img

আমি লেখক নই, আমি শব্দের টুকাই

প্রকাশিত :  ১৯:২৭, ১৬ জুন ২০২৬

আমি লেখক নই, আমি শব্দের টুকাই

রেজুয়ান আহম্মেদ

মানুষের কিছু পরিচয় অযাচিত, যা সময় নিজে এসে কাঁধে চাপিয়ে দেয়। আবার কিছু পরিচয় মানুষ বেছে নেয় সম্পূর্ণ নিজের তাগিদে—একেবারে নিভৃতে, কোনো ঢাকঢোল না পিটিয়ে। আমার পরিচয়টা পরের দলের। কেউ যখন অবলীলায় জিজ্ঞেস করে বসেন, \"আপনি কি লেখক?\"—আমি খানিকটা থমকে যাই। \'লেখক\' শব্দটার একটা নিজস্ব ওজন আছে, এক ধরনের গাম্ভীর্য আছে; যা আমার ঠিক আসে না। তাই মৃদু হেসে আলতো করে দায় এড়াতে বলি, \"আমি লেখক নই, বড়জোর শব্দের টুকাই।\"

\'টুকাই\' শব্দটার গায়ে এক চিলতে অনাড়ম্বর সারল্য লেগে থাকে। অলিগলিতে বা চেনা চত্বরে আমরা এমন কিছু মানুষকে দেখি, যারা সবার ফেলে দেওয়া টুকরো জিনিস কুড়িয়ে বেড়ায়। পথচলতি মানুষের চোখে ওগুলো স্রেফ আবর্জনা হলেও, ওই সংগ্রাহকের চোখে তার প্রতিটিই মূল্যবান। সে জানে, এই আপাত-পরিত্যক্ত ভাঙাচোরার বুকেও কোনো না কোনো জীবনের আখ্যান লুকিয়ে থাকে।

আমার কাজটাও আলাদা কিছু নয়; তফাত শুধু আমি কুড়িয়ে নিই ছিটকে পড়া সব শব্দ।

ভিড়ের মধ্যে আচমকা খসে পড়া কোনো অবহেলিত বাক্য, মায়ের বুকের গভীর থেকে আসা এক দীর্ঘশ্বাস, শ্রমিকের চেরা কণ্ঠস্বর, বৃদ্ধ বাবার একা হয়ে যাওয়া বিকেল, শিশুর অকারণ খিলখিল কিংবা নিঝুম রাতে বালিশে মুখ গোঁজা চাপা কান্না—এসবই আমার সঞ্চয়। আমি সেগুলোকে পরম যত্নে মনের কোনো এক গোপন কুঠুরিতে জমিয়ে রাখি। তারপর কোনো এক অলস অবসরে সেই জমা হওয়া উপাদানগুলোই নতুন গল্পের অবয়ব নেয়।

অনেকের ধারণা, গল্প মানেই জাদুকরী কল্পনা। আমার তা মনে হয় না। বিশ্বাস করি, এই মহাবিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর গল্পকার হলো স্বয়ং \'জীবন\'। আমরা যারা লিখতে বসি, তারা আসলে সেই প্রবহমান জীবনের এক-একজন সামান্য অনুবাদক মাত্র। জীবন যা আড়ালে বলে যায়, আমরা তাকেই অক্ষরে বাঁধি; সময় যা দেখিয়ে যায়, আমরা তাকেই বাক্যের সুতোয় বুনে রাখি।

দিনকয়েক আগে বাজারের এক কোণে এক বৃদ্ধকে দেখেছিলাম। হাতে জীর্ণ একটা বাটন ফোন, যার রঙ চটে গেছে বহু আগে। শার্টের পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করে তিনি বারবার কী যেন মিলিয়ে দেখছিলেন। কৌতূহল সামলাতে না পেরে কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, \"কী খুঁজছেন, চাচা?\"

তিনি ম্লান হেসে বললেন, \"ছেলেদের মোবাইল নম্বরগুলো লিখে রাখছি বাবা। ফোনটা তো বুড়ো হয়েছে, কখন নষ্ট হয়ে যায় ঠিক নেই। কাগজটা থাকলে নম্বরগুলো অন্তত হারাবে না।\"

কথাটা শোনার পর মনে হলো, ওটা তো কেবল কিছু সংখ্যার খতিয়ান নয়, ওটা আসলে এক বাবার বুকপকেটে আগলে রাখা ভালোবাসার দলিল। এই ডিজিটাল যুগে, যেখানে আঙুলের ডগায় হাজারো নম্বর নিমেষে সংরক্ষিত থাকে, সেখানে একজন বাবা সন্তানদের সঙ্গে যোগাযোগের শেষ সূত্রটুকু কাগজের টুকরোতে বাঁচিয়ে রাখছেন। কারণ নম্বর হারালে যে বড্ড একলা হয়ে যেতে হবে!

সেদিন ডায়েরির পাতায় কোনো গল্প উঠেনি, শুধু দৃশ্যটা বুকের ভেতর গেঁথে গিয়েছিল। পরে বুঝেছি, গল্পের আসল বীজ তো ওখানেই ছড়ানো ছিল।

পথ হাঁটতে হাঁটতে এইটুকু বুঝেছি, মানুষের আসল সম্পদ তার অনুভূতি। ক্ষমতা, দাপট, ধনদৌলত—সবই একসময় ধুলোয় মেশে, কেবল অনুভূতিটুকুই অমর। সন্তানের পথ চেয়ে থাকা মায়ের ব্যাকুলতা, প্রেমিকের আজন্ম ব্যর্থতা, চাতক পাখির মতো বৃষ্টির অপেক্ষায় থাকা কৃষকের চশমাহীন চোখ কিংবা প্রবাসে বসে ঈদের দিনে ঘরের জন্য হাহাকার—এসব অনুভূতির কোনো মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার তারিখ থাকে না।

আমি নিজেকে সেই অনুভূতির এক সামান্য ফেরিওয়ালা ভাবতেই পছন্দ করি।

ভোরের ঘাসে জমে থাকা শিশিরের মতো ছোট ছোট অনুভূতি কুড়িয়ে এনে আমি শব্দের মালায় গাঁথি, তারপর তুলে দিই পাঠকের হাতে। কেউ সেখানে নিজের ফেলে আসা ছায়া দেখতে পান, কেউ খুঁজে পান চেনা স্মৃতি, আবার কেউ হয়তো নতুন করে বাঁচার একটুখানি রসদ পান।

অনেকে লেখালেখিকে পেশা বলেন, কারও কাছে এটা সাধনা কিংবা শুদ্ধ শিল্প। আমার কাছে এর চেয়ে বড় সত্য হলো—এটি এক মানুষের বুক থেকে অন্য মানুষের বুকে পৌঁছানোর সেতু। যখন সাদা পাতায় কলম ঘষি, তখন নিজেকে আর একলা মনে হয় না। মনে হয় আমার চারপাশের অজস্র মানুষ, তাঁদের অধরা স্বপ্ন, ক্লান্তি, আশা আর গোপন দীর্ঘশ্বাসগুলো এসে মিশে যাচ্ছে আমার কালির স্রোতে।

এই চেনা পৃথিবীতে প্রতিটি মানুষের বুকেই একটা না বলা উপাখ্যান থাকে। কেউ তা প্রকাশ করতে পারে, কেউ পারে না। কেউ অপবাদে জড়ানোর ভয়ে কুঁকড়ে থাকে, কেউ আবার সুযোগের অভাবে নীরব হয়ে যায়। আমি সেই স্তব্ধ অধ্যায়গুলোর একনিষ্ঠ শ্রোতা হতে চাই। জীবনের সবচেয়ে দামি পাতাগুলো তো আসলে নিঃশব্দেই ওল্টায়।

একজন রিকশাচালক যখন সারাদিন রোদে পুড়ে ঘরে ফেরেন, তাঁর সেই ক্লান্তির বিবরণ সংবাদপত্রের মূল শিরোনাম হয় না। একজন গৃহিণী যখন নিজের চাওয়া-পাওয়া বিসর্জন দিয়ে সংসার টানেন, তাঁর জন্য কোনো পুরস্কার বরাদ্দ থাকে না। নামমাত্র বেতনে যে শিক্ষক শত শত ভবিষ্যৎ গড়ে দিচ্ছেন, ইতিহাসের পাতায় তাঁর নাম খোদাই করা থাকে না।

অথচ প্রকৃত গল্পগুলো তো ঠিক এই অন্তরালেই লুকিয়ে থাকে। আমি শুধু সেই আড়ালের আখ্যানগুলো খুঁজে বেড়াই।

সময়ের ধুলোবালির নিচে চাপা পড়া জীবনগুলো এত বেশি সাধারণ যে, সাধারণ চোখে তা অলক্ষ্যেই থেকে যায়। অথচ ওই সাদামাটা যাপনের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে মহাকাব্যের সৌন্দর্য। একটা গ্রামের শেষ সীমানায় দাঁড়িয়ে থাকা নিঃসঙ্গ কদমগাছ, একটা জরাজীর্ণ সাঁকো, পুরোনো স্কুলঘর কিংবা উদাস হয়ে থাকা কোনো পার্কের বেঞ্চ—দুনিয়ার কোনো কিছুই গল্পহীন নয়। শুধু তা শোনার মতো কান আর ছোঁয়ার মতো একটা সংবেদনশীল হৃদয় থাকতে হয়। আমি কেবল সেই হৃদয়টুকুকে মরে যেতে দিই না।

চারপাশে যখন ইঁদুরদৌড়, ক্ষোভ আর তীব্র কোলাহল দেখি, তখন আমি মানুষের চোখের দিকে তাকাই। প্রতিটি চোখেই একটা করে অসমাপ্ত উপন্যাস বোনা থাকে। কেউ সেখানে সুখের পরিচ্ছেদ লিখছেন, কেউ দুঃখের; কেউ নতুন স্বপ্নের প্রাক্কথন সাজাচ্ছেন, কেউ বা বিদায়ের শেষ লাইনটি টেনে চলে যাচ্ছেন।

আমি তাঁদের পাশে একটু বসি। শুনি। অনুভব করি। তারপর মনের অজান্তেই শব্দগুলো কুড়িয়ে নিই।

আমার এই ঝুলির শব্দগুলো খুব দামি বা অলংকৃত নয়। কোনো রাজকীয় বিপণি থেকে এগুলো সংগৃহীত হয়নি। এগুলো উঠে এসেছে পথের ধুলোবালি থেকে, মানুষের আটপৌরে যাপন আর বুকফাটা দীর্ঘশ্বাস থেকে। হয়তো সে কারণেই সাধারণ মানুষ আমার লেখার লাইনে নিজেদের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পায়।

যখন কোনো পাঠক এসে বলেন, \"আপনার লেখাটা পড়ার পর মনে হলো, এটা তো আমারই ভেতরের কথা\"—তখন মনে হয়, এই ধুলো ঘেঁটে শব্দ কুড়ানোর ক্লান্তিটুকু এক নিমেষে সার্থক হলো। সাহিত্য তো শেষ পর্যন্ত মানুষের বুকেই আশ্রয় খোঁজে; কোনো বইয়ের মধ্যে তাকে বন্দী করে রাখা তার নিয়তি নয়।

আমি বিশ্বাস করি, সমাজ বা মনস্তত্ত্ব বদলে দেওয়ার চাবিকাঠি সবসময় দীর্ঘ বক্তৃতার মঞ্চে থাকে না। কখনো কখনো একটা ছোট গল্প, একটা সহজ সরল বাক্য কিংবা এক চিলতে আন্তরিক অনুভূতিও মানুষের ভেতরের নিভে যাওয়া আলোটাকে নতুন করে জ্বালিয়ে দিতে পারে। যে আলো মানুষকে একটু বেশি মানবিক হতে শেখায়, অন্যের ক্ষতটাকে নিজের বলে চিনতে শেখায়, আর মানুষকে ভালোবাসতে বাধ্য করে।

তাই বুক ফুলিয়ে লেখক হওয়ার কোনো দাবি আমার নেই। তেমন কোনো মহৎ কৃতিত্বও আমি অর্জন করিনি। আমি কেবল মানুষের চলার পথে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অনুভূতির কণাগুলো কুড়িয়ে আনি। কারও ফেলে যাওয়া ভাঙা স্মৃতি, কারও ভুলে যাওয়া আবেগ, কারও অবহেলিত স্বপ্ন—এসব দিয়েই নিজের মতো করে মালা গাঁথি।

হয়তো কোনো এক সময় মানুষ আমার নামটা ভুলে যাবে, আমার লেখাগুলোও মহাকালের স্রোতে ভেসে যাবে। কিন্তু যদি কোনো একটি লাইনও কোনো এক উদাসীন পাঠকের চোখে এক ফোঁটা জল এনে দিতে পারে, কোনো এক ভগ্নহৃদয় মানুষকে নতুন করে দাঁড়ানোর সাহস দেয়—তবেই বুঝব আমার এই জীবন বৃথা যায়নি।

আমি তো যশের ক্যানভাসার নই। আমি অনুভূতির বাহক, সময়ের ধুলোয় লুকিয়ে থাকা গল্পের এক সামান্য অন্বেষী।

আমি লেখক নই, আমি শব্দের টুকাই।

আজও পথ চলতে চলতে আমি মানুষের হাসি, কান্না, মান-অভিমান আর অন্তহীন অপেক্ষা থেকে শব্দ কুড়িয়ে চলি। প্রতিটি দিন আমাকে নতুন করে বাঁচতে শেখায়, নতুন কিছু অনুভব করায়। আর আমি সেই অনুভূতিগুলো যত্ন করে পকেটে পুরে রাখি।

হয়তো কোনো এক নিঝুম রাতে, যখন চরাচর নিস্তব্ধ হয়ে যাবে, তখন ওই কুড়িয়ে আনা শব্দগুলো আবার ডানা মেলবে। তারা গল্প হবে, স্মৃতি হবে, আর ঠাঁই করে নেবে কোনো এক মানুষের নিভৃত হৃদয়ে।

সেদিনও যদি কেউ শুধায়, আমি একই উত্তর দেব—

আমি লেখক নই, আমি শব্দের টুকাই; মানুষের জীবনের রাজপথে ছড়িয়ে থাকা অনুভূতির কণা কুড়িয়ে বেড়ানো এক নামহীন পথিক।

সাহিত্য-সংস্কৃতি এর আরও খবর

img

মানুষ, সময় ও সীমান্তের ওপারে: রেজুয়ান আহম্মেদের সাহিত্যভুবনের পাঠ

প্রকাশিত :  ১৮:১২, ০৩ আগষ্ট ২০২৬

✍️ ড. সৈয়দ আনিসুর রহমান 

সমকালীন বাংলা সাহিত্যের পরিসরে এমন কিছু লেখক আছেন, যাঁরা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে না থেকেও দীর্ঘ সময় ধরে নিজস্ব সাহিত্যভাষা নির্মাণ করে চলেছেন। রেজুয়ান আহম্মেদ সেই ধারারই একজন। তাঁর সাহিত্যিক যাত্রার বিশেষত্ব কেবল বিষয় নির্বাচনে নয়, মানুষের অন্তর্জগতের গভীর উপলব্ধির আন্তরিক চেষ্টাতেও দৃশ্যমান। তাঁর গল্প, উপন্যাস ও নিবন্ধ সবকিছুর কেন্দ্রেই শেষ পর্যন্ত ফিরে আসে মানুষ; উঠে আসে তার ভয়, ভাঙন, আশা, স্মৃতি এবং টিকে থাকার অবিরাম সংগ্রাম।

রেজুয়ান আহম্মেদের লেখায় প্রাত্যহিক জীবনের দৃশ্যমান ঘটনাগুলোর চেয়ে অদৃশ্য মানসিক অভিঘাতই বেশি গুরুত্ব পায়। তিনি বাহ্যিক সংঘাতের বর্ণনার চেয়ে মানুষের অন্তর্লোকের নীরব আলোড়নকে ধরতে আগ্রহী। তাঁর কাছে যুদ্ধ কেবল গোলাবারুদ বা রণক্ষেত্রের ইতিহাস নয়; যুদ্ধ মানে পরিবার হারানোর বেদনা, শৈশবের বিচ্ছেদ, দীর্ঘ নির্বাসনের ছায়া কিংবা মানুষের গভীরে জন্ম নেওয়া তীব্র অনিরাপত্তাবোধ। এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁর আখ্যানকে কেবল ঘটনানির্ভর না রেখে মানবিক অভিজ্ঞতার বিস্তৃত পরিসরে উন্নীত করে।

বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় তাঁর লেখালেখির প্রবণতা লক্ষণীয়। বাংলা রচনায় দেশীয় সমাজ, প্রান্তিক মানুষের জীবন, লোকজ বাস্তবতা ও সামাজিক বৈপরীত্য বারবার ফিরে আসে। অন্যদিকে, ইংরেজি আখ্যানগুলোতে প্রাধান্য পায় যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি, অভিবাসন, মানসিক স্বাস্থ্য এবং বৈশ্বিক মানবিক সংকটের মতো বিষয়। বিষয়ের ভিন্নতা থাকলেও উভয় ধারার লেখার ভেতরেই একটি অভিন্ন সুর স্পষ্ট মানুষের মর্যাদা, সহমর্মিতা ও অস্তিত্বের প্রশ্ন।

তাঁর গদ্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য সংযম। অপ্রয়োজনীয় অলংকারে তিনি আখ্যানকে ভারাক্রান্ত করেন না, আবার অতিরিক্ত নাটকীয়তার আশ্রয়ও নেন না। বরং দৃশ্য, সংলাপ ও চরিত্রের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই তিনি পাঠকের গভীরে পৌঁছাতে চান। তাঁর চরিত্রগুলো প্রায়ই সমাজের প্রান্তিক বাস্তবতা থেকে উঠে আসা। তাদের জীবনে বড় কোনো বীরত্ব নেই; আছে ক্ষুদ্র অথচ গভীর মানবিক মুহূর্ত, যা পাঠ শেষ হওয়ার পরও দীর্ঘ সময় পাঠকের মনে অনুরণিত হয়।

রেজুয়ান আহম্মেদের সাহিত্যে নৈতিক বোধ সুস্পষ্ট। তিনি নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়াতে চান, যুদ্ধের বিরুদ্ধে কথা বলতে চান এবং সামাজিক বৈষম্যের প্রশ্ন উত্থাপন করতে চান। এই অবস্থান তাঁর সাহিত্যিক পরিচয়েরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে সাহিত্যের নিজস্ব একটি নিয়ম রয়েছে চরিত্র যখন নিজ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে কথা বলে, তখন আখ্যান আরও বহুমাত্রিক হয়ে ওঠে। ভবিষ্যতের লেখায় চরিত্রের অন্তর্দ্বন্দ্ব ও অনিশ্চয়তার গভীরতা আরও বৃদ্ধি পেলে তাঁর সাহিত্য নতুন শিল্পসম্ভাবনার দিকে অগ্রসর হবে।

পেশাগত জীবনে অর্থনীতি ও পুঁজিবাজার-সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা তাঁর চিন্তার কাঠামোকে প্রভাবিত করেছে। ফলে সমাজ, রাষ্ট্র ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার আন্তঃসম্পর্ক তিনি অত্যন্ত সচেতনভাবে উপলব্ধি করেন। এই অভিজ্ঞতা তাঁর গদ্যকে অনেক সময় বিশ্লেষণধর্মী ভিত্তি দেয়, যা সমকালীন বাংলা কথাসাহিত্যে সচরাচর দেখা যায় না। তবে সাহিত্য তখনই সবচেয়ে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে, যখন বিশ্লেষণ চরিত্রের অভিজ্ঞতার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে মিশে যায়। রেজুয়ান আহম্মেদের সাম্প্রতিক লেখায় সেই ভারসাম্যের অনুসন্ধানই লক্ষ করা যায়।

সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে প্রকাশনাজগতেও বদল এসেছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, ই-বুক এবং প্রিন্ট-অন-ডিমান্ড প্রযুক্তি লেখকদের সামনে নতুন পাঠকসমাজের দ্বার উন্মুক্ত করেছে। রেজুয়ান আহম্মেদ এই পরিবর্তিত বাস্তবতাকে গ্রহণ করেছেন। ফলে তাঁর রচনা দেশীয় পাঠকের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পাঠকমহলেও পৌঁছে যাচ্ছে। তবে সাহিত্যে দীর্ঘস্থায়ী গ্রহণযোগ্যতার প্রকৃত ভিত্তি বিপণন নয়; বরং পাঠকের মনে গল্পের দীর্ঘস্থায়ী অনুরণন সৃষ্টির ক্ষমতা। সেই পরীক্ষা প্রতিটি লেখকের মতো তাঁর সামনেও উন্মুক্ত।

সবশেষে বলা যায়, রেজুয়ান আহম্মেদের সাহিত্যকে এক কথায় সংজ্ঞায়িত করা সহজ নয়। তিনি যেমন প্রান্তিক জীবনের কথক, তেমনি বৈশ্বিক মানবিক সংকটেরও নিবিড় পর্যবেক্ষক। তাঁর লেখায় দেশীয় বাস্তবতা ও বিশ্বজনীন অভিজ্ঞতা একে অপরের সঙ্গে প্রাঞ্জল সংলাপে যুক্ত হয়েছে। নিজের স্বরকে আরও শাণিত করা, চরিত্রের অন্তর্জীবনকে গভীরভাবে অন্বেষণ করা এবং ভাষার সংযমকে পরিণত করে তোলার মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা কথাসাহিত্যে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান নির্মাণের সম্ভাবনা ধারণ করেন। একজন লেখকের প্রকৃত পরিচয় তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যায় নয়, বরং সময়ের সঙ্গে তাঁর সাহিত্য কতটা নতুন পাঠ ও ভাবনার জন্ম দিতে পারছে তার মধ্যেই। সেই বিবেচনায় রেজুয়ান আহম্মেদের সাহিত্যভুবন আরও মনোযোগী পাঠ ও গভীর আলোচনার দাবি রাখে।