পরিত্যক্ত পলিথিন ও প্লাস্টিক পুড়িয়ে পেট্রোল, ডিজেল ও গ্যাস তৈরি
জনমত ডেস্ক: পরিত্যক্ত পলিথিন ও প্লাস্টিক বোতল পুড়িয়ে পেট্রোল, অকটেন, ডিজেল ও এলপি গ্যাস তৈরি করে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে কুড়িগ্রামের রাজারহাটে রোস্তম আলী নামের এক ছাত্র । তার তৈরি করা পদ্ধতি ও জ্বালানি সরেজমিনে দেখতে প্রতিদিন শত শত মানুষ ভিড় জমাচ্ছে।
খবর পেয়ে মঙ্গলবার (২৭ আগস্ট) বিকেলে রাজারহাট উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুহ. রাশেদুল হক প্রধানসহ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা রোস্তম আলীর পেট্রোল তৈরি পদ্ধতি পরিদর্শন করেছেন। রোস্তম আলীর তৈরি করা তরল জ্বালানি এক সময় খনিজ সম্পদে প্রভাব ফেলে অর্থনৈতিক ভাবে লাভজনক হবে অনেকে ধারণা করা হচ্ছে।
সরেজমিনে গিয়ে এলাকাবাসী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উপজেলার উমরমজিদ ইউনিয়নের প্রত্যন্ত অঞ্চল বালাকান্দি গ্রামের কৃষক মফিজুল হকের পুত্র রোস্তম আলী(২২) বাড়ির উঠানেই একটি আবদ্ধ তেলের ড্রামে বেশকিছু পরিত্যক্ত পলিথিন রেখে আগুন দিয়ে তাপ দিয়ে পলিথিন গলিয়ে ডিজেল পেট্রোল অকটেন ও এলপি গ্যাস তৈরি করে। এসব জ্বালানি তার নিজস্ব মোটরসাইকেলে দিয়ে চালনা করে এলাকার মানুষকে হতবাক করে দিয়েছে। এছাড়া মাটি ও পানিতে ওই তরল পদার্থ ফেলে দিয়ে আগুন প্রজ্বলিত করে পেট্রোল প্রমাণ করেছেন। তার দেয়া পেট্রোল ও অকটেন ব্যবহারকারী এলাকার বেশ কিছু মোটরসাইকেল আরোহী বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
পলিথিনে পেট্রোল তৈরির ঘটনাটি রাজারহাট উপজেলা, উলিপুর উপজেলা ও কুড়িগ্রাম জেলা শহরে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সাড়া জাগায়। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে শত শত দর্শক এসে রোস্তম আলীর তৈরি করা পেট্রোল ডিজেল অকটেন ও এলপি গ্যাস অবলোকন করেন।
খবর পেয়ে কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসকের নির্দেশে মঙ্গলবার বিকেলে রাজারহাট উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুহ. রাশেদুল হক প্রধানসহ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা রোস্তম আলীর বাড়ি পরিদর্শন করেন। এ সময় তাদের সামনেই রোস্তম আলী পরিত্যক্ত পলিথিন দিয়ে পেট্রোল, অকটেন, ডিজেল ও এলপি গ্যাস তৈরি করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন।
উদ্ভাবক রোস্তম আলী জানান, ছোট বেলায় শীতকালে ঠান্ডার হাত থেকে রক্ষা পেতে খড়কুটো দিয়ে বাড়িতে আগুন জ্বালানো হতো। সেখানে পলিথিন ও প্লাস্টিকের বোতল পোড়ানো হতো। পলিথিন পোড়াতে গিয়ে টোপে টোপে তরল পদার্থ পড়তো। কিন্তু সেটি পরিবেশ বান্ধব ছিল না। এটি নিয়ে রিসার্চ করা হয়। সেই সঙ্গে এই তরল পদার্থ আসলে কি? তা নিয়ে গবেষণা করা হয়।
আড়াই বছর আগে ২০১৭ সালের দিকে একদিন টিনের ছোট কৌটায় পলিথিন পুড়ে তরল পদার্থ বের করি। সেগুলো শোধন করে পরীক্ষা করে দেখতে পাই এগুলো ডিজেল ও পেট্রোল জাতীয় তরল পদার্থ। পরে পরিকল্পনা মোতাবেক পরিত্যক্ত পলিথিন যত্রতত্র ফেলে না দিয়ে এগুলো সংগ্রহ করে একটি আবদ্ধ প্রকোষ্ট ড্রামে ভিতরে রেখে আগুনে অতিমাত্রায় তাপ প্রয়োগ করে গলিয়ে ফেলা হয়। বাস্পায়িত হয়ে ডিজেল এবং নল দিয়ে বের হয়ে পেট্রোল, অকটেন তৈরি হয়। সর্বশেষ পাইপ দিয়ে গ্যাস বের হলে সেখানে আগুন দিলে আগুন লেগে থাকতো। যত তাপমাত্রা বেশি দেয়া হত তত বেশি তরল পদার্থ নির্গত হয়। সেই সাথে গ্যাস বের হয়। এসব সংগৃহীত তরল পদার্থ দু’টি পদ্ধতিতে পরিশোধন করা হয়। এক ছাকন পদ্ধতি দুই থিতানো পদ্ধতি।
উদ্ভাবক রোস্তম আলী দাবি করেন, এই তরল পদার্থগুলো হাইড্রোকার্বন এবং এগুলোর ধর্ম এবং বর্ণ ডিজেল পেট্রোল অকটেন এবং নির্গত গ্যাস এলপি গ্যাস এর মতো। তাই এগুলো ডিজেল পেট্রোল অকটেন ও এলপি গ্যাস। তিনি ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার সুযোগ না পেলেও প্রাথমিকভাবে পরীক্ষা করেছেন।
রোস্তম আলী ওই এলাকার মরহুম মফিজুল হকের কনিষ্ট পুত্র। সে দুই ভাই ও ৩ বোনের মধ্যে সর্বকনিষ্ট। মাত্র ৭ শতক জমির উপর তাদের বসত বাড়ি। এছাড়া তাদের আর কোনও আবাদী জমি নেই। মাত্র ৪ বছর বয়সে সে তার বাবাকে হারিয়েছে। ছোটবেলা থেকেই সে গবেষণায় আগ্রহী। সে ২০১৩ সালে পান্থাবাড়ী বালাকান্দি দ্বি-মূখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ করে। পরে অভাবের কারণে ভাল কলেজে ভর্তি হতে না পেরে কুড়িগ্রাম পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন। ২০১৭ সালে সে ডিপ্লোমা পাশ করে অনলাইন কোর্সে ইনস্টিটিউট অফ ইঞ্জিনিয়ারস বাংলাদেশ (আইইবি) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এ ভর্তি হন। বর্তমানে সে অনলাইনে অধ্যয়নরত। এছাড়া সংসারের হাল ধরতে সে প্রাইভেট টিউটর হিসেবে কাজ করছে। পাশাপাশি গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। তার গবেষণায় পরিবেশ বান্ধব পরিত্যাক্ত পলিথিন প্লাস্টিক থেকে ডিজেল, পেট্রোল, এলপি গ্যাস ছাড়াও বেশ কযেকটি আর্কষণীয় গবেষনা রয়েছে। এর মধ্যে উছিষ্ট পলিথিনের ছাই ফটোসষ্ট্যাট মেশিনের কালি হিসেবে ব্যবহার উপযোগী করার পদ্ধতি চালিয়ে যাচ্ছে।
পার্শ্ববর্তী পান্থাবাড়ী বালাকান্দি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ধনেশ্বর চন্দ্র বর্ম্মণ বলেন, ‘রোস্তম আলী আমাদের ছাত্র ছিল। আমরাই ভাবতে পারিনি সে এতবড় আবিস্কারক হবে। রোস্তম আলী অস্বচ্ছল পরিবারের সন্তান। তাই সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আরও ভাল কিছু করতে পারবে ‘
বুধবার (২৮ আগস্ট) এ ব্যাপারে রাজারহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহ. রাশেদুল হক প্রধান বলেন, ‘রোস্তম আলীর পলিথিন পুড়িয়ে পেট্রোল তৈরির বিষয়টি দেখলাম। এটি একটি ভাল উদ্যোগ। রোস্তম আলীর যদি আরও উন্নতভাবে তৈরি করতে সহযোগিতা লাগে তাহলে সহযোগিতা করা হবে।’



















