img

রেজুয়ান আহম্মেদ: সাহিত্যিক বিবেক, নাকি আত্মঘোষিত নৈতিক অভিভাবক?

প্রকাশিত :  ০৫:০৭, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

রেজুয়ান আহম্মেদ: সাহিত্যিক বিবেক, নাকি আত্মঘোষিত নৈতিক অভিভাবক?

✍️ ড. নাজমুল ইসলাম 

সমকালীন বাংলা সাহিত্যে রেজুয়ান আহম্মেদ নিজেকে এমন এক অবস্থানে স্থাপন করেছেন, যেখানে তিনি কেবল গল্পকার নন—একজন নৈতিক ভাষ্যকারও। তিনি প্রান্তিক মানুষের কথা বলেন, আন্তর্জাতিক যুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন, পুঁজিবাজারের অসংগতি বিশ্লেষণ করেন, মনস্তত্ত্ব ব্যাখ্যা করেন। প্রশ্ন হলো—এতসব উচ্চারণের ভেতরে শিল্প কতটা স্বাধীন থাকে?

প্রান্তিকতার ভাষ্য: সহমর্মিতা নাকি নৈতিক আধিপত্য?

\'এক মুঠো গল্প\'-এ তিনি দরিদ্র, বঞ্চিত ও নিঃশব্দ মানুষের কথা বলেন। কিন্তু এই সহমর্মিতা অনেক সময় এমন এক নৈতিক উচ্চভূমি থেকে উচ্চারিত হয়, যেখানে লেখক চরিত্রের পাশে না দাঁড়িয়ে, তাদের ওপর দাঁড়িয়ে কথা বলছেন—এমন অনুভূতি তৈরি হয়।

প্রশ্ন উঠতেই পারে: প্রান্তিক মানুষের গল্প কি তাঁদের নিজস্ব জটিলতায় উন্মুক্ত হয়েছে, নাকি লেখকের পূর্বনির্ধারিত সামাজিক বার্তার বাহক হয়ে উঠেছে? যখন গল্পের পরিণতি আগে থেকেই অনুমেয় হয়ে যায়, তখন তা শিল্প নয়—এক ধরনের নৈতিক রচনা হয়ে ওঠে।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় যেখানে চরিত্রকে নিজের অন্ধকারসহ বাঁচতে দিয়েছেন, রেজুয়ান সেখানে চরিত্রকে প্রায়শই নৈতিক প্রতীকে রূপান্তর করেন। এই পার্থক্যই তাঁকে প্রভাবিত উত্তরসূরি হিসেবে রাখে, কিন্তু সমান উচ্চতায় নয়।

\'গাজার দিনগুলো\': মানবতা নাকি রাজনৈতিক অবস্থান?

গাজার যুদ্ধ নিয়ে লেখা তাঁর সাহসিকতা স্বীকার করতেই হয়। কিন্তু সাহস আর শিল্প এক জিনিস নয়। সাহিত্যে যখন রাজনৈতিক অবস্থান প্রবল হয়ে ওঠে, তখন চরিত্রের জটিলতা প্রায়শই স্লোগানের আড়ালে হারিয়ে যায়।

রেজুয়ানের উপন্যাসে মানবতার উচ্চারণ আছে, কিন্তু মানবিক দ্বন্দ্বের জটিলতা সীমিত। চরিত্রগুলো অনেক সময় ব্যক্তি নয়—একেকটি নৈতিক অবস্থানের প্রতিনিধি। এতে পাঠক আবেগপ্রবণ হন, কিন্তু চিন্তার গভীর সংকটে পড়েন না।

সাহিত্য যদি প্রশ্ন তোলে, রেজুয়ান সেখানে উত্তর দেন। আর সাহিত্য যখন উত্তর দিয়ে ফেলে, তখন বিতর্কের জায়গা সংকুচিত হয়।

বিশ্লেষণাত্মক মন: শিল্পের বন্ধু, নাকি শত্রু?

রেজুয়ান অর্থনীতি ও পুঁজিবাজার বিশ্লেষণে পারদর্শী। কিন্তু এই বিশ্লেষণী অভ্যাস তাঁর সাহিত্যেও প্রবেশ করেছে। গল্পের মাঝখানে হঠাৎ সমাজ-অর্থনৈতিক ব্যাখ্যার ঢেউ ওঠে। শিল্প যেখানে ইঙ্গিতে কাজ করে, সেখানে তিনি যুক্তির আলো জ্বালান।

এতে তাঁর লেখায় বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি আছে—কিন্তু রহস্য কম। পাঠককে ভাবতে দেওয়ার বদলে তিনি নিজেই ভাবনার দিশা দেখিয়ে দেন।

সাহিত্যের বড় শক্তি হলো অনিশ্চয়তা; রেজুয়ান সেই অনিশ্চয়তাকে পুরোপুরি গ্রহণ করেন না।

তিনি কি সময়ের লেখক, নাকি সময়ের সমালোচক?

রেজুয়ান নিজেকে সময়ের বিবেক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান—এমন আভাস তাঁর লেখায় স্পষ্ট। কিন্তু সাহিত্যে বিবেক হওয়ার আগে শিল্পী হওয়া জরুরি।

যদি তুলনা টানা হয়—সমকালীন অনেক লেখক যেখানে ব্যক্তিগত বেদনা ও সামাজিক সংকটকে জটিল আখ্যানের ভেতর ঢুকিয়ে দেন, রেজুয়ান সেখানে অবস্থানকে স্পষ্ট করেন, দ্বন্দ্বকে সরল করেন। এতে তাঁর বক্তব্য পরিষ্কার, কিন্তু সাহিত্যিক অনিশ্চয়তা কম।

শেষ প্রশ্ন: আলোচনার কেন্দ্রে, নাকি সীমান্তে?

রেজুয়ান আহম্মেদ নিঃসন্দেহে সাহসী, প্রাসঙ্গিক এবং বুদ্ধিদীপ্ত লেখক। তাঁর সততা ও অবস্থান প্রশ্নাতীত। কিন্তু সাহিত্য কেবল অবস্থানের শক্তিতে টিকে থাকে না; টিকে থাকে গভীরতা, দ্বন্দ্ব, নীরবতা ও অনির্দেশ্যতার ওপর।

তিনি আলোচিত—কারণ তিনি স্পষ্ট।

তিনি গুরুত্বপূর্ণ—কারণ তিনি সময়ের প্রশ্ন তোলেন।

কিন্তু তিনি কি পরিণত শিল্পী—যিনি নিজের বক্তব্যকেও সন্দেহ করতে পারেন?

সমকালীন বাংলা সাহিত্যে তাঁর স্থান অন্যতম। তিনি এক সম্ভাবনার প্রান্তে দাঁড়িয়ে। এখন দেখার—তিনি কি নিজের উচ্চারণকে সংযমে রূপ দেবেন, নাকি অবস্থানের দৃঢ়তায়ই আটকে থাকবেন।


img

মানুষ মানুষের জন্য

প্রকাশিত :  ০৭:২০, ০৬ জুন ২০২৬

রেজুয়ান আহম্মেদ
“সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।”
— চণ্ডীদাস
মানবসভ্যতার ইতিহাসের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত যে মূলমন্ত্রটি সমাজকে টিকিয়ে রেখেছে, তা হলো ‘মনুষ্যত্ব’। সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে মানুষের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তার সহমর্মিতা ও ভালোবাসার ক্ষমতা। কবি চণ্ডীদাস বহু বছর আগে মানুষের এই শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু আধুনিক যুগে এসে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির সমান্তরালে মানুষের আত্মিক জগতে এক অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি হয়েছে। মানুষ আজ যান্ত্রিক গতিশীলতায় অন্ধ হয়ে নিজের ভেতরের দয়া ও সহানুভূতি হারিয়ে ফেলছে। অথচ ইতিহাসের প্রতিটি সংকটে বারবার প্রমাণিত হয়েছে যে, সভ্যতার শেষ আশ্রয় কোনো ইট-পাথরের প্রাসাদে নয়, বরং তা লুকিয়ে আছে মানুষের বাড়িয়ে দেওয়া উষ্ণ হাতটির ভেতর।
সময়ের আবর্তনে শহরের পিচঢালা রাজপথ, বহুতল ভবন আর নিয়ন আলোর ঝলকানিতে মানুষের জীবন সহজ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আত্মিক দূরত্ব বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। আজকের মানুষ ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে চলেছে এক ক্লান্তিকর ইঁদুর-দৌড়ে। প্রযুক্তি মানুষকে ভৌগোলিক দূরত্বে কাছাকাছি আনলেও হৃদয়ের বন্ধনগুলোকে এক অদৃশ্য প্রাচীরের আড়ালে বন্দি করে ফেলেছে।
এই মানবিক দেউলিয়াত্বের চরম রূপ দেখা যায় যখন মানুষের তীব্রতম কষ্ট অন্য মানুষের বিনোদনের খোরাক হয়ে ওঠে। নরসিংদী রেলস্টেশনের এক মর্মন্তুদ দুর্ঘটনায় যখন চলন্ত ট্রেনের ধাক্কায় এক রক্তাক্ত মা ও শিশু প্ল্যাটফর্মে কাতরাচ্ছিল, তখন শত শত মানুষ এগিয়ে না এসে ব্যস্ত ছিল মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় সেই মৃত্যুর দৃশ্য ধারণ করতে। মানুষের আর্তনাদ আজ স্ক্রিনের ‘কনটেন্ট’ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের লাইক-শেয়ারের উপাদানে পরিণত হয়েছে। যখন মানুষের জীবনের চেয়ে ভার্চুয়াল দুনিয়ার প্রসার বড় হয়ে ওঠে, তখন সমাজের আত্মিক মৃত্যু ঘটে। এই স্বার্থপরতা ও উদাসীনতা প্রমাণ করে যে, বাহ্যিক সভ্যতার মুখোশের আড়ালে মানুষ আজ একেকজন স্বার্থপর পশুতে পরিণত হচ্ছে।
শহুরে জীবনের এই যান্ত্রিক নরক ও মানসিক অবসাদ থেকে মুক্তির পথ দেখায় বাংলার চিরন্তন গ্রামীণ প্রকৃতি ও মাটির কাছাকাছি থাকা সাধারণ মানুষ। বাংলার লোকজ সংস্কৃতি ও দর্শনের মূল ভিত্তিই হলো মানবতাবাদ। লালন শাহের জাত-পাতহীন দর্শন, শ্রীচৈতন্যদেবের প্রেমধর্ম কিংবা রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের “শিবজ্ঞানে জীবসেবা”—সবই মানুষকে এক পরম সত্যের দিকে আহ্বান করে।
এই পরম সত্যের সন্ধান কোনো বিলাসবহুল প্রাসাদে নয়, বরং পাওয়া যায় প্রত্যন্ত গ্রামের কোনো এক দরিদ্র রিকশাচালকের মাটির কুঁড়েঘরে। জীবিকার তাগিদে যে মানুষটি দিনে রিকশা চালায়, অথচ রাতে হারিকেনের আলোয় লিও টলস্টয়, ম্যাক্সিম গোর্কি, রবীন্দ্রনাথ কিংবা নজরুলের সাহিত্যসাধনায় মগ্ন থাকে, সেই-ই প্রকৃত মানুষ। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায়, তাঁর বেড়ে ওঠার পেছনেও ছিল জাত-ধর্মের ঊর্ধ্বে ওঠা কিছু মানুষের মানবিক হাত। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্যও আমাদের শেখায়—ছোট হোক বা বড় হোক, মানুষ চরম মুহূর্তে নিজের স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দাঁড়াতে পারে। মানুষের এই দেবত্বকে বিশ্বাস করাই বেঁচে থাকার আসল পাঠ।
প্রকৃতির রুদ্ররূপ মানুষের অহংকার ও সংকীর্ণতাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়। জলবায়ু পরিবর্তন ও মানুষের দুর্নীতির কারণে নদীভাঙন আজ এক নির্মম সত্য। মহেশপুর গ্রামের দক্ষিণ পাড়ার জীর্ণ বাঁধটি যখন ধনী ব্যবসায়ী হরিহর ঘোষের মতো প্রভাবশালী মানুষের অর্থ আত্মসাতের কারণে ভেঙে পড়ে, তখন প্রকৃতি ধনী-দরিদ্রের কোনো ভেদ রাখে না। আষাঢ়ের প্রলয়ংকরী বন্যায় যখন তাসের ঘরের মতো ভেসে যায় গরিবের কুঁড়েঘর, তখন জল কিন্তু ধনীর পাকা দালানকেও রেহাই দেয় না।
কিন্তু এই প্রলয়ের মাঝেই ঘটে মানুষের আত্মিক রূপান্তর। যে রিকশাচালক রশিদুলকে সমাজ ‘ছোটলোক’ বলে অবহেলা করত, সে নিজের একমাত্র সম্বল—প্রিয় বইয়ের তাকের মায়া ত্যাগ করে নৌকার হাল ধরে মানুষের জান বাঁচাতে। অন্যদিকে, যে হরিহর ঘোষ অহংকারে অন্ধ হয়ে মানুষকে উপহাস করেছিলেন, বন্যার তীব্র স্রোতে দালান ভেঙে পড়ার মুহূর্তে তাঁর সব অর্থ-সম্পদ অর্থহীন হয়ে যায়। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন:
“নারীর কোমলতা আর পুরুষের সহমর্মিতাই এই ভঙ্গুর সমাজকে টিকিয়ে রাখে।”
বিপদের মুখে শত্রুর প্রতি ক্ষোভ ভুলে নিজের জীবন বাজি রেখে মানুষকে বাঁচানোই মানুষের পরম ধর্ম। বন্যার জলে নামলে যেমন ধনী-দরিদ্রের ভেদাভেদ থাকে না, তেমনই মানুষের মনুষ্যত্ব সমস্ত কুসংস্কার ও স্বার্থপরতার দেয়াল ধুলোয় মিশিয়ে একাকার করে দেয়।
সংকট কেটে যাওয়ার পর মানুষের বুকের ভেতরের সংকীর্ণতাও ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে যায়। বিপর্যয়ের পর তৈরি হয় এক নতুন সমবায় চেতনা। অর্থের পেছনে অন্ধের মতো ছোটা মানুষও বুঝতে পারে যে, মানুষের আসল সম্পদ তার অর্থ নয়, বরং তার চরিত্র ও মানবিকতা। ধনীর অর্থ আর শ্রমিকের আদর্শ যখন মিলেমিশে একাকার হয়, তখন সমাজে এক নতুন যুগের সূচনা ঘটে। নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত ভূমিহীন মানুষের যৌথ চাষাবাদ ও শিশুদের অবৈতনিক পাঠশালা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যে নতুন কর্মযজ্ঞ শুরু হয়, তা-ই হলো প্রকৃত সমাজসংস্কার।
ভূপেন হাজারিকার সেই অমর বাণী— “মানুষ মানুষের জন্যে, জীবন জীবনের জন্যে, একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না... ও বন্ধু?” —কেবল একটি গান নয়, এটি আমাদের জীবনের শেষ ধ্রুবতারা। আধুনিক যান্ত্রিক সভ্যতার মুখে মহেশপুরের গল্প এক জ্বলন্ত চপেটাঘাত। আমরা যখন নিজের স্বার্থের গণ্ডিতে আবদ্ধ হয়ে পড়ি, তখন প্রলয়ের রাতগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের চেয়ে বড় এই মহাবিশ্বে আর কিছু নেই। আসুন, আমরা আমাদের ভেতরের স্বার্থপরতার মুখোশটি ছিঁড়ে ফেলি। বিপদে পড়া মানুষের দিকে ফোনের ক্যামেরা না বাড়িয়ে সাহায্যের হাতটি বাড়িয়ে দিই। আসুন, আমরা আবার প্রকৃত অর্থে মানুষ হয়ে উঠি।

সাহিত্য-সংস্কৃতি এর আরও খবর