img

ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা : আল্লাহর স্মরণেই পারিবারিক জীবনে আসে শান্তি ও ভালোবাসা

প্রকাশিত :  ১০:৩২, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা : আল্লাহর স্মরণেই পারিবারিক জীবনে আসে শান্তি ও ভালোবাসা

শায়খ আবদুল কাইয়ুম

পারিবারিক জীবনে ভালোবাসা, দয়া ও পারস্পরিক দায়িত্ববোধের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন ইস্ট লন্ডন মসজিদের প্রধান ইমাম ও খতীব শায়খ আবদুল কাইয়ুম। তিনি ৪ সেপ্টেম্বর শুক্রবার জুমার খুতবায় কথাগুলো বলেন।

শায়খ আবদুল কাইয়ুম বলেছেন, পরিবার ও পারিবারিক জীবন আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মানুষের জন্য একটি মহান নেয়ামত । একটি ঘর কেবল চার দেয়াল ও ছাদের সমষ্টি নয়; বরং তা হওয়া উচিত শান্তি, ভালোবাসা, মমতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার নিরাপদ আশ্রয়স্থল।

তিনি বলেন, পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “আর আল্লাহ তোমাদের ঘরগুলোকে তোমাদের জন্য বিশ্রামের স্থান করেছেন।” (সুরা আন-নাহল, ১৬:৮০)। এখানে ব্যবহৃত সাকান শব্দটি সুকুন থেকে এসেছে, যার অর্থ শান্তি, স্বস্তি ও প্রশান্তি।

তিনি বলেন, একটি বাড়ি অনেক বড় ও সুন্দর হতে পারে, দামি আসবাবপত্রে পরিপূর্ণ হতে পারে; কিন্তু সেখানে যদি পারিবারিক শান্তি, ভালোবাসা ও সুসম্পর্ক না থাকে, তাহলে সেটি প্রকৃত অর্থে প্রশান্তির ঘর নয়। আবার ছোট ও সাধারণ একটি ঘরেও যদি ভালোবাসা, সম্মান ও আল্লাহর স্মরণ থাকে, তাহলে সেটিই প্রকৃত সুখের আবাস হতে পারে।

দাম্পত্য জীবনের উদ্দেশ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে জীবনসঙ্গী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও; আর তোমাদের মধ্যে সৃষ্টি করেছেন ভালোবাসা ও দয়া।” (সুরা আর-রূম, ৩০:২১)।

শায়খ আবদুল কাইয়ুম বলেন, আমাদের নিজেদের প্রশ্ন করা উচিত—আমাদের ঘরে কি সেই প্রশান্তি, ভালোবাসা ও রহমত আছে? কারণ শয়তান পরিবারের মধ্যে বিভেদ, ঝগড়া-বিবাদ ও দূরত্ব সৃষ্টি করতে চায়। আল্লাহর স্মরণ থেকে পরিবার যত দূরে যায়, শয়তানের প্রভাব তত বাড়তে থাকে।

তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ঘরে আল্লাহকে স্মরণ করা হয় এবং যে ঘরে আল্লাহকে স্মরণ করা হয় না, এ দুই ঘরের উদাহরণ জীবিত ও মৃতের মতো। তাই ঘরে কুরআন তিলাওয়াত, দোয়া, যিকির ও ইবাদতের পরিবেশ থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি আরও বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “তোমাদের ঘরগুলোকে কবরস্থানে পরিণত করো না।” এর অর্থ হলো ঘরেও সালাত, নফল ইবাদত, কুরআন তিলাওয়াত ও আল্লাহর স্মরণের পরিবেশ থাকতে হবে।

সকাল-সন্ধ্যার যিকির ও ঘুমের আগের দোয়াগুলো নিয়মিত পাঠ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সন্তানরা বাবা-মায়ের কাছ থেকেই সবচেয়ে বেশি শেখে। তারা যদি ছোটবেলা থেকেই কুরআন, সালাত ও দোয়ার পরিবেশে বড় হয়, তাহলে তা তাদের জীবনের স্থায়ী অভ্যাসে পরিণত হতে পারে।

তিনি বলেন, শুধু ইবাদত করলেই হবে না; পরিবারের সদস্যদের একে অন্যের প্রতি দয়ালু, সহনশীল ও দায়িত্বশীল হতে হবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমাদের মধ্যে উত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম।

তিনি বলেন, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক সম্মান, বোঝাপড়া, ছাড় দেওয়া ও সুন্দর আচরণ। সংসার শুধু নিজের ইচ্ছা প্রতিষ্ঠার জায়গা নয়; বরং একে অন্যের হক আদায় এবং ভালোবাসার সঙ্গে পথ চলার নাম।

বর্তমান সমাজে পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, অনেক সন্তান ছোটবেলায় বাবা-মায়ের খুব ঘনিষ্ঠ থাকলেও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়। বর্তমান সমাজের অতিরিক্ত ব্যক্তিকেন্দ্রিক মানসিকতা এর একটি বড় কারণ। তাই পরিবারে ইসলামি মূল্যবোধ, দায়িত্ববোধ ও আত্মীয়তার বন্ধন শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

শায়খ আবদুল কাইয়ুম বলেন, সন্তানদের জন্য শুধু বাড়ি, সম্পদ বা আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য রেখে যাওয়া সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ নয়। বরং তাদের দ্বীনদার, সৎ, দায়িত্বশীল ও ভালো চরিত্রের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই মা-বাবার প্রকৃত বিনিয়োগ।

তিনি বলেন, মা-বাবা পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ার পরও সন্তানদের সালাত, সৎকর্ম এবং মা-বাবার জন্য করা দোয়া তাদের জন্য সওয়াবের কারণ হতে পারে।

সবশেষে তিনি দোয়া করেন, আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের ঘরগুলোকে শান্তি ও প্রশান্তির আবাসস্থল করেন, তাঁর স্মরণে ঘরগুলোকে জীবন্ত রাখেন, পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেন এবং শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে আমাদের পরিবারকে রক্ষা করেন ।

(শায়খ আবদুল কাইয়ুম : প্রধান ইমাম ও খতীব, ইস্ট লন্ডন মসজিদ এন্ড লন্ডন মুসলিম সেন্টার । জু\'মার খুতবা, ৪ সেপ্টেম্বর শুক্রবার ২০২৬।)

ধর্ম এর আরও খবর

img

ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা : ইস্তিগফার মানুষের জীবনে খুলে দেয় প্রশান্তি ও বরকতের দরজা

প্রকাশিত :  ১৫:০৮, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৫:৩৭, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

শায়খ আনিসুল হক

নিয়মিত আল্লাহ'র কাছে ক্ষমা প্রার্থনা বা ইস্তিগফারকে দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ করে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ইস্ট লন্ডন মসজিদের সিনিয়র ইমাম শায়খ আনিসুল হক । তিনি বলেন, ইস্তিগফার মানুষের জীবনে আত্মিক প্রশান্তি, আল্লাহর রহমত ও বরকত লাভের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম । সুখে-দুঃখে, স্বাচ্ছন্দ্যে কিংবা সংকটে সর্বাবস্থায় আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিত।

২৩ অক্টোবর ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবায় শায়খ আনিসুল হক আরো বলেন, মানুষ জীবনের অধিকাংশ সময় ধনসম্পদ, সফলতা ও সামাজিক মর্যাদা অর্জনের পেছনে ব্যয় করে । অথচ পরকালে প্রকৃত কল্যাণ বয়ে আনবে এমন আমলের প্রতি অনেকেই যথাযথ গুরুত্ব দেন না।

তিনি ইসলামের ন্যায়পরায়ণ শাসক উমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.)-এর একটি ঘটনা উল্লেখ করেন। বর্ণিত আছে, তাঁর মৃত্যুর পর ছেলে আবদুল আজিজ স্বপ্নে বাবাকে একটি বাগানে দেখতে পান । এ সময় তিনি জানতে চান, কোন আমলটি তাঁর জন্য সবচেয়ে বেশি উপকারী হয়েছে? জবাবে উমর ইবনে আবদুল আজিজ বলেন, ‘হে আমার পুত্র, আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা।’

শায়খ আনিসুল হক বলেন, ইস্তিগফারের জন্য অর্থসম্পদ, সামাজিক অবস্থান কিংবা বিশেষ কোনো স্থান ও সময়ের প্রয়োজন হয় না। ঘরে-বাইরে, কর্মস্থলে, যাতায়াতের সময় কিংবা ঘুমানোর আগে যেকোনো মুহূর্তে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া যায়।

তিনি বলেন, একজন মুমিনের জীবনে দুটি বিষয় সর্বদা গুরুত্ব পাওয়া উচিত । একটি হলো আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, অন্যটি নিজের ভুলত্রুটি ও গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা।

এ প্রসঙ্গে তিনি বিখ্যাত ইসলামী মনীষী হাসান আল-বসরি (রহ.)-এর সঙ্গে একজন মালবাহকের একটি ঘটনা তুলে ধরেন। ঘটনায় বলা হয়, ওই মালবাহক পথ চলতে চলতে বারবার দুটি বাক্য উচ্চারণ করছিলেন—‘আলহামদুলিল্লাহ’ ও ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’।

এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার জীবনে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কের দুটি দিক রয়েছে। একটি হলো তাঁর দেওয়া নিয়ামত, যার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা প্রয়োজন। অন্যটি হলো তাঁর প্রতি আমার দায়িত্ব পালনে ত্রুটি, যার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা প্রয়োজন।’

শায়খ আনিসুল হক বলেন, এই সাধারণ কথার মধ্যেই রয়েছে গভীর শিক্ষা। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে আমরা হয় আল্লাহর কোনো নিয়ামত ভোগ করছি, যার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রয়োজন; নয়তো কোনো না কোনো ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হচ্ছি, যার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা প্রয়োজন।

ইস্তিগফারের মাধ্যমে রিজিক ও বরকত বৃদ্ধির বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি পবিত্র কুরআনের সুরা নুহের ১০ থেকে ১২ নম্বর আয়াতের উদ্ধৃতি দেন । এসব আয়াতে নবী নুহ (আ.) তাঁর সম্প্রদায়কে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার আহ্বান জানিয়ে বৃষ্টি, ধনসম্পদ, সন্তান-সন্ততি, বাগান ও নদ-নদীর নিয়ামতের কথা তুলে ধরেছিলেন।

শায়খ আনিসুল হক বলেন, আর্থিক সংকট, পারিবারিক অশান্তি, কর্মক্ষেত্রের সমস্যা কিংবা ব্যক্তিগত দুশ্চিন্তায় পড়লে মানুষের উচিত আন্তরিকভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে আসা।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ইস্তিগফার করলেই জীবনের সব সমস্যা তাৎক্ষণিকভাবে দূর হয়ে যাবে, এমন নয় । আল্লাহর নবী-রাসুলরাও কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন। কিন্তু আল্লাহর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক মানুষকে কঠিন পরিস্থিতিতে ধৈর্য, মানসিক প্রশান্তি ও সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি দেয় ।

তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) প্রতিদিন একশ'বার আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতেন। তাই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত ইস্তিগফারকে নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত করা।

শায়খ আনিসুল হক আন্তরিক ইস্তিগফারের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেন। এগুলো হলো বিনয়, ভুল স্বীকার এবং আল্লাহর রহমতের প্রতি আশা।

তিনি বলেন, বিনয় মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে জীবনের সব অর্জন ও সফলতা আল্লাহর দান । ভুল স্বীকারের অর্থ হলো অজুহাত না দেখিয়ে নিজের অন্যায় ও ত্রুটির দায়িত্ব গ্রহণ করা। আর আশা হলো অতীতের গুনাহ যত বড়ই হোক, আল্লাহর অসীম রহমত থেকে কখনো নিরাশ না হওয়া।

যাঁরা বারবার একই ভুলে জড়িয়ে পড়েন, তাঁদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আন্তরিক অনুতাপ ও নিজেকে সংশোধনের চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। শয়তানের প্ররোচনায় আল্লাহর ক্ষমার ব্যাপারে হতাশ হওয়া যাবে না।

তিনি বলেন, ‘আপনি গতকালকে পরিবর্তন করতে পারবেন না, কিন্তু আজ কী করবেন, তা পরিবর্তন করতে পারেন । আপনার পরবর্তী নামাজ থেকেই শুরু করুন এবং আন্তরিকভাবে আস্তাগফিরুল্লাহ বলুন।’

আলোচনার শেষ পর্যায়ে শায়খ আনিসুল হক বলেন, ইস্তিগফার যেন কেবল মুখে উচ্চারিত কয়েকটি শব্দে সীমাবদ্ধ না থাকে। বরং এর মাধ্যমে নিজের ভুল উপলব্ধি, আত্মশুদ্ধি এবং আল্লাহর ক্ষমার প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস গড়ে তুলতে হবে।

পরিশেষে তিনি মহান আল্লাহর কাছে সবার জন্য ইবাদতে বিনয়, তওবায় আন্তরিকতা, গুনাহের ক্ষমা এবং তাঁর রহমতের প্রতি অবিচল আস্থা কামনা করেন।

শায়খ আনিসুল হক : সিনিয়র ইমাম ও খতীব, ইস্ট লন্ডন মস্ক এন্ড লন্ডন মুসলিম সেন্টার, জুমার খুতবা

ধর্ম এর আরও খবর