ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা : জিহ্বার অপব্যবহার মানুষের আমল ধ্বংসের কারণ হতে পারে
শায়খ রাশিদ খান
গীবত, অপবাদ ও জিহ্বার অপব্যবহার মানুষের আমল ধ্বংসের কারণ হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন ইমাম শায়খ রাশিদ খান।
গত ২১ আগস্ট শুক্রবার ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবায় ইমাম শায়খ রাশিদ খান বলেন, মুখ থেকে একটি কথা বের হতে খুব বেশি সময় লাগে না, কিন্তু সেই কথার পরিণতি আল্লাহর কাছে অত্যন্ত গুরুতর হতে পারে । বর্তমান সময়ে মুখের কথার পাশাপাশি হোয়াটসঅ্যাপ ম্যাসেজ, ফেসবুক কমেন্ট বা যাচাই না করে কারও সম্পর্কে কিছু ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেও একই সতর্কতা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, একবার সাহাবি হযরত মু‘আয ইবনে জাবাল (রা.) নবী মুহাম্মদ (সা:)-এর কাছে এমন আমল সম্পর্কে জানতে চান, যা তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে এবং জাহান্নাম থেকে দূরে রাখবে। রাসুলুল্লাহ (সা:) নামাজ, রোজাসহ বিভিন্ন ইবাদতের কথা বলার পর নিজের জিহ্বা ধরে বলেন, “এটিকে সংযত রাখো।”
তিনি বলেন, এ হাদিস থেকে বোঝা যায় মানুষের জিহ্বা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। অসতর্ক কথা একজন মানুষকে বড় ধরনের গুনাহের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
গীবতের সংজ্ঞা তুলে ধরে শায়খ রাশিদ খান বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা:) জানিয়েছেন, কারও অনুপস্থিতিতে তার সম্পর্কে এমন কিছু বলা, যা সে অপছন্দ করে, সেটিই গীবত। কথাটি সত্য হলে তা গীবত, আর সত্য না হলে তা অপবাদ।
তিনি বলেন, অনেকেই মনে করেন, “আমি তো সত্য কথাই বলেছি।” কিন্তু সত্য হলেও কারও এমন দোষ বা বিষয় তার অনুপস্থিতিতে বলা, যা সে অপছন্দ করবে, তা গীবতের মধ্যে পড়ে।
শায়খ রাশিদ খান বলেন, গীবত শুধু কারও চরিত্র বা আচরণ নিয়ে কথা বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কারও চেহারা, উচ্চতা, ওজন, কণ্ঠস্বর, হাঁটার ভঙ্গি বা অন্য কোনো শারীরিক বৈশিষ্ট্য নিয়েও উপহাস করা গীবতের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
আয়িশা (রা.)-এর একটি ঘটনার উল্লেখ করে তিনি বলেন, একবার তিনি একজনের উচ্চতা নিয়ে মন্তব্য করলে রাসুলুল্লাহ (সা:) তাঁকে কঠোরভাবে সতর্ক করেন । এতে বোঝা যায়, আমাদের কাছে তুচ্ছ মনে হওয়া একটি মন্তব্যও আল্লাহর কাছে গুরুতর হতে পারে।
বর্তমান সমাজে মানুষের চেহারা, শারীরিক গঠন বা কথা বলার ধরন নিয়ে হাসাহাসি অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এগুলোকে শুধু মজা হিসেবে নেওয়া ঠিক নয়। অন্যকে ছোট করা, অনুকরণ করে উপহাস করা কিংবা তার দুর্বলতাকে বিনোদনের বিষয় বানানো থেকে বিরত থাকতে হবে।
যাচাই না করে কোনো কথা ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপারে সতর্ক করে শায়খ রাশিদ খান বলেন, মানুষ কোনো বিষয়কে তুচ্ছ মনে করলেও আল্লাহর কাছে তা গুরুতর হতে পারে। এ প্রসঙ্গে তিনি সুরা আন-নূরের ১৫ নম্বর আয়াতের কথা উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, গীবত অনেক সময় সরাসরি না হয়ে পরোক্ষভাবেও করা হয়। যেমন—“আমি কারও বদনাম করতে চাই না, কিন্তু…”, “লোকটি ভালো, তবে…”—এ ধরনের কথার মাধ্যমেও অন্যের দোষচর্চা হতে পারে।
শায়খ রাশিদ খান বলেন, গীবতের ক্ষেত্রে শুধু বক্তার নয়, শ্রোতারও দায়িত্ব রয়েছে । কোনো বৈঠক, আড্ডা বা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে গীবত হলে তা বন্ধ করার চেষ্টা করা উচিত । সম্ভব না হলে সেই আলোচনা থেকে সরে যাওয়া উত্তম।
খুতবার শেষাংশে তিনি বলেন, ইসলাম মানুষকে শুধু নীরব থাকতে বলে না; বরং জিহ্বাকে ভালো কাজে ব্যস্ত রাখতে শিক্ষা দেয়। আল্লাহর জিকির, দরুদ ও ভালো কথার মাধ্যমে জিহ্বাকে অভ্যস্ত করা উচিত।
তিনি বলেন, মানুষের জিহ্বা যেমন তাকে জান্নাতের পথে নিয়ে যেতে পারে, তেমনি একটি অসতর্ক কথাও তার জন্য ধ্বংসের কারণ হতে পারে। তাই কথা বলার আগে চিন্তা করা এবং অন্যের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করা একজন মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।



















