img

ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা : আমরা আমাদের মুল্যবান সময়কে কীভাবে কাজে লাগাচ্ছি?

প্রকাশিত :  ১৮:৫৬, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা : আমরা আমাদের মুল্যবান সময়কে কীভাবে কাজে লাগাচ্ছি?

শায়খ মুস্তফা আবদুল্লাহ

সময় আল্লাহ তাআলার অন্যতম বড় নিয়ামত। মানুষের জীবন মূলত আল্লাহর দেওয়া সময়েরই একটি সমষ্টি । তাই সময়কে অবহেলা না করে সঠিকভাবে কাজে লাগানো প্রত্যেকের দায়িত্ব— কথাগুলো বলেছেন শায়খ মুস্তফা আবদুল্লাহ।

২৮ আগস্ট শুক্রবার ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবায় তিনি আরো বলেন, আল্লাহ তাআলা মানুষকে অসংখ্য নিয়ামত দিয়েছেন, যা গণনা করে শেষ করা সম্ভব নয়। এর মধ্যে সময় এমন একটি মৌলিক নিয়ামত, যার ওপর আমাদের শিক্ষা, ইবাদত, পরিবার, কাজ, সাফল্য ও মানুষের সেবা—সবকিছু নির্ভর করে।

তিনি বলেন, হৃদপিণ্ডের প্রতিটি স্পন্দন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জীবনের আরেকটি মুহূর্ত চলে যাচ্ছে । হারিয়ে যাওয়া সময় আর কখনো ফিরে আসে না।

মোবাইল ফোন ও সোশাল মিডিয়াকে বর্তমান সময়ের বড় একটি বিভ্রান্তি হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনেক সময় আমরা কয়েক মিনিটের জন্য ফোন হাতে নিই, কিন্তু অজান্তেই এক ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় চলে যায়। এতে শুধু মনোযোগ নষ্ট হয় না, জীবনের মূল্যবান একটি অংশও হারিয়ে যায়।

তরুণদের উদ্দেশে শায়খ মোস্তফা আবদুল্লাহ বলেন, যারা নতুন করে স্কুলে যাচ্ছে, জিসিএসই পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করছে কিংবা ভবিষ্যতে কী করবে তা নিয়ে ভাবছে—তাদের উচিত কোনো কাজ শেষ মুহূর্তের জন্য ফেলে না রাখা।

অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষার মাত্র এক বা দুই সপ্তাহ আগে পড়াশোনা শুরু করে । কিন্তু যদি বছরের শুরু থেকেই প্রতিদিন অল্প অল্প করে পড়া, রিভিশন বা নতুন কিছু শেখার অভ্যাস করা যায়, তাহলে পরীক্ষার সময় অতিরিক্ত চাপ নিতে হয় না এবং প্রস্তুতিও অনেক ভালো হয়।

প্রতিদিন মাত্র ১০ মিনিট পড়াশোনা হয়তো খুব সামান্য মনে হতে পারে । কিন্তু এই ১০ মিনিট যদি নিয়মিতভাবে কাজে লাগানো হয়, তাহলে কয়েক মাস বা এক বছরে তা অনেক ঘণ্টায় পরিণত হয় । একইভাবে, প্রতিদিন মাত্র দুই পৃষ্ঠা করে পড়লেও এক বছরে শত শত পৃষ্ঠা পড়া হয়ে যায়।

বড় সাফল্যের জন্য সবসময় একসঙ্গে অনেক কিছু করতে হয় না। প্রতিদিন অল্প অল্প করে নিয়মিত চেষ্টা করলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা বড় অর্জনে পরিণত হতে পারে। তাই ভালো কোনো কাজ শুরু করার জন্য ‘পরে করব’ না ভেবে আজ থেকেই শুরু করা উচিত।

তিনি বলেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের শক্তি ও সামর্থ্য কমে যায়। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন, মানুষকে দুর্বল অবস্থায় সৃষ্টি করার পর শক্তি দেন, আবার শক্তির পর দুর্বলতা ও বার্ধক্য আসে। তাই শক্তি ও সুযোগ থাকা অবস্থাতেই সময়ের সদ্ব্যবহার করা প্রয়োজন।

পবিত্র কুরআনে সময়ের গুরুত্ব বারবার তুলে ধরা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা সূরা আল-আসরে সময়ের শপথ করেছেন। এছাড়া দিন, রাত, সকাল ও ভোরের শপথের মাধ্যমেও মানুষকে সময়ের গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে।

রাসুলুল্লাহ (সা:)-এর হাদিস উদৃত করে তিনি বলেন, “যা তোমার উপকারে আসে, তার প্রতি আগ্রহী হও, আল্লাহর সাহায্য চাও এবং অসহায় হয়ে বসে থেকো না।”

তিনি আরও বলেন, অলসতা মানুষের শুধু সময়ই নষ্ট করে না, জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সুযোগও কেড়ে নেয়। তাই দিনকে পরিকল্পিতভাবে সাজানো, সময়কে রক্ষা করা এবং ভালো কাজ দ্রুত শুরু করা উচিত।

খুতবার শেষাংশে মুসলিম কমিউনিটিকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কিছু ব্যক্তি বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণের মাধ্যমে মুসলমানদের বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলিয়ে পরে সেসব বক্তব্য প্রসঙ্গের বাইরে ব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার করে ইসলাম ও মুসলমানদের ভুলভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছেন।

তিনি কমিউনিটির সদস্যদের এ ধরনের ব্যক্তিদের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় আলোচনায় না জড়ানোর পরামর্শ দিয়ে বলেন, মসজিদ প্রাঙ্গণে এমন কিছু ঘটলে দায়িত্বশীল স্টাফদের দ্রুত জানানো উচিত।

সবশেষে শায়খ মুস্তফা আবদুল্লাহ দোয়া করেন, আল্লাহ যেন আমাদের সময়ের মধ্যে বরকত দান করেন, অলসতা ও উদাসীনতা থেকে রক্ষা করেন এবং জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত কল্যাণকর কাজে ব্যয় করার তাওফিক দেন।

(শায়খ মোস্তফা আবদুল্লাহ : অতিথি খাতিব, ইস্ট লন্ডন মস্ক এন্ড লন্ডন মুসলিম সেন্টার । জুমার খুতবা, ২৮ আগস্ট ২০২৬। )

ধর্ম এর আরও খবর

img

ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা : জিহ্বার অপব্যবহার মানুষের আমল ধ্বংসের কারণ হতে পারে

প্রকাশিত :  ১৬:২০, ২৯ আগষ্ট ২০২৬

শায়খ রাশিদ খান

গীবত, অপবাদ ও জিহ্বার অপব্যবহার মানুষের আমল ধ্বংসের কারণ হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন ইমাম শায়খ রাশিদ খান।

গত ২১ আগস্ট শুক্রবার ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবায় ইমাম শায়খ রাশিদ খান বলেন, মুখ থেকে একটি কথা বের হতে খুব বেশি সময় লাগে না, কিন্তু সেই কথার পরিণতি আল্লাহর কাছে অত্যন্ত গুরুতর হতে পারে । বর্তমান সময়ে মুখের কথার পাশাপাশি হোয়াটসঅ্যাপ ম্যাসেজ, ফেসবুক কমেন্ট বা যাচাই না করে কারও সম্পর্কে কিছু ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেও একই সতর্কতা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, একবার সাহাবি হযরত মু‘আয ইবনে জাবাল (রা.) নবী মুহাম্মদ (সা:)-এর কাছে এমন আমল সম্পর্কে জানতে চান, যা তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে এবং জাহান্নাম থেকে দূরে রাখবে। রাসুলুল্লাহ (সা:) নামাজ, রোজাসহ বিভিন্ন ইবাদতের কথা বলার পর নিজের জিহ্বা ধরে বলেন, “এটিকে সংযত রাখো।”

তিনি বলেন, এ হাদিস থেকে বোঝা যায় মানুষের জিহ্বা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। অসতর্ক কথা একজন মানুষকে বড় ধরনের গুনাহের দিকে নিয়ে যেতে পারে।

গীবতের সংজ্ঞা তুলে ধরে শায়খ রাশিদ খান বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা:) জানিয়েছেন, কারও অনুপস্থিতিতে তার সম্পর্কে এমন কিছু বলা, যা সে অপছন্দ করে, সেটিই গীবত। কথাটি সত্য হলে তা গীবত, আর সত্য না হলে তা অপবাদ।

তিনি বলেন, অনেকেই মনে করেন, “আমি তো সত্য কথাই বলেছি।” কিন্তু সত্য হলেও কারও এমন দোষ বা বিষয় তার অনুপস্থিতিতে বলা, যা সে অপছন্দ করবে, তা গীবতের মধ্যে পড়ে।

শায়খ রাশিদ খান বলেন, গীবত শুধু কারও চরিত্র বা আচরণ নিয়ে কথা বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কারও চেহারা, উচ্চতা, ওজন, কণ্ঠস্বর, হাঁটার ভঙ্গি বা অন্য কোনো শারীরিক বৈশিষ্ট্য নিয়েও উপহাস করা গীবতের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

আয়িশা (রা.)-এর একটি ঘটনার উল্লেখ করে তিনি বলেন, একবার তিনি একজনের উচ্চতা নিয়ে মন্তব্য করলে রাসুলুল্লাহ (সা:) তাঁকে কঠোরভাবে সতর্ক করেন । এতে বোঝা যায়, আমাদের কাছে তুচ্ছ মনে হওয়া একটি মন্তব্যও আল্লাহর কাছে গুরুতর হতে পারে।

বর্তমান সমাজে মানুষের চেহারা, শারীরিক গঠন বা কথা বলার ধরন নিয়ে হাসাহাসি অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এগুলোকে শুধু মজা হিসেবে নেওয়া ঠিক নয়। অন্যকে ছোট করা, অনুকরণ করে উপহাস করা কিংবা তার দুর্বলতাকে বিনোদনের বিষয় বানানো থেকে বিরত থাকতে হবে।

যাচাই না করে কোনো কথা ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপারে সতর্ক করে শায়খ রাশিদ খান বলেন, মানুষ কোনো বিষয়কে তুচ্ছ মনে করলেও আল্লাহর কাছে তা গুরুতর হতে পারে। এ প্রসঙ্গে তিনি সুরা আন-নূরের ১৫ নম্বর আয়াতের কথা উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, গীবত অনেক সময় সরাসরি না হয়ে পরোক্ষভাবেও করা হয়। যেমন—“আমি কারও বদনাম করতে চাই না, কিন্তু…”, “লোকটি ভালো, তবে…”—এ ধরনের কথার মাধ্যমেও অন্যের দোষচর্চা হতে পারে।

শায়খ রাশিদ খান বলেন, গীবতের ক্ষেত্রে শুধু বক্তার নয়, শ্রোতারও দায়িত্ব রয়েছে । কোনো বৈঠক, আড্ডা বা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে গীবত হলে তা বন্ধ করার চেষ্টা করা উচিত । সম্ভব না হলে সেই আলোচনা থেকে সরে যাওয়া উত্তম।

খুতবার শেষাংশে তিনি বলেন, ইসলাম মানুষকে শুধু নীরব থাকতে বলে না; বরং জিহ্বাকে ভালো কাজে ব্যস্ত রাখতে শিক্ষা দেয়। আল্লাহর জিকির, দরুদ ও ভালো কথার মাধ্যমে জিহ্বাকে অভ্যস্ত করা উচিত।

তিনি বলেন, মানুষের জিহ্বা যেমন তাকে জান্নাতের পথে নিয়ে যেতে পারে, তেমনি একটি অসতর্ক কথাও তার জন্য ধ্বংসের কারণ হতে পারে। তাই কথা বলার আগে চিন্তা করা এবং অন্যের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করা একজন মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

শায়খ রাশিদ খান : অতিথি খাতীব, ইস্ট লন্ডন মস্ক এন্ড লন্ডন মুসলিম সেন্টার । জুমা\'র খুতবা ২১ আগস্ট ২০২৬ ।