img

আজ ১৯ মে: আসামে বাংলা ভাষা আন্দোলনের রক্তাক্ত দিন

প্রকাশিত :  ০৮:০৯, ১৯ মে ২০২৬

আজ ১৯ মে: আসামে বাংলা ভাষা আন্দোলনের রক্তাক্ত দিন

সংগ্রাম দত্ত: বাংলা ভাষার অধিকার রক্ষার সংগ্রামে শুধু ঢাকার রাজপথই রক্তে রঞ্জিত হয়নি, ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রচিত হয়েছিল ভারতের আসাম রাজ্যের বরাক উপত্যকায়। ১৯৬১ সালের ১৯ মে শিলচর রেলওয়ে স্টেশনে বাংলা ভাষার দাবিতে আন্দোলনরত নিরস্ত্র মানুষের ওপর গুলি চালায় আসাম প্রাদেশিক পুলিশ। সেই ঘটনায় প্রাণ হারান ১১ জন ভাষাসৈনিক। তাঁদের মধ্যে ছয়জনই ছিলেন অবিভক্ত সিলেটের সন্তান।

আজ ১৯ মে। বরাক উপত্যকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বাঙালির কাছে দিনটি ‘বাংলা ভাষা শহীদ দিবস’ হিসেবে গভীর শ্রদ্ধা ও বেদনার সঙ্গে স্মরণীয়।

অসমীয়াকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার উদ্যোগ থেকেই উত্তেজনা

১৯৬০ সালের এপ্রিলে আসাম প্রদেশ কংগ্রেস কমিটিতে অসমীয়াকে প্রদেশের একমাত্র দাপ্তরিক ভাষা করার প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। এতে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকাজুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। অসমিয়া উগ্রবাদী গোষ্ঠীর হামলার মুখে বহু বাঙালি পরিবার এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়।

বিভিন্ন সহিংস ঘটনায় হাজার হাজার বাঙালি ক্ষতিগ্রস্ত হন। তদন্ত কমিশনের তথ্যমতে, কামরূপ জেলার বহু গ্রামে ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়, নিহত হন অন্তত নয়জন বাঙালি, আহত হন শতাধিক মানুষ।

এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৬০ সালের ২৪ অক্টোবর আসাম বিধানসভায় অসমীয়াকে রাজ্যের একমাত্র সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। উত্তর করিমগঞ্জের বিধায়ক রণেন্দ্রমোহন দাস এ প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করলেও শেষ পর্যন্ত তা পাস হয়।

জন্ম নেয় কাছাড় গণসংগ্রাম পরিষদ

অসম সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বরাক উপত্যকার বাংলাভাষী জনগণ সংগঠিত হতে শুরু করেন। ১৯৬১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি গঠিত হয় ‘কাছাড় গণসংগ্রাম পরিষদ’। বাংলা ভাষাকে সরকারি ভাষার স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিতে শুরু হয় গণআন্দোলন।

১৪ এপ্রিল পালন করা হয় ‘সংকল্প দিবস’। এরপর ২৪ এপ্রিল থেকে শুরু হয় দীর্ঘ পদযাত্রা। প্রায় ২০০ মাইল পথ ঘুরে আন্দোলনকারীরা গ্রামে গ্রামে গিয়ে জনমত গড়ে তোলেন। আন্দোলনের নেতা রথীন্দ্রনাথ সেন ঘোষণা দেন—বাংলাকে সরকারি ভাষার মর্যাদা না দিলে ১৯ মে সর্বাত্মক হরতাল পালন করা হবে।

আন্দোলন দমনে প্রশাসন কঠোর অবস্থান নেয়। ১৮ মে আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ নেতা নলিনীকান্ত দাস, রথীন্দ্রনাথ সেন ও সাংবাদিক বিধুভূষণ চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হয়।

শিলচর রেলস্টেশনে রক্তঝরা ১৯ মে

১৯ মে সকাল থেকেই শিলচর, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দিতে শান্তিপূর্ণ হরতাল ও পিকেটিং চলছিল। শিলচর রেলস্টেশনে সত্যাগ্রহে অংশ নেন হাজারো মানুষ। সকালজুড়ে পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও দুপুরের পর উত্তেজনা বাড়তে থাকে।

প্রায় আড়াইটার দিকে কাটিগোরা থেকে গ্রেপ্তারকৃত কয়েকজন আন্দোলনকারীকে বহনকারী একটি পুলিশ ট্রাক স্টেশনের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় জনতা প্রতিবাদ জানায়। পরে সেখানে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই স্টেশনে অবস্থান নেওয়া প্যারামিলিটারি বাহিনী আন্দোলনকারীদের ওপর লাঠিচার্জ শুরু করে এবং মাত্র সাত মিনিটে ১৭ রাউন্ড গুলি চালায়।

গুলিতে আহত হন ১২ জন। তাঁদের মধ্যে নয়জন ঘটনাস্থলেই মারা যান। পরে আরও দু’জনের মৃত্যু হয়। ইতিহাসে অমর হয়ে যান বাংলা ভাষার ১১ শহীদ।

ভাষা আন্দোলনের ১১ শহীদ

শহীদরা হলেন—কানাইলাল নিয়োগী, চণ্ডীচরণ সূত্রধর, হিতেশ বিশ্বাস, সত্যেন্দ্রকুমার দেব, কুমুদরঞ্জন দাস, সুনীল সরকার, তরণী দেবনাথ, শচীন্দ্র চন্দ্র পাল, বীরেন্দ্র সূত্রধর, সুকোমল পুরকায়স্থ ও কমলা ভট্টাচার্য।

১১ শহীদের মধ্যে ৬ জনই সিলেটের সন্তান

ভাষা আন্দোলনে আত্মদানকারী ১১ শহীদের মধ্যে ছয়জন ছিলেন বর্তমান বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলের মানুষ। তাঁদের মধ্যে পাঁচজন হবিগঞ্জ জেলার এবং একজন সিলেটের গোলাপগঞ্জের বাসিন্দা। তাঁরা হলেন—বীরেন্দ্র সূত্রধর, নবীগঞ্জের বাহারামপুর গ্রামের সন্তান শচীন্দ্র চন্দ্র পাল, নবীগঞ্জের সন্দলপুর গ্রামের বাসিন্দা

হিতেশ বিশ্বাস, হবিগঞ্জের ব্রাহ্মণডুরা গ্রামের সন্তান

সত্যেন্দ্র দেব, হবিগঞ্জের দেউলী গ্রামের কৃতি সন্তান চণ্ডীচরণ সূত্রধর, উছাইল গ্রামের বাসিন্দা

কমলা ভট্টাচার্য, সিলেটের গোলাপগঞ্জের ঢাকা দক্ষিণ গ্রামের সন্তান কমলা ভট্টাচার্য ছিলেন বাংলা ভাষার দাবিতে প্রাণ দেওয়া একমাত্র নারী শহীদ।

আন্দোলনের বিজয় ও ইতিহাসের স্বীকৃতি

১৯ মে’র রক্তক্ষয়ী ঘটনার পর প্রবল জনচাপের মুখে আসাম সরকার বরাক উপত্যকায় বাংলাকে সরকারি ভাষার মর্যাদা দিতে বাধ্য হয়। সেই থেকে প্রতি বছর ১৯ মে বরাক উপত্যকাসহ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বাংলা ভাষা শহীদ দিবস পালিত হয়ে আসছে।

শুধু ১৯৬১ সালেই নয়, আসামে বাংলা ভাষার অধিকার রক্ষার আন্দোলনে পরবর্তীতেও রক্ত ঝরেছে। ১৯৭২ সালের ১৭ আগস্ট শহীদ হন বিজন চক্রবর্তী। পরে ১৯৮৬ সালের ২১ জুলাই প্রাণ দেন জগন্ময় দেব ও দিব্যেন্দু দাস।

ভাষার জন্য আত্মত্যাগের ইতিহাসে তাই ১৯ মে শুধু বরাক উপত্যকার নয়, সমগ্র বাঙালি জাতির এক অবিস্মরণীয় দিন।


img

‘আমি লেখক নই, শব্দের টোকাই’— মানুষের না-বলা বেদনা নিয়েই যার পথচলা

প্রকাশিত :  ০৯:০৬, ১৪ মে ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৯:৫২, ১৪ মে ২০২৬

ড. নাজমুল ইসলাম

নিজেকে লেখক বা সাহিত্যিক পরিচয়ে পরিচিত করাতে তিনি নারাজ। বরং মানুষের ফেলে আসা কষ্ট, নীরব কান্না আর অবহেলিত জীবনের গল্প কুড়িয়ে বেড়ানো একজন সাধারণ মানুষ হিসেবেই নিজের পরিচয় দিতে তিনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। তাই নিজের ভাষায় তিনি বলেন, "আমি আসলে একজন শব্দের টোকাই।"

তাঁর মতে, সাহিত্য কেবল কল্পনার রঙিন জগৎ নয়; বরং মানুষের বাস্তব জীবনের ক্ষত, না-বলা বেদনা আর নীরব দীর্ঘশ্বাস থেকেই সত্যিকারের লেখনীর জন্ম হয়। শহরের ক্লান্ত ফুটপাত, গ্রামের ধুলোমাখা পথ, হাসপাতালের করিডোরে কান্নায় ভেঙে পড়া কোনো মা কিংবা শেষ ট্রেন মিস করা মানুষের নিঃসঙ্গ প্রতীক্ষা — এসব দৃশ্যই তাঁর শব্দের মূল উৎস।

তিনি বলেন, "আমি গল্প লিখি না, মানুষর ভেতরে জমে থাকা কষ্টের ভাষা খুঁজে বেড়াই।" সারাদিন রিকশা চালিয়ে রাতে সন্তানকে আধপেটা খাইয়ে ঘুম পাড়ানো বাবার চাপা দীর্ঘশ্বাস কিংবা প্রতিদিন হাসির অভিনয় করা কোনো মেয়ের অন্তর্বেদনা — এসব অনুভূতিই তাঁর লেখার প্রধান উপজীব্য।

তাঁর লেখার টেবিলে জমা থাকে ভাঙা স্মৃতি, নির্ঘুম রাত আর অসমাপ্ত স্বপ্নের আখ্যান। তিনি বিশ্বাস করেন, সমাজ যাদের কথা মনে রাখে না এবং ইতিহাস যাদের পাশ কাটিয়ে যায়, তারাই আসলে সবচেয়ে গভীর গল্পের মানুষ।

মানুষের চোখের জলকে তিনি সবচেয়ে 'সত্যিকারের ভাষা' বলে মনে করেন। তাঁর ভাষায়, "কান্না শুকিয়ে যাওয়ার পর যে দাগটি থেকে যায়, আমি শুধু সেই দাগের ভাষা পড়ার চেষ্টা করি।"

গভীর রাতে মানুষের যাতনা তাঁকে নির্ঘুম রাখে। কোনো অবহেলিত মানুষের ভাঙা স্বপ্ন বা নীরব দীর্ঘশ্বাস যখন তাঁর সত্তায় শব্দ হয়ে প্রতিধ্বনিত হয়, তখনই তিনি কলম ধরেন। নিজের পরিচয় প্রসঙ্গে তিনি আবারও বিনয়ের সঙ্গে বলেন, "আমি লেখক নই; আমি কেবল মানুষের ফেলে যাওয়া ব্যথা কুড়িয়ে বেড়ানো এক শব্দের টোকাই।"