রাশিয়ার ভূখণ্ডে ইউক্রেনের হামলায় ব্রিটিশ ড্রোন ব্যবহারের অভিযোগ তুলে যুক্তরাজ্যকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে মস্কো। রুশ দূতাবাসের দাবি, ইউক্রেনকে অস্ত্র সরবরাহের মাধ্যমে লন্ডন ইচ্ছাকৃতভাবে সংঘাত আরও উসকে দিচ্ছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের জন্য যুক্তরাজ্যকে ‘মূল্য দিতে হবে’ বলেও সতর্ক করেছে রাশিয়া।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম সানডে টাইমসের এক প্রতিবেদনের পর সোমবার এ প্রতিক্রিয়া জানায় লন্ডনে রুশ দূতাবাস।
সানডে টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ছয় মাসে রাশিয়ার ভেতরে দূরপাল্লার হামলায় ব্রিটেনের দুটি প্রতিষ্ঠানের তৈরি ড্রোন ব্যবহার করেছে ইউক্রেন। ইউক্রেনের কয়েকটি সামরিক সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাশিয়ার শিল্প ও সামরিক স্থাপনায় এসব ড্রোন দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে। এর মধ্যে ভলগোগ্রাদ ও ইয়ারোস্লাভলের তেল শোধনাগারও রয়েছে।
রুশ দূতাবাস জানিয়েছে, একদিকে ব্রিটেন শান্তির কথা বলছে, অন্যদিকে ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দিয়ে যুদ্ধ আরও তীব্র করছে। তাদের দাবি, এর মাধ্যমে লন্ডন ইউক্রেনের হামলার সহযোগী হয়ে উঠছে।
রুশ দূতাবাস আরও জানিয়েছে, সংঘাতে ব্রিটেনের সম্পৃক্ততা যত বাড়বে এবং ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা যত বাড়বে, যুক্তরাজ্যকে এর ‘মূল্য’ তত বেশি দিতে হবে।
২০২২ সালে ইউক্রেন সংঘাত শুরুর পর থেকেই কিয়েভের অন্যতম প্রধান সামরিক সহায়তাকারী দেশ ব্রিটেন। গত জুনে লন্ডন জানিয়েছিল, বছরের শেষ নাগাদ ইউক্রেনকে ১ লাখ ৫০ হাজার ড্রোন দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এর আগে ইউক্রেনকে স্টর্ম শ্যাডো দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রও দিয়েছে যুক্তরাজ্য। এসব অস্ত্র রাশিয়ার ভূখণ্ডে হামলায় ব্যবহার করা হয়েছে বলে মস্কো অভিযোগ করে আসছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রাশিয়ার ভেতরে ইউক্রেনের ড্রোন হামলা বেড়েছে। মস্কোর দাবি, এসব হামলায় জ্বালানি অবকাঠামো, আবাসিক এলাকা ও অন্যান্য স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
অন্যদিকে রাশিয়াও ইউক্রেনের সামরিক ও শিল্প স্থাপনা, সরবরাহব্যবস্থা এবং সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা জোরদার করেছে।
শ্রীমঙ্গলে মোবাইল কোর্টে ১,০০০ ঘনফুট বালু জব্দ, মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে
প্রকাশিত :
০৯:১৭, ১৯ আগষ্ট ২০২৬
সংগ্রাম দত্ত: মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার ইছবপুর-নোয়াগাঁও গ্রামের রাবার ফ্যাক্টরিসংলগ্ন জাগছড়া এলাকায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) সকালে পরিচালিত মোবাইল কোর্টের উপস্থিতি টের পেয়ে বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান। ফলে কাউকে আটক বা গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তবে ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ১ হাজার ঘনফুট অবৈধভাবে উত্তোলিত বালু জব্দ করা হয়েছে।
সহকারী কমিশনার (ভূমি), শ্রীমঙ্গল-এর নামে পরিচালিত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া তথ্য ও ছবিতে এ অভিযানের বিষয়টি জানানো হয়েছে।
প্রশাসনের দেওয়া তথ্যমতে, মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে ইছবপুর-নোয়াগাঁও গ্রামের রাবার ফ্যাক্টরিসংলগ্ন জাগছড়া এলাকায়, মৌলভীবাজার সড়কের ৮ নম্বর পুলের কাছে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। অভিযানের উপস্থিতি টের পেয়ে বালু উত্তোলনকারীরা পালিয়ে যাওয়ায় কোনো আসামিকে পাওয়া যায়নি। এ কারণে কাউকে অর্থদণ্ড বা কারাদণ্ড দেওয়া সম্ভব হয়নি।
অভিযানে প্রায় ১ হাজার ঘনফুট অবৈধভাবে উত্তোলিত বালু জব্দ করে স্থানীয় ইউপি সদস্যের জিম্মায় দেওয়া হয়েছে। জব্দ করা বালু বিধি অনুযায়ী নিষ্পত্তি করা হবে বলে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। জনস্বার্থে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও জানানো হয়।
বারবার অভিযান, তবু বন্ধ হচ্ছে না বালু উত্তোলন
প্রকৃতি ও পরিবেশগত বৈচিত্র্যের কারণে শ্রীমঙ্গল উপজেলা চারদিকে পাহাড়-টিলা, বনাঞ্চল ও চা-বাগানঘেরা। এ উপজেলায় রয়েছে অসংখ্য পাহাড়ি ছড়া, যেগুলো স্থানীয়ভাবে ছোট নদী হিসেবেও পরিচিত। এসব ছড়া থেকে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে।
জানা গেছে, একটি সংঘবদ্ধ প্রভাবশালী গোষ্ঠী এসব অবৈধ বালু উত্তোলনের পেছনে অর্থায়ন করে। ছড়া থেকে বালু উত্তোলনের জন্য শ্রমিক নিয়োগের পাশাপাশি বালু পরিবহনে ট্রাক, চালক ও হেলপার এবং তদারকির জন্য লোকজন রাখা হয়। পরে উত্তোলিত বালু বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়।
উপজেলার ভুনবীর ও সিন্দুরখান ইউনিয়নে অবৈধভাবে বালু বহনকারী ট্রাকের ধাক্কায় এক বৃদ্ধা, এক শিশুকন্যা ও এক ছাত্রের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে বলে স্থানীয় সূত্র ও অতীতের সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব ঘটনার পর স্থানীয় মানুষ বিভিন্ন সময়ে সড়কে নেমে আন্দোলন করেছেন। আন্দোলন ও প্রশাসনের অভিযানের পর কিছু সময়ের জন্য বালু উত্তোলন বন্ধ থাকলেও পরে আবার তা শুরু হয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
অবৈধ বালু উত্তোলন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
অবৈধ বালু উত্তোলনে সাংবাদিকের সম্পৃক্ততার অভিযোগ
অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের সঙ্গে একজন সাংবাদিকের সম্পৃক্ততার অভিযোগও সামনে এসেছে। দৈনিক কালের কণ্ঠ-এর মৌলভীবাজার প্রতিনিধি মো. সাইফুল ইসলাম তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে এ-সংক্রান্ত তথ্য শেয়ার করেছেন। তাঁর পোস্টে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের সঙ্গে ওই সাংবাদিকের সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থার তদন্তে ওই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, কিংবা তাঁকে আটক করা হয়েছে কি না—এমন কোনো তথ্য এখনো জানা যায়নি।
অভিযানের আগেই পালিয়ে যায় সংশ্লিষ্টরা
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, উপজেলা প্রশাসন প্রায়ই অভিযান পরিচালনা করলেও অভিযানের খবর আগে থেকেই পেয়ে যায় বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা। ফলে অভিযানপরিচালনার সময় ঘটনাস্থলে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই কাউকে পাওয়া যায় না।
এলাকাবাসীর মধ্যে গুঞ্জন রয়েছে, এসব অবৈধ কর্মকাণ্ডের পেছনে যারা অর্থায়ন করেন, তাঁরা সাধারণত সরাসরি ঘটনাস্থলে থাকেন না। ফলে শ্রমিক, ট্রাকচালক, হেলপার কিংবা বালু উত্তোলনের তদারকিতে নিয়োজিত ব্যক্তিরা মাঝেমধ্যে আটক হলেও অর্থের জোগানদাতারা থেকে যান ধরাছোঁয়ার বাইরে।
স্থানীয়দের কেউ কেউ এসব অর্থ জোগানদাতার রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে বলেও দাবি করেন। তাঁদের অনেকে বড় রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে এলাকায় গুঞ্জন রয়েছে।
নিরাপত্তার কারণে স্থানীয় অনেক মানুষও এসব বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না বলে জানা গেছে। তাঁদের আশঙ্কা, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কথা বললে তাঁরা নানা ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে পারেন।
খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে গণমাধ্যমকর্মী আক্রান্ত
শ্রীমঙ্গলের ভুনবীর এলাকায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে এক গণমাধ্যমকর্মী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হামলার শিকার হয়েছেন বলেও জানা গেছে। এ ঘটনায় অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িতদের প্রভাব ও স্থানীয় পর্যায়ে তাঁদের নিয়ে মানুষের ভীতির বিষয়টি সামনে এসেছে।
স্থানীয়দের মতে, পাহাড়ি ছড়া থেকে নির্বিচারে বালু উত্তোলনের ফলে পরিবেশের ক্ষতির পাশাপাশি ছড়ার স্বাভাবিক প্রবাহ ও আশপাশের জমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে অবৈধ বালুবাহী যান চলাচল বাড়ায় সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টিও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযান চালানো হলেও অভিযানের সময় মূল ব্যক্তিদের ঘটনাস্থলে না পাওয়ার বিষয়টি এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, শুধু ঘটনাস্থলে থাকা শ্রমিক বা পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে অবৈধ বালু উত্তোলনের মূল উৎস বন্ধ করা কতটা সম্ভব?
স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করেন, অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার পাশাপাশি অর্থের জোগানদাতা, সংগঠক ও সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদেরও আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। তা না হলে একদিকে যেমন পাহাড়ি ছড়া ও পরিবেশের ক্ষতি অব্যাহত থাকবে, অন্যদিকে অবৈধ বালুবাহী যান চলাচল ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঝুঁকিও কমবে না।