img

ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা: গ্রীষ্মকালে দৃষ্টি সংযত রাখা কেন আরো বেশি জরুরী?

প্রকাশিত :  ১০:২২, ১৮ জুলাই ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৭:৪৮, ১৮ জুলাই ২০২৬

ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা: গ্রীষ্মকালে দৃষ্টি সংযত রাখা কেন আরো বেশি জরুরী?

শায়খ আবদুল কাইয়ূম

গ্রীষ্মকালে মানুষের পোশাক-পরিচ্ছদে পরিবর্তন আসে, ফলে অনেক সময় অনৈতিক কাজে আকর্ষণ সৃষ্টি হয়ে থাকে। তাই ইসলাম মুমিনদের দৃষ্টি সংযত রাখতে শিক্ষা দেয়। কারণ চোখের মাধ্যমে অনেক সময় গুনাহের সূচনা হয় এবং তা মানুষের হৃদয়কে প্রভাবিত করে।

দৃষ্টি সংযত রাখার সুফল ব্যক্তি, পরিবার এবং সমাজ—সব ক্ষেত্রেই প্রতিফলিত হয়। এতে হৃদয় পবিত্র হয়, ঈমান আরও দৃঢ় হয়, দাম্পত্য সম্পর্ক সুরক্ষিত থাকে এবং অশান্তি ও অনৈতিকতার পথ রুদ্ধ হয়।

গত ১০ জুলাই শুক্রবার ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবায় কথাগুলো বলেছেন মসজিদের প্রধান ইমাম ও খতীব শায়খ আব্দুল কাইয়ূম।

তিনি বলেন, প্রচণ্ড গরম আমাদের কাছে সাধারণ একটি ঋতুগত অভিজ্ঞতা মনে হলেও ইসলামের দৃষ্টিতে এটি আল্লাহ তাআলার এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন । একজন মুমিন কেবল আবহাওয়ার পরিবর্তন অনুভব করেন না; বরং এসব ঘটনার মাধ্যমে আল্লাহর কুদরত, তাঁর সতর্কবার্তা এবং নিজের জীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে নতুন করে চিন্তা করেন ।

বর্তমানের তীব্র গরম আমাদের জাহান্নামের আগুনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) হাদিসে বর্ণনা করেছেন যে, জাহান্নাম আল্লাহর কাছে অভিযোগ করেছিল এবং আল্লাহ তাকে বছরে দুটি নিঃশ্বাস নেওয়ার অনুমতি দেন—একটি শীতে এবং অন্যটি গ্রীষ্মে । পৃথিবীর তীব্র গরম ও প্রচণ্ড শীত সেই নিঃশ্বাসেরই প্রভাব । তাই এই গরম কেবল সহ্য করার বিষয় নয়; বরং এটি আল্লাহর শাস্তির ভয় স্মরণ করে তওবা ও নেক আমলের দিকে ফিরে আসার একটি সুযোগ।

তিনি কোরআনের সেই আয়াতের কথা স্মরণ করিয়ে দেন, যেখানে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের নিজেদের এবং নিজেদের পরিবারকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করার নির্দেশ দিয়েছেন, যার জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর। দুনিয়ার কয়েক ঘণ্টার গরমই যদি আমাদের কষ্ট দেয়, তাহলে আখিরাতের স্থায়ী শাস্তি কত ভয়াবহ হতে পারে—এই উপলব্ধি একজন মুমিনকে আত্মসমালোচনা ও আত্মশুদ্ধির দিকে পরিচালিত করে।

শায়খ আব্দুল কাইয়ূম বলেন, প্রচণ্ড গরম আমাদের আল্লাহর অগণিত নিয়ামতের মূল্য উপলব্ধি করতেও সাহায্য করে। শীতল বাতাস, ছায়া, সুস্বাস্থ্য, বিশুদ্ধ পানি, নিরাপদ আশ্রয় এবং শারীরিক সক্ষমতা—এসব এমন নিয়ামত, যেগুলোর গুরুত্ব আমরা প্রায়ই অনুভব করি না। কিন্তু যখন তীব্র গরমে এসবের অভাব দেখা দেয়, তখনই আমরা বুঝতে পারি আল্লাহ আমাদের কত বড় অনুগ্রহ দান করেছেন। কোরআনে আল্লাহ বলেন, মানুষ যদি তাঁর নিয়ামত গণনা করতে চায়, তবে তা কখনোই শেষ করতে পারবে না। আবার তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে, তাদের জন্য তিনি আরও নিয়ামত বৃদ্ধি করবেন।

তিনি কিয়ামতের দিনের কথাও স্মরণ করিয়ে দিতে বলেন, পৃথিবীতে যেমন মানুষ ছায়া খোঁজে, তেমনি কিয়ামতের দিনও মানুষ আশ্রয় খুঁজবে। কিন্তু সেদিন আল্লাহর বিশেষ রহমতের ছায়া ছাড়া অন্য কোনো ছায়া থাকবে না । রাসুলুল্লাহ (সা:) সাত শ্রেণির সৌভাগ্যবান মানুষের কথা উল্লেখ করেছেন, যাদের আল্লাহ তাঁর আরশের ছায়ায় স্থান দেবেন । তাদের মধ্যে রয়েছেন সেই ব্যক্তি, যিনি সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর ভয়ে গুনাহ থেকে নিজেকে বিরত রাখেন। এই হাদিস আমাদের শেখায় যে, দুনিয়ায় আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা আত্মসংযম আখিরাতে মহাপুরস্কারের কারণ হবে।

তিনি বলেন, গ্রীষ্মকালে মানুষের চলাফেরা ও পোশাকে পরিবর্তনের কারণে নানা ধরনের প্রলোভন বেড়ে যায়। তাই এ সময় দৃষ্টি সংযত রাখার গুরুত্ব আরও বেশি। কোরআনে আল্লাহ মুমিন পুরুষ ও নারীদের দৃষ্টি সংযত রাখা এবং পবিত্রতা রক্ষার নির্দেশ দিয়েছেন। ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী, চোখ মানুষের অন্তরের অন্যতম প্রবেশদ্বার। তাই দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণ করা শুধু নৈতিক আচরণ নয়; এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত এবং আত্মশুদ্ধির মাধ্যম।

হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রথম অনিচ্ছাকৃত দৃষ্টিকে ক্ষমাযোগ্য বলেছেন, কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে দ্বিতীয়বার তাকাতে নিষেধ করেছেন। তিনি আরও বলেছেন, মানুষের চোখেরও একটি নির্ধারিত গুনাহ রয়েছে, আর তা হলো হারাম দৃষ্টি দেওয়া । অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, হারাম দৃষ্টি শয়তানের বিষাক্ত তীরের মতো। যে ব্যক্তি আল্লাহর ভয়ে তা থেকে বিরত থাকে, আল্লাহ তার অন্তরে এমন ঈমান দান করেন, যার মাধুর্য সে অনুভব করতে পারে।

শায়খ আবদুল কাইয়ূমের মতে, দৃষ্টি সংযত রাখার সুফল ব্যক্তি, পরিবার এবং সমাজ—সব ক্ষেত্রেই প্রতিফলিত হয়। এতে হৃদয় পবিত্র হয়, ঈমান আরও দৃঢ় হয়, দাম্পত্য সম্পর্ক সুরক্ষিত থাকে এবং অশান্তি ও অনৈতিকতার পথ রুদ্ধ হয়। তিনি উল্লেখ করেন, অনেক পারিবারিক সংকট ও নৈতিক অবক্ষয়ের সূচনা ঘটে একটি অনিয়ন্ত্রিত দৃষ্টি থেকে। বিপরীতে, আল্লাহর ভয়ে নিজেকে সংযত রাখা মানুষের অন্তরে প্রশান্তি ও আত্মতৃপ্তি এনে দেয়।

তিনি আরও স্মরণ করিয়ে দেন, শুধু আশা করলেই জান্নাতে প্রবেশ করা যায়না।  আল্লাহর আনুগত্য, গুনাহ থেকে বিরত থাকা এবং জীবনের পরীক্ষাগুলো ধৈর্যের সঙ্গে মোকাবিলা করার মাধ্যমেই জান্নাতের পথে এগিয়ে যেতে হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি তার জিহ্বা ও লজ্জাস্থানের হেফাজতের নিশ্চয়তা দেবে, তিনি তার জন্য জান্নাতের নিশ্চয়তা দেন। কোরআনেও আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, যে ব্যক্তি তাঁর সামনে উপস্থিত হওয়ার ভয় রাখে এবং নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে, জান্নাতই হবে তার চূড়ান্ত আবাস।

প্রবন্ধের শেষাংশে শায়খ আবদুল কাইয়ূম মুসলমানদের প্রতি আহ্বান জানান, যেন তারা এই প্রচণ্ড গরমকে কেবল ঋতুর একটি বৈশিষ্ট্য হিসেবে না দেখে বরং আত্মসমালোচনা, তওবা এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের একটি সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে তিনি আল্লাহর অগণিত নিয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকার, দৃষ্টি সংযত রাখার, পরিবারকে ইসলামের আদর্শে গড়ে তোলার এবং আখিরাতের সফলতার জন্য আন্তরিকভাবে প্রস্তুতি নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

তিনি দোয়া করেন, আল্লাহ তাআলা যেন এই গরমকে মানুষের অন্তর কোমল করার মাধ্যম বানান, সবাইকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করেন, কিয়ামতের দিন তাঁর আরশের ছায়ায় স্থান দেন, হৃদয়কে পবিত্র রাখার তাওফিক দান করেন এবং নিজ রহমতে সবাইকে জান্নাত নসিব করেন।


শায়খ আবদুল কাইয়ূম : প্রধান ইমাম ও খতীব, ইস্ট লন্ডন মস্ক এন্ড লন্ডন মুসলিম সেন্টার । জুমার খুতবা ১০ জুলাই ২০২৬।

ধর্ম এর আরও খবর

img

ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা : আমরা আমাদের মুল্যবান সময়কে কীভাবে কাজে লাগাচ্ছি?

প্রকাশিত :  ১৮:৫৬, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শায়খ মুস্তফা আবদুল্লাহ

সময় আল্লাহ তাআলার অন্যতম বড় নিয়ামত। মানুষের জীবন মূলত আল্লাহর দেওয়া সময়েরই একটি সমষ্টি । তাই সময়কে অবহেলা না করে সঠিকভাবে কাজে লাগানো প্রত্যেকের দায়িত্ব— কথাগুলো বলেছেন শায়খ মুস্তফা আবদুল্লাহ।

২৮ আগস্ট শুক্রবার ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবায় তিনি আরো বলেন, আল্লাহ তাআলা মানুষকে অসংখ্য নিয়ামত দিয়েছেন, যা গণনা করে শেষ করা সম্ভব নয়। এর মধ্যে সময় এমন একটি মৌলিক নিয়ামত, যার ওপর আমাদের শিক্ষা, ইবাদত, পরিবার, কাজ, সাফল্য ও মানুষের সেবা—সবকিছু নির্ভর করে।

তিনি বলেন, হৃদপিণ্ডের প্রতিটি স্পন্দন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জীবনের আরেকটি মুহূর্ত চলে যাচ্ছে । হারিয়ে যাওয়া সময় আর কখনো ফিরে আসে না।

মোবাইল ফোন ও সোশাল মিডিয়াকে বর্তমান সময়ের বড় একটি বিভ্রান্তি হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনেক সময় আমরা কয়েক মিনিটের জন্য ফোন হাতে নিই, কিন্তু অজান্তেই এক ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় চলে যায়। এতে শুধু মনোযোগ নষ্ট হয় না, জীবনের মূল্যবান একটি অংশও হারিয়ে যায়।

তরুণদের উদ্দেশে শায়খ মোস্তফা আবদুল্লাহ বলেন, যারা নতুন করে স্কুলে যাচ্ছে, জিসিএসই পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করছে কিংবা ভবিষ্যতে কী করবে তা নিয়ে ভাবছে—তাদের উচিত কোনো কাজ শেষ মুহূর্তের জন্য ফেলে না রাখা।

অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষার মাত্র এক বা দুই সপ্তাহ আগে পড়াশোনা শুরু করে । কিন্তু যদি বছরের শুরু থেকেই প্রতিদিন অল্প অল্প করে পড়া, রিভিশন বা নতুন কিছু শেখার অভ্যাস করা যায়, তাহলে পরীক্ষার সময় অতিরিক্ত চাপ নিতে হয় না এবং প্রস্তুতিও অনেক ভালো হয়।

প্রতিদিন মাত্র ১০ মিনিট পড়াশোনা হয়তো খুব সামান্য মনে হতে পারে । কিন্তু এই ১০ মিনিট যদি নিয়মিতভাবে কাজে লাগানো হয়, তাহলে কয়েক মাস বা এক বছরে তা অনেক ঘণ্টায় পরিণত হয় । একইভাবে, প্রতিদিন মাত্র দুই পৃষ্ঠা করে পড়লেও এক বছরে শত শত পৃষ্ঠা পড়া হয়ে যায়।

বড় সাফল্যের জন্য সবসময় একসঙ্গে অনেক কিছু করতে হয় না। প্রতিদিন অল্প অল্প করে নিয়মিত চেষ্টা করলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা বড় অর্জনে পরিণত হতে পারে। তাই ভালো কোনো কাজ শুরু করার জন্য ‘পরে করব’ না ভেবে আজ থেকেই শুরু করা উচিত।

তিনি বলেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের শক্তি ও সামর্থ্য কমে যায়। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন, মানুষকে দুর্বল অবস্থায় সৃষ্টি করার পর শক্তি দেন, আবার শক্তির পর দুর্বলতা ও বার্ধক্য আসে। তাই শক্তি ও সুযোগ থাকা অবস্থাতেই সময়ের সদ্ব্যবহার করা প্রয়োজন।

পবিত্র কুরআনে সময়ের গুরুত্ব বারবার তুলে ধরা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা সূরা আল-আসরে সময়ের শপথ করেছেন। এছাড়া দিন, রাত, সকাল ও ভোরের শপথের মাধ্যমেও মানুষকে সময়ের গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে।

রাসুলুল্লাহ (সা:)-এর হাদিস উদৃত করে তিনি বলেন, “যা তোমার উপকারে আসে, তার প্রতি আগ্রহী হও, আল্লাহর সাহায্য চাও এবং অসহায় হয়ে বসে থেকো না।”

তিনি আরও বলেন, অলসতা মানুষের শুধু সময়ই নষ্ট করে না, জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সুযোগও কেড়ে নেয়। তাই দিনকে পরিকল্পিতভাবে সাজানো, সময়কে রক্ষা করা এবং ভালো কাজ দ্রুত শুরু করা উচিত।

খুতবার শেষাংশে মুসলিম কমিউনিটিকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কিছু ব্যক্তি বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণের মাধ্যমে মুসলমানদের বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলিয়ে পরে সেসব বক্তব্য প্রসঙ্গের বাইরে ব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার করে ইসলাম ও মুসলমানদের ভুলভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছেন।

তিনি কমিউনিটির সদস্যদের এ ধরনের ব্যক্তিদের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় আলোচনায় না জড়ানোর পরামর্শ দিয়ে বলেন, মসজিদ প্রাঙ্গণে এমন কিছু ঘটলে দায়িত্বশীল স্টাফদের দ্রুত জানানো উচিত।

সবশেষে শায়খ মুস্তফা আবদুল্লাহ দোয়া করেন, আল্লাহ যেন আমাদের সময়ের মধ্যে বরকত দান করেন, অলসতা ও উদাসীনতা থেকে রক্ষা করেন এবং জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত কল্যাণকর কাজে ব্যয় করার তাওফিক দেন।

(শায়খ মোস্তফা আবদুল্লাহ : অতিথি খাতিব, ইস্ট লন্ডন মস্ক এন্ড লন্ডন মুসলিম সেন্টার । জুমার খুতবা, ২৮ আগস্ট ২০২৬। )