ভালোবাসার নামে শৃঙ্খল: একটি সংসারের ভেতরে ধীরে ধীরে মরে যাওয়া মানুষের গল্প
শান্ত নুর সোহাইল
মানুষের মন বড় বিচিত্র। একই ঘরে পাশাপাশি বসবাস করেও একজন মানুষ আরেকজনের মনের খবর কতটুকুই বা রাখে! প্রতিদিন দেখা হয়, কথা হয়, একসঙ্গে আহার হয়, রাত হলে একই ছাদের নিচে ঘুম আসে; তবু মনের মধ্যে যে কতখানি দূরত্ব জমে উঠতে পারে, তা বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই।
সংসারে এমন অনেক মানুষ আছে, যাদের দেখে মনে হয় তারা বেশ সুখেই আছে। স্বামী অফিস থেকে ফিরলে স্ত্রী এগিয়ে আসে, স্ত্রী অসুস্থ হলে স্বামী ওষুধ এনে দেয়, সন্তানদের পড়াশোনা চলে, ঈদে নতুন পোশাক কেনা হয়, আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে যাওয়া-আসাও বন্ধ হয় না। পাড়া-প্রতিবেশীর চোখে তাদের সংসারে কোনো অভাব নেই।
অথচ সেই সংসারেরই কোনো এক কোণে হয়তো একজন মানুষ প্রতিদিন একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছে।
তারও একদিন স্বপ্ন ছিল। ইচ্ছা ছিল নিজের মতো করে বাঁচার। হয়তো গান শুনতে ভালোবাসত, হয়তো বিকেলে পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে চাইত, হয়তো নিজের পছন্দের পোশাকটি কিনে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একটু হাসতে চাইত। এসবের কোনোটিই তো খুব বড় চাওয়া ছিল না।
কিন্তু সংসারে আসার পর ধীরে ধীরে সে বুঝতে পারল, তার নিজের বলে আর কিছু নেই। কখন কী পরবে, কোথায় যাবে, কার সঙ্গে কথা বলবে, কী পছন্দ করবে—সবকিছুরই যেন একজনের অনুমোদন প্রয়োজন।
প্রথম প্রথম সে প্রতিবাদ করেছিল। বলেছিল, \'আমারও তো কিছু ভালো লাগা আছে।\'
উত্তরে শুনেছিল, \'সংসার করতে হলে এত নিজের ইচ্ছা নিয়ে চললে হয় না।\'
কথাটি শুনে সে আর কিছু বলেনি। মনে মনে ভেবেছিল, হয়তো সংসার এমনই। হয়তো ভালোবাসার মানুষের জন্য কিছু ইচ্ছা বিসর্জন দিতে হয়।
কিন্তু মানুষ যে কতখানি বিসর্জন দিলে নিজের অস্তিত্বটুকুও হারিয়ে ফেলে, সে হিসাব বোধ হয় কেউ রাখে না।
একটুখানি স্বাধীনতার অপরাধ
যে মানুষটি এতদিন অন্যের ইশারায় চলেছে, তার মন পাওয়ার পথটিও নিয়ন্ত্রণকারী মানুষের কাছে বেশ মসৃণ ছিল। কিন্তু একদিন সে নিজের ইচ্ছায় সামান্য একটু ভিন্ন পথে হাঁটতে চাইল। নিজের পছন্দের কথা বলল, কিংবা কোনো সিদ্ধান্তে দ্বিমত প্রকাশ করল।
ব্যস, সেদিন থেকেই যেন সবকিছু বদলে গেল।
যে কথাটি আগে ভালোবাসার আবদার বলে মনে হতো, সেটিই এখন অবাধ্যতা। যে বন্ধুটির সঙ্গে কথা বলা নিয়ে কোনো আপত্তি ছিল না, সে-ই এখন সন্দেহের কারণ। যে সামান্য স্বাধীনতাটুকু একসময় স্বাভাবিক ছিল, সেটিই এখন সংসারের অশান্তির নামান্তর।
মানুষটি অবাক হয়ে ভাবল, এতদিন যে কথাগুলো বললে সংসারে ভালোবাসা ছিল, আজ সেই একই কথা বললে ভালোবাসা কমে গেল কেন?
সে বুঝতে পারল না, ভালোবাসা কি তবে শুধু মেনে নেওয়ার নাম? সেখানে নিজের মত প্রকাশের কোনো অধিকার নেই?
অথচ যে মানুষটি তাকে নিয়ন্ত্রণ করছে, তারও হয়তো নিজের যুক্তি আছে। সে মনে করে, সংসারের ভালো-মন্দ বোঝার দায়িত্ব তারই বেশি। সে যেভাবে ভাবছে, সেটিই সঠিক। প্রিয় মানুষটিকে নিজের মতো করে চালাতে পারলেই বুঝি সংসার সুন্দর থাকবে।
এই ভুল ধারণাটিই একসময় ভালোবাসার জায়গায় দেয়াল তুলে দেয়।
যে অভিমান কেউ দেখতে পায় না
তারপর থেকে মানুষটি ধীরে ধীরে চুপ হয়ে গেল।
আগে কোনো কিছু ভালো না লাগলে বলত। এখন আর বলে না। আগে কোনো শখের কথা মনে এলে জানাত। এখন সেটিও জানায় না। কোনোদিন মন খারাপ হলে একা বসে থাকে। কেউ জিজ্ঞাসা করলে বলে, \'কিছু হয়নি।\'
এই \'কিছু হয়নি\' কথাটির মধ্যে যে কত কিছু লুকিয়ে থাকে, তা বোঝার মতো মানুষটি পাশে থেকেও যেন পাশে থাকে না।
রাতের বেলা সবাই ঘুমিয়ে গেলে সে কখনো কখনো জানালার পাশে দাঁড়ায়। বাইরে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার মনে পড়ে, একদিন সে কত কিছু করতে চেয়েছিল। কত জায়গায় যাওয়ার কথা ছিল, কত গান শোনার কথা ছিল, কত মানুষের সঙ্গে দেখা করার কথা ছিল।
আজ সেসব কথা মনে করতেও তার কষ্ট হয়।
নিজের ইচ্ছাগুলোকে সে যেন একে একে মাটিচাপা দিয়েছে। মনের ভেতর তৈরি হয়েছে কতগুলো অদৃশ্য কবর। আর সেই কবরগুলোর পাশে সে নিঃশব্দে বসে নিজের অপূর্ণ স্বপ্নগুলোর জিয়ারত করে।
কেউ দেখে না। কেউ জানে না।
সংসারের মানুষটি শুধু ভাবে, সে আগের চেয়ে অনেক শান্ত হয়েছে।
কিন্তু সে জানে না, শান্ত হওয়া আর ভেতর থেকে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া এক কথা নয়।
যখন এক ছাদের নিচে দুটি পৃথিবী
দিন যায়, মাস যায়। সংসারের কাজকর্ম ঠিকই চলে। অথচ দুজন মানুষের মধ্যে কথার চেয়ে নীরবতা বাড়তে থাকে।
একজন ভাবে, অপরজন বুঝি আর আগের মতো ভালোবাসে না। অন্যজন ভাবে, এতদিনেও যখন কেউ তার মনের খবর নিল না, তখন আর বলেই বা কী হবে?
এইভাবে একই ঘরে দুটি আলাদা পৃথিবী তৈরি হয়।
একটি পৃথিবীতে আছে সংসারের হিসাব, দায়িত্ব, নিয়মকানুন এবং কর্তৃত্ব। অন্য পৃথিবীতে আছে অপূর্ণতা, অভিমান, দীর্ঘশ্বাস এবং কিছু না-পাওয়ার বেদনা।
একসময় মানুষটি মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। যে গান শুনলে একদিন তার মন ভালো হতো, আজ সেই গানেও আনন্দ পায় না। পরিচিত মানুষের সঙ্গে কথা বলতেও অনীহা জন্মায়। কখনো অকারণে চোখ ভিজে আসে, কখনো সারারাত ঘুম আসে না।
এমন অবস্থাকে শুধু অভিমান বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ ও অবহেলা মানুষের মনে গভীর অবসাদ তৈরি করতে পারে। তখন তার প্রয়োজন হয় সহমর্মিতা, নিরাপদ পরিবেশ এবং প্রয়োজনে পেশাদার সহায়তা।
কিন্তু সংসারের মানুষটি হয়তো এসবের কিছুই বুঝতে পারে না। সে শুধু বলে, \'ইদানীং তোমাকে কেমন যেন লাগে।\'
কথাটি শুনে মানুষটি মৃদু হাসে। বলে, \'না, কিছু না।\'
তারপর আবার চুপ করে যায়।
অন্য কারও একটি প্রশ্ন
মানুষের জীবনে কখনো কখনো এমন একজন আসে, যে খুব বেশি কিছু করে না। শুধু মন দিয়ে কথা শোনে। জিজ্ঞাসা করে, \'তোমার মন খারাপ কেন?\'
হয়তো এই প্রশ্নটি সে বহুদিন শোনেনি।
যে মানুষটি দীর্ঘদিন নিজের কথা বলার কাউকে পায়নি, তার কাছে এই সামান্য মনোযোগটুকুও বড় হয়ে দেখা দেয়। কেউ তার পছন্দের গানটি শুনতে চায়, কেউ তার পুরোনো স্বপ্নের কথা জানতে চায়, কেউ তার হাসির আড়ালে জমে থাকা কষ্টটুকু বুঝতে চেষ্টা করে।
তখন তার মনে হয়, পৃথিবীতে অন্তত একজন মানুষ আছে, যার কাছে সে নিজের মতো করে কথা বলতে পারে।
কেউ সেই মমতার মধ্যে আশ্রয় খুঁজে পায়, কেউ আবার আবেগের দুর্বল মুহূর্তে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে অন্য সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে।
তবে সব নিঃসঙ্গ মানুষ অন্য সম্পর্কে যায় না। কেউ নিজের ভেতরেই কষ্ট লুকিয়ে রাখে, কেউ সম্পর্কটি মেরামত করার চেষ্টা করে, কেউ নিজের আত্মসম্মান রক্ষায় আলাদা হয়ে যায়।
আর কেউ কেউ ভুল করে ফেলে।
কিন্তু মানুষের ভুলের বিচার করতে গিয়ে তার জীবনের আগের অধ্যায়গুলোও একেবারে মুছে ফেলা যায় না। আবার আগের কষ্টের অজুহাতে পরবর্তী বিশ্বাসভঙ্গকেও নির্দোষ বলা যায় না।
জীবন এত সরল নয়।
তারপর একদিন সংসারের গোপন খবর প্রকাশ পেল
একদিন হয়তো সেই মানুষটির অন্য সম্পর্কের কথা প্রকাশ হয়ে গেল।
সংসারে ঝড় উঠল। এতদিন যে মানুষটি নিজের ইচ্ছাকে সংসারের নিয়ম বলে প্রতিষ্ঠা করেছিল, সে ক্ষোভে ফেটে পড়ল।
বলল, \'আমি কি তার কোনো অভাব রেখেছিলাম? খাওয়াইনি? পরাইনি? এত কিছু করার পরও সে এমন করতে পারল?\'
তার আত্মীয়স্বজনও পাশে এসে দাঁড়ালেন।
কেউ বললেন, \'আমরা তো আগেই বুঝেছিলাম, মানুষটি ভালো নয়।\'
কেউ আবার সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, \'ওকে ভুলে যাও। তোমাকে এমন জায়গায় বিয়ে দেব, যেখানে তুমি রাজরানির মতো থাকবে। সম্রাট শাহজাহানের মমতাজ হয়ে থাকবে।\'
কথাগুলো শুনে সে হয়তো কিছুটা সান্ত্বনা পেল। কিন্তু যে সংসারটি এতদিন ধরে তার চোখের সামনে ছিল, তার ভেতরের গল্পটি কি সে একবারও মনে করার চেষ্টা করল?
একবারও কি মনে পড়ল, কতদিন ধরে অপর মানুষটি নিজের পছন্দের কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিল?
কতদিন ধরে তার মুখে হাসি ছিল না?
কতদিন ধরে দুজনের মধ্যে কোনো মন খুলে কথা হয়নি?
সে কি কখনো জিজ্ঞাসা করেছিল, \'তুমি কি আমার সঙ্গে সুখে আছ?\'
নাকি শুধু জানতে চেয়েছিল, \'আমার কথা মতো চলছ তো?\'
এই প্রশ্ন দুটির মধ্যে যে আকাশ-পাতাল তফাত, তা সে হয়তো কোনোদিন বুঝতেই পারেনি।
ভালোবাসা কি তবে এত কঠিন?
দাম্পত্যে একজন আরেকজনের সম্পত্তি নয়। স্বামী যেমন নিজের পছন্দ নিয়ে বাঁচার অধিকার রাখে, স্ত্রীও তেমনি নিজের স্বপ্ন ও ব্যক্তিসত্তা নিয়ে বাঁচার অধিকার রাখে।
একজনের স্বাধীনতা অন্যজনের প্রতি দায়িত্বহীনতার নাম নয়। আবার দায়িত্বের নামে অন্যজনের সবটুকু স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়াও ভালোবাসা নয়।
সংসারে মতের অমিল থাকবে। কখনো ঝগড়া হবে, অভিমান হবে, ভুল বোঝাবুঝিও হবে। কিন্তু সবকিছুর শেষে দুজনের মধ্যে কথা বলার একটি দরজা খোলা থাকা চাই।
যেখানে একজন বলতে পারবে, \'তোমার এই কথায় আমার কষ্ট হয়েছে।\'
অন্যজন বলতে পারবে, \'আমি বুঝতে পারিনি, আমাকে ক্ষমা করো।\'
সেখানে নিজের ভুল স্বীকার করতে লজ্জা থাকবে না, অন্যের মতামত শুনতে অপমান বোধ হবে না।
কারণ সংসার কোনো আদালত নয়, যেখানে একজন বিচারক হবে আর অন্যজন সারাজীবন আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকবে।
সংসার তো দুটি মানুষের সহযাত্রা। একজনের পা ব্যথা হলে অন্যজন একটু ধীরে হাঁটবে। একজনের মন খারাপ হলে অন্যজন তার পাশে বসবে। একজন ভুল করলে অন্যজন তাকে বোঝাবে। কিন্তু কেউ কাউকে নিজের ইচ্ছার কারাগারে বন্দি করে রাখবে না।
শেষ দৃশ্যের আগে একটি প্রশ্ন
কোনো একদিন যদি সেই নিয়ন্ত্রণকারী মানুষটি হঠাৎ বুঝতে পারে, তার পাশে থাকা মানুষটি আর আগের মতো নেই, তখন হয়তো তার বুকের ভেতরেও শূন্যতা তৈরি হবে।
সে হয়তো অনেক কিছু ফিরিয়ে আনতে চাইবে। পুরোনো দিন, পুরোনো হাসি, একসঙ্গে কাটানো বিকেল, অভিমানের পর কাছে টেনে নেওয়া সেই মুহূর্তগুলো।
কিন্তু সবকিছু কি আর ফিরিয়ে আনা যায়?
যে স্বপ্নগুলো বহুদিন আগে মাটিচাপা পড়েছে, সেগুলো কি শুধু একদিনের অনুতাপে আবার বেঁচে ওঠে?
মানুষকে হারানোর পর তার ভুল খুঁজে পাওয়া সহজ। কিন্তু মানুষটি যখন পাশে ছিল, তখন তার মনের কথা বোঝার চেষ্টা করাই ছিল প্রকৃত ভালোবাসা।
সংসার বাঁচাতে হলে শুধু ঘরটিকে বাঁচালেই হয় না, ঘরের মানুষটিকেও বাঁচিয়ে রাখতে হয়।
কারণ মানুষকে শিকল দিয়ে পাশে রাখা যায়, কিন্তু হৃদয়ে রাখা যায় না। ভয় দেখিয়ে আনুগত্য আদায় করা যায়, ভালোবাসা নয়।
যে সংসারে দুজন মানুষ পাশাপাশি থেকেও নিজের মতো করে নিঃশ্বাস নিতে পারে, যে সংসারে একজনের স্বপ্ন অন্যজনের কাছে বোঝা নয়, বরং আনন্দের বিষয়—সেই সংসারেই ভালোবাসা বেঁচে থাকে।
আর যে সংসারে একজনের আকাশ অন্যজন নিজের হাতে ঢেকে দেয়, সেখানে একসময় দুজন মানুষই অন্ধকারে পথ হারায়।
ভালোবাসা মানুষকে বন্দি করে না, মুক্তি দেয়। ভালোবাসা কারও ডানা কেটে দেয় না, উড়তে সাহস জোগায়।
হয়তো পৃথিবীর সব সংসার টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। সব বিচ্ছেদ ঠেকানোও সম্ভব নয়। কিন্তু ভালোবাসার নামে একজন মানুষকে প্রতিদিন একটু একটু করে মেরে ফেলা থেকে বিরত থাকা নিশ্চয়ই সম্ভব।
আর সেই উপলব্ধিটুকুই যদি একটি মানুষকে তার জীবনসঙ্গীর দিকে নতুন করে তাকাতে শেখায়, তবে এই লেখার সার্থকতা সেখানেই।
















