কুলাউড়ার নার্সারি পুঞ্জিতে পানজুমে দুর্বৃত্তদের হামলা: অপরাধীদের গ্রেপ্তার ও ক্ষতিপূরণের দাবিতে মানববন্ধন
সংগ্রাম দত্ত: মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার কর্মধা ইউনিয়নের নার্সারি খাসিয়া পুঞ্জিতে রাতের আঁধারে কেটে ফেলা হয়েছে হাজারো ফলবান পানগাছ। এক রাতের এই তাণ্ডবে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে পান চাষের ওপর নির্ভরশীল ১০টি খাসিয়া ও গারো পরিবার। তাঁদের দাবি, কেটে ফেলা পানগাছের সংখ্যা ৮ হাজারের বেশি, আর এতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫০ লাখ টাকা। পানজুম হারিয়ে পরিবারগুলো এখন জীবিকা নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তায় পড়েছে। ঘটনার পর থেকে পুঞ্জির বাসিন্দাদের মধ্যে বিরাজ করছে আতঙ্ক ও ক্ষোভ।
এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেপ্তার, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ এবং আদিবাসী পান চাষিদের জীবন-জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে মানববন্ধন, প্রতিবাদ সমাবেশ ও স্মারকলিপি দিয়েছেন বিভিন্ন আদিবাসী সংগঠন, নাগরিক অধিকারকর্মী ও পরিবেশকর্মীরা।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সকাল ১১টায় মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব চত্বরে এ কর্মসূচি পালিত হয়। বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম মৌলভীবাজার জেলা শাখা, কুবরাজ আন্তঃপুঞ্জি উন্নয়ন সংগঠন, খাসি স্টুডেন্ট ইউনিয়ন, বৃহত্তর সিলেট আদিবাসী অধিকার সুরক্ষা নাগরিক কমিটি এবং ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’ (ধরা) যৌথভাবে এর আয়োজন করে।
মানববন্ধন শেষে একটি প্রতিবাদী মিছিল নিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যান অংশগ্রহণকারীরা। সেখানে পাঁচ দফা দাবি সংবলিত স্মারকলিপি দেওয়া হয়।
এক রাতের ঘটনায় অনিশ্চিত ১০ পরিবারের ভবিষ্যৎ
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ৩০ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে একদল দুর্বৃত্ত নার্সারি পুঞ্জির পানজুমে ঢুকে পানগাছ কেটে ফেলে। এতে ১০টি খাসিয়া ও গারো পরিবারের পান চাষের জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভুক্তভোগীদের হিসাবে, কেটে ফেলা গাছের সংখ্যা ৮ হাজারের বেশি এবং আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ৫০ লাখ টাকা।
পুঞ্জির বাসিন্দাদের প্রধান জীবিকার উৎস পান চাষ। দীর্ঘ সময় ধরে পরিচর্যা করে একটি পানগাছ থেকে আয় পাওয়ার উপযোগী করে তুলতে হয়। সেই গাছ এক রাতেই কেটে ফেলা হলে শুধু তাৎক্ষণিক আর্থিক ক্ষতিই হয় না, বন্ধ হয়ে যায় ভবিষ্যৎ আয়ের পথও। নতুন করে পানগাছ লাগিয়ে উৎপাদনে ফিরতে গেলেও প্রয়োজন হয় সময়, শ্রম ও অর্থের।
কুবরাজ আন্তঃপুঞ্জি উন্নয়ন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ফ্লোরা বাবলি তালাং বলেন, নার্সারি পুঞ্জির ঘটনার আগে সাহেব টিলা পুঞ্জিতেও দুর্বৃত্তরা হামলা চালিয়ে পানগাছ কেটে ফেলেছিল। এরপর একই ধরনের ঘটনা ঘটায় পান চাষের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর মধ্যে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
তাঁর ভাষ্য, পুঞ্জির বাসিন্দারা মূলত পান চাষ করেই জীবিকা নির্বাহ করেন। এভাবে একের পর এক পানগাছ ধ্বংস হতে থাকলে তাঁরা সর্বস্বান্ত হয়ে পড়বেন।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন পুলিশের
পানগাছ কাটার ঘটনার পর ক্ষতিগ্রস্ত পানজুম পরিদর্শন করেছেন কুলাউড়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমান। শুক্রবার (৯ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে তিনি ঘটনাস্থলে যান। এ সময় কুলাউড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ জহিরুল ইসলাম মুন্না, উপপরিদর্শক (এসআই) অলক বিহারী গুন ও মো. ফজলুল হক উপস্থিত ছিলেন।
পরিদর্শনকালে পুলিশ কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত খাসিয়া ও গারো পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাঁদের কাছ থেকে ঘটনার বিস্তারিত শোনেন। এ সময় তাঁরা ঘটনার নিন্দা জানিয়ে তদন্তের মাধ্যমে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।
ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে উপস্থিত ছিলেন কুবরাজ আন্তঃপুঞ্জি উন্নয়ন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ফ্লোরা বাবলি তালাং, কর্মধা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য সিলভেস্টার পাঠাং, নার্সারি পুঞ্জির মান্ত্রী (প্রধান) জনি পতামসহ ক্ষতিগ্রস্ত ১০টি পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় আদিবাসীরা।
সহকারী পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, নার্সারি পানপুঞ্জিতে পানগাছ কেটে ফেলার ঘটনা অত্যন্ত ন্যক্কারজনক। খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে যায়। পরে ক্ষতিগ্রস্ত পানপুঞ্জি পরিদর্শন করে ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে।
তিনি বলেন, এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে দ্রুত গ্রেপ্তার এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পুলিশ কাজ করছে। অপরাধীরা কোনোভাবেই ছাড় পাবে না। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সে জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।
পাঁচ দফা দাবিতে মানববন্ধন
মঙ্গলবারের প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তারা বলেন, পানগাছ কেটে ফেলার ঘটনায় শুধু কয়েকটি পরিবারের সম্পদের ক্ষতি হয়নি, তাঁদের দীর্ঘদিনের জীবিকা ও ভবিষ্যৎও হুমকির মুখে পড়েছে। তাই অপরাধীদের শনাক্ত করে শাস্তি দেওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জীবন-জীবিকা সুরক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
মানববন্ধন থেকে পাঁচ দফা দাবির ভিত্তিতে স্মারকলিপি দেওয়া হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে পানগাছ কাটার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তার, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং আদিবাসী পান চাষিদের জীবন-জীবিকা ও সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম মৌলভীবাজার জেলা শাখার সভাপতি ফ্লোরা বাবলি তালাংয়ের সভাপতিত্বে এবং মানবাধিকারকর্মী হেলেনা তালাংয়ের সঞ্চালনায় সমাবেশে বক্তব্য দেন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’ (ধরা) সিলেটের সদস্যসচিব আব্দুল করিম কিম, ভয়েস অব রিভার মনুর প্রধান নির্বাহী আসম ছালেহ সুহেল, বৃহত্তর সিলেট আদিবাসী অধিকার সুরক্ষা নাগরিক কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট ডাডলি ডেরিক প্রেন্টিস ও সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট আবুল হাসান।
এ ছাড়া বক্তব্য দেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম মৌলভীবাজার জেলার সহসভাপতি নারায়ন কুর্মী, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি পংকজ কন্দ, মুন্ডা সমাজ কল্যাণ পরিষদ বৃহত্তর সিলেটের সাধারণ সম্পাদক লক্ষন মুন্ডা, লাউয়াছড়া পুঞ্জির মান্ত্রী ফিলা পতমী, খাসি স্টুডেন্ট ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক লান্ছার তংপের, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট মৌলভীবাজার জেলা শাখার সভাপতি বিশ্বজিৎ নন্দী ও সাধারণ সম্পাদক রাজিব সূত্রধর, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) মৌলভীবাজার জেলার ইনচার্জ উজ্জল রায় এবং ফাদার যোসেফ গমেজসহ স্থানীয় আদিবাসী নেতারা।
নিরাপত্তা ও জীবিকা রক্ষার দাবি
নার্সারি পুঞ্জিতে পানগাছ কাটার ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, কীভাবে তাঁরা আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরবেন। পান চাষের জমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তাঁদের নিয়মিত আয়ের উৎস সংকুচিত হয়েছে। অন্যদিকে, একই ধরনের ঘটনা পুনরাবৃত্তির আশঙ্কাও তাঁদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
স্থানীয় আদিবাসী পরিবারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক পুনর্বাসনের বিষয়টিও তাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পুঞ্জিবাসী ও আন্দোলনকারীদের প্রত্যাশা, তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো যাতে তাঁদের জীবিকা পুনর্গঠন করতে পারেন, সে জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
হাজারো পানগাছের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল কয়েকটি পরিবারের দীর্ঘদিনের শ্রম, স্বপ্ন ও বেঁচে থাকার অবলম্বন। সেই অবলম্বন হারিয়ে তাঁদের জীবনে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা কাটাতে অপরাধীদের বিচার ও ক্ষতিপূরণের দাবির পাশাপাশি প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার নিশ্চয়তা।



















