রেজুয়ান আহম্মেদের ‘এক মুঠো গল্প’ জীবনকে স্পর্শ করার এক আন্তরিক প্রয়াস
প্রকাশিত :
১৯:২৭, ১২ মার্চ ২০২৫ সর্বশেষ আপডেট: ১৯:৫০, ১২ মার্চ ২০২৫
গ্রন্থের নাম: ‘এক মুঠো গল্প’
লেখক: রেজুয়ান আহম্মেদ
জীবন নামক এই বিস্তৃত ক্যানভাসে রং তো লেগেই থাকে—কখনো উজ্জ্বল আনন্দের, কখনো ধূসর বেদনার, আবার কখনো বা রক্তাক্ত ক্ষতের। রেজুয়ান আহম্মেদের গল্পসংকলন "এক মুঠো গল্প" পাঠককে ঠিক এই জীবনের ভেতরেই টেনে নেয়, যেখানে প্রতিটি গল্প একেকটি দর্পণ: সমাজের নিগূঢ় চিত্র, অবহেলিত মানুষের নিঃশব্দ যন্ত্রণা এবং স্বপ্ন-সংগ্রামের বহুচিত্রী রূপ এতে প্রতিফলিত হয়েছে। গল্পগুলোর ভাষা সরল, কিন্তু আবেদন গভীর—যেন লেখক জীবনের গভীরে ডুব দিয়ে তুলে এনেছেন অমূল্য মুক্তো।
এই সংকলনের প্রতিটি গল্পই সমাজের সেই মানুষদের কথা বলে, যাদের অস্তিত্ব আমাদের দৈনন্দিন জীবনের পটভূমিতে মিশে আছে, কিন্তু আমরা দেখি না। ক্ষুধার জ্বালা, বেঁচে থাকার লড়াই, স্বপ্নভঙ্গের গ্লানি, নিঃসঙ্গতার ভার—এসবই এখানে মূর্ত হয়ে ওঠে চরিত্রগুলোর মুখে। লেখক কখনো একজন রিকশাচালকের জবানিতে বলেন তার দারিদ্র্যের গল্প, কখনো বা একজন বৃদ্ধ মায়ের অন্তর্নিহিত বেদনা ফুটিয়ে তোলেন, যার সন্তান তাকে ভুলে গেছে শহরের ভিড়ে। গল্পের নায়করা আমাদেরই প্রতিবেশী, কিন্তু তাদের কণ্ঠস্বর সমাজের মূলধারায় কখনোই পৌঁছায় না। রেজুয়ান আহম্মেদ সেই কণ্ঠগুলোকে কাগজে স্থান দিয়েছেন নিপুণ হাতে।
সংকলনটির বিশেষত্ব হলো এর গল্পগুলোর মধ্যে থাকা আবেগের দ্বৈততা। "এক মুঠো গল্প"-এ এমন গল্পও আছে যা হাসির রেশ ছড়ায়, আবার এমন গল্পও রয়েছে যা পাঠ শেষে হৃদয়ে পাথরের মতো চাপ রেখে যায়। উদাহরণস্বরূপ, "আলোর সন্ধানে" গল্পটি একটি দরিদ্র শিশুর আশাবাদী সংগ্রামের কথা বলে, যার চোখে স্বপ্নের জ্যোতি আছে, কিন্তু পরিণতিতে বাস্তবতার নির্মমতা পাঠককে স্তব্ধ করে দেয়। অন্যদিকে, "মাটির গন্ধ" গল্পে প্রেম ও বিচ্ছেদের মিশ্রণে তৈরি হয় এক করুণ সুর, যা হৃদয়ে দাগ কাটে। লেখক এখানে কখনো পাঠককে আশায় বাঁধেন, কখনো বা বাস্তবতার কঠিন মাটিতে নামিয়ে দেন—এই টানাপোড়েনই গল্পগুলোর প্রাণ।
রেজুয়ান আহম্মেদের গল্পগুলো শুধু ঘটনা বর্ণনা করে না, বরং পাঠককে জাগ্রত করে। "নীরব চিৎকার" গল্পটি সমাজের বৈষম্যকে এমন মর্মস্পর্শী ভাষায় উপস্থাপন করে যে, পাঠক নিজেকে প্রশ্ন করতে বাধ্য হন: "আমরা কি আসলেই মানবিক?" আবার "ফেলে আসা দিনগুলি" গল্পে অতীত ও বর্তমানের দ্বন্দ্বে ব্যক্তির আত্মানুসন্ধানের মাঝে লুকিয়ে থাকে বৃহত্তর সামাজিক দায়বদ্ধতার ইঙ্গিত। গল্পকার এখানে কেবল বর্ণনাকারী নন, তিনি সমাজের দর্পণ ধরিয়ে দেন—যেখানে পাঠক নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে পায়।
এই সংকলনের গদ্য প্রাঞ্জল, কিন্তু তাৎপর্যে ভারী। লেখক জটিল শব্দের বাহুল্য এড়িয়ে গেছেন, বরং মাটির গন্ধমাখা ভাষায় জীবনকে ফুটিয়ে তুলেছেন। প্রকৃতির উপমা, লোকজ অভিব্যক্তি এবং দৈনন্দিন সংলাপের ব্যবহার গল্পগুলোকে করে তোলে প্রাণবন্ত। যেমন, "ক্ষুধার আগুন" গল্পে তিনি লিখেন: "সে ক্ষুধাকে চিনত না, ক্ষুধাই তাকে চিনে ফেলেছিল—হাড়ে হাড়ে।" এই সরল বাক্যগুলোই পাঠকের মনে গেঁথে যায়।
"এক মুঠো গল্প" নিছক গল্পের বই নয়, এটি একটি সমাজ-ইতিহাসের দলিল। যারা মনে করেন সাহিত্য শিল্পের জন্য, তাদের জন্য এই বই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেবে—কারণ এখানে শিল্প ও বাস্তবতার সীমানা অনন্ত। রেজুয়ান আহম্মেদ দেখিয়েছেন, গল্প বলার শক্তি হলো সমাজকে প্রত্যক্ষ করার হাতিয়ার। এই বই পাঠকের হৃদয়ে নাড়া দেবে, হয়তো কাঁদাবে, হয়তো ক্ষোভ জাগাবে, কিন্তু নিশ্চিতভাবে ভাবাবে। জীবনের গভীরে যেতে চাইলে এই সংকলন আপনার হাতের মুঠোয় রাখুন—এক মুঠো গল্প, এক বস্তা অনুভূতি।
রেটিং: ৪.৫/৫
প্রস্তাবনা: যারা জীবন ও মানুষের গল্পে বিশ্বাসী, তাদের জন্য এই বই অবশ্যপাঠ্য।
গ্রন্থ সমালোচনায়: ড. নাজমুল ইসলাম, লেখক, গবেষক, সাহিত্য সমালোচক
মানুষের কিছু পরিচয় অযাচিত, যা সময় নিজে এসে কাঁধে চাপিয়ে দেয়। আবার কিছু পরিচয় মানুষ বেছে নেয় সম্পূর্ণ নিজের তাগিদে—একেবারে নিভৃতে, কোনো ঢাকঢোল না পিটিয়ে। আমার পরিচয়টা পরের দলের। কেউ যখন অবলীলায় জিজ্ঞেস করে বসেন, \"আপনি কি লেখক?\"—আমি খানিকটা থমকে যাই। \'লেখক\' শব্দটার একটা নিজস্ব ওজন আছে, এক ধরনের গাম্ভীর্য আছে; যা আমার ঠিক আসে না। তাই মৃদু হেসে আলতো করে দায় এড়াতে বলি, \"আমি লেখক নই, বড়জোর শব্দের টুকাই।\"
\'টুকাই\' শব্দটার গায়ে এক চিলতে অনাড়ম্বর সারল্য লেগে থাকে। অলিগলিতে বা চেনা চত্বরে আমরা এমন কিছু মানুষকে দেখি, যারা সবার ফেলে দেওয়া টুকরো জিনিস কুড়িয়ে বেড়ায়। পথচলতি মানুষের চোখে ওগুলো স্রেফ আবর্জনা হলেও, ওই সংগ্রাহকের চোখে তার প্রতিটিই মূল্যবান। সে জানে, এই আপাত-পরিত্যক্ত ভাঙাচোরার বুকেও কোনো না কোনো জীবনের আখ্যান লুকিয়ে থাকে।
আমার কাজটাও আলাদা কিছু নয়; তফাত শুধু আমি কুড়িয়ে নিই ছিটকে পড়া সব শব্দ।
ভিড়ের মধ্যে আচমকা খসে পড়া কোনো অবহেলিত বাক্য, মায়ের বুকের গভীর থেকে আসা এক দীর্ঘশ্বাস, শ্রমিকের চেরা কণ্ঠস্বর, বৃদ্ধ বাবার একা হয়ে যাওয়া বিকেল, শিশুর অকারণ খিলখিল কিংবা নিঝুম রাতে বালিশে মুখ গোঁজা চাপা কান্না—এসবই আমার সঞ্চয়। আমি সেগুলোকে পরম যত্নে মনের কোনো এক গোপন কুঠুরিতে জমিয়ে রাখি। তারপর কোনো এক অলস অবসরে সেই জমা হওয়া উপাদানগুলোই নতুন গল্পের অবয়ব নেয়।
অনেকের ধারণা, গল্প মানেই জাদুকরী কল্পনা। আমার তা মনে হয় না। বিশ্বাস করি, এই মহাবিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর গল্পকার হলো স্বয়ং \'জীবন\'। আমরা যারা লিখতে বসি, তারা আসলে সেই প্রবহমান জীবনের এক-একজন সামান্য অনুবাদক মাত্র। জীবন যা আড়ালে বলে যায়, আমরা তাকেই অক্ষরে বাঁধি; সময় যা দেখিয়ে যায়, আমরা তাকেই বাক্যের সুতোয় বুনে রাখি।
দিনকয়েক আগে বাজারের এক কোণে এক বৃদ্ধকে দেখেছিলাম। হাতে জীর্ণ একটা বাটন ফোন, যার রঙ চটে গেছে বহু আগে। শার্টের পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করে তিনি বারবার কী যেন মিলিয়ে দেখছিলেন। কৌতূহল সামলাতে না পেরে কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, \"কী খুঁজছেন, চাচা?\"
তিনি ম্লান হেসে বললেন, \"ছেলেদের মোবাইল নম্বরগুলো লিখে রাখছি বাবা। ফোনটা তো বুড়ো হয়েছে, কখন নষ্ট হয়ে যায় ঠিক নেই। কাগজটা থাকলে নম্বরগুলো অন্তত হারাবে না।\"
কথাটা শোনার পর মনে হলো, ওটা তো কেবল কিছু সংখ্যার খতিয়ান নয়, ওটা আসলে এক বাবার বুকপকেটে আগলে রাখা ভালোবাসার দলিল। এই ডিজিটাল যুগে, যেখানে আঙুলের ডগায় হাজারো নম্বর নিমেষে সংরক্ষিত থাকে, সেখানে একজন বাবা সন্তানদের সঙ্গে যোগাযোগের শেষ সূত্রটুকু কাগজের টুকরোতে বাঁচিয়ে রাখছেন। কারণ নম্বর হারালে যে বড্ড একলা হয়ে যেতে হবে!
সেদিন ডায়েরির পাতায় কোনো গল্প উঠেনি, শুধু দৃশ্যটা বুকের ভেতর গেঁথে গিয়েছিল। পরে বুঝেছি, গল্পের আসল বীজ তো ওখানেই ছড়ানো ছিল।
পথ হাঁটতে হাঁটতে এইটুকু বুঝেছি, মানুষের আসল সম্পদ তার অনুভূতি। ক্ষমতা, দাপট, ধনদৌলত—সবই একসময় ধুলোয় মেশে, কেবল অনুভূতিটুকুই অমর। সন্তানের পথ চেয়ে থাকা মায়ের ব্যাকুলতা, প্রেমিকের আজন্ম ব্যর্থতা, চাতক পাখির মতো বৃষ্টির অপেক্ষায় থাকা কৃষকের চশমাহীন চোখ কিংবা প্রবাসে বসে ঈদের দিনে ঘরের জন্য হাহাকার—এসব অনুভূতির কোনো মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার তারিখ থাকে না।
আমি নিজেকে সেই অনুভূতির এক সামান্য ফেরিওয়ালা ভাবতেই পছন্দ করি।
ভোরের ঘাসে জমে থাকা শিশিরের মতো ছোট ছোট অনুভূতি কুড়িয়ে এনে আমি শব্দের মালায় গাঁথি, তারপর তুলে দিই পাঠকের হাতে। কেউ সেখানে নিজের ফেলে আসা ছায়া দেখতে পান, কেউ খুঁজে পান চেনা স্মৃতি, আবার কেউ হয়তো নতুন করে বাঁচার একটুখানি রসদ পান।
অনেকে লেখালেখিকে পেশা বলেন, কারও কাছে এটা সাধনা কিংবা শুদ্ধ শিল্প। আমার কাছে এর চেয়ে বড় সত্য হলো—এটি এক মানুষের বুক থেকে অন্য মানুষের বুকে পৌঁছানোর সেতু। যখন সাদা পাতায় কলম ঘষি, তখন নিজেকে আর একলা মনে হয় না। মনে হয় আমার চারপাশের অজস্র মানুষ, তাঁদের অধরা স্বপ্ন, ক্লান্তি, আশা আর গোপন দীর্ঘশ্বাসগুলো এসে মিশে যাচ্ছে আমার কালির স্রোতে।
এই চেনা পৃথিবীতে প্রতিটি মানুষের বুকেই একটা না বলা উপাখ্যান থাকে। কেউ তা প্রকাশ করতে পারে, কেউ পারে না। কেউ অপবাদে জড়ানোর ভয়ে কুঁকড়ে থাকে, কেউ আবার সুযোগের অভাবে নীরব হয়ে যায়। আমি সেই স্তব্ধ অধ্যায়গুলোর একনিষ্ঠ শ্রোতা হতে চাই। জীবনের সবচেয়ে দামি পাতাগুলো তো আসলে নিঃশব্দেই ওল্টায়।
একজন রিকশাচালক যখন সারাদিন রোদে পুড়ে ঘরে ফেরেন, তাঁর সেই ক্লান্তির বিবরণ সংবাদপত্রের মূল শিরোনাম হয় না। একজন গৃহিণী যখন নিজের চাওয়া-পাওয়া বিসর্জন দিয়ে সংসার টানেন, তাঁর জন্য কোনো পুরস্কার বরাদ্দ থাকে না। নামমাত্র বেতনে যে শিক্ষক শত শত ভবিষ্যৎ গড়ে দিচ্ছেন, ইতিহাসের পাতায় তাঁর নাম খোদাই করা থাকে না।
অথচ প্রকৃত গল্পগুলো তো ঠিক এই অন্তরালেই লুকিয়ে থাকে। আমি শুধু সেই আড়ালের আখ্যানগুলো খুঁজে বেড়াই।
সময়ের ধুলোবালির নিচে চাপা পড়া জীবনগুলো এত বেশি সাধারণ যে, সাধারণ চোখে তা অলক্ষ্যেই থেকে যায়। অথচ ওই সাদামাটা যাপনের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে মহাকাব্যের সৌন্দর্য। একটা গ্রামের শেষ সীমানায় দাঁড়িয়ে থাকা নিঃসঙ্গ কদমগাছ, একটা জরাজীর্ণ সাঁকো, পুরোনো স্কুলঘর কিংবা উদাস হয়ে থাকা কোনো পার্কের বেঞ্চ—দুনিয়ার কোনো কিছুই গল্পহীন নয়। শুধু তা শোনার মতো কান আর ছোঁয়ার মতো একটা সংবেদনশীল হৃদয় থাকতে হয়। আমি কেবল সেই হৃদয়টুকুকে মরে যেতে দিই না।
চারপাশে যখন ইঁদুরদৌড়, ক্ষোভ আর তীব্র কোলাহল দেখি, তখন আমি মানুষের চোখের দিকে তাকাই। প্রতিটি চোখেই একটা করে অসমাপ্ত উপন্যাস বোনা থাকে। কেউ সেখানে সুখের পরিচ্ছেদ লিখছেন, কেউ দুঃখের; কেউ নতুন স্বপ্নের প্রাক্কথন সাজাচ্ছেন, কেউ বা বিদায়ের শেষ লাইনটি টেনে চলে যাচ্ছেন।
আমি তাঁদের পাশে একটু বসি। শুনি। অনুভব করি। তারপর মনের অজান্তেই শব্দগুলো কুড়িয়ে নিই।
আমার এই ঝুলির শব্দগুলো খুব দামি বা অলংকৃত নয়। কোনো রাজকীয় বিপণি থেকে এগুলো সংগৃহীত হয়নি। এগুলো উঠে এসেছে পথের ধুলোবালি থেকে, মানুষের আটপৌরে যাপন আর বুকফাটা দীর্ঘশ্বাস থেকে। হয়তো সে কারণেই সাধারণ মানুষ আমার লেখার লাইনে নিজেদের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পায়।
যখন কোনো পাঠক এসে বলেন, \"আপনার লেখাটা পড়ার পর মনে হলো, এটা তো আমারই ভেতরের কথা\"—তখন মনে হয়, এই ধুলো ঘেঁটে শব্দ কুড়ানোর ক্লান্তিটুকু এক নিমেষে সার্থক হলো। সাহিত্য তো শেষ পর্যন্ত মানুষের বুকেই আশ্রয় খোঁজে; কোনো বইয়ের মধ্যে তাকে বন্দী করে রাখা তার নিয়তি নয়।
আমি বিশ্বাস করি, সমাজ বা মনস্তত্ত্ব বদলে দেওয়ার চাবিকাঠি সবসময় দীর্ঘ বক্তৃতার মঞ্চে থাকে না। কখনো কখনো একটা ছোট গল্প, একটা সহজ সরল বাক্য কিংবা এক চিলতে আন্তরিক অনুভূতিও মানুষের ভেতরের নিভে যাওয়া আলোটাকে নতুন করে জ্বালিয়ে দিতে পারে। যে আলো মানুষকে একটু বেশি মানবিক হতে শেখায়, অন্যের ক্ষতটাকে নিজের বলে চিনতে শেখায়, আর মানুষকে ভালোবাসতে বাধ্য করে।
তাই বুক ফুলিয়ে লেখক হওয়ার কোনো দাবি আমার নেই। তেমন কোনো মহৎ কৃতিত্বও আমি অর্জন করিনি। আমি কেবল মানুষের চলার পথে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অনুভূতির কণাগুলো কুড়িয়ে আনি। কারও ফেলে যাওয়া ভাঙা স্মৃতি, কারও ভুলে যাওয়া আবেগ, কারও অবহেলিত স্বপ্ন—এসব দিয়েই নিজের মতো করে মালা গাঁথি।
হয়তো কোনো এক সময় মানুষ আমার নামটা ভুলে যাবে, আমার লেখাগুলোও মহাকালের স্রোতে ভেসে যাবে। কিন্তু যদি কোনো একটি লাইনও কোনো এক উদাসীন পাঠকের চোখে এক ফোঁটা জল এনে দিতে পারে, কোনো এক ভগ্নহৃদয় মানুষকে নতুন করে দাঁড়ানোর সাহস দেয়—তবেই বুঝব আমার এই জীবন বৃথা যায়নি।
আমি তো যশের ক্যানভাসার নই। আমি অনুভূতির বাহক, সময়ের ধুলোয় লুকিয়ে থাকা গল্পের এক সামান্য অন্বেষী।
আমি লেখক নই, আমি শব্দের টুকাই।
আজও পথ চলতে চলতে আমি মানুষের হাসি, কান্না, মান-অভিমান আর অন্তহীন অপেক্ষা থেকে শব্দ কুড়িয়ে চলি। প্রতিটি দিন আমাকে নতুন করে বাঁচতে শেখায়, নতুন কিছু অনুভব করায়। আর আমি সেই অনুভূতিগুলো যত্ন করে পকেটে পুরে রাখি।
হয়তো কোনো এক নিঝুম রাতে, যখন চরাচর নিস্তব্ধ হয়ে যাবে, তখন ওই কুড়িয়ে আনা শব্দগুলো আবার ডানা মেলবে। তারা গল্প হবে, স্মৃতি হবে, আর ঠাঁই করে নেবে কোনো এক মানুষের নিভৃত হৃদয়ে।
সেদিনও যদি কেউ শুধায়, আমি একই উত্তর দেব—
আমি লেখক নই, আমি শব্দের টুকাই; মানুষের জীবনের রাজপথে ছড়িয়ে থাকা অনুভূতির কণা কুড়িয়ে বেড়ানো এক নামহীন পথিক।