গভীর খাদে গ্রাস হচ্ছে শ্রীমঙ্গলের ভূমি, বালু জব্দ হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে মূল হোতারা
সংগ্রাম দত্ত: মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার পাহাড়ি ছড়াগুলো থেকে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। সময়ে সময়ে প্রশাসনের অভিযান, বালু ও যন্ত্রপাতি জব্দ, জরিমানা এবং বিভিন্ন আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হলেও পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না এই কার্যক্রম। বরং প্রতিটি অভিযানের পর কিছুদিন পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও অল্প সময়ের মধ্যেই আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে একই চক্র। ফলে প্রশাসনের ধারাবাহিক অভিযানের কার্যকারিতা এবং অবৈধ বালু উত্তোলনের নেপথ্যে থাকা মূল হোতাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
৩১ জুলাই শ্রীমঙ্গল উপজেলার ২ নম্বর ভূনবীর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের আলিসার কুল (বরপাড়া) এলাকায় অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে উপজেলা প্রশাসন। বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত পরিচালিত অভিযানে নেতৃত্ব দেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. জিয়াউর রহমান এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মিনহাজুল ইসলাম। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্ব পালন করে শ্রীমঙ্গল থানা পুলিশ।
অভিযানে ঘটনাস্থল থেকে আনুমানিক ৮ হাজার ঘনফুট বালু, একটি এক্সক্যাভেটর (ভ্যাকু) মেশিন, বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত পাঁচটি মেশিন এবং প্রায় এক হাজার ফুট পাইপ জব্দ করা হয়। তবে প্রশাসনের উপস্থিতি টের পেয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা পালিয়ে যাওয়ায় কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি।
মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯ অনুযায়ী জব্দ করা বালু ও যন্ত্রপাতি স্থানীয় জনপ্রতিনিধির জিম্মায় দেওয়া হয়। জনস্বার্থে স্থানীয় বাসিন্দারা বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত পাইপের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে নষ্ট করে দেন। উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, জব্দ করা বালু ও অন্যান্য মালামাল বিধি অনুযায়ী নিলাম বা অন্য উপায়ে নিষ্পত্তি করা হবে।
এর আগে ৩০ জুলাই উপজেলার ৫ নম্বর কালাপুর ইউনিয়নের শেভরন গ্যাস কোম্পানি ও গারো লাইনের মধ্যবর্তী এলাকায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মিনহাজুল ইসলামের নেতৃত্বে পরিচালিত আরেকটি মোবাইল কোর্ট অভিযানে অবৈধভাবে উত্তোলিত প্রায় ৬০০ ঘনফুট বালু জব্দ করা হয়। ঘটনাস্থলে কাউকে পাওয়া না যাওয়ায় ওই বালুও জব্দ করে স্থানীয় এক ইউপি সদস্যের জিম্মায় দেওয়া হয়। পরে বিষয়টি আইন অনুযায়ী নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন দপ্তরকে অবহিত করা হয়।
দুই দিনের অভিযানে মোট ৮ হাজার ৬০০ ঘনফুট বালু, একটি এক্সক্যাভেটর, পাঁচটি মেশিন ও প্রায় এক হাজার ফুট পাইপ জব্দ হলেও কোনো অভিযুক্তকে আটক করা সম্ভব হয়নি।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রশাসন এবং উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে অভিযানসংক্রান্ত তথ্য ও ছবি প্রকাশ করা হয়েছে। ৩১ জুলাই পরিচালিত অভিযানের বিষয়ে দেওয়া পোস্টের শেষাংশে প্রশাসন জানায়, "জনস্বার্থে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।"
সরেজমিনে দেখা যায়, দীর্ঘদিনের নির্বিচার বালু উত্তোলনে অনেক স্থানে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি গভীর খাদে পরিণত হয়েছে। কোথাও কয়েকতলা সমান গভীর গর্ত, কোথাও ধসে পড়েছে মাটির স্তর। বৃষ্টির পানি জমে তৈরি হয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ জলাধার। পরিবেশবিদদের মতে, পাহাড়ি ছড়া থেকে অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলন প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ভারসাম্যের জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করছে।
অবৈধ বালু পরিবহনের কারণে অতীতেও একাধিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন সময়ে ভূনবীর ইউনিয়নে বালুবাহী ট্রাকের ধাক্কায় এক বৃদ্ধা ও এক শিশুকন্যার মৃত্যু হয়। সিন্দুরখান ইউনিয়নে পৃথক ঘটনায় প্রাণ হারায় এক স্কুলছাত্র। এসব ঘটনার পরও বালু উত্তোলন ও পরিবহন পুরোপুরি বন্ধ না হওয়ায় জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
এদিকে সম্প্রতি দৈনিক ইনকিলাব-এর শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি মো. আনোয়ার হোসেন জসিম তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে লেখেন, "শ্রীমঙ্গলে যে কর্মকর্তা বালুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন, শ্রীমঙ্গলের জনগণ সেই যুদ্ধের দৃশ্যমান প্রতিফলন চায়। আর কত প্রাণ গেলে বালু উত্তোলন বন্ধ হবে?" তাঁর এই মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
এর পাশাপাশি দৈনিক কালের কণ্ঠ-এর মৌলভীবাজার জেলা প্রতিনিধি মো. সাইফুল ইসলাম তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এক পোস্টে দাবি করেন, অবৈধ বালু উত্তোলনের তদবিরের সঙ্গে একজন প্রভাবশালী সাংবাদিক জড়িত। তবে তিনি কারও নাম উল্লেখ করেননি এবং ওই দাবির পক্ষে কোনো তথ্য-প্রমাণও প্রকাশ করেননি। পোস্টটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করে। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো তদন্তের ফলাফল বা কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে এবং স্থানীয় পর্যায়ে অনুসন্ধানে জানা যায়, অধিকাংশ অভিযানে ঘটনাস্থলে থাকা শ্রমিক, ট্রাকচালক কিংবা তাঁদের সহকারীদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কিন্তু অবৈধ বালু উত্তোলনের অর্থায়ন, পরিচালনা বা নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ যাঁদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান আইনগত পদক্ষেপের নজির খুবই সীমিত। এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
অবৈধ বালু উত্তোলন নিয়ে অতীতেও জাতীয় ও স্থানীয় প্রিন্ট, অনলাইন এবং ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমে অসংখ্য প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। পরিবেশ ধ্বংস, কৃষিজমির ক্ষতি, সড়ক দুর্ঘটনা এবং জননিরাপত্তার ঝুঁকি সত্ত্বেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে। পরিবেশ ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট মহলের মতে, কেবল বালু জব্দ বা বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত পুরো নেটওয়ার্ক—অর্থদাতা, সংগঠক ও প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করে ধারাবাহিক ও কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে তবেই এ সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব হতে পারে।



















