ষায় সেখানে ব্যাঙ ডাকত, শীতের ভোরে বাঁশের মাথায় কুয়াশা এসে জমে থাকত।

অনিকের বাবা ছিলেন গ্রামের পুরোনো পরিবারের মানুষ। ধনী নন, অভাবীও নন। তাঁর সবচেয়ে বড় সম্পদ ছিল মানুষের বিশ্বাস। কারও অসুখ হলে ডাক্তার আনতে নিজের সাইকেলটি এগিয়ে দিতেন। কারও মেয়ের বিয়েতে টাকার টান পড়লে চুপচাপ কিছু টাকা রেখে আসতেন। শহরে চাকরির পরীক্ষা দিতে যাওয়া কোনো ছেলের ভাড়া না থাকলে সেটাও মিটিয়ে দিতেন নিজের পকেট থেকে।

প্রায়ই বলতেন, “মানুষের ঘরে টাকা না থাকতেই পারে। কিন্তু দরজা যেন বন্ধ না হয়।”

ছোট অনিক কথাটার মানে বুঝত না। দরজা তো কাঠের জিনিস, ভাবত সে। বন্ধ না করলে ভেতরে শুধু বাতাস ঢোকে। বড় হয়ে সে বুঝেছিল, বাবা কাঠের দরজার কথা বলেননি, বলেছিলেন মনের দরজার কথা।

সে বাড়িতে সন্ধ্যা নামলেই কেরোসিনের বাতি জ্বলত। পরে গ্রামে বিদ্যুৎ এল, কিন্তু পুরোনো বাতিটি ফেলা হলো না।

“বিদ্যুৎ চলে গেলে এটা জ্বালাবি,” বাবা বলতেন।

অনিক হেসে জিজ্ঞেস করত, “এখন আর কেরোসিনের বাতি দিয়ে কী হবে?”

“আলো কখনো পুরোনো হয় না।”

কথাটা অনিকের মনে পড়েছিল বহু বছর পর, যেদিন সে নিজেকে একটি লোহার পিলারের সঙ্গে বাঁধা অবস্থায় আবিষ্কার করল। সেদিনও তার মনে হয়েছিল, পৃথিবীর কোথাও হয়তো একটি আলো এখনো জ্বলছে। কোথায়, তা সে জানত না। পরে বুঝেছিল, আলোটি ছিল তার নিজেরই ঘরে, তার মেয়ের চোখে।

ছোটবেলায় অনিক ছিল ভালো ছাত্র। স্কুলের শিক্ষকেরা তার বাবাকে বলতেন, “ছেলেটাকে পড়ান, অনেক দূর যাবে।” বাবা গর্ব দেখাতেন না। মাথা নিচু করে শুধু বলতেন, “আল্লাহ ভরসা।”

মা ছেলের বইয়ের মলাটে খবরের কাগজ জড়িয়ে দিতেন। নতুন বই কেনার সামর্থ্য সব সময় হতো না, তাই পুরোনো বইয়ের পাতায় থাকত অন্য কোনো ছাত্রের নাম। অনিক সেই নামের ওপরেই যত্ন করে নিজের নাম লিখত।

তার স্বপ্ন ছিল শহরে গিয়ে পড়াশোনা করার। কিন্তু গ্রামের ছেলেদের স্বপ্নেরও একটা সংসার থাকে। বাবা অসুস্থ হলে সেই সংসার এসে চাপল তার কাঁধে।

শুরুতে অসুখটাকে তেমন গুরুতর মনে হয়নি। স্থানীয় ডাক্তার দেখানো হলো, ওষুধ চলল, কয়েক দিনের মধ্যে বাবা কিছুটা সুস্থও হলেন। তারপর আবার অসুখ, আবার পরীক্ষা, তার পরে আরেক পরীক্ষা। একসময় অনিক বুঝল, রোগের চেয়ে বড় সমস্যা রোগের খরচ।

হাসপাতালের করিডরে দাঁড়িয়ে সে প্রথমবার টের পেয়েছিল, টাকা যেন মানুষের কষ্ট মাপার এক অদৃশ্য যন্ত্র। ডাক্তারের কক্ষে ঢোকার আগে টাকা লাগে, পরীক্ষার আগে লাগে, ওষুধের আগে লাগে। অ্যাম্বুলেন্সে টাকা, বিছানায় টাকা, বাড়ি ফেরার পরেও টাকা।

এক রাতে বাবা বললেন, “তুই আর এত দৌড়াস না।”

“আপনি ভালো হয়ে যান, তারপর থামব।”

বাবা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, “সবাইকে বাঁচাতে হয় না, বাবা।”

“আপনাকে আমার বাঁচাতেই হবে,” অনিক উত্তর দিল।

বাবা আর কিছু বললেন না।

সে রাতে অনিক হাসপাতালের বারান্দায় বসে ছিল। দূরে মেঝেতে ঘুমিয়ে ছিল কোনো রোগীর স্বজন। একজন নার্স দ্রুত পায়ে হেঁটে গেলেন। জানালার কাচে শহরের আলো কাঁপছিল। অনিক মোবাইল বের করে হিসাব কষল। হাতে যা টাকা আছে, তাতে আর দুই দিনের ওষুধও হবে না।

তখনই সে প্রথমবার নিজের জমির কথা ভাবল।

জমি বিক্রির দিন মানুষ টের পায়, মাটি আসলে কতটা ভারী।

বাবা নিজের হাতে যে জমিগুলো কিনেছিলেন, তার প্রতিটির সঙ্গে জড়িয়ে ছিল একটি করে গল্প। কোনোটিতে ধান হতো, কোনোটিতে পাট, কোনোটিতে শীতের সবজি। ছোটবেলায় বর্ষার দিনে অনিক সেই জমিতে দাঁড়িয়ে কাদায় পা ডুবিয়ে রাখত।

এখন সেই জমির কাগজে একে একে উঠতে লাগল অন্য মানুষের নাম। প্রথম জমিটি গেল চিকিৎসার খরচে, দ্বিতীয়টি আগের ঋণ শোধ করতে, তৃতীয়টির টাকা গেল হাসপাতালের বকেয়া মেটাতে। জমির পর গেল গয়না, গয়নার পর সঞ্চয়। তারপর শুরু হলো ধার, আর ধারের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের কাছে মাথা নিচু করা।

একদিন বাড়ি ফিরে অনিক দেখল, মা চুপচাপ একটি ছোট বাক্স খুলে বসে আছেন। ভেতরে দুটি কানের দুল।

“এগুলো রেখে আর কী হবে?” মা বললেন।

“থাক মা, রাখেন।”

“তোর বাবার ওষুধ লাগবে।”

অনিক চুপ করে রইল। মা দুল দুটি তার হাতে তুলে দিয়ে বললেন, “নিয়ে যা।”

দুল হাতে সে বাইরে বেরিয়ে এল। উঠোনে দাঁড়িয়ে তার মনে হলো, সে শুধু মায়ের কাছ থেকে সোনা নিচ্ছে না, এই পরিবারের শেষ উজ্জ্বলতাটুকুও কেড়ে নিয়ে যাচ্ছে।

বাবার চিকিৎসা চলল, কিন্তু রোগ থামল না। ধীরে ধীরে বাড়িতে লোকের আসা কমে গেল। যাঁরা আগে সন্ধ্যায় এসে বসতেন, তাঁরা আর এলেন না। কারও হয়তো সময় ছিল না, কারও ছিল অস্বস্তি। কেউ হয়তো ভাবতেন, ও বাড়িতে গেলে টাকা ধার চেয়ে বসবে।

অথচ অনিক কারও কাছে টাকা চাইত না। সে শুধু চাইত, কেউ তার পাশে পাঁচ মিনিট বসুক, কেউ বলুক, “ভয় পেয়ো না।”

দারিদ্র্য যাদের ছোঁয়, অনেক সময় তাদের বন্ধুত্বও দরিদ্র হয়ে যায়।

একদিন বিছানায় শুয়ে বাবা জিজ্ঞেস করলেন, “তুই ক্লান্ত?”

“না।”

“মিথ্যা বলিস না।”

অনিক হাসল। “আপনি সুস্থ হয়ে উঠলেই আমি বিশ্রাম নেব।”

বাবা জানালার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমার জন্য নিজেকে শেষ করে দিস না।”

এবার অনিক রেগে উঠল। “আপনি এসব কথা বলবেন না।”

“কেন?”

“কারণ আপনি আমার বাবা।”

বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “এটাই তোর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।”

অনিক তখন কথাটার মানে বোঝেনি। বুঝেছিল বহু বছর পরে। মানুষ প্রিয়জনকে হারানোর ভয়ে কাতর হলে নিজের জীবনটাকেই সবচেয়ে সহজে বন্ধক রেখে দেয়।

তারপর একদিন বাবার শরীর আরও খারাপ হলো। হাসপাতালের বিছানায় অনিকের হাত ধরে তিনি বললেন, “তোর মেয়েটাকে দেখিস।”

“আপনি নিজেই দেখবেন।”

বাবা মৃদু হাসলেন। “সবাই সব সময় থাকে না।”

কথাটা অনিকের ভেতরে কোথাও গিয়ে আটকে রইল।

কিছুদিন পর বাবা আর কথা বলতে পারলেন না। তারপর একদিন চলেই গেলেন। বাড়িতে মানুষের ভিড় জমল। এই উঠোনেই একসময় বাবা বসে মানুষের সমস্যা শুনতেন, আজ সেই মানুষেরাই নীরবে এসে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ কোরআন পড়ল, কেউ কাঁদল, কেউ সান্ত্বনা দিল। তারপর একে একে সবাই ফিরে গেল।

রাতে উঠোন ফাঁকা হয়ে গেল। অনিক একা বসে রইল। তার মনে হচ্ছিল, বাড়ির দেয়ালগুলোও যেন একটু সরে গেছে। মা সেদিন থেকে প্রায় কথা বলা ছেড়ে দিলেন, শুধু বাতিটির দিকে তাকিয়ে থাকতেন।

অনিক বুঝল, মৃত্যু অনেক সময় কষ্টের শেষ নয়। যে যায় সে চলে যায়, আর কষ্টের ভারটুকু রেখে যায় বাকিদের জন্য।

বাড়িতে ঋণ ছিল, চিকিৎসার ধার ছিল। জমি আর ছিল না, সঞ্চয়ও না। বাবার পুরোনো পরিচয় তখনো ছিল, কিন্তু সেই পরিচয় দেখিয়ে বাজার থেকে এক কেজি চালও আনা যায় না।

স্ত্রী জান্নাতুল প্রাণপণে সংসার সামলানোর চেষ্টা করছিলেন। তাঁদের বড় মেয়ে তুবার বয়স তখন নয়। ছোট ছেলেটি একেবারেই শিশু। তুবা সারাক্ষণ বাবার পিছু পিছু ঘুরত।

“বাবা, তুমি কোথায় যাবে?”

“বাজারে।”

“আমাকেও নেবে?”

“আজ না।”

“কেন?”

“তুমি আগে পড়া শেষ করো।”

তুবা মুখ ফুলিয়ে বলত, “তুমি খালি পড়ার কথা বলো।”

অনিক হেসে বলত, “তুই পড়লে আমার কাজ কমবে।”

“কীভাবে?”

“তুই বড় হয়ে ডাক্তার হবি।”

“আমি ডাক্তার হব না।”

“তাহলে কী হবি?”

তুবা একটু ভেবে বলত, “আমি তোমার সঙ্গে থাকব।”

অনিক হাসত। সে জানত না, একদিন এই ছোট্ট মেয়েটিই তাকে আবার বাঁচার কারণ এনে দেবে।

মানুষ একদিনে নষ্ট হয়ে যায় না। প্রথমে সে ক্লান্ত হয়, তারপর একা হয়ে পড়ে। তারপর আসে লজ্জা, কারও কাছে যেতে ভয় হয়। শেষে সে নিজের কাছ থেকেও পালাতে শুরু করে।

অনিকও পালাতে চেয়েছিল। বাজারে কিছু মানুষের সঙ্গে তার পরিচয় হলো। তারা বেশি প্রশ্ন করত না, শুধু বলত, “চিন্তা করিস না।” তখনকার অনিকের কাছে এই একটি বাক্যেরই অনেক দাম ছিল। সে চেয়েছিল, কেউ একজন বলুক, সব ঠিক হয়ে যাবে।

কিন্তু কিছুই ঠিক হয়নি।

নেশা প্রথমে তাকে কয়েক ঘণ্টার জন্য নিজের জীবন ভুলিয়ে দিত। সেই কয়েক ঘণ্টা বাবার মৃত্যুর কথা মনে থাকত না, ঋণের কথা না, স্ত্রীর চোখের জলের কথাও না। মনে পড়ত না তুবার স্কুলের খরচের কথা। কিন্তু নেশা কেবল সময় ধার দেয়। দাম নেয় পরে, এবং অনেক বেশি করে।

কখন যে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে, অনিক টের পায়নি। যারা তাকে নেশা জোগাত, তারা ততদিনে তার দুর্বলতা চিনে ফেলেছে। ক্ষুধার্ত মানুষকে খাবার দিলে সে কৃতজ্ঞ হয়, আর ভাঙা মানুষকে নেশা দিলে সে আরও সহজে বশ মানে, এ কথা তারা ভালোই জানত। অনিক ধীরে ধীরে তাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠল। ইচ্ছাশক্তি কমে গেল, লজ্জা বাড়ল, ঘর থেকে দূরত্বও বাড়ল।

একদিন তুবা বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “বাবা, তুমি কি অসুস্থ?”

“না।”

“তাহলে তোমার চোখ লাল কেন?”

অনিক উত্তর দিতে পারেনি।

জান্নাতুল অনেক কিছুই বুঝতেন, কিন্তু সব কথা মুখে বলা যায় না। একদিন তিনি বললেন, “তুমি যদি এভাবেই চলতে থাকো, বাচ্চাদের কী হবে?”

অনিক চুপ করে রইল।

“আমি তোমাকে ঘৃণা করি না।”

অনিক তাকাল।

“আমি ভয় পাই।”

“কীসের ভয়?”

“একদিন তুমি আর ফিরে আসবে না।”

জানালার দিকে তাকিয়ে অনিক বলল, “আমি নিজেও জানি না কোথায় যাচ্ছি।”

জান্নাতুল আর কিছু বললেন না।

সে রাতে তুবা এসে বাবার পাশে ঘুমাল। অনিক মেয়ের চুলে হাত রাখল। তার মনে হলো, পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো মানুষটি তারই পাশে শুয়ে আছে। অথচ এই শিশুর ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় ভয় হয়ে উঠছে সে নিজেই। সারা রাত তার ঘুম এল না।

ভোরে বাইরে বেরিয়ে দেখল, আকাশ ধূসর। পাখি ডাকছে, দূর থেকে আজানের সুর ভেসে আসছে। এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো, সে বদলে যাবে। কিন্তু দুপুর গড়াতে না গড়াতেই সেই সংকল্প ভেঙে পড়ল।

অন্ধকারের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কটা অনেকটা নদীর মতো। একবার গভীরে নামলে আর পাড় দেখা যায় না।

রাত নামলে বামরাইল বাজারের চেহারা বদলে যায়।

দিনের বেলা দোকানের সামনে ভিড়। চায়ের দোকানে আড্ডা জমে, সবজির ঝুড়ি সাজানো থাকে, রিকশা আর ভ্যানের হর্নে কথাবার্তা চাপা পড়ে। রাতে সবকিছু ধীরে ধীরে থেমে আসে। কিছু দোকানের ঝাঁপ পড়ে, কিছু আলো জ্বলে থাকে। কুকুর ঘোরে, নৈশপ্রহরীরা টহল দেয়, দূরের কোনো দোকান থেকে ভেসে আসে টেলিভিশনের শব্দ।

সেই রাতটিও ছিল ঠিক এমনই। কেউ জানত না, কয়েক ঘণ্টা পরে এই বাজারের একটি খুঁটি একজন মানুষের জীবনের সবচেয়ে লজ্জার স্মৃতি হয়ে দাঁড়াবে।

অনিক সেখানে কী করতে গিয়েছিল, সে বিষয়ে স্থানীয়দের বর্ণনায় নানা রকম কথা পাওয়া যায়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, চুরির চেষ্টার অভিযোগে তাকে আটকে রাখা হয়েছিল।

কিন্তু কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠা আর আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক কথা নয়। সেই রাতের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক ছিল, এই পার্থক্যটুকু কেউ মনে রাখেনি।

লোকজন তাকে ঘিরে ধরল। কেউ চিৎকার করে উঠল, “চোর!” আরেকজন বলল, “বেঁধে রাখ।” কোথা থেকে একটি দড়ি এল, আর সামনেই ছিল একটি খুঁটি। ক্রুদ্ধ মানুষের জন্য এটুকুই যথেষ্ট।

দড়ি বাঁধার সময় অনিক প্রথমে কিছু বলেনি। তার মাথা ঝিমঝিম করছিল। কেউ গালাগাল করল, কেউ ধাক্কা দিল, কেউ শাসিয়ে বলল, “কাল পুলিশে দেব।”

“একবার বাড়িতে ফোন করতে দেন,” অনিক বলল।

কেউ শুনল না। তার হাত শক্ত করে বেঁধে দেওয়া হলো।

পিলারটি ছিল বরফের মতো ঠান্ডা। পিঠ ঠেকতেই অনিকের সারা শরীর কেঁপে উঠল। সে আকাশের দিকে তাকাল। চাঁদ নেই, শুধু অন্ধকার।

কিছুক্ষণের মধ্যেই বাজার প্রায় ফাঁকা হয়ে গেল, তবু চারপাশে অদৃশ্য কিছু চোখ যেন রয়ে গেল। প্রথমে অনিকের মনে হলো, মানুষ তাকে দেখছে। তারপর বুঝল, মানুষ নয়, তার অতীত তাকে দেখছে। বাবা দেখছেন, মা দেখছেন, স্ত্রী দেখছেন। সবার শেষে দেখছে তুবা, তার নয় বছরের মেয়ে।

সে চোখ বন্ধ করল। যেন কানে এল তুবার গলা, “বাবা, তুমি কি সত্যিই চোর?”

চমকে চোখ খুলে সে বলে উঠল, “না।”

কেউ শুনল না। সে আবার বলল, “আমি চোর নই।”

রাতের বাজারে তার কণ্ঠ মিলিয়ে গেল।

রাত বারোটার পর সময় অন্যরকম হয়ে যায়। ঘড়ির কাঁটা এগোয়, অথচ মনে হয় পৃথিবী দাঁড়িয়ে আছে।

অনিকের শরীর ব্যথায় টনটন করছিল। তেষ্টা পেয়েছিল, ক্ষুধাও। কিন্তু সবচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছিল লজ্জায়। একসময় সে ভাবল, বাবা বেঁচে থাকলে কী হতো। বাবা কি তাকে এই অবস্থায় দেখতে পারতেন? নিজেই উত্তর দিল, না, পারতেন না। হয়তো বলতেন, “মানুষকে বিচার করার আগে তার দিকে তাকাস।”

অনিকের চোখে জল এল, কিন্তু কেউ দেখল না।

একটি কুকুর এসে পিলারের কাছে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে চলে গেল। অনিক হঠাৎ হেসে ফেলল। হাসিটা ছিল নিজেরই বিরুদ্ধে। একটা কুকুরও আজ তাকে মানুষ বলে চিনল না।

রাত আরও গভীর হলো। দূরের কোনো মসজিদ থেকে তাহাজ্জুদের সুর ভেসে এল। অনিক মাথা নিচু করে মনে মনে বলল, “আল্লাহ, আমি অনেক ভুল করেছি।”

অনেকক্ষণ থেমে থেকে যোগ করল, “কিন্তু আমার মেয়েটাকে তুমি রক্ষা করো।”

ওদিকে জান্নাতুল সারা রাত জেগে বসে ছিলেন। ভোরে ঘুম থেকে উঠেই তুবা বাবাকে খুঁজল।

“মা, বাবা কোথায়?”

জান্নাতুল চুপ করে রইলেন।

“মা?”

“বাজারে গেছে।”

“এত সকালে?”

এবারও মা কিছু বললেন না। তখন পাড়ার একটি ছেলে এসে দরজায় দাঁড়াল। তার মুখে অস্বস্তি।

“তুবা...”

“কী?”

“তোর বাবা বাজারে আছে।”

“কেন?”

ছেলেটি নিচু গলায় বলল, “লোকজন ধরে রেখেছে।”

“কেন ধরে রেখেছে?”

“চুরির কথা বলছে।”

তুবা স্থির হয়ে গেল। তারপর বলল, “আমার বাবা চোর না।”

ছেলেটি কিছু বলল না।

তুবা ঘরে গিয়ে একটি ছোট কাপড়ের ব্যাগ খুলল। ভেতরে কিছু টাকা ছিল। টাকাগুলো গুনে নিয়ে সে পাশের দোকান থেকে পাউরুটি আর চা কিনে আনল। জান্নাতুল তাকে থামাতে চাইলেন।

“তুই কোথায় যাবি?”

“বাবার কাছে।”

“একা যাবি না।”

“আমি যাব, মা।”

“তুবা...”

মেয়েটি মায়ের দিকে তাকাল। তার চোখে ভয় ছিল না, ছিল শুধু এক অটল বিশ্বাস।

“বাবা না খেয়ে আছে।”

জান্নাতুল আর বাধা দিলেন না।

তুবা দ্রুত পায়ে হাঁটছিল। এক হাতে পাউরুটির প্যাকেট, অন্য হাতে চায়ের কাপ। রাস্তায় কাদা জমে ছিল। এক জায়গায় তার পা পিছলে গেল, কাপ থেকে কিছুটা চা চলকে পড়ল। সে একবার কাপের দিকে তাকাল, তারপর আবার হাঁটতে লাগল। সেই মুহূর্তে বাবার জন্য নিয়ে যাওয়া ওই চায়ের চেয়ে দামি আর কিছুই ছিল না তার কাছে।

বাজারের কাছে আসতেই ভিড় চোখে পড়ল। তুবা একটু থমকে দাঁড়াল। বুকের ভেতর ধড়ফড় করছিল। তারপর সে ভিড়ের ভেতর ঢুকে পড়ল। কেউ তাকে চিনতে পেরে বলে উঠল, “ওই তো অনিকের মেয়ে।” মানুষ সরে গিয়ে পথ করে দিল।

তারপর সে দেখল। পিলার। দড়ি। বাবা।

কয়েক সেকেন্ড সে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ছুটে গেল।

“বাবা!”

অনিক মাথা তুলল। প্রথমে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না। “তুই এখানে কেন?”

কাঁদতে কাঁদতে তুবা বলল, “তুমি তো কিছু খাওনি।”

অনিক মুখ ঘুরিয়ে নিল। সে চায়নি, মেয়ে তার চোখের জল দেখুক।

তুবা পাউরুটির প্যাকেট খুলল। এক টুকরো ছিঁড়ে বাবার মুখের কাছে ধরে বলল, “খাও।”

“তুই খা।”

“আমি খেয়েছি।”

“মিথ্যা বলিস না।”

“সত্যি বলছি।”

তুবা আবার রুটির টুকরোটি এগিয়ে দিল। “খাও না, বাবা।”

এবার অনিক মুখ খুলল। ছোট্ট টুকরোটি তার মুখে গেল। তারপর তুবা চায়ের কাপ তুলে ধরল।

“গরম আছে,” অনিক বলল। “তুই সাবধানে ধর।”

“আমি পারব।”

চায়ের দিকে তাকিয়ে অনিক কাঁদতে শুরু করল। সেই কান্নায় ছিল লজ্জা, ছিল ক্ষুধা, ছিল পরাজয়। কিন্তু সবচেয়ে বেশি ছিল একজন বাবার কাছে তার মেয়ের ফিরে আসা।

ভিড়ের মধ্যে দাঁড়ানো এক তরুণ মোবাইল বের করে দৃশ্যটি ধারণ করল। তখন কেউ ভাবেনি, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ওই ছোট্ট ভিডিও অগণিত মানুষের সামনে পৌঁছে যাবে।

দৃশ্যটির দিকে তাকিয়ে ভিড়ের অনেকেই হঠাৎ কেমন অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। কেউ চোখ নামিয়ে নিল, কেউ পিছিয়ে দাঁড়াল। একজন এগিয়ে এসে অনিকের হাতের দড়ি খুলে দিল। কারও মুখে কোনো কথা ছিল না। পুলিশ পৌঁছানোর আগেই মানুষ অনিককে ছেড়ে দিল।

ভিডিওতে কোনো বড় ভাষণ ছিল না, রাজনৈতিক বক্তব্য ছিল না, ছিল না নাটকীয় সংগীতও। ছিল শুধু একটি শিশু, একজন বাঁধা বাবা, একটুকরো পাউরুটি, এক কাপ চা আর চারপাশের মানুষের ভিড়।

ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ল। মানুষ দেখল, আর মন্তব্য লিখতে শুরু করল। কেউ লিখল, “এটা কীভাবে সম্ভব?” কেউ লিখল, “একটা শিশুর সামনে একজন মানুষকে এভাবে রাখা হলো কেন?” কেউ বলল, “অভিযোগ সত্য হলেও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া যায় না।” আবার কেউ অনিকের অতীত নিয়ে নানা কথা বলতে লাগল।

ডিজিটাল দুনিয়ার সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, সেখানে একজন মানুষের জীবনের বিচার হয়ে যায় কয়েক মিনিটেই। কেউ তার শৈশব জানে না, বাবার অসুখের কথা জানে না, জানে না তার ঘরে কত রাত ভাত জোটেনি। কেউ জানে না, তার মেয়ের নাম তুবা। তবু মতামত দিতে সবাই প্রস্তুত।

অনিক তখনো জানত না, তার জীবনের সবচেয়ে অপমানের রাতটিই তাকে আবার মানুষের সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।

পরদিন সকাল থেকে সাংবাদিকেরা খোঁজখবর নিতে শুরু করলেন। কেউ গেলেন বাজারে, কেউ অনিকের বাড়িতে, কেউ কথা বললেন পুলিশের সঙ্গে, কেউ স্থানীয় মানুষের সঙ্গে।

প্রতিবেদনগুলোতে ঘটনার বিবরণ একরকম হলো না। কোথাও অনিকের নাম এল অনিক সরদার, কোথাও অনিক হাওলাদার। ঘটনাস্থল, সময় আর কিছু পারিবারিক তথ্যেও অমিল দেখা গেল। তবু প্রায় সবখানে একটি ছবি ছিল অভিন্ন: একজন বাবা, একটি শিশু, একটি পিলার, এক কাপ চা। আর ছিল এমন এক সমাজ, যে মাঝে মাঝে মানুষের অপরাধের আগে তার দুর্বলতাকে দেখতে পায় না।

উজিরপুর থানায়ও খবর পৌঁছেছিল। পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু পৌঁছানোর আগেই স্থানীয়রা অনিককে ছেড়ে দিয়েছিল। বিষয়টি অনুসন্ধান করা হবে বলেও জানানো হয়।

পুলিশ কর্মকর্তা ফারুক হোসেন এ নিয়ে কথা বলেছিলেন। তাঁর কাছে এটি শুধু একটি ভাইরাল ভিডিও ছিল না, এর ভেতরে ছিল আইনের প্রশ্নও। একজন মানুষ অপরাধ করেছে কি না, তা ঠিক করার অধিকার কার? রাস্তার মানুষের? বাজারের? নাকি আইনের?

প্রশ্নগুলো কাগজে লেখা সহজ। কিন্তু গ্রামের বাস্তবতা এত সরল নয়। সেখানে সবাই সবাইকে চেনে। আজ যাকে চোর বলা হচ্ছে, কাল তার কাছ থেকেই হয়তো কেউ টাকা ধার নেবে। আজ যে লোক দড়ি ধরে দাঁড়িয়েছে, কাল তার নিজের ছেলেই হয়তো বিপদে পড়বে। মানুষের বিচার হয় দ্রুত, আইনের বিচারে সময় লাগে। আর সেই সময়টুকুতেই অনেক সময় একজন মানুষের জীবন বদলে যায়।

সেদিন তুবাদের বাড়িতে অনেক মানুষ এসেছিল। কেউ সাংবাদিক, কেউ স্বেচ্ছাসেবক, কেউ কৌতূহলী, কেউ এসেছিল সাহায্য করতে। জান্নাতুল সবাইকে চা দিতে চাইছিলেন। একজন বললেন, “আপনি বসুন।”

“মানুষ এসেছে, কিছু না দিলে কেমন দেখায়?”

দরিদ্র মানুষের আত্মসম্মান এমনই অদ্ভুত। ঘরে খাবার কম থাকতে পারে, কিন্তু অতিথির সামনে খালি হাতে দাঁড়াতে তার লজ্জা করে।

একজন স্বেচ্ছাসেবক তুবার পাশে বসে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কী চাও?”

“কিছু না।”

“খেলনা?”

“না।”

“নতুন জামা?”

“না।”

“স্কুলের বই?”

তুবা একটু চুপ করে থেকে বলল, “বাবার একটা কাজ লাগবে।”

লোকটি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। “কী কাজ?”

“যে কাজ করলে কেউ বাবাকে আর চোর বলবে না।”

ঘরের ভেতর কয়েক মুহূর্ত কোনো শব্দ হলো না। জান্নাতুল মুখ ফিরিয়ে নিলেন, তাঁর চোখ ভিজে উঠেছে। তুবা বুঝতেই পারল না, সে এমন কী বলেছে যে সবাই হঠাৎ চুপ হয়ে গেল।

সেদিন রাতে অনিকের ঘুম এল না। জান্নাতুল জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি বদলাতে চাও?”

“চাই।”

“সত্যি?”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে শুরু করো।”

“কীভাবে?”

“আজ থেকেই।”

অনিক মাথা নিচু করল। “আমি জানি না, পারব কি না।”

“তুমি একা পারবে না,” জান্নাতুল বললেন। “কিন্তু চেষ্টা না করলে কেউ তোমাকে টেনে তুলতে পারবে না।”

অনেকক্ষণ চুপ থেকে অনিক বলল, “আমি তুবার চোখের দিকে তাকাতে পারছিলাম না।”

“কেন?”

“কারণ ও আমাকে এখনো ভালো মানুষ ভাবে।”

“তুমি এখনো ওর বাবা।”

“সেটাই তো ভয়ের।”

জান্নাতুল স্বামীর দিকে তাকালেন। “বাবা হওয়া মানে শুধু ভালো সময়ের মানুষ হওয়া নয়। এবার তোমাকে ওর জন্য ভালো হতে হবে।”

সে রাতেই অনিক ঠিক করল, নেশা ছাড়ার চেষ্টা করবে। পথটা কতটা কঠিন হবে, তা সে জানত না। শুধু এটুকু বুঝেছিল, পিলারে বাঁধা থাকার রাতটি তাকে একটা শিক্ষা দিয়ে গেছে। মানুষ একেবারে তলানিতে নেমে গেলেও তার সামনে অন্তত একটি পথ খোলা থাকে। উপরে ওঠার পথ।

ভিডিওটি একসময় WAB Foundation-এর নজরে আসে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে ঘটনাটি অনুসন্ধানের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে যোগাযোগ করা হয়, এবং পরে অনিকের পরিবারকে সহায়তা করার উদ্যোগের কথা প্রকাশ্যে আসে।

একদল মানুষ যেদিন অনিকের বাড়িতে এলেন, তুবা তাঁদের দিকে চুপ করে তাকিয়ে ছিল। একজন তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার বাবার জন্য কী করা যায়?”

“কাজ।”

“আর তোমার জন্য?”

“আমি পড়ব।”

“কী পড়বে?”

“সব।”

লোকটি হেসে ফেললেন। “সব কি পড়া যায়?”

“আমি চেষ্টা করব,” তুবা বলল।

তারপর সে বাবার দিকে তাকাল। অনিক মাথা নিচু করে বসে আছে। একজন স্বেচ্ছাসেবক তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কী করতে চান?”

কিছুক্ষণ নীরব থেকে অনিক বলল, “অটোভ্যান চালাতে পারলে ভালো হয়।”

“কেন?”

“নিজে আয় করতে পারব।”

“আর?”

“কারও কাছে হাত পাততে হবে না।”

শেষ কথাটা বলতে গিয়ে তার গলা কেঁপে গেল।

একটি অটোভ্যানের দাম দিয়ে কোনো মানুষের অতীত কেনা যায় না। কিন্তু তার ভবিষ্যতের একটি দরজা খুলে দেওয়া যায়।

WAB Foundation-এর পক্ষ থেকে অটোভ্যান দেওয়ার উদ্যোগের কথা জানানো হলো। প্রকাশিত প্রতিবেদনে তুবার পড়াশোনার দায়িত্ব নেওয়ার কথাও এসেছে।

যেদিন অটোভ্যানটি বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল, তুবা অনেকক্ষণ সেটির দিকে তাকিয়ে থাকল।

“এটা কি বাবার?”

“হ্যাঁ,” অনিক বলল।

“তুমি চালাবে?”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে তুমি আর রাতে বাজারে যাবে না?”

অনিক মেয়ের দিকে তাকিয়ে হাসল। “না।”

“আমাকে স্কুলে নিয়ে যাবে?”

“যদি দেরি না করিস।”

তুবা ছুটে এসে বাবাকে জড়িয়ে ধরল। অনিক মেয়েকে শক্ত করে বুকে চেপে রাখল। তার মনে হলো, পৃথিবীর সব আদালতের রায়ের চেয়ে এই আলিঙ্গন অনেক বড়। আদালত তাকে অপরাধী বলতে পারে, নির্দোষও বলতে পারে। কিন্তু এই শিশুটি তাকে ডাকছে বাবা বলে।

প্রথম দিন অনিক উঠল ভোরে। ফজরের আজান তখন শেষ হয়েছে, আকাশে নীল আর ধূসরের মিশেল। জান্নাতুল চুলায় পানি বসিয়েছেন, তুবা তখনো ঘুমে। অনিক বাইরে এসে অটোভ্যানের পাশে দাঁড়াল। স্টিয়ারিংয়ে হাত রাখতেই তার আঙুল কাঁপতে লাগল।

নতুন জীবনের শুরুতে মানুষ সব সময় আত্মবিশ্বাসী থাকে না। কখনো ভয় পায়, কখনো নিজের অতীতকেই সন্দেহ করে। অনিকও ভয় পাচ্ছিল। সে জানত, গ্রামের মানুষ তাকে সহজে ভুলবে না। কেউ তাকে নিয়ে কথা বলবে, কেউ হাসবে, কেউ হয়তো পুরোনো ঘটনা মনে করিয়ে দিয়ে বলবে, “ওই যে, পিলারে বাঁধা হয়েছিল যে লোকটা।”

সবই সে জানত। তবু ইঞ্জিন চালু করল। অটোভ্যানের শব্দে ভোরের নীরবতা ভেঙে গেল। ঘর থেকে বেরিয়ে এল তুবা।

“বাবা!”

“কী রে?”

“আমি স্কুলে যাব।”

“যা।”

“আজ তুমি আমাকে নিয়ে যাবে?”

অনিক হাসল। “চল।”

কাঁধে ব্যাগ নিয়ে তুবা অটোভ্যানে উঠে বসল। রাস্তায় কুয়াশা, ধানখেতের ওপর ধোঁয়ার মতো সাদা চাদর। সুপারিগাছের মাথা শিশিরে ভেজা, দূরে কোথাও পাখি ডাকছে। অনিক ধীরে ধীরে ভ্যান চালাতে লাগল। পেছন থেকে তুবা ডাকল, “বাবা।”

“হুম?”

“তুমি আর কাঁদবে না?”

কিছুক্ষণ চুপ থেকে অনিক বলল, “মানুষ কাঁদে।”

“তুমিও কাঁদো?”

“হ্যাঁ।”

“কখন?”

রাস্তার দিকে তাকিয়ে সে বলল, “যখন খুব ভালোবাসে।”

তুবা কথাটা বুঝল কি না, বোঝা গেল না। সে শুধু বাবার পিঠের দিকে তাকিয়ে হাসল।

নতুন জীবন শুরু করা সহজ নয়। অটোভ্যান চলতে শুরু করলেও অনিকের অতীত তার সঙ্গে সঙ্গেই চলছিল। একদিন বাজারে কেউ ডেকে বলল, “কী খবর, পিলার সাহেব?” কয়েকজন হেসে উঠল। অনিকও হাসল, কিন্তু ভেতরে ভেতরে ব্যথা পেল। সে গাড়ি থামাল না।

আরেকদিন একজন জিজ্ঞেস করল, “ভালো হয়ে গেছিস নাকি?”

“চেষ্টা করছি।”

“দেখি, কতদিন টিকিস।”

অনিক উত্তর দিল না। সে বুঝেছিল, মানুষের বিশ্বাস ফিরে পেতে সময় লাগে। নিজের ওপর বিশ্বাস ফিরে পেতেও।

তার সবচেয়ে কঠিন লড়াইটা ছিল রাতের সঙ্গে। রাত নামলে নেশার টান ফিরে আসত। পুরোনো লোকগুলো ডাকত, “চল।” অনিক তখন কখনো দরজা বন্ধ করে বসে থাকত, কখনো তাকিয়ে থাকত তুবার বইয়ের দিকে, কখনো বের করত বাবার পুরোনো ছবি। একদিন সেই ছবির সামনে বসে সে বলল, “আমি পারছি না।”

ছবির মানুষটি কোনো উত্তর দিলেন না।

“তবু চেষ্টা করছি,” অনিক বলল।

তুবার স্কুলের পোশাক পুরোনো, তবু সেদিন সে সেটি খুব যত্ন করে পরেছিল। জান্নাতুল চুল বেঁধে দিচ্ছিলেন। আয়নায় নিজেকে দেখে তুবা বলল, “আমি বড় হলে কী হব, মা?”

“তুই যা হতে চাস।”

“আমি বাবার মতো হব না।”

জান্নাতুলের হাত থেমে গেল। একটু পরে তিনি বললেন, “তুই বাবার মতো ভালোবাসতে শিখবি।”

তুবা চুপ করে রইল। তারপর জিজ্ঞেস করল, “বাবা কি খারাপ?”

মা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “মানুষ খারাপ হওয়া আর মানুষের ভুল করা এক জিনিস নয়।”

তুবা কথাটা মনে রাখল। সেদিন স্কুল থেকে ফিরে সে বাবাকে বলল, “মা বলেছে, মানুষ ভুল করে।”

“হ্যাঁ।”

“তুমিও ভুল করেছিলে?”

অনিক মাথা নিচু করল। “হ্যাঁ।”

“আবার করবে?”

“না, করব না।”

“প্রমিজ?”

“প্রমিজ।”

তুবা হাত বাড়িয়ে বলল, “তাহলে হাত দাও।”

অনিক মেয়ের ছোট্ট হাতটি নিজের হাতে নিল। তুবা গম্ভীর মুখে বলল, “এই হলো প্রমিজ।”

অনিকের জীবনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসলে অটোভ্যান নয়। সে আবার সময়ের মূল্য বুঝতে শিখেছিল। সকাল মানে কাজ, দুপুর মানে যাত্রী, বিকেল মানে বাড়ি ফেরা, আর রাত মানে পরিবার। আগে রাত ছিল পালানোর সময়। এখন রাত মানে তুবার পড়ার খাতা।

তুবা অঙ্ক করত, অনিক পাশে বসে থাকত।

“বাবা, এটা কীভাবে হবে?”

“আমি জানি না।”

“তুমি না বাবা?”

“বাবা হলেই কি সব জানা যায়?”

তুবা হেসে ফেলত। “তাহলে তুমি কী জানো?”

“মানুষের জীবন নষ্ট করতে কত অল্প সময় লাগে, তা জানি।”

তুবা বুঝত না। অনিক আবার বলত, “আর সেটা ঠিক করতে যে কত সময় লাগে, তা-ও জানি।”

একদিন তুবা জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি আবার অনেক টাকা কামাবে?”

“অনেক না।”

“তাহলে?”

“যতটুকু দরকার।”

“কতটুকু?”

“তুই যেন স্কুলে যেতে পারিস। তোর ভাই যেন পড়তে পারে। তোর মাকে যেন কারও কাছে হাত পাততে না হয়।”

“আর তোমার?”

অনিক একটু হাসল। “আমার?”

“তোমার কী দরকার?”

মেয়ের মাথায় হাত রেখে সে বলল, “আমার দরকার, তুই আমাকে বাবা বলে ডাকিস।”

কয়েক সপ্তাহ পর একদিন অনিক একা বাজারে গেল। পিলারটি তখনো সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে। সে গাড়ি থামিয়ে কিছুক্ষণ দূর থেকে তাকিয়ে রইল। তারপর কাছে গিয়ে পিলারের গায়ে হাত রাখল। ঠান্ডা লোহা। সেই একই পিলার, কিন্তু আজ তার হাত বাঁধা নেই।

চোখ বন্ধ করতেই সেই রাতটা ফিরে এল। দড়ি, অন্ধকার, ক্ষুধা, তেষ্টা আর মানুষের কণ্ঠস্বর। তারপর তুবা, পাউরুটি আর চা। চোখ খুলতেই দেখল, এক বৃদ্ধ পাশ দিয়ে যেতে যেতে থেমে গেছেন।

“কী করছিস ওখানে?”

“কিছু না, চাচা।”

“ওখানে দাঁড়িয়ে থাকিস না।”

অনিক মৃদু হেসে বলল, “আগে আমাকে এখানে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল।”

বৃদ্ধ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন, কিছু বললেন না।

“আজ আমি নিজে এসে দাঁড়িয়েছি,” অনিক বলল।

শীতের এক সকালে তুবা বাবার অটোভ্যানে চড়ে স্কুলে যাচ্ছিল। রাস্তার দুই পাশে কাশফুল, ধানখেতের ওপর কুয়াশা, সূর্য তখনো ভালো করে ওঠেনি।

“বাবা।”

“হুম?”

“আলো কোথা থেকে আসে?”

“সূর্য থেকে।”

“না।”

“তাহলে?”

“মানুষের কাছ থেকে।”

অনিক অবাক হয়ে মেয়ের দিকে তাকাল। “কে বলেছে তোকে?”

“আমি জানি।”

অনিক হাসল। “তুই তো অনেক কিছু জানিস।”

তুবা বলল, “যেদিন তুমি পিলারে বাঁধা ছিলে, সবাই তোমাকে দেখছিল। কিন্তু কেউ তোমাকে আলো দেয়নি।”

অনিক গাড়ির গতি কমিয়ে দিল।

“আমি দিয়েছিলাম,” তুবা বলল।

অনিক কিছু বলতে পারল না। তার চোখ ঝাপসা হয়ে এল। সে শুধু সামনের রাস্তার দিকে তাকিয়ে গাড়ি চালিয়ে যেতে লাগল।

মানুষ নিজের ভুল স্বীকার করলেও সমাজ সব সময় তাকে দ্বিতীয় সুযোগ দিতে প্রস্তুত থাকে না। এটাই জীবনের কঠিনতম সত্যগুলোর একটি। অনিক তা বুঝেছিল, তবু সে আর পালাতে চায়নি। কেউ তাকে “চোর” বললে সে শান্ত গলায় উত্তর দিত, “আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল। আমি নিজের জীবনের ভুলও স্বীকার করি। কিন্তু আমি বদলাতে চাই।”

এই কথায় কোনো নাটক ছিল না। ছিল ক্লান্ত একজন মানুষের সত্যি হয়ে ওঠার চেষ্টা।

একদিন বাজারের এক দোকানি তাকে ডেকে বলল, “অনিক, চা খাবি?”

অনিক অবাক হলো। “আমি?”

“হ্যাঁ, বস।”

অনিক বসল। দোকানি চা এগিয়ে দিল। কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে রইল। তারপর দোকানি বলল, “তোর মেয়েটা খুব সাহসী।”

“ও আমার চেয়ে অনেক সাহসী।”

দোকানি মাথা নেড়ে বলল, “হয়তো।”

সেদিন অনিক বুঝল, মানুষের মনও ধীরে ধীরে বদলায়, তবে সবাই একসঙ্গে নয়। কেউ বদলায় একদিনে, কেউ এক বছরে, আর কেউ কোনোদিনই বদলায় না।

জান্নাতুলও নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন। তিনি লেখাপড়া জানতেন, নিজের জন্য কিছু করার ইচ্ছাও ছিল। কিন্তু সংসারের টানাপোড়েনে সব থেমে গিয়েছিল। একদিন তিনি অনিককে বললেন, “আমি কিছু করতে চাই।”

“করো।”

“তুমি পারবে?”

“কী পারব?”

“সংসারটা সামলাতে?”

অনিক বলল, “এতদিন তুমি আমাকে ধরে রেখেছ। এবার আমি তোমাকে ধরে রাখব।”

জান্নাতুল মৃদু হাসলেন। বহুদিন পর এমন হাসি দেখা গেল তাঁর মুখে।

একটি পরিবার ভেঙে পড়লে শুধু একজন মানুষ ভাঙে না। ঘরের ভাষা বদলে যায়, খাবারের স্বাদ বদলে যায়, শিশুর প্রশ্নগুলো বদলে যায়, স্বামী-স্ত্রীর নীরবতাও অন্যরকম হয়ে ওঠে। আবার পরিবার যখন ঘুরে দাঁড়ায়, তখনো সবকিছু একদিনে আগের মতো হয়ে যায় না। তবু একটি জিনিস ফিরে আসে। আশা।

একদিন স্কুল থেকে তুবা একটি রচনা লিখে আনল। বিষয় ছিল “আমার বাবা”। সে লিখেছিল:

“আমার বাবা একজন গাড়ি চালান। তিনি আমাকে স্কুলে নিয়ে যান। তিনি আমাকে পড়তে বলেন। আগে বাবা অনেক কষ্ট পেয়েছিলেন। আমি বাবাকে খাবার দিয়েছিলাম। বাবা কেঁদেছিলেন। এখন বাবা হাসেন।”

শিক্ষিকা রচনাটি পড়ে অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি বাবাকে খুব ভালোবাসো?”

“হ্যাঁ।”

“কেন?”

“কারণ তিনি আমার বাবা।”

“আর যদি কেউ তোমার বাবাকে খারাপ বলে?”

“মানুষ ভুল করতে পারে,” তুবা বলল।

শিক্ষিকা তার মাথায় হাত রাখলেন। “তুমি মন দিয়ে পড়াশোনা করো।”

“আমি অনেক পড়ব।”

অনিকের গল্প শুধু একটি পরিবারের গল্প হয়ে থাকেনি। মানুষ এ গল্পের মধ্যে নিজেদেরই খুঁজে পেয়েছিল। কেউ দেখেছিল নিজের ভাইকে, কেউ বাবাকে, কেউ নিজের ভুলকে, কেউ নিজের সন্তানকে। কেউ দেখেছিল সমাজের তাড়াহুড়ো, কেউ আইনের প্রয়োজন, কেউ বা পুনর্বাসনের গুরুত্ব। আর কেউ কেউ শুধু দেখেছিল একটি শিশুকে, যে বাবার মুখে খাবার তুলে দিয়েছিল।

সেই শিশু কোনো বক্তৃতা দেয়নি, কোনো দাবিও তোলেনি। সে শুধু বলেছিল, “খাও।” মানবিকতার সবচেয়ে গভীর ভাষা কখনো কখনো এটুকুই।

বছর গড়ালে মানুষ অনেক ঘটনা ভুলে যায়। একদিনের খবর পরদিনই পুরোনো হয়ে যায়, একটি ভিডিও হারিয়ে যায় হাজারো ভিডিওর ভিড়ে, একজন মানুষের কান্না ঢাকা পড়ে যায় অন্যদের ব্যস্ততার আড়ালে। তবু কিছু দৃশ্য মানুষের ভেতরে রয়ে যায়। তুবার হাতে পাউরুটি, এক কাপ চা, পিলারে বাঁধা একজন বাবা, ভিড়ের মাঝে একটি শিশুর কান্না। আর তার পেছনে জেগে থাকে একটি প্রশ্ন।

মানুষ কি শুধু শাস্তি পাওয়ার জন্যই জন্মায়? নাকি ভুলের পর ফিরে আসারও অধিকার তার আছে?

অনিকের জীবন এই প্রশ্নের সহজ উত্তর দেয় না। কারণ মানুষ একরঙা নয়। একই মানুষ ভুল করতে পারে, আবার ভালোবাসতেও পারে। সে পড়ে যেতে পারে, আবার উঠে দাঁড়াতেও পারে। সে অন্যকে কষ্ট দিতে পারে, আবার নিজের সন্তানকে ভালোবাসতে পারে পৃথিবীর সবার চেয়ে বেশি।

তার অপরাধের বিচার আইনের বিষয়। তার পুনর্বাসনের সুযোগ সমাজের মানবিকতার বিষয়। আর সন্তানকে ভালোবাসার অধিকার তার অস্তিত্বেরই অংশ।

সেদিন সন্ধ্যায় অটোভ্যান নিয়ে অনিক বাড়ি ফিরল। তুবা উঠোনে দাঁড়িয়ে ছিল। বাবাকে দেখেই সে ছুটে এসে বলল, “বাবা, আজ আমি একটা কবিতা লিখেছি।”

“শোনাবি?”

“হ্যাঁ।”

তুবা খাতা খুলে কয়েক লাইন পড়ে শোনাল। অনিক পুরোটা বুঝল না, কিন্তু শেষ লাইনে এসে থমকে গেল।

“আলো কখনো একা আসে না।”

সে মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। “এই লাইনটা কোথা থেকে পেলি?”

“আমি নিজেই লিখেছি।”

“কেন লিখলি?”

“কারণ সেদিন তুমি অন্ধকারে ছিলে।”

অনিকের গলা ভারী হয়ে এল।

“আমি তো আলো নিয়ে গিয়েছিলাম,” তুবা বলল।

অনিক মেয়েকে বুকে টেনে নিল।

সন্ধ্যা নামছিল। দূরের মসজিদ থেকে আজানের সুর ভেসে এল, নারিকেলপাতায় বাতাসের শব্দ উঠল, আকাশে ফুটল প্রথম তারা। মেয়ের মাথায় হাত রেখে অনিকের মনে হলো, মানুষ হয়তো কখনোই পুরোপুরি অতীত থেকে মুক্ত হতে পারে না। কিন্তু অতীতের ওপরে সে নতুন একটি সকাল গড়ে তুলতে পারে।

ঠিক তখনই গ্রামের বিদ্যুৎ চলে গেল। চারদিক এক নিমেষে অন্ধকার হয়ে এল। অনিক ঘরে ঢুকে তাক থেকে সেই পুরোনো কেরোসিনের বাতিটি নামাল। বাবার কণ্ঠ যেন বহুদিন পর কানের কাছে বেজে উঠল, “বিদ্যুৎ চলে গেলে এটা জ্বালাবি।”

দেশলাইয়ের কাঠি জ্বলল। বাতির শিখা কেঁপে উঠে ধীরে ধীরে স্থির হলো। সেই আলোয় ঘরের দেয়াল আবার কাছে সরে এল।

অনিকের বাবা নেই, পুরোনো জমি নেই, সচ্ছলতা নেই, হারানো দিনগুলোও নেই। তবু একটি পরিবার আছে, একটি অটোভ্যান আছে, একটি স্কুলব্যাগ আছে, আছে একটি শিশুর ভবিষ্যৎ। আর আছে এক মানুষ, যে নতুন করে শুরু করার চেষ্টা করছে।

বাতির আলোর দিকে তাকিয়ে অনেকক্ষণ সে চুপ করে থাকল। তারপর তুবাকে বলল, “চল, পড়তে বস।”

“আজ গল্প শুনব।”

“কী গল্প?”

“তোমার গল্প।”

অনিক মৃদু হাসল। “আমার গল্প তো অনেক লম্বা।”

“আমি শুনব।”

অনিক মেয়ের হাত ধরল। দুজনে বাতির কাছে গিয়ে বসল। বাইরে রাত নামছিল, কিন্তু সে রাতের অন্ধকার আর আগের মতো ছিল না। ঘরের ভেতর আলো জ্বলছিল, আর সেই আলোর পাশে বসে ছিল একজন বাবা। তার পাশে তার মেয়ে, সামনে একটি খাতা, একটি কলম, আর আগামী দিনের জন্য খোলা একটি দরজা।

যে মানুষকে এক রাতে পিলারের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছিল, সে হয়তো সারাজীবন সেই রাতের স্মৃতি বহন করবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পিলারটি তার জীবনের পরিচয় হয়ে থাকবে না। তার পরিচয় হয়ে থাকবে সেই ছোট্ট হাত, যা দড়ি খুলতে পারেনি, কিন্তু বাবার মুখে তুলে দিতে পেরেছিল একটুকরো পাউরুটি। থাকবে সেই এক কাপ চা, যা ক্ষুধা মেটানোর চেয়েও বড় কিছু ছিল। আর থাকবে একটি শিশুর অটুট বিশ্বাস।

হয়তো জীবনের সবচেয়ে গভীর সত্য এটাই। কখনো কখনো একজন মানুষকে অন্ধকার থেকে টেনে তুলতে বড় কোনো বক্তৃতার দরকার হয় না। একটি হাতই যথেষ্ট, একটি ডাকই যথেষ্ট। একটি ছোট্ট শিশু যদি কাঁদতে কাঁদতে বলে, “বাবা, খাও,” তাহলে পৃথিবীর সব অপমানের মাঝেও একজন মানুষ আবার বেঁচে থাকার কারণ খুঁজে পেতে পারে।

অনিক সেই কারণ পেয়েছিল। তার নাম তুবা।

সে আলো ছিল খুব ছোট। তবু একটি মানুষের জীবন বদলে দিতে কখনো কখনো ততটুকুই যথেষ্ট।

-সমাপ্ত-


সাহিত্য-সংস্কৃতি এর আরও খবর