img

ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা : দুশ্চিন্তা বিভ্রান্তি অশান্তিতে আল্লাহর ওপর ভরসা

প্রকাশিত :  ১৩:২৩, ০১ মে ২০২৬

ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা : দুশ্চিন্তা বিভ্রান্তি অশান্তিতে আল্লাহর ওপর ভরসা

শায়খ আবদুল কাইয়ুম

আমরা অনেক সময় দুশ্চিন্তা, ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়, নিজের ব্যর্থতার অনুভূতি এবং মনের অশান্তির মধ্যে থাকি । কখনো কখনো ইবাদতের সময়ও আমরা কষ্ট পাই। নামাজে দাঁড়াই, কিন্তু মন বসে না। কুরআন খুলি, কিন্তু হৃদয় দূরে থাকে। তবুও আমরা অনেক সময় শান্তি খুঁজি আল্লাহ ছাড়া অন্য কোথাও, আর ভুলে যাই সেই সত্তাকে, যিনি আসল শক্তি, সাহায্য এবং পথনির্দেশের মালিক।

রাসূলুল্লাহ (সা:) আমাদের এই উম্মাহকে কোনো দিকনির্দেশনা ছাড়া রেখে যাননি। তিনি হৃদয়ের রোগগুলো চিনিয়ে দিয়েছেন এবং তার স্পষ্ট ও বাস্তব সমাধানও শিখিয়েছেন । সেই সমাধান হলো—আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া, তাঁর ওপর পুরোপুরি ভরসা করা এবং তাঁর ফয়সালার কাছে নিজেকে সঁপে দেওয়া।

কিন্তু আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়ার মানে কী? এর মানে হলো—পুরো বিশ্বাস রাখা যে, আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কোনো উপকার বা ক্ষতি আমাদের কাছে আসতে পারে না। জীবনের প্রতিটি বিষয়—সফলতা, ব্যর্থতা, সুখ, কষ্ট—সবই আল্লাহর হাতে । শুধু কষ্টের সময় নয়, সুখের সময়েও তাঁর দিকে ফিরে যাওয়া। নিজের দুর্বলতা বুঝে তাঁর ইবাদত করা।

এ কারণেই আমরা প্রতিদিন নামাজের প্রতিটি রাকাতে এই দোআ পড়ি।

“আমরা শুধু তোমারই ইবাদত করি, এবং শুধু তোমার কাছেই সাহায্য চাই।”

(কুরআন ১:৫)

একবার চিন্তা করুন—আমরা দিনে বহুবার স্বীকার করছি যে, আল্লাহর সাহায্য ছাড়া আমরা ঠিকভাবে ইবাদতও করতে পারি না। আমরা বলছি: “হে আল্লাহ, তোমার সাহায্য ছাড়া আমি ভালোভাবে নামাজও পড়তে পারি না।”

একজন আলেম বলেছেন: “যাকে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে অনুপ্রাণিত করা হয়েছে, সে ইতিমধ্যেই সফল হয়েছে। আরেকজন বলেছেন: “আমি অবাক হই সেই ব্যক্তির ওপর, যে আল্লাহর কাছে সাহায্য চায় না, কিন্তু মুক্তি আশা করে।

আমাদের বুঝতে হবে—আমরা দুর্বল । আল্লাহ নিজেই বলেছেন, মানুষকে দুর্বল করে সৃষ্টি করা হয়েছে।” (কুরআন ৪:২৮)

আপনি আপনাকে যতই শক্তিশালী ভাবুন না কেন—আপনার সম্পদ, স্বাস্থ্য, অবস্থান—সবকিছু এক মুহূর্তে বদলে যেতে পারে।

তাহলে আমরা কোথায় ফিরব? আল্লাহ তায়ালা বলেন: “যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে—তিনিই তার জন্য যথেষ্ট।” (কুরআন ৬৫:৩)। আমাদের আসল শক্তি নিজের আত্মবিশ্বাসে নয়, বরং আল্লাহর ওপর সম্পূর্ণ ভরসায়।

রাসূল (সা:) বলেছেন: শক্তিশালী মুমিন দুর্বল মুমিনের চেয়ে উত্তম ও আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয়, তবে উভয়ের মধ্যেই কল্যাণ আছে।

তিনি আমাদের একটি সুন্দর পথনির্দেশ দিয়েছেন। যা উপকারী, তা অর্জনের চেষ্টা করো, আল্লাহর সাহায্য চাও, এবং হাল ছেড়ো না। যদি কিছু হয়ে যায়, তাহলে “যদি এমন করতাম…” এসব বলো না। বরং বলো: আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন, তাই হয়েছে।”

কারণ “যদি” শব্দটি শয়তানের দরজা খুলে দেয় । অনুশোচনা আর দুঃখ বাড়ায়। কিন্তু মুমিন সেই দরজা বন্ধ করে দেয় আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থেকে।

আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া শুধু বড় বিষয় নয়—ছোট বিষয়েও। রাসূল (সা:) মুআয (রা:)-এর হাত ধরে বলেছিলেন: “আমি তোমাকে ভালোবাসি।” তারপর একটি দোআ শিখিয়েছিলেন: “হে আল্লাহ, আমাকে সাহায্য করো যেন আমি তোমাকে স্মরণ করতে পারি, তোমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারি, এবং সুন্দরভাবে তোমার ইবাদত করতে পারি।”

এমনকি আমাদের ইবাদতেও আল্লাহর সাহায্য প্রয়োজন। রাসূল (সা:) আরও বলেছেন, তোমাদের কেউ যেন তার সব প্রয়োজনে আল্লাহর কাছে চায়-এমনকি জুতার ফিতা ছিঁড়ে গেলেও। কিছুই ছোট নয়। প্রতিটি প্রয়োজনের জন্য আল্লাহর দিকে ফিরে যেতে হবে।

কারণ আল্লাহর ওপর ভরসা শুধু একটি কাজ নয়—এটি একটি সম্পর্ক। বলা হয়েছে, আল্লাহর ওপর ভরসা করা দ্বীনের অর্ধেক, আর বাকি অর্ধেক হলো তাঁর দিকে ফিরে আসা।

তাই আসুন, প্রতিটি দুশ্চিন্তায়, প্রতিটি বিভ্রান্তিতে আমরা আল্লাহর দিকে ফিরে আসি । চারদিকে সমাধান খোঁজার আগে তাঁর সাথে সম্পর্ক ঠিক করি।

আমরা সব জায়গায় সমাধান খুঁজি, কিন্তু ভুলে যাই সেই সত্তাকে, যিনি সবকিছুর নিয়ন্ত্রক।

হে আল্লাহ, আমাদেরকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করুন যারা সত্যিকারভাবে আপনার ওপর ভরসা করে। আমাদের অন্তরকে ঈমান দিয়ে শক্তিশালী করুন।

আমাদেরকে সাহায্য করুন যেন আমরা আপনাকে স্মরণ করতে পারি, কৃতজ্ঞ হতে পারি, এবং সুন্দরভাবে ইবাদত করতে পারি।

হে আল্লাহ, আমাদের অন্তরে শান্তি দিন এবং আপনার যেকোনো সিন্ধান্তে সন্তুষ্টি দান করুন। আমীন।


শায়খ আবদুল কাইয়ুম: প্রধান ইমাম ও খতীব, ইস্ট লন্ডন মস্ক এন্ড লন্ডন মুসলিম সেন্টার । জুমার খুতবা, ২৪ এপ্রিল ২০২৬।

কমিউনিটি এর আরও খবর

img

ইতালিতে নয়ন খুনের নেপথ্যে বড় ভাইয়ের পরকীয়া

প্রকাশিত :  ১৬:৪০, ০১ মে ২০২৬

শোকের মাতম থামছেই না মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ী উপজেলার পশ্চিম সোনারং গ্রামে। ইতালির লেইজ শহরে বড় ভাই হুমায়ুন ফকিরের হাতে ছোট ভাই নয়ন ফকির খুনের ঘটনায় একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে। বিদেশের মাটিতে এই হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে বড় ভাইয়ের পরকীয়া, দ্বিতীয় বিয়ে এবং আর্থিক দ্বন্দ্বের এক জটিল সমীকরণ।

জানা যায়, ঘাতক হুমায়ুন ফকিরের প্রথম স্ত্রী আমেনা আফরিন থাকলেও, তিনি তায়েবার (চাচাতো বোন) সঙ্গে দীর্ঘদিনের পরকীয়া সম্পর্কে লিপ্ত ছিলেন।

তিন বছর আগে টেলিফোনে আমেনাকে (প্রথম স্ত্রী) বিয়ে করলেও, হুমায়ুন দুই বছর আগে ছুটিতে দেশে এসে গোপনে চাচাতো বোন তায়েবাকে (দ্বিতীয় স্ত্রী) বিয়ে করেন। এই দ্বিতীয় বিয়েটি হুমায়ুনের মা-বাবা এবং পরিবার মেনে নেয়নি। এ নিয়ে পরিবারের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে কলহ চলছিল।

পরে হুমায়ুনের দ্বিতীয় স্ত্রী তায়েবাকে বাড়িতে তোলার খবর শুনে তার বাবা দেলোয়ার হোসেন ক্ষিপ্ত হয়ে ওই ঘরের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

 এ কারণে নিজের মা-বাবা ও ছোট ভাই নয়নের ওপর চরম ক্ষুব্ধ ছিলেন হুমায়ুন। প্রথম স্ত্রীকে তাড়িয়ে দেওয়ার জন্য ৫ লাখ টাকার বিনিময়ে একটি সমঝোতাও করেছিলেন হুমায়ুন।

এ ছাড়া বড় ভাই হুমায়ুন ছোট ভাই নয়নকে ১৩ লাখ টাকা খরচ করে ইতালি নিলেও, নয়ন তাকে বিভিন্ন সময়ে ২০ লাখ টাকা ফেরত দিয়েছিলেন। কিন্তু সম্প্রতি হুমায়ুন তার মা-বাবার ভরণপোষণ বাবদ খরচ করা ১৬ লাখ টাকার অর্ধেক, অর্থাৎ ৮ লাখ টাকা নয়নের কাছে দাবি করেন।

নয়ন সেই টাকা দিতে রাজি হওয়া সত্ত্বেও হুমায়ুন পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটান বলে পরিবারের অভিযোগ।

নিহত নয়ন ও ঘাতক হুমায়ুনের একমাত্র বোন দিলারা আক্তার তার বড় ভাইয়ের সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি দাবি করেছেন। অন্যদিকে, প্রথম স্ত্রী আমেনা আফরিন অভিযোগ করেছেন যে, হুমায়ুন তাকে নিয়মিত মানসিক নির্যাতন করতেন এবং ভরণপোষণ দিতেন না। অভিযুক্ত হুমায়ুন বর্তমানে ইতালি পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন।

উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) ইতালির সময় বিকেল ৫টায় নয়ন তার বড় ভাই হুমায়ুনের বাড়ির নিচে বৈদ্যুতিক সাইকেল চার্জ দিতে যান।

নয়ন যখন প্লাগ লাগাতে নিচু হন, তখন ওত পেতে থাকা হুমায়ুন পেছন থেকে ছুরি দিয়ে নয়নের পিঠে ও মাথায় আঘাত করে তাকে হত্যা করে। হত্যার পর ভিডিও কলের মাধ্যমে মরদেহ দেশে থাকা মা-বাবাকে দেখান হুমায়ুন।

কমিউনিটি এর আরও খবর