img

ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা : বছরের সেরা দশ দিন

প্রকাশিত :  ০৮:৪৮, ২৩ মে ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৯:৩৭, ২৩ মে ২০২৬

ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা : বছরের সেরা দশ দিন

শায়খ রাশিদ খান

এটা আল্লাহর অসীম দয়া ও অনুগ্রহ যে, তিনি বছরের মধ্যে কিছু বিশেষ সময় রেখেছেন। এসব সময়ে ভালো আমলের সওয়াব অনেক বেশি বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এগুলো এমন সময়, যখন আমরা আগের ঘাটতি পূরণ করতে পারি এবং আল্লাহ আমাদের জন্য রহমত ও নেকির দরজা খুলে দেন।

আল্লাহ আমাদের নামাজ, রোজা ও ভালো কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন । নবী (সা:) শিখিয়েছেন যে, সবসময় আল্লাহর ইবাদত করতে হবে । কিন্তু তিনি এটাও শিখিয়েছেন যে, কিছু বিশেষ সময় আছে যখন আল্লাহর রহমত আরও বেশি নেমে আসে । মুমিনকে বলা হয়েছে, সে যেন এই রহমতের মৌসুমকে কাজে লাগায়।

এমনই এক মহান সময় হলো: জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিন।

আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনের সুরা আল-ফজর-এর শুরুতে শপথ করে বলেন: “শপথ ফজরের, এবং শপথ দশ রাতের।”

আল্লাহ যখন কুরআনে শপথ করেন, তা আমাদের মতো নয়। আমরা সত্য প্রমাণের জন্য শপথ করি, কিন্তু আল্লাহ তো নিজেই পরম সত্য। বরং, আল্লাহর শপথের উদ্দেশ্য হলো আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা—যেন আমরা বিষয়টির গুরুত্ব বুঝি।

অনেক আলেম বলেছেন, “ফজর” বলতে জিলহজ্জের দশম দিনের ফজর বোঝানো হয়েছে । আবার কেউ বলেছেন, এটি প্রথম দিনের ফজরকে বোঝায়। কারণ, এই দশ দিনের শুরু থেকেই আল্লাহর বরকত নেমে আসতে শুরু করে। তাই আমাদের দশম দিন বা আরাফার দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত নয়। প্রথম দিন থেকেই এই বিশেষ সময়কে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

এরপর আল্লাহ বলেন, “দশ রাতের শপথ।” অধিকাংশ তাফসিরবিদ বলেছেন, এটি জিলহজ্জের প্রথম দশ দিনকেই বোঝায়। এই দিনগুলোর ফজিলত সম্পর্কে ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত সহিহ বুখারির একটি হাদিস রয়েছে। নবী (সা:) বলেছেন: এমন কোনো দিন নেই, যেসব দিনে নেক আমল আল্লাহর কাছে এই দিনগুলোর চেয়ে বেশি প্রিয়।

এই হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনা আছে । আলেমরা বলেন, নবী (সা:) বিভিন্ন সময়ে এই দশ দিনের ফজিলত বিভিন্নভাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন—এগুলো বছরের সেরা দিন, সবচেয়ে প্রিয় দিন, এবং ইবাদতের জন্য সবচেয়ে উত্তম সময়। তাই আলেমরা বলেছেন, এই দশ দিনই পুরো বছরের শ্রেষ্ঠ দশ দিন।

অনেকের মনে প্রশ্ন আসে—তাহলে রমজানের শেষ দশ রাত? আলেমরা বলেন, রমজানের শেষ দশ রাত সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ রাত, আর জিলহজ্জের প্রথম দশ দিন সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ দিন।

তাহলে প্রশ্ন হলো: আমরা কেন এই দিনগুলোকে রমজানের শেষ দশ রাতের মতো গুরুত্ব দিই না কেন?

রমজানে চারদিকে ইবাদতের পরিবেশ থাকে। মসজিদ ভরা থাকে, পরিবারে সবাই একে অপরকে উৎসাহ দেয়, সামাজিক মাধ্যমেও ইবাদতের কথা চলে । কিন্তু জিলহজ্জের এই দশ দিনে এমন পরিবেশ অনেক সময় দেখা যায় না।

হয়তো এ কারণেই এই দিনগুলো এত মূল্যবান। অনেক মানুষ এসব দিনের গুরুত্ব জানেই না বা অবহেলা করে। আর মানুষের অবহেলার সময়ে আল্লাহর ইবাদত করা বিশেষ মর্যাদার কাজ।

নবী (সা:) জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তিনি কেন শাবান মাসে এত রোজা রাখতেন। তিনি বলেন, এটি এমন একটি মাস, যাকে মানুষ অবহেলা করে । যেন তিনি বলতে চেয়েছেন: “মানুষ যখন গাফেল থাকে, তখন আমি চাই আল্লাহ আমাকে তাঁর ইবাদতে দেখুন।' এটাই হলো অবহেলার সময়ে ইবাদতের সৌন্দর্য।

তাহাজ্জুদের নামাজ এত বিশেষ কেন? কারণ, তখন সবাই ঘুমিয়ে থাকে। কেউ গাফেল, কেউ হয়তো গুনাহে লিপ্ত—আর সেই সময় একজন মুমিন আল্লাহর সামনে দাঁড়ায়।

সাহাবারা এই বিষয়টি বুঝেছিলেন। তাই তারা এই দশ দিনকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতেন। তারা তিনভাবে এই দিনগুলোর মর্যাদা প্রকাশ করতেন: হৃদয়ে, মুখে, এবং কাজে।

প্রথমে হৃদয়ে। আল্লাহ বলেন: যে ব্যক্তি আল্লাহর নিদর্শনসমূহের সম্মান করে, তা তো অন্তরের তাকওয়ার পরিচয়।” তাকওয়া এভাবেই তৈরি হয়—আল্লাহ যা সম্মান করেন, সেটাকে সম্মান করা; আল্লাহ যা ভালোবাসেন, সেটাকে ভালোবাসা।

যখন হৃদয়ে এই ভালোবাসা আসে, তখন তা কথাতেও প্রকাশ পায় । কারণ, আমরা যাকে ভালোবাসি, তার কথা বলতেই ভালো লাগে।

এরপর আসে কাজ। এই সময়ের সবচেয়ে বড় কদর হলো—এতে বেশি বেশি নেক আমল করা। এগুলো এমন দিন, যখন আল্লাহ সওয়াব বহু গুণ বাড়িয়ে দেন। আল্লাহ জানেন আমরা দুর্বল। তিনি বলেন: মানুষকে দুর্বল করে সৃষ্টি করা হয়েছে।”

আমরা ভুল করি, ইবাদতে কমতি করি। তাই আল্লাহ আমাদের জন্য বিশেষ বিশেষ সময় দেন, যেন আমরা ঘাটতি পূরণ করতে পারি। যদি রমজানে কিছু মিস হয়ে যায়, তাহলে এই দিনগুলো আরেকটি সুযোগ।

তবে মনে রাখতে হবে—যেমন নেকির সওয়াব বাড়ে, তেমনি এই সময়ের গুনাহও বেশি গুরুতর হয়। আল্লাহ যে সময়কে সম্মানিত করেছেন, সেই সময়ে গুনাহ করা অকৃতজ্ঞতার মতো।

আল্লাহ শুধু দিনের নয়, রাতের কথাও বলেছেন। জিলহজ্জের রাতগুলোও বরকতময়। রাত হলো নিরিবিলি ইবাদতের সময়—কাজ নেই, কোলাহল নেই, শুধু আপনি আর আল্লাহ। আপনি যদি আল্লাহর কাছাকাছি হতে চান, তাহলে এই রাতগুলোতে ইবাদত করার চেষ্টা করুন।

সবশেষে, হাদিসের একটি শব্দের দিকে খেয়াল করুন। নবী (সা:) বলেছেন, এই দিনগুলোর নেক আমল “আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয়।” ইবাদতের মূল ভিত্তি হলো ভালোবাসা। আমরা যাকে ভালোবাসি, সে যা পছন্দ করে, আমরাও তা গুরুত্ব দিই। তাই আল্লাহ যদি বলেন, কোনো কিছু তাঁর কাছে প্রিয়, তাহলে সেটি আমাদের হৃদয়কে নাড়া দেওয়া উচিত।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে যেন এই মহান দশ দিনকে সঠিকভাবে কাজে লাগানোর তাওফিক দেন। তিনি যেন আমাদেরকে তাঁর প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করেন, যারা আল্লাহ যা ভালোবাসেন তা ভালোবাসে, যা সম্মান করেন তা সম্মান করে, এবং আন্তরিকতার সঙ্গে ইবাদত করে। আমীন।

শায়খ রাশিদ খান : অতিথি খাতিব, ইস্ট লন্ডন মস্ক এন্ড লন্ডন মুসলিম সেন্টার । ১৫ মে ২০২৬।

ধর্ম এর আরও খবর

img

ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা : আমরা আমাদের মুল্যবান সময়কে কীভাবে কাজে লাগাচ্ছি?

প্রকাশিত :  ১৮:৫৬, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শায়খ মুস্তফা আবদুল্লাহ

সময় আল্লাহ তাআলার অন্যতম বড় নিয়ামত। মানুষের জীবন মূলত আল্লাহর দেওয়া সময়েরই একটি সমষ্টি । তাই সময়কে অবহেলা না করে সঠিকভাবে কাজে লাগানো প্রত্যেকের দায়িত্ব— কথাগুলো বলেছেন শায়খ মুস্তফা আবদুল্লাহ।

২৮ আগস্ট শুক্রবার ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবায় তিনি আরো বলেন, আল্লাহ তাআলা মানুষকে অসংখ্য নিয়ামত দিয়েছেন, যা গণনা করে শেষ করা সম্ভব নয়। এর মধ্যে সময় এমন একটি মৌলিক নিয়ামত, যার ওপর আমাদের শিক্ষা, ইবাদত, পরিবার, কাজ, সাফল্য ও মানুষের সেবা—সবকিছু নির্ভর করে।

তিনি বলেন, হৃদপিণ্ডের প্রতিটি স্পন্দন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জীবনের আরেকটি মুহূর্ত চলে যাচ্ছে । হারিয়ে যাওয়া সময় আর কখনো ফিরে আসে না।

মোবাইল ফোন ও সোশাল মিডিয়াকে বর্তমান সময়ের বড় একটি বিভ্রান্তি হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনেক সময় আমরা কয়েক মিনিটের জন্য ফোন হাতে নিই, কিন্তু অজান্তেই এক ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় চলে যায়। এতে শুধু মনোযোগ নষ্ট হয় না, জীবনের মূল্যবান একটি অংশও হারিয়ে যায়।

তরুণদের উদ্দেশে শায়খ মোস্তফা আবদুল্লাহ বলেন, যারা নতুন করে স্কুলে যাচ্ছে, জিসিএসই পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করছে কিংবা ভবিষ্যতে কী করবে তা নিয়ে ভাবছে—তাদের উচিত কোনো কাজ শেষ মুহূর্তের জন্য ফেলে না রাখা।

অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষার মাত্র এক বা দুই সপ্তাহ আগে পড়াশোনা শুরু করে । কিন্তু যদি বছরের শুরু থেকেই প্রতিদিন অল্প অল্প করে পড়া, রিভিশন বা নতুন কিছু শেখার অভ্যাস করা যায়, তাহলে পরীক্ষার সময় অতিরিক্ত চাপ নিতে হয় না এবং প্রস্তুতিও অনেক ভালো হয়।

প্রতিদিন মাত্র ১০ মিনিট পড়াশোনা হয়তো খুব সামান্য মনে হতে পারে । কিন্তু এই ১০ মিনিট যদি নিয়মিতভাবে কাজে লাগানো হয়, তাহলে কয়েক মাস বা এক বছরে তা অনেক ঘণ্টায় পরিণত হয় । একইভাবে, প্রতিদিন মাত্র দুই পৃষ্ঠা করে পড়লেও এক বছরে শত শত পৃষ্ঠা পড়া হয়ে যায়।

বড় সাফল্যের জন্য সবসময় একসঙ্গে অনেক কিছু করতে হয় না। প্রতিদিন অল্প অল্প করে নিয়মিত চেষ্টা করলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা বড় অর্জনে পরিণত হতে পারে। তাই ভালো কোনো কাজ শুরু করার জন্য ‘পরে করব’ না ভেবে আজ থেকেই শুরু করা উচিত।

তিনি বলেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের শক্তি ও সামর্থ্য কমে যায়। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন, মানুষকে দুর্বল অবস্থায় সৃষ্টি করার পর শক্তি দেন, আবার শক্তির পর দুর্বলতা ও বার্ধক্য আসে। তাই শক্তি ও সুযোগ থাকা অবস্থাতেই সময়ের সদ্ব্যবহার করা প্রয়োজন।

পবিত্র কুরআনে সময়ের গুরুত্ব বারবার তুলে ধরা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা সূরা আল-আসরে সময়ের শপথ করেছেন। এছাড়া দিন, রাত, সকাল ও ভোরের শপথের মাধ্যমেও মানুষকে সময়ের গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে।

রাসুলুল্লাহ (সা:)-এর হাদিস উদৃত করে তিনি বলেন, “যা তোমার উপকারে আসে, তার প্রতি আগ্রহী হও, আল্লাহর সাহায্য চাও এবং অসহায় হয়ে বসে থেকো না।”

তিনি আরও বলেন, অলসতা মানুষের শুধু সময়ই নষ্ট করে না, জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সুযোগও কেড়ে নেয়। তাই দিনকে পরিকল্পিতভাবে সাজানো, সময়কে রক্ষা করা এবং ভালো কাজ দ্রুত শুরু করা উচিত।

খুতবার শেষাংশে মুসলিম কমিউনিটিকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কিছু ব্যক্তি বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণের মাধ্যমে মুসলমানদের বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলিয়ে পরে সেসব বক্তব্য প্রসঙ্গের বাইরে ব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার করে ইসলাম ও মুসলমানদের ভুলভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছেন।

তিনি কমিউনিটির সদস্যদের এ ধরনের ব্যক্তিদের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় আলোচনায় না জড়ানোর পরামর্শ দিয়ে বলেন, মসজিদ প্রাঙ্গণে এমন কিছু ঘটলে দায়িত্বশীল স্টাফদের দ্রুত জানানো উচিত।

সবশেষে শায়খ মুস্তফা আবদুল্লাহ দোয়া করেন, আল্লাহ যেন আমাদের সময়ের মধ্যে বরকত দান করেন, অলসতা ও উদাসীনতা থেকে রক্ষা করেন এবং জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত কল্যাণকর কাজে ব্যয় করার তাওফিক দেন।

(শায়খ মোস্তফা আবদুল্লাহ : অতিথি খাতিব, ইস্ট লন্ডন মস্ক এন্ড লন্ডন মুসলিম সেন্টার । জুমার খুতবা, ২৮ আগস্ট ২০২৬। )