img

গাজার দিনলিপি, মানবতার ভাষ্য

প্রকাশিত :  ১৮:২৮, ০৫ মার্চ ২০২৬

‘দ্য ডেইজ অব গাজা’ নিয়ে মুখোমুখি রেজুয়ান আহম্মেদ

গাজার দিনলিপি, মানবতার ভাষ্য

ড. নাজমুল ইসলাম 

যুদ্ধের খবর প্রতিদিনই আসে—সংখ্যায়, পরিসংখ্যানে, কূটনৈতিক বিবৃতিতে। কিন্তু সেই সব সংখ্যার আড়ালে যে মানুষ, যে শিশু, যে মা—তাদের গল্প কতটা শোনা যায়? এই প্রশ্ন থেকেই কথাসাহিত্যিক রেজুয়ান আহম্মেদের সাম্প্রতিক গ্রন্থ ‘দ্য ডেইজ অব গাজা’-এর জন্ম। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বইটির প্রেরণা, নির্মাণপ্রক্রিয়া ও বার্তা নিয়ে কথা বলেছেন তিনি।

বইটি লেখার পেছনের কারণ জানতে চাইলে রেজুয়ান আহম্মেদ বলেন, এটি কোনো রাজনৈতিক অবস্থান থেকে লেখা নয়। “গাজার শিশুদের চোখে যে আতঙ্ক, মায়েদের চোখে যে অপেক্ষা, আর ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকেও বেঁচে থাকার যে অদম্য ইচ্ছা—সেই মানবিক গল্পগুলো আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। আমি চেয়েছি যুদ্ধের পরিসংখ্যান নয়, মানুষের অনুভূতির ইতিহাস লিখতে।”

লেখকের ভাষায়, সংবাদ তাৎক্ষণিক; কিন্তু সাহিত্য দীর্ঘস্থায়ী। সংবাদ জানায় কী ঘটেছে, সাহিত্য অনুভব করায় কেন তা আমাদের ভাবায়।

‘দ্য ডেইজ অব গাজা’—নামের ভেতরেই যেন এক দীর্ঘ সময়ের সঞ্চিত বেদনা। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “‘ডেইজ’ মানে দিনগুলো। কিন্তু এখানে প্রতিটি দিন এক-একটি দীর্ঘ ইতিহাস। প্রতিটি সকাল অনিশ্চয়তার, প্রতিটি রাত বেঁচে থাকার সংগ্রামের। গাজার দিনগুলো কেবল সংবাদ শিরোনাম নয়; এগুলো মানুষের জীবন, স্বপ্ন আর অশ্রুর দিনলিপি।” এই বক্তব্যেই বোঝা যায়, বইটি ঘটনাপঞ্জি নয়; বরং এক মানবিক দলিল।

বইটি পুরোপুরি বাস্তব ঘটনার ওপর নির্ভরশীল কিনা—এ প্রশ্নে রেজুয়ান আহম্মেদ জানান, এটি গবেষণা, সংবাদ ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বর্ণনার সঙ্গে সাহিত্যিক কল্পনার মিশ্রণে তৈরি। “সাহিত্যের কাজ কেবল তথ্য দেওয়া নয়, অনুভব করানো,”—বলেছেন তিনি। বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়েই তিনি চরিত্র নির্মাণ করেছেন, যাতে পাঠক কেবল পড়েন না, ভেতরে ভেতরে অংশ হয়ে ওঠেন।

লিখতে গিয়ে আবেগের সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে বলেও জানান তিনি। “অনেক সময় লিখতে গিয়ে থেমে যেতে হয়েছে। কিছু অধ্যায় লেখার সময় চোখ ভিজে গেছে। কিন্তু আমি থামিনি। কারণ কেউ না কেউ তো এই গল্পগুলো বলবেই। যদি আমার কলম সেই কণ্ঠ হতে পারে, সেটাই আমার সার্থকতা।” এই স্বীকারোক্তি বইটির আবেগঘন ভেতরকার সুরকে স্পষ্ট করে।

বর্তমান প্রজন্মের উদ্দেশে লেখকের বার্তা—“মানবতা কখনো পরাজিত হয় না। পৃথিবীর যে প্রান্তেই অন্যায় হোক না কেন, আমাদের বিবেককে জাগ্রত রাখতে হবে। সহমর্মিতা, ন্যায়বোধ এবং ভালোবাসাই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে।” দ্রুত তথ্যপ্রবাহের যুগে ঘটনাকে দ্রুত ভুলে যাওয়ার প্রবণতার বিপরীতে সাহিত্যকে তিনি দেখেন স্মৃতি ও বিবেকের ধারক হিসেবে।

সাক্ষাৎকারের শেষপ্রান্তে রেজুয়ান আহম্মেদ বলেন, “বইটি পড়ুন খোলা হৃদয়ে। এটি কোনো পক্ষ নেওয়ার বই নয়; এটি মানুষকে অনুভব করার বই। যদি পাঠক একটি মুহূর্তের জন্যও গাজার কোনো শিশুর চোখ দিয়ে পৃথিবীকে দেখতে পারেন, তবে আমার লেখা সফল।”

সমাপনী বক্তব্যে তিনি যোগ করেন, “সাহিত্যের শক্তি বন্দুকের চেয়ে বড়। শব্দের শক্তি ধ্বংস নয়, সৃষ্টি করে। ‘দ্য ডেইজ অব গাজা’ সেই সৃষ্টির একটি ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা—মানবতার পক্ষে, জীবনের পক্ষে।”

যুদ্ধের কোলাহলের ভেতরেও মানবতার যে ক্ষীণ কিন্তু স্থায়ী সুর, এই বই যেন সেই সুরকেই শব্দে রূপ দেওয়ার চেষ্টা।

img

ইউনেস্কো উদ্যোগে শ্রীমঙ্গলে জীবন্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের উদ্যোগ

প্রকাশিত :  ১৫:১৪, ২৩ মে ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৫:১৭, ২৩ মে ২০২৬

ইউনেস্কো, আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (CRIHAP) ও অনুবাদের সহযোগিতায় শ্রীমঙ্গলে পাঁচ দিনের কর্মশালার আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে।

১৭–২১ মে পর্যন্ত ব্র্যাক লার্নিং সেন্টারে অনুষ্ঠিত এই কর্মশালায় সিলেট বিভাগের তিনটি সম্প্রদায় — বিষ্ণুপ্রিয়া, মেইতেই এবং চা-জনগোষ্ঠী — থেকে ১৫ জন আদিবাসী তরুণ অংশগ্রহণ করেন।

কর্মশালার মাধ্যমে তারা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কমিউনিটি-ভিত্তিক তালিকাকরণে ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জন করেন। এর মধ্যে রয়েছে মৌখিক ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক চর্চা, ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্প এবং আদিবাসী জ্ঞানব্যবস্থার নথিভুক্তকরণ।

কর্মশালাটি পরিচালনা করেন ইউনেস্কো স্বীকৃত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিশেষজ্ঞ ড. আলেকজান্দ্রা ডেনেস।

কর্মশালার উদ্বোধনীতে ইউনেস্কোর বাংলাদেশ অফিস প্রধান ও প্রতিনিধি ড. সুসান ভাইস বলেন, “তরুণরা শুধুমাত্র ভবিষ্যতের ঐতিহ্যের রক্ষকের ভূমিকা পালন করবে এমন নয়, বরং বর্তমানেও তারা সক্রিয় সংস্কৃতির অংশীদার। এই কর্মশালার মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা কমিউনিটি ভিত্তিক তালিকাকরণে ব্যবহারযোগ্য দক্ষতা অর্জন করবে, যা সাক্ষাৎকার গ্রহণ, অডিওভিজুয়াল ডকুমেন্টেশন, নৈতিক গবেষণা পদ্ধতি এবং সঠিক অনুমোদন প্রক্রিয়ার সাথে সম্পর্কিত। এই পুরো প্রক্রিয়ার সময় কমিউনিটির ভূমিকা সর্বদাই কেন্দ্রীয় হওয়া উচিত।”

তিনি আরও বলেন: “সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে তরুণরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। কমিউনিটি-ভিত্তিক তালিকাকরণ ও নথিভুক্তকরণে তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই কর্মশালা আদিবাসী তরুণদের নিজেদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সক্রিয় রক্ষক হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।”

কমলগঞ্জের বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণকারী তৃষা সিনহা বলেন: “নিজের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে কাজ শুরু করার পর এই কর্মশালাটি আমার জন্য অনেক অর্থবহ হয়ে উঠেছে। ছোটবেলায় শুধু বইয়ে ইউনেস্কো সম্পর্কে পড়েছি, কিন্তু এই প্রথমবার তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ কার্যক্রমকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেলাম। গত কয়েক দিনে আমি অনেক নতুন বিষয় শিখেছি, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নতুন বন্ধু পেয়েছি এবং আমাদের ঐতিহ্য সংরক্ষণের গুরুত্ব আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছি।”

শমসেরনগর, কমলগঞ্জের চা-জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণকারী জিয়ানা মাদ্রাজি বলেন: “আমি সত্যি এখানকার কর্মশালার অংশ হতে পেরে খুবই আনন্দিত এবং গর্বিত। ইউনেস্কো ও CRIHAP দ্বারা আয়োজিত এই প্রশিক্ষণ কর্মশালার মাধ্যমে আমি আমাদের চা-জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা লাভ করেছি। বিশেষত, আমাদের দল "পাটিচকা" ঐতিহ্য নিয়ে আমাদের গবেষণার মাধ্যমে এই কর্মশালা আমাদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জীবনধারার কথা তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। আমি বিশ্বাস করি, এ ধরনের উদ্যোগ আমাদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করে এবং ভবিষ্যতে চা-জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”

সাহিত্য-সংস্কৃতি এর আরও খবর