মৌলভীবাজারের পাঁচ ভাষাসৈনিকই রয়ে গেলেন স্বীকৃতির বাইরে
একজন জীবিত, চারজন প্রয়াত
সংগ্রাম দত্ত: ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠে আমাদের জাতিসত্তা, আত্মপরিচয় ও রাষ্ট্রচেতনার ভিত্তি। অথচ সেই ঐতিহাসিক আন্দোলনের ৭৪ বছর পেরিয়ে গেলেও মৌলভীবাজার জেলার পাঁচজন ভাষাসৈনিক আজও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাননি। তাঁদের অবদান নিয়ে নেই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়ন, নেই রাষ্ট্রীয় কোনো স্মারক বা স্থায়ী উদ্যোগ।
এই পাঁচ ভাষাসৈনিক হলেন সাবেক জাতীয় সংসদ সদস্য মোহাম্মদ ইলিয়াস, সৈয়দ মতিউর রহমান, মফিজ আলী, রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী ও ডা. মোঃ আব্দুল আলী। তাঁদের মধ্যে বর্তমানে একমাত্র জীবিত ভাষাসৈনিক হলেন রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী। জীবনের দীর্ঘ সময় সংগ্রাম ও আন্দোলনে কাটালেও তিনি আজও নীরবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছেন।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভাষাসৈনিকদের নামে সড়ক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্মৃতিফলক কিংবা বৃত্তি চালু থাকলেও মৌলভীবাজারের এই পাঁচ কৃতী সন্তানের ক্ষেত্রে সরকারি কিংবা বেসরকারি কোনো কার্যকর উদ্যোগ এখনো চোখে পড়েনি। ফলে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে তাঁদের নাম অনেকটাই আড়ালে রয়ে গেছে।
কমলগঞ্জ থানার কুশালপুর গ্রামে জন্মগ্রহণকারী মোহাম্মদ ইলিয়াস ছিলেন ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে ঢাকার রাজপথের একজন সক্রিয় সংগঠক। তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় সংগঠকের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ১৯৭০, ১৯৭৯ ও ১৯৮৬ সালে তিনি জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ—প্রতিটি অধ্যায়েই তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ ও সুস্পষ্ট।
কমলগঞ্জ থানার শ্রীরামপুর গ্রামের সন্তান সৈয়দ মতিউর রহমান ছিলেন ভাষা আন্দোলনের অন্যতম স্থানীয় সংগঠক, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) সক্রিয় নেতা ও প্রখ্যাত সাংবাদিক। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তিনি মৌলভীবাজারের বিভিন্ন স্কুল ও মাদ্রাসায় ছাত্র ধর্মঘট পালনে নেতৃত্ব দেন। তাঁর নেতৃত্বে কমলগঞ্জ সদর, শমশেরনগর, ভানুগাছ ও শ্রীমঙ্গলে প্রতিবাদ সভা ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। ভাষা আন্দোলনের পাশাপাশি তিনি ’৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৩ সালের বালিশিরা পাহাড় আন্দোলন, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধেও সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। স্থানীয় পর্যায়ে তিনি মরণোত্তর সম্মাননা পেলেও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আজও পাননি।
কমলগঞ্জ থানার ধূপাটিলা গ্রামের প্রয়াত মফিজ আলী ভাষা আন্দোলনের সময় সিলেট, শমশেরনগর ও কমলগঞ্জকেন্দ্রিক আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি প্রগতিশীল রাজনীতির পাশাপাশি পূর্ব পাকিস্তান চা শ্রমিক সংঘের শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। ২০০৩ সালে কমলগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়া হলেও এরপর আর কোনো রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত তাঁর নিরলস সংগ্রামের কারণে এলাকায় তিনি আজও ‘বিপ্লবী মফিজ আলী’ নামেই পরিচিত।
শ্রীমঙ্গল থানার নোয়াগাঁও গ্রামে জন্ম নেওয়া রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী দীর্ঘ সাত দশক ধরে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সামনের সারিতে নেতৃত্ব দিয়ে এসেছেন। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ’৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৩ সালের বালিশিরা পাহাড় আন্দোলন, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ও ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ—সব আন্দোলনেই তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ভারতে একটি প্রশিক্ষণ ক্যাম্প পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন তিনি। স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গঠনে ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে ভারত সরকার তাঁকে সম্মানসূচক সার্টিফিকেট প্রদান করে।
১৯৭০ সালের বহুল আলোচিত ‘পাকিস্তান ভাঙা (জয় বাংলা) মামলায়’ প্রথম আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার হয়ে কারাবরণ করেন রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী। তাঁর গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে শ্রীমঙ্গলজুড়ে ছাত্র-জনতা, কৃষক ও শ্রমিকদের তীব্র আন্দোলন গড়ে ওঠে। প্রবল গণচাপের মুখে পাকিস্তান সরকার শেষ পর্যন্ত তাঁকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। তবু দুঃখজনকভাবে সংকীর্ণ রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে ২০১৭ সালে তাঁর নাম মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
শ্রীমঙ্গল থানার শ্রীমঙ্গল বস্তি (বর্তমান লালবাগ এলাকা)–তে জন্মগ্রহণকারী প্রয়াত ডা. মোঃ আব্দুল আলী ছিলেন ভাষা আন্দোলনের একজন সক্রিয় সংগঠক। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে আশির দশক পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তিনি নেতৃত্ব দেন। ১৯৬৯ সালে শ্রীমঙ্গলে আওয়ামী লীগের থানা কমিটি গঠনের সময় যে কজন উদ্যোগী সংগঠক ভূমিকা রাখেন, তাঁদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। রাজনৈতিক আন্দোলনের পাশাপাশি একজন চিকিৎসক হিসেবেও তিনি সাধারণ মানুষের পাশে ছিলেন।
স্থানীয় পর্যায়ের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার কারণে এবং বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের কিছু প্রভাবশালী মহলের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির ফলে এই পাঁচ ভাষাসৈনিকের অবদান রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যথাযথভাবে উঠে আসেনি। অথচ ভাষা আন্দোলন আমাদের রাষ্ট্রচেতনার ভিত্তি, আর সেই আন্দোলনের সৈনিকদের স্বীকৃতি দেওয়া রাষ্ট্রের নৈতিক ও ঐতিহাসিক দায়িত্ব।
কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গলের এই পাঁচ ভাষাসৈনিক—বিশেষ করে জীবিত থেকেও দীর্ঘ ৭৪ বছর স্বীকৃতিবঞ্চিত রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী—আজ ইতিহাসের এক উপেক্ষিত অধ্যায়। তাঁদের নামে সড়ক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্মারক কিংবা রাষ্ট্রীয় সম্মাননা প্রদান এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় ভাষার জন্য আত্মনিবেদনকারী মানুষগুলোর প্রতি অবজ্ঞার দায় ইতিহাস একদিন আমাদের সবার কাছেই প্রশ্ন হয়ে ফিরে আসবে।



















