img

মানুষ মানুষের জন্য

প্রকাশিত :  ০৭:২০, ০৬ জুন ২০২৬

মানুষ মানুষের জন্য
রেজুয়ান আহম্মেদ
“সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।”
— চণ্ডীদাস
মানবসভ্যতার ইতিহাসের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত যে মূলমন্ত্রটি সমাজকে টিকিয়ে রেখেছে, তা হলো ‘মনুষ্যত্ব’। সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে মানুষের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তার সহমর্মিতা ও ভালোবাসার ক্ষমতা। কবি চণ্ডীদাস বহু বছর আগে মানুষের এই শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু আধুনিক যুগে এসে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির সমান্তরালে মানুষের আত্মিক জগতে এক অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি হয়েছে। মানুষ আজ যান্ত্রিক গতিশীলতায় অন্ধ হয়ে নিজের ভেতরের দয়া ও সহানুভূতি হারিয়ে ফেলছে। অথচ ইতিহাসের প্রতিটি সংকটে বারবার প্রমাণিত হয়েছে যে, সভ্যতার শেষ আশ্রয় কোনো ইট-পাথরের প্রাসাদে নয়, বরং তা লুকিয়ে আছে মানুষের বাড়িয়ে দেওয়া উষ্ণ হাতটির ভেতর।
সময়ের আবর্তনে শহরের পিচঢালা রাজপথ, বহুতল ভবন আর নিয়ন আলোর ঝলকানিতে মানুষের জীবন সহজ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আত্মিক দূরত্ব বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। আজকের মানুষ ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে চলেছে এক ক্লান্তিকর ইঁদুর-দৌড়ে। প্রযুক্তি মানুষকে ভৌগোলিক দূরত্বে কাছাকাছি আনলেও হৃদয়ের বন্ধনগুলোকে এক অদৃশ্য প্রাচীরের আড়ালে বন্দি করে ফেলেছে।
এই মানবিক দেউলিয়াত্বের চরম রূপ দেখা যায় যখন মানুষের তীব্রতম কষ্ট অন্য মানুষের বিনোদনের খোরাক হয়ে ওঠে। নরসিংদী রেলস্টেশনের এক মর্মন্তুদ দুর্ঘটনায় যখন চলন্ত ট্রেনের ধাক্কায় এক রক্তাক্ত মা ও শিশু প্ল্যাটফর্মে কাতরাচ্ছিল, তখন শত শত মানুষ এগিয়ে না এসে ব্যস্ত ছিল মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় সেই মৃত্যুর দৃশ্য ধারণ করতে। মানুষের আর্তনাদ আজ স্ক্রিনের ‘কনটেন্ট’ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের লাইক-শেয়ারের উপাদানে পরিণত হয়েছে। যখন মানুষের জীবনের চেয়ে ভার্চুয়াল দুনিয়ার প্রসার বড় হয়ে ওঠে, তখন সমাজের আত্মিক মৃত্যু ঘটে। এই স্বার্থপরতা ও উদাসীনতা প্রমাণ করে যে, বাহ্যিক সভ্যতার মুখোশের আড়ালে মানুষ আজ একেকজন স্বার্থপর পশুতে পরিণত হচ্ছে।
শহুরে জীবনের এই যান্ত্রিক নরক ও মানসিক অবসাদ থেকে মুক্তির পথ দেখায় বাংলার চিরন্তন গ্রামীণ প্রকৃতি ও মাটির কাছাকাছি থাকা সাধারণ মানুষ। বাংলার লোকজ সংস্কৃতি ও দর্শনের মূল ভিত্তিই হলো মানবতাবাদ। লালন শাহের জাত-পাতহীন দর্শন, শ্রীচৈতন্যদেবের প্রেমধর্ম কিংবা রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের “শিবজ্ঞানে জীবসেবা”—সবই মানুষকে এক পরম সত্যের দিকে আহ্বান করে।
এই পরম সত্যের সন্ধান কোনো বিলাসবহুল প্রাসাদে নয়, বরং পাওয়া যায় প্রত্যন্ত গ্রামের কোনো এক দরিদ্র রিকশাচালকের মাটির কুঁড়েঘরে। জীবিকার তাগিদে যে মানুষটি দিনে রিকশা চালায়, অথচ রাতে হারিকেনের আলোয় লিও টলস্টয়, ম্যাক্সিম গোর্কি, রবীন্দ্রনাথ কিংবা নজরুলের সাহিত্যসাধনায় মগ্ন থাকে, সেই-ই প্রকৃত মানুষ। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায়, তাঁর বেড়ে ওঠার পেছনেও ছিল জাত-ধর্মের ঊর্ধ্বে ওঠা কিছু মানুষের মানবিক হাত। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্যও আমাদের শেখায়—ছোট হোক বা বড় হোক, মানুষ চরম মুহূর্তে নিজের স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দাঁড়াতে পারে। মানুষের এই দেবত্বকে বিশ্বাস করাই বেঁচে থাকার আসল পাঠ।
প্রকৃতির রুদ্ররূপ মানুষের অহংকার ও সংকীর্ণতাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়। জলবায়ু পরিবর্তন ও মানুষের দুর্নীতির কারণে নদীভাঙন আজ এক নির্মম সত্য। মহেশপুর গ্রামের দক্ষিণ পাড়ার জীর্ণ বাঁধটি যখন ধনী ব্যবসায়ী হরিহর ঘোষের মতো প্রভাবশালী মানুষের অর্থ আত্মসাতের কারণে ভেঙে পড়ে, তখন প্রকৃতি ধনী-দরিদ্রের কোনো ভেদ রাখে না। আষাঢ়ের প্রলয়ংকরী বন্যায় যখন তাসের ঘরের মতো ভেসে যায় গরিবের কুঁড়েঘর, তখন জল কিন্তু ধনীর পাকা দালানকেও রেহাই দেয় না।
কিন্তু এই প্রলয়ের মাঝেই ঘটে মানুষের আত্মিক রূপান্তর। যে রিকশাচালক রশিদুলকে সমাজ ‘ছোটলোক’ বলে অবহেলা করত, সে নিজের একমাত্র সম্বল—প্রিয় বইয়ের তাকের মায়া ত্যাগ করে নৌকার হাল ধরে মানুষের জান বাঁচাতে। অন্যদিকে, যে হরিহর ঘোষ অহংকারে অন্ধ হয়ে মানুষকে উপহাস করেছিলেন, বন্যার তীব্র স্রোতে দালান ভেঙে পড়ার মুহূর্তে তাঁর সব অর্থ-সম্পদ অর্থহীন হয়ে যায়। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন:
“নারীর কোমলতা আর পুরুষের সহমর্মিতাই এই ভঙ্গুর সমাজকে টিকিয়ে রাখে।”
বিপদের মুখে শত্রুর প্রতি ক্ষোভ ভুলে নিজের জীবন বাজি রেখে মানুষকে বাঁচানোই মানুষের পরম ধর্ম। বন্যার জলে নামলে যেমন ধনী-দরিদ্রের ভেদাভেদ থাকে না, তেমনই মানুষের মনুষ্যত্ব সমস্ত কুসংস্কার ও স্বার্থপরতার দেয়াল ধুলোয় মিশিয়ে একাকার করে দেয়।
সংকট কেটে যাওয়ার পর মানুষের বুকের ভেতরের সংকীর্ণতাও ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে যায়। বিপর্যয়ের পর তৈরি হয় এক নতুন সমবায় চেতনা। অর্থের পেছনে অন্ধের মতো ছোটা মানুষও বুঝতে পারে যে, মানুষের আসল সম্পদ তার অর্থ নয়, বরং তার চরিত্র ও মানবিকতা। ধনীর অর্থ আর শ্রমিকের আদর্শ যখন মিলেমিশে একাকার হয়, তখন সমাজে এক নতুন যুগের সূচনা ঘটে। নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত ভূমিহীন মানুষের যৌথ চাষাবাদ ও শিশুদের অবৈতনিক পাঠশালা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যে নতুন কর্মযজ্ঞ শুরু হয়, তা-ই হলো প্রকৃত সমাজসংস্কার।
ভূপেন হাজারিকার সেই অমর বাণী— “মানুষ মানুষের জন্যে, জীবন জীবনের জন্যে, একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না... ও বন্ধু?” —কেবল একটি গান নয়, এটি আমাদের জীবনের শেষ ধ্রুবতারা। আধুনিক যান্ত্রিক সভ্যতার মুখে মহেশপুরের গল্প এক জ্বলন্ত চপেটাঘাত। আমরা যখন নিজের স্বার্থের গণ্ডিতে আবদ্ধ হয়ে পড়ি, তখন প্রলয়ের রাতগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের চেয়ে বড় এই মহাবিশ্বে আর কিছু নেই। আসুন, আমরা আমাদের ভেতরের স্বার্থপরতার মুখোশটি ছিঁড়ে ফেলি। বিপদে পড়া মানুষের দিকে ফোনের ক্যামেরা না বাড়িয়ে সাহায্যের হাতটি বাড়িয়ে দিই। আসুন, আমরা আবার প্রকৃত অর্থে মানুষ হয়ে উঠি।

সাহিত্য-সংস্কৃতি এর আরও খবর

img

সীমানা পেরিয়ে সাহিত্যের নীরব যাত্রা: বিশ্বায়নের যুগে এক প্রচারবিমুখ কথাসাহিত্যিকের মনন ও সৃজনবীক্ষা

প্রকাশিত :  ১৮:৫৮, ১৮ জুলাই ২০২৬

ড. অরুণ রায় চৌধুরী 

সাহিত্যের সুদীর্ঘ ইতিহাসে এমন কিছু কালজয়ী স্রষ্টার দেখা মেলে, যাঁদের নাম প্রথমে লোকমুখে উচ্চারিত হয় না; বরং তাঁদের কালজয়ী সৃষ্টিই একসময় প্রদীপ্ত হয়ে আত্মপ্রকাশ করে। তাঁরা কখনো প্রচারের আলো খোঁজেন না; বরং আলোই এক মোহময় আকর্ষণের মাধ্যমে তাঁদের খুঁজে নেয়। বাংলা সাহিত্যের সুদীর্ঘ ও সমৃদ্ধ ঐতিহ্যে এই ঘরানার নিভৃতচারী লেখকের সংখ্যা নিতান্ত কম নয়। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিভৃত জীবন, জীবনানন্দ দাশের ঘোরলাগা আত্মমগ্নতা কিংবা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের পরিমিত ও সংযত সাহিত্যচর্চা আমাদের বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় স্থায়ী সাহিত্যিক ভিত্তি শেষ পর্যন্ত প্রচারের করতালিতে নয়, বরং সৃষ্টির অতল গভীরতায় নির্মিত হয়।

তবে বর্তমান ডিজিটাল যুগে এসে সেই চিরন্তন বাস্তবতার রূপান্তর ঘটেছে। আধুনিক বিপণনব্যবস্থায় একজন লেখকের বই প্রকাশের সঙ্গেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় প্রচারণার ঝড়। অনেক সময় পাঠক মূল বইটি পড়ার আগেই লেখকের বহুল প্রচারিত পরিচিতির মুখোমুখি হন। বাজার, করপোরেট বিপণন এবং যান্ত্রিক অ্যালগরিদমের এই সময়ে সাহিত্যও যেন পণ্যের মতো দৃশ্যমানতার প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়েছে। এই বাস্তবতার মধ্যেও যদি কোনো কথাসাহিত্যিক দীর্ঘ সময় ধরে নিভৃত সাধনায় আত্মনিয়োগ করেন এবং তাঁর রচনা দেশীয় গণ্ডি অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক পাঠকমহলে আলোচিত হতে শুরু করে, তবে তা নিঃসন্দেহে গভীর সাহিত্যিক আলোচনার দাবি রাখে।

ডিজিটাল বাস্তবতায় বিশ্বায়ন ও নন্দনতত্ত্বের দ্বান্দ্বিকতা

ঠিক এই প্রেক্ষাপটেই রেজুয়ান আহম্মেদের সাহিত্যযাত্রা এক গভীর ও মৌলিক প্রশ্নের জন্ম দেয়। তিনি কি সমকালীন বাংলা কথাসাহিত্যের কোনো নতুন ও প্রগতিশীল ধারার প্রতিনিধিত্ব করছেন, নাকি কেবল ডিজিটাল প্রকাশনার সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিশ্ববাজারে প্রবেশের একটি উদাহরণ? এই প্রশ্নের উত্তর এতটা সরল নয়। কারণ, একজন লেখকের সামগ্রিক সাহিত্যিক গুরুত্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাঁর বইয়ের বিক্রি বা বৈশ্বিক বিপণনই শেষ কথা নয়; বরং তাঁর রচনার অন্তর্নিহিত নন্দনতত্ত্ব, ভাষার বুনন, মানবিক গভীরতা এবং সময়কে ধারণ করার ক্ষমতাই প্রকৃত কষ্টিপাথর।

তবু এটুকু অনস্বীকার্য যে, বাংলা ভাষায় লিখে আন্তর্জাতিক প্রকাশনা ও বৈশ্বিক বিতরণব্যবস্থায় প্রবেশের এই প্রচেষ্টা নিজেই একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। বহু দশক ধরে বাংলা সাহিত্য বিশ্বের নানা ভাষায় অনূদিত হলেও সমকালীন লেখকদের একটি বড় অংশ আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিলেন। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর প্রকাশনা সেই দীর্ঘদিনের সীমাবদ্ধতায় কিছুটা হলেও পরিবর্তনের সূচনা করেছে। আজ পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে একজন লেখকের বই সংগ্রহ করা সম্ভব। কিন্তু সেই প্রযুক্তিগত সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একজন স্রষ্টা আদৌ পাঠকের অন্তরের সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারছেন কি না সেটিই আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাস আমাদের এই শাশ্বত শিক্ষাই দেয় সাহিত্য কখনো কেবল ভাষার মাধ্যমেই বিশ্বজনীন হয় না; বরং মানুষের মৌলিক অভিজ্ঞতার গভীরতায় তা বিশ্বজনীন হয়ে ওঠে। ভাষা তার নান্দনিক বাহন, কিন্তু অকৃত্রিম মানবিকতাই তার প্রকৃত পরিচয়।

শিকড়ের গণ্ডি পেরিয়ে বৈশ্বিক সংকটের আখ্যান

রেজুয়ান আহম্মেদের সাহিত্যচর্চার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি চেনা লোকজ বাস্তবতার ভেতর থেকে বৈশ্বিক প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেন। তাঁর আলোচিত উপন্যাসগুলোর বিষয়বস্তু লক্ষ করলে দেখা যায় যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি, মানবিক সংকট, নৈতিক দোলাচল এবং শান্তির আকাঙ্ক্ষা বারবার ফিরে আসে। সাহিত্য যখন কেবল ইতিহাসের ঘটনাবিবরণ নয়, বরং মানুষের অন্তর্গত ভাঙন ও রক্তক্ষরণকে শিল্পের ভাষায় প্রকাশ করে, তখনই তা ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক সীমানা অতিক্রম করার সক্ষমতা অর্জন করে। কারণ, যুদ্ধের ভাষা দেশভেদে ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু স্বজন হারানোর শোকের ভাষা পৃথিবীর সর্বত্র এক।

সমকালীন বিশ্ব আজ এক অস্থির সময় অতিক্রম করছে। গণমাধ্যম প্রতিদিন আমাদের সামনে যুদ্ধ, উদ্বাস্তু সংকট, ধ্বংসযজ্ঞ এবং মানবিক বিপর্যয়ের অসংখ্য চিত্র তুলে ধরছে। কিন্তু সংবাদ যেখানে কেবল ঘটনার বিবরণ দেয়, সাহিত্য সেখানে মানুষের নীরব অভিজ্ঞতাকে ধারণ করে। একজন প্রকৃত কথাসাহিত্যিকের কাজ কোনো রাজনৈতিক পক্ষের মুখপাত্র হওয়া নয়; তাঁর দায়িত্ব মানুষের অন্তর্গত সত্যকে শিল্পে রূপ দেওয়া। কোনো লেখক যদি সেই মানবিক ও নান্দনিক ভারসাম্য রক্ষা করতে পারেন, তবে তাঁর সৃষ্টি ভাষা ও সংস্কৃতির সীমানা অতিক্রম করে বিশ্বপাঠকের কাছেও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।

এই কারণেই রেজুয়ান আহম্মেদের সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করতে হলে কেবল তাঁর প্রকাশনার আন্তর্জাতিক পরিসর নয়, বরং তাঁর বিষয় নির্বাচনের দিকেও গভীর দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। যুদ্ধকে তিনি যদি কেবল ভূরাজনৈতিক সংঘাত হিসেবে না দেখে মানুষের অস্তিত্বসংকট হিসেবে তুলে ধরেন, তবে তা বাংলা সাহিত্যের মানবিক ধারার একটি তাৎপর্যপূর্ণ সম্প্রসারণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

দ্বিভাষিক প্রকাশনা ও সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন

রেজুয়ান আহম্মেদের সাহিত্যযাত্রার আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো তাঁর দ্বিভাষিক প্রকাশনার প্রচেষ্টা। বাংলা ভাষায় রচিত সাহিত্য যখন ইংরেজির মাধ্যমে নতুন পাঠকের কাছে পৌঁছে যায়, তখন তা কেবল অনুবাদ থাকে না; বরং একটি সাংস্কৃতিক সংলাপে রূপ নেয়। বিশেষ করে, প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের বহু বাঙালি মাতৃভাষায় পুরোপুরি স্বচ্ছন্দ না হলেও নিজেদের শিকড় ও ঐতিহ্যকে জানতে আগ্রহী। তাঁদের কাছে বাংলা সমাজ, পারিবারিক মনস্তত্ত্ব, ইতিহাস এবং বাঙালি মানসের পরিচয় পৌঁছে দিতে দ্বিভাষিক সাহিত্য একটি কার্যকর সাংস্কৃতিক সেতু হিসেবে কাজ করতে পারে।

অবশ্য এই অগ্রযাত্রার পাশাপাশি একটি সতর্কতাও জরুরি। আন্তর্জাতিক প্রকাশনা কিংবা বৈশ্বিক বিপণন একজন লেখককে দৃশ্যমান করে তুলতে পারে, কিন্তু তা তাঁকে রাতারাতি বড় সাহিত্যিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে না। প্রকৃত সাহিত্যিক মর্যাদা অর্জনের জন্য প্রয়োজন সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া। এর জন্য অপরিহার্য পাঠকের পুনঃপাঠ, সমালোচকের বিশ্লেষণ এবং গবেষকের মনোযোগ। ইতিহাসে বহু জনপ্রিয় বই বিস্মৃত হয়েছে, আবার বহু অবহেলিত রচনা সময়ের প্রবাহে ক্লাসিক হয়ে উঠেছে। তাই সমকালীন যেকোনো লেখকের মূল্যায়নে সংযম ও ভারসাম্য বজায় রাখাই শ্রেয়।

মহাকালের আদালতে সাহিত্যের প্রকৃত বিচার

একবিংশ শতাব্দীর পৃথিবীকে যদি একটি শব্দে সংজ্ঞায়িত করতে হয়, তবে সেই শব্দটি হবে অনিশ্চয়তা। আধুনিক প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু যুদ্ধ, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য মানবসভ্যতাকে এক গভীর সংকটের কিনারায় দাঁড় করিয়েছে। এই সময়ে সাহিত্য কি কেবল বিনোদনের মাধ্যম হয়ে থাকবে, নাকি তারও একটি নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব রয়েছে?

বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মহান সাহিত্য সব সময় তার সময়ের সঙ্গে সংলাপে লিপ্ত থাকে। হোমারের ইলিয়াড থেকে শুরু করে এরিখ মারিয়া রেমার্কের অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট, আর্নেস্ট হেমিংওয়ের এ ফেয়ারওয়েল টু আর্মস কিংবা স্বেতলানা আলেক্সিয়েভিচের যুদ্ধভিত্তিক প্রামাণ্য রচনাগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস কেবল রাষ্ট্রের দলিলে লেখা থাকে না; তা মানুষের স্মৃতিতে, চোখের জলে এবং সাহিত্যের পাতায় সংরক্ষিত থাকে।

রেজুয়ান আহম্মেদের সাহিত্যিক পথচলা আজ সেই দীর্ঘ ও কঠিন পরীক্ষার সূচনালগ্নে দাঁড়িয়ে আছে। তাঁর সামনে যেমন সম্ভাবনার বিস্তৃত দিগন্ত, তেমনি রয়েছে সাহিত্যিক দায়বদ্ধতার গভীর আহ্বান। সেই আহ্বানের প্রতি তিনি যত বেশি নিষ্ঠার সঙ্গে সাড়া দেবেন, তাঁর সৃষ্টিও তত বেশি সময়ের কঠিন পরীক্ষায় নিজের স্থায়ী অবস্থান গড়ে তোলার সুযোগ পাবে। প্রচারণার কোলাহল অতিক্রম করে, করতালির মোহ থেকে মুক্ত হয়ে, মানুষের প্রতি গভীর আস্থা এবং সৃষ্টির প্রতি অকৃত্রিম নিষ্ঠাই শেষ পর্যন্ত একজন কথাসাহিত্যিককে মহাকালের দরবারে বাঁচিয়ে রাখে।