দুপুরে পর্দা উঠছে একুশে বইমেলার, উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
প্রকাশিত :
০৪:৪৯, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
‘বহুমাত্রিক বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আজ শুরু হচ্ছে অমর একুশে বইমেলা ২০২৬। দুপুর ২টায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে প্রথমবারের মতো বইমেলার উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে থাকবেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী এবং প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম। শুভেচ্ছা বক্তব্য প্রদান করবেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মফিদুর রহমান ও বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সভাপতি মো. রেজাউল করিম বাদশা।
সভাপতিত্ব করবেন বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক এবং স্বাগত বক্তব্য দেবেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম।
\r\n\r\n\r\n
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্তদের হাতে পুরস্কার তুলে দেবেন প্রধানমন্ত্রী।
এবারের বইমেলায় অংশগ্রহণকারী মোট প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ৫৪৯টি। এর মধ্যে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ৮১টি এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ৪৬৮টি। মেলায় লিটল ম্যাগাজিন চত্বরের অবস্থান থাকছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের উন্মুক্ত মঞ্চের কাছাকাছি গাছতলায়। সেখানে ৮৭টি লিটলম্যাগকে স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া শিশুচত্বরে মোট প্রতিষ্ঠান ৬৩টি। ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন দুপুর ২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মেলা খোলা থাকবে। ছুটির দিন মেলা শুরু হবে বেলা ১১টায় এবং চলবে যথারীতি রাত ৯টা পর্যন্ত। তবে, রাত সাড়ে ৮টার পর নতুন করে কেউ মেলা প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতে পারবেন না।
বাংলা একাডেমির জনসংযোগ উপবিভাগ জানায়, প্রতিদিন বেলা ৩টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত মেলার মূলমঞ্চে বিষয়ভিত্তিক সেমিনার এবং বিকাল ৪টা থেকে ৫টা পর্যন্ত চলবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। প্রতি শুক্র ও শনিবার মেলায় বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত ‘শিশুপ্রহর’ থাকবে। অমর একুশে উদ্যাপনের অংশ হিসাবে শিশুকিশোর চিত্রাঙ্কন, আবৃত্তি এবং সংগীত প্রতিযোগিতার আয়োজন থাকছে।
বরাবরের মতো এবারও বইমেলায় বাংলা একাডেমি এবং মেলায় অংশগ্রহণকারী অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ২৫ শতাংশ কমিশনে বই বিক্রি করবে। তবে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নির্ধারিত কমিশনে বই বিক্রি করবে বলেও জানিয়েছে বাংলা একাডেমির জনসংযোগ উপবিভাগ।
মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য-সচিব ড. সেলিম রেজা জানান, বিগত বছরের মতো এবারও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আর রমজান উপলক্ষ্যে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে মেলায় আগত মুসল্লিদের জন্য সুরা তারাবি নামাজের ব্যবস্থা থাকছে। বরাবরের মতো এবারের মেলার প্রবেশ ও বাহিরপথে পর্যাপ্ত সংখ্যক আর্চওয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মেলার সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবে পুলিশ, র্যাব, আনসার ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা। এছাড়া নিরাপত্তার জন্য মেলায় ক্লোজসার্কিট ক্যামেরার ব্যবস্থা করা হয়েছে। মেলা পলিথিন ও ধূমপানমুক্ত থাকবে।
মেলায় পুরস্কার : মেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের ২০২৫ সালে প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্য থেকে গুণগতমান বিচারে সেরা বইয়ের জন্য প্রকাশককে ‘চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার’ এবং ২০২৫ সালের বইমেলায় প্রকাশিত বইয়ের মধ্য থেকে শৈল্পিক বিচারে সেরা বই প্রকাশের জন্য ৩টি প্রতিষ্ঠানকে ‘মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার’ দেওয়া হবে। এছাড়া ২০২৫ সালে প্রকাশিত শিশুতোষ গ্রন্থের মধ্য থেকে গুণগত মান বিচারে সর্বাধিক গ্রন্থের জন্য ১টি প্রতিষ্ঠানকে ‘রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই স্মৃতি পুরস্কার’ এবং এ-বছরের মেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের মধ্য থেকে স্টলের নান্দনিক সাজসজ্জায় শ্রেষ্ঠ বিবেচিত প্রতিষ্ঠানকে ‘কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার’ দেওয়া হবে। এবারের বইমেলায় প্রবর্তিত হচ্ছে ‘সরদার জয়েনউদদীন স্মৃতি পুরস্কার’ শিরোনামে একটি নতুন পুরস্কার। মেলায় নতুন অংশগ্রহণকারীদের (যেসব প্রতিষ্ঠান নতুন প্রকাশক হিসাবে এবারই প্রথম বা ২০২৪ বা ২০২৫ সালে মেলায় প্রথম অংশগ্রহণ করেছে) মধ্য থেকে ‘গুণগতমান বিচার’-এ সর্বাধিক সংখ্যক বইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে ‘সরদার জয়েনউদ্দীন স্মৃতি পুরস্কার’ (১ম, ২য়, ৩য়) দেওয়া হবে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (প্রশাসন) মো. সরওয়ার বলেছেন, বইমেলায় এবার মবের কোনো আশঙ্কা নেই। তবে মব মোকাবিলায় পুলিশের সর্বোচ্চ প্রস্তুতি থাকবে। বুধবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বইমেলার নিরাপত্তা নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, মেলায় আগত নারী ও শিশুদের সুরক্ষায় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এছাড়া মেলা প্রাঙ্গণে লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড সেন্টার, ব্রেস্টফিডিং সেন্টার বা কর্নার এবং শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। অসুস্থদের জন্য পর্যাপ্ত প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা এবং অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থাও থাকবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ধর্ম অবমাননা অথবা উসকানিমূলক বই মেলায় এলে পুলিশের গোয়েন্দা সংস্থা নজরদারি করবে, যাতে এমন বই মেলায় না আসে।
ট্রাফিক নির্দেশনা ও পার্কিং প্রসঙ্গে অতিরিক্ত কমিশনার বলেন, মেলা চলাকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় যানজট নিরসনে ট্রাফিক বিভাগ বিশেষ ডাইভারশন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। মেলা চলাকালীন ঢাবি এলাকায় কোনো ভারী যানবাহন প্রবেশ করতে পারবে না। টিএসসি থেকে দোয়েল চত্বর পর্যন্ত রাস্তাটি জনসমাগম বিবেচনায় সময়ে সময়ে খোলা বা বন্ধ রাখা হবে।
ডিএমপির পক্ষ থেকে দর্শনার্থীদের অনুরোধ করা হয়েছে, তারা যেন মেলা গেট পর্যন্ত যানবাহনের জন্য অপেক্ষা না করে কিছুটা আগে নেমে হেঁটে মেলায় প্রবেশ করেন। এতে প্রবেশপথগুলোতে যানজট কম হবে এবং অন্যদের চলাচল সহজ হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাতকাল। এ যেন শহরের যান্ত্রিক জীবনের সমান্তরালে স্পন্দিত এক নিজস্ব মহাদেশের আহ্বান। ভোরের প্রথম আলো যখন হাকিম চত্বরের শিশিরস্নাত সবুজ ঘাস স্পর্শ করে, টিএসসি, কলাভবন আর কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সিঁড়িতে তখন সঞ্চালিত হতে শুরু করে এক প্রাণবন্ত জনস্রোত। চায়ের দোকানের ভাপ ওঠা কাপ থেকে ধোঁয়া ওড়ে, যা মিশে যায় কচি পাতার সবুজ সুবাসে। কারও হাতে মোটা মলাটের বই, কারও হাতে তাড়াহুড়ো করে লেখা নোটখাতা, আবার কারও আঙুলের ডগায় শুধু নিকোটিনের ছোঁয়া আর চোখভরা এক অনিশ্চিত আগামীর স্বপ্ন।
এই প্রাণচঞ্চলতার ঢেউয়ের মাঝেই আরিয়ান আর মায়ার প্রথম পরিচয়। যেন দুটি বিপরীতমুখী জলধারা এক মোহনায় এসে মিলিত হলো।
আরিয়ান মনস্তত্ত্ব বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। স্বভাবতই শান্ত, মিতভাষী এবং অন্তর্মুখী; তার কাছে জগৎটা যেন এক বিশাল পাঠশালা, যেখানে প্রতিটি মানুষই একেকটি উন্মোচনযোগ্য রহস্য। টিএসসির পশ্চিমের ছায়াঘেরা বেঞ্চটিতে তাকে প্রায়ই দেখা যেত, হাতে কোনো মনস্তাত্ত্বিক জার্নাল কিংবা ফ্রয়েডের গভীর মনঃসমীক্ষণের বই। আরিয়ান স্বপ্ন দেখত—সে হবে একজন দক্ষ পরামর্শদাতা, যে মানুষের ভেতরের জটিল জটগুলো পরম মমতায় ছাড়িয়ে দেবে, নীরবে শুনবে আত্মার না-বলা ক্রন্দন।
অন্যদিকে মায়া সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। প্রাণোচ্ছল, বাগ্মী—যে সহজেই চারপাশের কোলাহলের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে। তবে এই বাহ্যিক চঞ্চলতার আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক অদ্ভুত দার্শনিক গাম্ভীর্য। তার চোখ ভরা ছিল সমাজের প্রতি এক তীব্র দায়বদ্ধতা এবং ইতিবাচক পরিবর্তনের সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা। ক্লাস শেষে তার স্থায়ী ঠিকানা ছিল কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সেই স্যাঁতসেঁতে প্রাচীন গন্ধমাখা কোণটি, যেখানে সমাজতত্ত্বের গবেষণাপত্রগুলো সযত্নে চাপা পড়ে থাকত।
সেদিনও, সেই কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে, গ্রন্থাগারের মূল ফটকের কাছেই দেখা হলো ওদের। আরিয়ানের হাতে তখন সদ্য কেনা একটা বই—\"Interpersonal Relationship and Psychological Conflicts\"। আর মায়া ব্যস্ত ছিল প্রয়োজনীয় এক সমাজতাত্ত্বিক নথি খুঁজতে। বইয়ের শিরোনামের দিকে চোখ পড়তেই, দুজনের চোখাচোখি হলো।
মায়া ঠোঁটে আলতো হাসি ফুটিয়ে জিজ্ঞেস করল, \"আপনি কি এই বইটা নিচ্ছেন? আমার কাছে বিষয়বস্তুটা খুব আকর্ষণীয় মনে হলো।\"
আরিয়ান মৃদু হাসল, সে হাসিটা ছিল শান্ত দিঘির জলের প্রতিচ্ছবি। \"হ্যাঁ, তবে চাইলে আমরা একসাথেই পড়তে পারি। আমি মনস্তত্ত্ব নিয়ে পড়ি, আর আপনি যদি সমাজবিজ্ঞান নিয়ে পড়েন, তবে আমাদের দুজনেরই কাজে লাগতে পারে; নতুন দৃষ্টিকোণ পাওয়া যাবে।\"
এই ছোট্ট কথোপকথনের সূত্র ধরেই শুরু হলো তাদের প্রথম আলাপ। তাদের বন্ধুত্বটা দ্রুতই হৃদয়ের গভীরে শিকড় ছড়াল। টিএসসির ক্যাফেটেরিয়া হয়ে উঠল তাদের গোপন মননশীল আড্ডার কেন্দ্র। কখনো বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতির তীব্র বিতর্ক, কখনো সামাজিক বৈষম্য নিয়ে দীর্ঘ ফিসফিসানি, আবার কখনো স্রেফ জীবনমুখী এলোমেলো আলাপ। দুজনের মধ্যেই ছিল জানার এক দুর্নিবার পিপাসা, আর সেই পিপাসাই তাদের একে অপরের প্রতি আরও কৌতূহলী করে তুলল।
এক বিকেলে মায়া গভীর মুগ্ধতা নিয়ে বলেছিল, \"তুমি এত ধৈর্য ধরে শোনো কীভাবে আরিয়ান? যখন কথা বলি, মনে হয় তুমি শুধু কান দিয়ে শুনছ না, যেন আমার ভেতরের মানুষটাকে দেখছ।\"
আরিয়ান চোখের কোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে উত্তর দিত, \"মানুষের ভেতরের কথা শুনতে চাইলে, বাইরের সমস্ত অপ্রাসঙ্গিক শব্দ আপনিই থেমে যায়। আমার কাছে সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।\"
এভাবেই, ধীরে ধীরে, অলক্ষ্যে তারা দুজন কাছাকাছি আসতে থাকে।
তবুও তাদের এই সম্পর্কের ভেতরে তখনও অদৃশ্য এক দেয়াল ছিল। আরিয়ান ছিল স্বভাবত ভীষণ সংবেদনশীল, যার অনুভূতিগুলো ছিল স্ফটিকের মতো ভঙ্গুর। আর মায়া ছিল স্বাধীনচেতা, আবেগের চেয়ে যুক্তিতে যার ভরসা ছিল বেশি। দুজনের ভাবনার ধারা সম্পূর্ণ ভিন্ন হলেও, সেই ভিন্নতার প্রতি এক তীব্র আকর্ষণ তাদের বন্ধনকে আরও নিবিড় ও দৃঢ় করে তুলছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ ছায়াঘেরা পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে, মল চত্বরের চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে, কিংবা লাইব্রেরির তাকে মাথা গুঁজে—তাদের সম্পর্কের বীজ নীরবে অঙ্কুরিত হচ্ছিল।
তারা তখনও জানত না যে সামনে অপেক্ষা করছে অসংখ্য মনস্তাত্ত্বিক উত্থান-পতন, বহু ভুল বোঝাবুঝি, অভিমান আর অশ্রুভেজা মুহূর্ত। তবে প্রথম অধ্যায়ের এই স্নিগ্ধ সূচনা যেন এক চিরন্তন সত্যকে জানান দেয়: প্রতিটি সম্পর্কের সূচনা হয় এক অবচেতন স্ফুলিঙ্গ থেকে, আর সেই স্ফুলিঙ্গই ভবিষ্যতে আবেগের জটিলতাকে অর্থপূর্ণ করে তোলে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলো দ্রুত চলে যায়। প্রথম দিকের সেই কাকতালীয় পরিচয় এখন আরিয়ান ও মায়ার জীবনে নিয়মিত রুটিনে পরিণত হয়। তাদের সম্পর্ক বন্ধুত্ব ছাড়িয়ে ধীরে ধীরে পারস্পরিক বোঝাপড়ার প্রথম পাঠে প্রবেশ করছিল।
এক দুপুরে টিএসসি ক্যাফেটেরিয়ায় চায়ের কাপ হাতে মায়া বলল, \"আমার ছোটবেলা থেকে স্বপ্ন, সমাজের অসহায়দের জন্য কিছু করা। হয়তো এনজিও করব, কিংবা গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ব। কিন্তু মাঝে মাঝে মনে হয়, স্বপ্নগুলো বড্ড বাড়াবাড়ি রকমের বড়।\"
আরিয়ান মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। তারপর মৃদু হেসে বলল, \"স্বপ্ন যত বড় হবে, তা পূরণের আগ্রহও তত বাড়বে। মনস্তত্ত্বে একটা তত্ত্ব আছে—\'Self-fulfilling Prophecy\'। তুমি যদি বিশ্বাস করো তোমার স্বপ্ন সম্ভব, তবে তোমার অবচেতন মন এমনভাবে কাজ করবে যে সেই স্বপ্ন পূর্ণ হতেই হবে।\"
মায়া চমকে উঠে বলল, \"তাহলে তোমার মতে আমার এই স্বপ্ন মোটেও অযৌক্তিক নয়?\"
আরিয়ান দৃঢ় কণ্ঠে বলল, \"অবশ্যই না। বরং আমি বলব, তোমার এই স্বপ্নই তোমাকে আর পাঁচজনের থেকে আলাদা করে তুলেছে।\"
এই ছোট ছোট আলোচনাগুলো শুধু তাদের ঘনিষ্ঠতাই বাড়ায়নি, বরং একে অপরের অন্তর্নিহিত শক্তিকে আবিষ্কারের পথও তৈরি করেছে। দিন গড়িয়ে সপ্তাহ পার হলো। লাইব্রেরির এক কোণে একসঙ্গে বসা তাদের নিত্যদিনের রুটিন হয়ে উঠল। মনস্তত্ত্বের বই পড়তে পড়তে আরিয়ান হঠাৎ বলত, \"দেখো, এখানে লেখা আছে—সম্পর্কের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো যোগাযোগের অভাব। আমরা প্রায়ই ধরে নিই, সঙ্গী মনের কথা এমনিতেই বুঝে নেবে, কিন্তু বাস্তবে তা হয় না।\"
মায়া হেসে উত্তর দিত, \"ঠিক বলেছ। আমাদের সমাজেও তো একই সমস্যা। পরিবারে, সম্পর্কে, এমনকি বন্ধুদের মধ্যেও কথা না বলার প্রবণতা থেকে ভুল বোঝাবুঝি বাড়ে। সবাই ভাবে—\'সে তো বুঝবেই\'। অথচ কেউই তো আসলে অন্যের মনের ভেতরে ঢুকে যেতে পারে না।\"
এই কথোপকথনগুলো যেন নীরবে তাদের ভেতরে এক ধরনের পরিপক্ব বোঝাপড়া তৈরি করছিল।
তবে সবকিছু সবসময় মসৃণ ছিল না। একদিন ডাকসু চত্বরের কংক্রিটের বেঞ্চে বসে মায়া কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলল, \"তুমি মাঝে মাঝে এমনভাবে চুপ করে থাকো যে আমার ভীষণ অস্বস্তি হয়। মনে হয় আমি একাই কথা বলছি।\"
আরিয়ান কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল, \"আমি আসলে ভেতরে ভেতরে অনেক ভাবি, কিন্তু সব কথা মুখে বলতে পারি না। ভয় হয়, যদি ভুল বুঝে ফেলো?\"
মায়া গভীরভাবে তার দিকে তাকাল। তার কণ্ঠে ছিল এক নরম অভিযোগ। \"দেখো আরিয়ান, সম্পর্ক হলো খোলামেলা কথা বলার একটা নির্ভরতার জায়গা। তুমি যদি সবসময় ভেবে যাও আর না বলো, তাহলে আমি কীভাবে বুঝব তোমার আসল অনুভূতি কী?\"
মায়ার এই কথাগুলো আরিয়ানকে ভাবিয়ে তুলল। সত্যিই তো! তার নিজের ভেতরের এই নীরবতার দেয়াল হয়তো ভবিষ্যতের জন্য কোনো অদৃশ্য বাধা তৈরি করছে।
পরদিন সমাজবিজ্ঞান বিভাগের এক সেমিনারে তারা দুজনেই উপস্থিত ছিল। আলোচনার বিষয় ছিল—\"ভুল বোঝাবুঝি: সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ।\" বক্তা বলছিলেন: \"আমরা প্রায়ই মনে করি, সম্পর্ক ভাঙার কারণ বড় কোনো দুর্ঘটনা। কিন্তু আসলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভুল বোঝাবুঝিই ধীরে ধীরে সম্পর্ককে দুর্বল করে দেয়। \'Silent Expectation\'—অর্থাৎ মনে মনে আশা রাখা, কিন্তু মুখে প্রকাশ না করা—এটাই ভুল বোঝাবুঝির মূল কারণ।\"
সেমিনারের সময় দুজনের চোখ হঠাৎ একে অপরের সঙ্গে মিলল। মায়ার দৃষ্টি যেন বলছিল—\'আমি তো আগেই বলেছিলাম!\' আর আরিয়ান মাথা নিচু করে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, হয়তো এবার তাকে আরও খোলামেলা হতে হবে।
তাদের এই সম্পর্ক তখনো তরুণ, অচেনা বাঁকে ভরপুর। কিন্তু একটা বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠছিল—দুজনের ভেতরেই ছিল শেখার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। মায়া শিখছিল ধৈর্যের মূল্য, আরিয়ান শিখছিল খোলামেলা হওয়ার গুরুত্ব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিরচেনা ভিড়, টিএসসির আড্ডা, লাইব্রেরির নিস্তব্ধতা—সব মিলিয়ে তাদের বন্ধুত্ব ধীরে ধীরে এক বিশেষ আবেগে রূপ নিচ্ছিল। তারা হয়তো তখনও তা স্বীকার করেনি, কিন্তু চারপাশের বাতাসই যেন ফিসফিস করে বলছিল: \"এটা কেবল বন্ধুত্ব নয়, এর গভীরে আছে এক অদৃশ্য আকর্ষণের স্রোত।\"
শরতের বিদায়ের পর শিউলি ফুলের হালকা সুবাস বাতাসে ভাসছিল। ছাত্র-ছাত্রীদের হাসি-ঠাট্টার কোলাহলে আরিয়ান আর মায়া হাঁটছিল পাশাপাশি। দুজনেই চুপচাপ, যেন ভেতরে ভেতরে অনেক অজানা কথা গুমরে মরছে। গত কয়েকদিন ধরে তাদের মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি কাজ করছিল। মায়া অনুভব করছিল, আরিয়ান অনেক কিছু বলতে চাইলেও থেমে যাচ্ছে। আর আরিয়ান মনে করছিল, মায়া নিশ্চয়ই তার মনের সব কথা বুঝে নেবে—তাকে আলাদা করে কিছু বলার প্রয়োজন নেই।
টিএসসি ক্যান্টিনে এক বিকেলে মায়া হালকা রাগী স্বরে বলল, \"তুমি মাঝে মাঝে এমনভাবে আচরণ করো যে আমি বুঝতেই পারি না, তোমার মাথার ভেতর কী চলছে। আমি তো তোমার বন্ধু, অন্তত আমায় তো বলতে পারো।\"
আরিয়ান মাথা নিচু করে বলল, \"আমি ভাবি তুমি বুঝে যাবে। অনেক সময় মনে হয় না বললেও তুমি নিশ্চয়ই আমার অনুভূতিগুলো ধরতে পারবে।\"
মায়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে উত্তর দিল, \"এইটাই তো ভুল। আমি মানুষ, যন্ত্র নই যে তোমার সব আবেগ বুঝে ফেলব। তুমি যদি না বলো, আমি কখনোই জানব না। আর এই না বলা থেকেই ভুল বোঝাবুঝি শুরু হয়।\"
সেদিন মনস্তত্ত্ব বিভাগের ক্লাসে অধ্যাপক \"Interpersonal Relationship\" টপিক পড়াচ্ছিলেন। তিনি বললেন, \"Silent Expectation হলো এমন এক মানসিক ফাঁদ, যেখানে আমরা ধরে নিই অন্যজন আমাদের মনের কথা বুঝবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয় না। আর এই না-বোঝা থেকেই জন্ম নেয় ক্ষোভ, বিরক্তি, এমনকি অবিশ্বাস।\"
আরিয়ান শুনতে শুনতে মায়ার দিকে তাকাল। তার মনে হলো, অধ্যাপক যেন মায়ার কথাগুলোকেই মনস্তাত্ত্বিক মোড়কে উপস্থাপন করছেন।
কিছুদিন পর একদিন মায়া দেখল, আরিয়ান ক্লাস শেষে হঠাৎ চুপচাপ হয়ে গেছে। তার গলায় জিজ্ঞাসা ঝরে পড়ল—\"কী হয়েছে তোমার? এত চুপচাপ কেন?\"
আরিয়ান মাথা নেড়ে বলল, \"কিছু হয়নি।\" কিন্তু তার মুখের গম্ভীর ভাব, শরীরের অস্বস্তিকর ভঙ্গি মায়াকে অন্য কিছু ভাবতে বাধ্য করল। মায়া ভাবল হয়তো সে কোনো কারণে রেগে আছে। অথচ আরিয়ানের আসল কারণ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন—সে সেমিস্টার ফাইনালের চাপ আর পারিবারিক আর্থিক দুশ্চিন্তায় ভুগছিল। এই ভুল ব্যাখ্যা থেকেই আবারও ছোট্ট একটা ঝগড়া বাধল। মায়া ভেবেছিল, আরিয়ান ইচ্ছা করে তাকে এড়িয়ে যাচ্ছে। আর আরিয়ান অবাক হলো—\'এত সহজ একটা ব্যাপার তুমি বুঝতে পারছ না?\'
এই ছোট ছোট ঘটনা ধীরে ধীরে এক অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করতে লাগল। তাদের মধ্যে কথাবার্তা কমে এল। একসময় যে বিষয় নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প হতো, এখন তা কেবল কয়েক মিনিটেই শেষ হয়ে যেত। মায়া অনুভব করছিল, \"যদি সে আমাকে বুঝতে না পারে, তবে বারবার বলার মানে কী?\" আরিয়ান ভেতরে ভেতরে ভাবছিল, \"যদি বলি আর ভুল বোঝে, তবে সম্পর্কটা আরও খারাপ হয়ে যাবে।\" দুজনের এই দ্বিধা-দ্বন্দ্ব সম্পর্ককে \'Silent Expectation\'-এর দুষ্টচক্রে আটকে দিল।
একদিন সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সেমিনারে তারা দুজনেই গেল। আলোচনার বিষয় ছিল—\"যোগাযোগের ঘাটতি ও সামাজিক সম্পর্ক।\" বক্তা বলছিলেন, \"যখন মানুষ মনে করে, তার কাছের মানুষটি কোনো কথা না বললেও বুঝবে—সেটাই আসল বিভ্রান্তি। এই প্রত্যাশা পূরণ না হলে ক্ষোভ জন্মায়, আর ক্ষোভ থেকেই জন্ম নেয় দূরত্ব।\"
এই কথা শুনে মায়া আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে দেখল। তার দৃষ্টি যেন নীরব বার্তা দিচ্ছিল—\'আমরা কি সেই একই ফাঁদে পড়ে যাচ্ছি?\' আরিয়ান চোখ নামিয়ে নিল। তার মনে হলো, সত্যিই তো, তারা নিজেরাই নিজেদের সম্পর্ককে জটিল করে তুলছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যস্ত ক্যাম্পাস তখনও আগের মতোই ছিল। কিন্তু এই চঞ্চল পরিবেশের ভেতরেও আরিয়ান আর মায়ার মনে জন্ম নিচ্ছিল নিঃশব্দ এক অস্থিরতা। তারা তখনও বুঝতে পারেনি, \'Silent Expectation\' কেবল ভুল বোঝাবুঝিই বাড়ায় না, বরং সম্পর্কের সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়ায়—যা অহংকারের সূক্ষ্ম দেওয়ালে পথ তৈরি করে দেয়।
শীতের হালকা হাওয়া বইছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে। অমর একুশে বইমেলা আসন্ন, চারপাশে উৎসবমুখর পরিবেশ। অথচ মায়া আর আরিয়ানের সম্পর্কে যেন জমে উঠেছে শীতলতা। আগের মতো খোলামেলা হাসি নেই, চোখে চোখ রেখে গভীর আলাপ নেই। তাদের সম্পর্ক ধীরে ধীরে প্রবেশ করছিল এক নতুন অধ্যায়ে—অবিশ্বাসের ছায়ায়।
একদিন বিকেলে টিএসসির ভিড়ে মায়া দেখল, আরিয়ান কারও সঙ্গে বেশ প্রাণবন্তভাবে কথা বলছে। মেয়েটি সমাজবিজ্ঞানেরই ছাত্রী, ক্লাসে তারা একসঙ্গে প্রেজেন্টেশন করছিল। মায়া দূর থেকে দৃশ্যটি দেখল। হঠাৎ তার বুকের ভেতরে এক ধরনের তীব্র অস্বস্তি কাজ করল। \'ওরা এত হাসছে কেন? আরিয়ান তো আমার সঙ্গে কখনো এত স্বতঃস্ফূর্ত হয় না। তবে কি...\'—এই \'তবে কি\' শব্দ দুটোই মায়ার মনে সন্দেহের বীজ বপন করল। আরিয়ান, যার কাছে সম্পর্ক মানেই আস্থা আর বিশ্বাস, সে বুঝতেই পারল না মায়ার মনে কী ঝড় বইছে।
কিছুদিন পর এক সন্ধ্যায় মায়া বলল, \"তুমি আজকাল আমাকে কম সময় দিচ্ছ। সবসময় হয় ক্লাস, নয়তো অন্য কিছু। আমার মনে হয় তুমি আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছ।\"
আরিয়ান বিস্মিত হয়ে উত্তর দিল, \"এড়িয়ে যাচ্ছি? আমি তো শুধু পড়াশোনার চাপ সামলাচ্ছি। তুমি কেন সবকিছু নেতিবাচকভাবে দেখছ?\"
মায়া কণ্ঠে ক্ষোভ মিশিয়ে বলল, \"কারণ আমি তোমার চোখে সেই মনোযোগটা পাই না, যা আগে পেতাম। হয়তো তুমি অন্য কারও প্রতি আগ্রহী হয়ে পড়েছ।\"
এই অভিযোগে আরিয়ান গভীরভাবে আহত হলো। সে মনে মনে ভাবল—\'যাকে আমি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি, সেই যদি আমার ওপর বিশ্বাস না রাখে, তবে সম্পর্ক টিকবে কীভাবে?\'
আরিয়ান একদিন ক্লাসে শুনল—\"Suspicion is the poison of relationship। অবিশ্বাস ধীরে ধীরে সম্পর্কের ভেতর আস্থা ক্ষয় করে দেয়। একবার সন্দেহ জন্মালে তা প্রমাণ দিয়ে মুছতে চাইলেও পুরোপুরি মুছে ফেলা যায় না।\" শিক্ষকের এই কথা তার কানে বাজতে থাকল। মনে হলো, এ যেন তাদের সম্পর্কেরই প্রতিচ্ছবি।
অন্যদিকে মায়া নিজেকেই প্রশ্ন করছিল—\'আমি কি সত্যিই ওকে অবিশ্বাস করছি? নাকি আমার নিজের অনিরাপত্তা আমাকে সন্দেহপ্রবণ করে তুলছে?\' তার ভেতরে একটা দ্বিধা কাজ করছিল। একদিকে ছিল আরিয়ানের প্রতি গভীর ভালোবাসা, অন্যদিকে ছিল এক অজানা ভয়—\'যদি সে একদিন আমার জীবন থেকে সরে যায়?\' এই ভয়ই তাকে আরও আঁকড়ে ধরতে চাইছিল, আর আঁকড়ে ধরার মাঝেই জন্ম নিচ্ছিল সন্দেহ। কারণ, মায়ার জীবনে একসময় অন্য একজন ছিল, যে তাকে অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েও শেষমেশ বিশ্বাসভঙ্গ করেছিল। সেই অতীতের ছায়া আজও মায়ার বর্তমানের দরজায় কড়া নাড়ে।
কুয়াশায় ঢাকা এক গম্ভীর বিকেলে আকাশ মেঘে কালো হয়ে রইল। মল চত্বরের প্রান্তরে দাঁড়িয়ে মায়া আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখল; ঠিক যেভাবে মেঘ আকাশকে আচ্ছন্ন করে রাখে, তার নিজের মনটাও তেমনই সন্দেহের মেঘে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। মায়ার চোখের কোণে জল জমেছিল, যা সে ঢাকতে চেয়েছিল তার উদাসীনতার চাদরে। ঠিক তখনই আরিয়ান তার পাশে এসে দাঁড়াল। তার শান্ত চোখ দুটি মায়ার দিকে তাকাল—সেখানে কোনো রাগ ছিল না, ছিল কেবল এক অসীম আকাশের মতো নীরবতা।
আরিয়ান ভাঙা গলায় বলল, \"মায়া, তুমি আমাকে মেঘের মতো আড়াল করতে পারো, কিন্তু আকাশকে কি কখনো তার অস্তিত্ব থেকে আলাদা করা যায়? আমি যদি আকাশ হই, তবে তুমিই তো সেই মেঘ যে আমার বুকে খেলা করে। মেঘের কালো ছায়ায় কখনো কখনো আকাশ ঢাকা পড়ে ঠিকই, কিন্তু ঝড় শেষে আকাশ আবার তার আপন রূপেই ফিরে আসে।\"
মায়ার চোখের বাঁধ ভেঙে জল গড়িয়ে পড়ল। সে বুঝতে পারল, তার মনের ভেতরের সন্দেহগুলো আসলে আরিয়ানের প্রতি অবিশ্বাস ছিল না, বরং তা ছিল তার নিজের ভেতরের পুরোনো ক্ষতের বহিঃপ্রকাশ। সে আরিয়ানের হাত দুটি শক্ত করে ধরে বলল, \"আমাকে ক্ষমা করো আরিয়ান। আমি ভাবতাম তুমি চুপ করে আছ মানে তুমি দূরে চলে যাচ্ছ। আমি ভুলে গিয়েছিলাম যে আকাশ কখনো মেঘকে ফেলে যায় না।\"
আরিয়ানের শান্ত চোখের দিকে তাকিয়ে মায়ার মনের সমস্ত সংশয় ও দ্বিধা কর্পূরের মতো উড়ে গেল। তাদের চারপাশের শীতল হাওয়া আর আকাশের কালো মেঘগুলো যেন এক নতুন বৃষ্টির ইঙ্গিত দিচ্ছিল—যে বৃষ্টি ধুয়ে দেয় সমস্ত মলিনতা, সমস্ত ভুল বোঝাবুঝি। টিএসসির সেই নিস্তব্ধ কোণে দাঁড়িয়ে মায়া ও আরিয়ান অনুভব করল এক নতুন চেতনার স্পন্দন। তাদের এই সম্পর্কের টানাপোড়েন অবশেষে তাদের নিয়ে গেল এক পরিপক্ব মোহনায়, যেখানে জন্ম নিল এক নতুন প্রতিজ্ঞা—\"বিশ্বাসের পুনর্জন্ম\"।