img

জমকালো আয়োজনে কমিউনিটি ল্যাঙ্গুয়েজেস সার্ভিস উদ্বোধন করলেন নির্বাহী মেয়র লুৎফর রহমান

প্রকাশিত :  ১৮:৪৩, ৩১ জানুয়ারী ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৮:৫৯, ৩১ জানুয়ারী ২০২৬

টাওয়ার হ্যামলেটসে ২২টি ক্লাসে ৩০০ শিশু নিয়ে শুরু হয়েছে ভাষা শিক্ষা কার্যক্রম

জমকালো আয়োজনে কমিউনিটি ল্যাঙ্গুয়েজেস সার্ভিস উদ্বোধন করলেন নির্বাহী মেয়র লুৎফর রহমান

টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের উদ্যোগে জমকালো আয়োজনে উদ্বোধন হলো কাউন্সিলের ইয়াং কমিউনিটি ল্যাঙ্গুয়েজেস (ওয়াইসিএল) সার্ভিস। ৩০ জানুয়ারী শুক্রবার বিকেল ৫টা থেকে সাতটা পর্যন্ত টাউন হলের গ্রোসার’স উইংয়ে অনুষ্ঠিত এই অনুষ্ঠানে টাওয়ার হ্যামলেটসের এক্সিকিউটিভ মেয়র লুৎফুর রহমান, ডেপুটি মেয়র এবং এডুকেশন ও ইয়ুথ কেবিনেট মেম্বার কাউন্সিলার মাইয়ুম তালুকদার, কাউন্সিলের চিফ এক্সিকিউটিভ স্টিফেন হসলি সহ কাউন্সিলের পদস্থ কমকর্তাবৃন্দ, বাংলাদেশ টিচার্স এসোসিয়েশন (বিটিএ) এর প্রেসিডেন্ট আবু আহমেদ, কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ, অভিভাবক ও শিক্ষকবৃন্দ এবং বিপুল সংখ্যক শিশু কিশোর উপস্থিত ছিলেন।
ওয়াইসিএল সার্ভিসের পরিচালকের স্বাগত বক্তব্যের মাধ্যমে শুরু হয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মূল আনুষ্ঠানিকতা। এরপর সুপরিচিত শিক্ষাবিদ ড. বেকি উইনস্ট্যানলি ‘ঐতিহ্যবাহী ভাষার গুরুত্ব‘ নিয়ে বক্তব্য রাখেন। তাঁর বক্তব্যের পর প্রদর্শিত পাঁচ মিনিটের একটি বিশেষ ডকুমেন্টারিতে ওয়াইসিএল সার্ভিসের লক্ষ্য, কার্যক্রম এবং শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়।
অভিভাবক তাহমিনা খানম, যিনি তার সন্তানদের বাংলা শেখার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, ছোটবেলায় বাংলাদেশে গিয়ে তিনি বাংলা শিখেছিলেন, কিন্তু নিজের সন্তানদের টাওয়ার হ্যামলেটসে সেই সুযোগ করে দিতে পারছিলেন না। এখন তার সন্তানরা বাসায় ছোট ছোট বাংলা শব্দ বলতে পারে, যা তার কাছে বড় আনন্দের বিষয়।
এর পর ভাষা শেখায় অনুপ্রেরণাদায়ক অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন গুলাম হুসেইন। যিনি কাউন্সিলে ডিরেক্টর পদে কাজ করছেন।

এক্সিকিউটিভ মেয়র লুৎফুর রহমান ওয়াইসিএল সার্ভিসের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। তিনি বলেন, “টাওয়ার হ্যামলেটস বহুভাষিক ও বহুসাংস্কৃতিক মানুষের বাসস্থান। যেসব শিশু একাধিক ভাষায় দক্ষ, তারা শিক্ষাগতভাবে আরও ভালো করে, আত্মবিশ্বাসী হয় এবং ভবিষ্যতে বেশি সফল হয়। এ কারণেই আমরা প্রায় এক মিলিয়ন পাউন্ড বরাদ্দ করেছি, যাতে আমাদের শিশুরা শুধু ইংরেজি নয়, নিজেদের কমিউনিটির ভাষা এবং অন্যান্য ভাষা শিখতে পারে।”
তিনি অভিভাবকদের উদ্দেশে বলেন, “আপনার সন্তানের ভাষাগত দক্ষতা যত বাড়বে, তার বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি, মননশীলতা এবং ভবিষ্যতের প্রস্তুতিও ততই শক্তিশালী হবে।”
ডেপুটি মেয়র মাইয়ুম তালুকদার বলেন, "বহু বছর আগে বাজেট কাটছাঁটের কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া কমিউনিটি ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাস আবার চালু হওয়ায় তরুণ তরুণী ও শিশুদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ দেখা গেছে।"
তিনি বলেন, “আমি নিজেই জর্জ গ্রিনস স্কুলে বাংলা পড়েছি এবং ভালো ফল করেছি। তাই জানি কমিউনিটি ভাষা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। এটি মানুষকে একত্র করে, বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে সেতুবন্ধন গড়ে তোলে এবং আমাদের শিকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করে।”
এরপর প্রদর্শিত হয় বিবিসি‘র "বেনেফিট অব বাইলিঙ্গুয়ালিজম" ডকুমেন্টারি, যেখানে বহুভাষিক দক্ষতার উপকারিতা তুলে ধরা হয়।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে ছিলো শিশু কিশোরদের পরিবেশনা। আরবি ও বাংলা ছড়া-গান, বাংলা কবিতা, সোমালি গান এবং চাইনিজ লায়ন ডান্সে টাউন হল প্রাঙ্গণ প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। বিভিন্ন ভাষার শিশুদের সম্মিলিত পরিবেশনায় বহুসংস্কৃতির আবহ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
চাইনিজ শিক্ষক জিয়াংকান ইয়াং বলেন, “যখন শিশুরা চাইনিজ ভাষায় শুভেচ্ছা জানিয়ে ক্লাসে প্রবেশ করে, তখন তা শুনে এক ভিন্ন রকম আনন্দ তৈরি হয়।”
ছয় বছরের শিক্ষার্থী মাইমুনা জানায়, সে এখন অ, আ পড়তে পারে,যা তার কাছে খুবই রোমাঞ্চকর।

উল্লেখ্য, কমিউনিটি লেঙ্গুয়েজ সার্ভিসের আওতায় বর্তমানে বারার আটটি কেন্দ্রে বাংলা, আরবি, ক্যান্টনিজ, ম্যান্ডারিন ও সোমালি - এই পাঁচটি ভাষায় সপ্তাহে মোট ২২টি ক্লাস চলছে এবং প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী অংশ নিচ্ছে। স্কুল সময়ের বাইরে এবং সপ্তাহান্তে পরিচালিত এসব ক্লাস শিশুদের শুধু ভাষা শেখার সুযোগই দিচ্ছে না, বরং তাদের নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করছে। তাছাড়া কাউন্সিল ভবিষ্যতে আরও বেশি স্কুল ও কমিউনিটি সেন্টারে ক্লাস চালুর পরিকল্পনা করছে। ২০২৬ সালের মে মাস থেকে বাংলা ও অন্যান্য কমিউনিটি ভাষায় জিসিএসই এবং এ-লেভেল পর্যায়ের পাঠদান চালুর প্রস্তুতিও চলছে, যাতে শিক্ষার্থীরা ২০২৭ সালের পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে। প্রাইমারি শেষ করা শিক্ষার্থীদের বিশেষ সার্টিফিকেট দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে তারা ভাষাশিক্ষা চালিয়ে যেতে উৎসাহিত হয়।

এই সার্ভিস টাওয়ার হ্যামলেটসে বসবাসকারী, এই বারার স্কুলে অধ্যয়নরত এবং যাদের বাবা মা বা অভিভাবক টাওয়ার হ্যামলেটসে কাজ করেন, তাদের সবার জন্যই উন্মুক্ত। ফলে বহু পরিবার সহজে সুবিধা নিতে পারছে এবং শিশুরা নিজেদের মাতৃভাষা ও কমিউনিটি ভাষার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের সুযোগ পাচ্ছে।
 

কমিউনিটি এর আরও খবর

লন্ডনে বাংলাদেশি প্রবীণদের আবাসন বৈষম্য নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা

img

হাউস অব লর্ডসে উন্মোচিত হলো ‘আমার বাড়ি, আমার জীবন’

প্রকাশিত :  ০৮:৪৭, ১২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৯:২৯, ১২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

লন্ডন, ৫ ফেব্রুয়ারি: পূর্ব লন্ডনের বাংলাদেশি কমিউনিটির প্রবীণদের আবাসন বাস্তবতা নিয়ে পরিচালিত গবেষণা প্রতিবেদন “আমার বাড়ি, আমার জীবন” আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচন করা হয়েছে লন্ডনের হাউস অব লর্ডসের চোলমন্ডেলি রুমে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন লর্ড বেস্ট, OBE, DL। তিনি গবেষণাটিকে “অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, সুসংহত ও লক্ষ্যভিত্তিক” হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, এটি এমন একটি কাজ যা সিভিল সার্ভেন্ট ও মন্ত্রীদের গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া উচিত। তাঁর মতে, গবেষণাটি বাস্তব ও অর্থবহ পরিবর্তন আনতে সক্ষম।

তিন বছরব্যাপী এই গবেষণাটি ভিভেনসা ফাউন্ডেশনের কমিশনে পরিচালিত হয় এবং এতে অংশীদার ছিল দ্য ওপেন ইউনিভার্সিটি, বাংলা হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন এবং হাউজিং লার্নিং অ্যান্ড ইমপ্রুভমেন্ট নেটওয়ার্ক (Housing LIN)। গবেষণায় টাওয়ার হ্যামলেটস, নিউহ্যাম, হ্যাকনি ও রেডব্রিজে বসবাসরত ৫০ বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সী ৭৬ জন বাংলাদেশি নারী-পুরুষের পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।

গবেষণাটি দেখিয়েছে, আজীবন চলমান আবাসন বৈষম্য বার্ধক্যে এসে আরও ঘনীভূত হয় এবং তা প্রবীণদের স্বাস্থ্য, সামাজিক কেয়ার, পারিবারিক সম্পর্ক ও সামগ্রিক সুস্থতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। অংশগ্রহণকারী অনেক প্রবীণ এমন ঘরে বসবাস করছেন, যা তাদের বয়সজনিত শারীরিক সীমাবদ্ধতা, দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা কিংবা চলাফেরার প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

বিশেষ করে সোশ্যাল হাউজিং ও প্রাইভেট ভাড়া বাসায় বসবাসকারীদের মধ্যে স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ, বাতাস চলাচলের অভাব এবং হিটিং সমস্যার বিষয়টি ব্যাপকভাবে উঠে এসেছে। এসব কারণে শ্বাসকষ্ট, সংক্রমণ ও মানসিক অবসাদের ঝুঁকি বাড়ছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

গবেষণায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে ‘কার্যকরী অতিরিক্ত ভিড়’ বা জনাকীর্ণ বসবাস। অধিকাংশ বাসস্থান একক পরিবারের ধারণায় নির্মিত হলেও বাস্তবে অনেক বাংলাদেশি পরিবার যৌথ বা মাল্টি-জেনারেশনাল কাঠামোয় বসবাস করে। এর ফলে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অভাব, পারিবারিক টানাপোড়েন এবং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক চর্চায় বাধা তৈরি হচ্ছে।

অনেক প্রবীণ অভিযোগ করেছেন, কাউন্সিল বা বাড়িওয়ালার কাছে সহায়তা চাইলে তারা ধীর বা অনুপযুক্ত সাড়া পান। ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে অনেকেই শেষ পর্যন্ত আবেদন করা থেকে সরে দাঁড়ান। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ ও অনুপযুক্ত পরিবেশেই তাদের বসবাস অব্যাহত থাকে, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবারের ওপর কেয়ারের চাপও বৃদ্ধি করে।

দ্য ওপেন ইউনিভার্সিটির বার্ধক্য বিষয়ক সিনিয়র লেকচারার এবং গবেষণার প্রধান গবেষক মানিক গোপীনাথ বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে বয়স্ক বাংলাদেশি মানুষরা বার্ধক্য ও আবাসন–সংক্রান্ত গবেষণা ও নীতিনির্ধারণে অদৃশ্য থেকেছেন। এই গবেষণা তাদের কণ্ঠকে কেন্দ্রে এনে দেখিয়েছে—বৈষম্য কেবল বিদ্যমান নয়, বরং তা প্রতিদিনের জীবনে কীভাবে অনুভূত হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে আজীবন বঞ্চনার পরিণতি হিসেবে কীভাবে প্রকাশ পায়।”

বাংলা হাউজিং অ্যাসোসিয়েশনের সিইও বশির উদ্দিন বলেন, “গবেষণা তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা বাস্তব পদক্ষেপে রূপ নেয়। এটি একটি স্পষ্ট ‘কল টু অ্যাকশন’। বিদ্যমান ঘরগুলোকে বসবাসযোগ্য করে তুলতে প্রয়োজনীয় অভিযোজন নিশ্চিত করতে হবে এবং নতুন নির্মাণে বড় ও পরিবার–উপযোগী বাসস্থানের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।”

গবেষণাটি নীতিনির্ধারক ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের প্রতি কয়েকটি সুস্পষ্ট সুপারিশ তুলে ধরেছে। এর মধ্যে রয়েছে—জাতিগত ও বয়সভিত্তিক বিভাজিত আবাসন তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ, প্রবীণদের জন্য বাসায় বিশেষ সুবিধা সংযোজনের পথে বৈষম্যমূলক বাধা দূর করা, মাল্টি-জেনারেশনাল বসবাসকে বৈধ আবাসন পছন্দ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং আবাসনকে স্বাস্থ্য ও সামাজিক কেয়ারের সঙ্গে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা।

গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে যে, ২০৫০ সালের আবাসনের প্রায় ৮০ শতাংশ ইতোমধ্যেই বিদ্যমান। ফলে বিদ্যমান বাসস্থানগুলোকে আরও নিরাপদ, প্রবেশগম্য ও বয়স-উপযোগী করে তোলা এখনই জরুরি। অন্যথায় আবাসন–সংক্রান্ত বৈষম্য ভবিষ্যতে জাতিগত, স্বাস্থ্য ও কেয়ার–সংক্রান্ত বৈষম্যকে আরও গভীর করবে।

সব মিলিয়ে,  ‘আমার বাড়ি, আমার জীবন’ শুধু একটি গবেষণা প্রতিবেদন নয়—এটি পূর্ব লন্ডনের প্রবীণ বাংলাদেশি কমিউনিটির জীবনসংগ্রামের এক মানবিক দলিল। গবেষণাটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে: উপযুক্ত আবাসন ছাড়া মর্যাদাপূর্ণ ও সুস্থ বার্ধক্য নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

কমিউনিটি এর আরও খবর