img

পুনর্জন্মের পথে!

প্রকাশিত :  ০৯:৪৫, ১৩ জানুয়ারী ২০২৫
সর্বশেষ আপডেট: ০৯:৫৪, ১৩ জানুয়ারী ২০২৫

পুনর্জন্মের পথে!

রেজুয়ান আহম্মেদ

জীবনের মানে কী? একজন মানুষ কি শুধুমাত্র তার শারীরিক অস্তিত্বের মাধ্যমে নিজেকে প্রকাশ করে, নাকি তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা অন্তর্গত শক্তিই তাকে অনন্য করে তোলে? এমন গভীর ভাবনাগুলোই ড. আরিফ রহমানের জীবনের চালিকা শক্তি ছিল। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন প্রশ্নপ্রবণ। জগতের রহস্য তাকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করত। মানুষের দেহে প্রকৃতির যে অসীম ক্ষমতা লুকিয়ে আছে, তা অন্বেষণের আগ্রহই তাকে মেডিক্যাল বিজ্ঞান অধ্যয়নে অনুপ্রাণিত করেছিল।

যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডি করার সুযোগ পেয়ে আরিফ জীবনের নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেন। তার গবেষণার বিষয় ছিল স্টেম সেল। এই কোষগুলো ঘিরে ছিল অসীম সম্ভাবনা ও বিতর্কের মিশ্রণ। আরিফ আজও স্পষ্ট মনে করতে পারেন প্রথমবার ল্যাবরেটরিতে প্রবেশের দিনটি। আধুনিক যন্ত্রপাতি আর স্টেম সেল—যা মানুষের জীবনের মূল চাবিকাঠি হিসেবে পরিচিত—সবকিছুই যেন তাকে অভিভূত করেছিল।

তার তত্ত্বাবধায়ক ড. এলেনা বলেছিলেন, “স্টেম সেল এমন এক বিস্ময়কর কোষ, যা কেবল শরীর গঠনেই নয়, পুনর্গঠনে সক্ষম। তবে এর নৈতিকতা নিয়ে যে বিতর্ক চলছে, তা আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।” আরিফ বুঝতে পারলেন, তার গবেষণা শুধু বৈজ্ঞানিক উন্নতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এটি মানবিকতার গভীরতম প্রশ্নগুলোতেও প্রভাব ফেলবে।

আরিফ প্রতিদিন এম্ব্রায়োনিক স্টেম সেলের নমুনা নিয়ে কাজ করতেন। তার নিরলস গবেষণার ফলে তিনি এমন কিছু আবিষ্কার করলেন যা বৈজ্ঞানিক মহলে আলোড়ন তুলেছিল। তিনি দেখতে পেলেন, ক্যান্সারের কোষগুলো স্টেম সেলের সঙ্গে যুক্ত হলে এক ধরনের প্রতিরোধ ক্ষমতা সৃষ্টি হয়। তার গবেষণায় সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছিল।

কিন্তু সমাজ তখনও প্রস্তুত ছিল না। স্টেম সেলের ব্যবহার নিয়ে নানা নৈতিক বিতর্ক শুরু হয়। “মানুষের জীবনের সাথে খেলা করা হচ্ছে”—এমন অভিযোগে তার ল্যাব সিলগালা করা হয়। হতবাক আরিফ বুঝতে পারলেন, বিজ্ঞান ও সমাজের এই দূরত্ব ঘোচাতে হলে তাকে আরও বড় পরিসরে কাজ করতে হবে।

ঠিক তখনই আরিফের জীবনে আসেন স্নিগ্ধা। এক তরুণী, যার চোখে ছিল বাঁচার আকুতি। ক্যান্সারে আক্রান্ত স্নিগ্ধা শেষ আশ্রয় হিসেবে আরিফের কাছে আসেন। তার জন্য স্টেম সেল থেরাপি নিয়ে কাজ শুরু করেন আরিফ। স্নিগ্ধার সঙ্গে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত আরিফকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছিল—একটি মানুষের জীবন কতটা মূল্যবান।

স্টেম সেল থেরাপির মাধ্যমে স্নিগ্ধার শরীরে নতুন কোষ তৈরি হলো। তার দেহের দুর্বলতা ধীরে ধীরে সেরে উঠতে লাগল। তবে এই থেরাপি চালিয়ে যেতে হলে আরও গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন ছিল।

যখন আরিফ তার গবেষণাকে বৃহত্তর পরিসরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন, তখন নতুন করে বিতর্কের ঝড় উঠল। অনেকে বললেন, “স্টেম সেল গবেষণা মানে ভ্রূণ হত্যা।” জনমতের চাপে তাকে ও তার দলকে আদালতে দাঁড়াতে হলো। কিন্তু স্নিগ্ধার মতো হাজারো রোগীর উদাহরণ দিয়ে আরিফ প্রমাণ করলেন, এই গবেষণা মানবজাতির জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

তার গবেষণার নৈতিক দিকগুলো নিয়ে বহু আলোচনা হলেও আরিফ সবসময় মানবতার কল্যাণকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। আদালতে তিনি বলেছিলেন, “আমাদের গবেষণার লক্ষ্য শুধু রোগ সারানো নয়, মানুষের জীবনের নতুন অর্থ খুঁজে দেওয়া।”

পাঁচ বছর পর স্নিগ্ধা সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন। এই সাফল্য শুধু আরিফের নয়; এটি ছিল এক নতুন যুগের সূচনা। তার থেরাপি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছিল। বৈজ্ঞানিক মহল তাকে সম্মান জানিয়েছিল, আর সাধারণ মানুষ তাকে দেখেছিল আশা ও পুনর্জন্মের প্রতীক হিসেবে।

ড. আরিফ রহমানের গল্প কেবল একজন বিজ্ঞানীর গল্প নয়। এটি এমন এক সংগ্রামের গল্প, যেখানে বিজ্ঞান ও মানবতার মিলনে নতুন ভোরের সূচনা হয়েছে। তার গবেষণা কেবল রোগ নিরাময়ের প্রযুক্তিই নয়, বরং মানুষের জীবনের গভীরতর প্রশ্নগুলোরও উত্তর দিয়েছে।

আরিফ আজও কাজ করে চলেছেন, তবে তার যাত্রার আসল গল্প হয়তো কেবল শুরু হয়েছে। তার এই সংগ্রাম দেখিয়েছে, পুনর্জন্ম কেবল একক ব্যক্তির নয়; এটি সমগ্র মানবজাতির জন্য এক নতুন অধ্যায়। “পুনর্জন্মের পথে” তাই শুধু জীবনের নতুন দিগন্ত উন্মোচন নয়; এটি বিশ্বাস, মানবতা ও আশার এক অনন্য সার্থকতার গল্প।




রেজুয়ান আহম্মেদ: কলামিস্ট, বিশ্লেষক; সম্পাদক অর্থনীতি ডটকম

সাহিত্য-সংস্কৃতি এর আরও খবর

img

গাজার দিনলিপি, মানবতার ভাষ্য

প্রকাশিত :  ১৮:২৮, ০৫ মার্চ ২০২৬

‘দ্য ডেইজ অব গাজা’ নিয়ে মুখোমুখি রেজুয়ান আহম্মেদ

ড. নাজমুল ইসলাম 

যুদ্ধের খবর প্রতিদিনই আসে—সংখ্যায়, পরিসংখ্যানে, কূটনৈতিক বিবৃতিতে। কিন্তু সেই সব সংখ্যার আড়ালে যে মানুষ, যে শিশু, যে মা—তাদের গল্প কতটা শোনা যায়? এই প্রশ্ন থেকেই কথাসাহিত্যিক রেজুয়ান আহম্মেদের সাম্প্রতিক গ্রন্থ ‘দ্য ডেইজ অব গাজা’-এর জন্ম। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বইটির প্রেরণা, নির্মাণপ্রক্রিয়া ও বার্তা নিয়ে কথা বলেছেন তিনি।

বইটি লেখার পেছনের কারণ জানতে চাইলে রেজুয়ান আহম্মেদ বলেন, এটি কোনো রাজনৈতিক অবস্থান থেকে লেখা নয়। “গাজার শিশুদের চোখে যে আতঙ্ক, মায়েদের চোখে যে অপেক্ষা, আর ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকেও বেঁচে থাকার যে অদম্য ইচ্ছা—সেই মানবিক গল্পগুলো আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। আমি চেয়েছি যুদ্ধের পরিসংখ্যান নয়, মানুষের অনুভূতির ইতিহাস লিখতে।”

লেখকের ভাষায়, সংবাদ তাৎক্ষণিক; কিন্তু সাহিত্য দীর্ঘস্থায়ী। সংবাদ জানায় কী ঘটেছে, সাহিত্য অনুভব করায় কেন তা আমাদের ভাবায়।

‘দ্য ডেইজ অব গাজা’—নামের ভেতরেই যেন এক দীর্ঘ সময়ের সঞ্চিত বেদনা। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “‘ডেইজ’ মানে দিনগুলো। কিন্তু এখানে প্রতিটি দিন এক-একটি দীর্ঘ ইতিহাস। প্রতিটি সকাল অনিশ্চয়তার, প্রতিটি রাত বেঁচে থাকার সংগ্রামের। গাজার দিনগুলো কেবল সংবাদ শিরোনাম নয়; এগুলো মানুষের জীবন, স্বপ্ন আর অশ্রুর দিনলিপি।” এই বক্তব্যেই বোঝা যায়, বইটি ঘটনাপঞ্জি নয়; বরং এক মানবিক দলিল।

বইটি পুরোপুরি বাস্তব ঘটনার ওপর নির্ভরশীল কিনা—এ প্রশ্নে রেজুয়ান আহম্মেদ জানান, এটি গবেষণা, সংবাদ ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বর্ণনার সঙ্গে সাহিত্যিক কল্পনার মিশ্রণে তৈরি। “সাহিত্যের কাজ কেবল তথ্য দেওয়া নয়, অনুভব করানো,”—বলেছেন তিনি। বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়েই তিনি চরিত্র নির্মাণ করেছেন, যাতে পাঠক কেবল পড়েন না, ভেতরে ভেতরে অংশ হয়ে ওঠেন।

লিখতে গিয়ে আবেগের সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে বলেও জানান তিনি। “অনেক সময় লিখতে গিয়ে থেমে যেতে হয়েছে। কিছু অধ্যায় লেখার সময় চোখ ভিজে গেছে। কিন্তু আমি থামিনি। কারণ কেউ না কেউ তো এই গল্পগুলো বলবেই। যদি আমার কলম সেই কণ্ঠ হতে পারে, সেটাই আমার সার্থকতা।” এই স্বীকারোক্তি বইটির আবেগঘন ভেতরকার সুরকে স্পষ্ট করে।

বর্তমান প্রজন্মের উদ্দেশে লেখকের বার্তা—“মানবতা কখনো পরাজিত হয় না। পৃথিবীর যে প্রান্তেই অন্যায় হোক না কেন, আমাদের বিবেককে জাগ্রত রাখতে হবে। সহমর্মিতা, ন্যায়বোধ এবং ভালোবাসাই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে।” দ্রুত তথ্যপ্রবাহের যুগে ঘটনাকে দ্রুত ভুলে যাওয়ার প্রবণতার বিপরীতে সাহিত্যকে তিনি দেখেন স্মৃতি ও বিবেকের ধারক হিসেবে।

সাক্ষাৎকারের শেষপ্রান্তে রেজুয়ান আহম্মেদ বলেন, “বইটি পড়ুন খোলা হৃদয়ে। এটি কোনো পক্ষ নেওয়ার বই নয়; এটি মানুষকে অনুভব করার বই। যদি পাঠক একটি মুহূর্তের জন্যও গাজার কোনো শিশুর চোখ দিয়ে পৃথিবীকে দেখতে পারেন, তবে আমার লেখা সফল।”

সমাপনী বক্তব্যে তিনি যোগ করেন, “সাহিত্যের শক্তি বন্দুকের চেয়ে বড়। শব্দের শক্তি ধ্বংস নয়, সৃষ্টি করে। ‘দ্য ডেইজ অব গাজা’ সেই সৃষ্টির একটি ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা—মানবতার পক্ষে, জীবনের পক্ষে।”

যুদ্ধের কোলাহলের ভেতরেও মানবতার যে ক্ষীণ কিন্তু স্থায়ী সুর, এই বই যেন সেই সুরকেই শব্দে রূপ দেওয়ার চেষ্টা।