img

সংবিধানে ঢোকার পথেই সীলমোহর মেরে রাখা হয়েছে

প্রকাশিত :  ১৩:২৯, ১৬ এপ্রিল ২০২৬

সংবিধানে ঢোকার পথেই সীলমোহর মেরে রাখা হয়েছে

আবদুল হামিদ মাহবুব

বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে এই দেড় মাসের মত হল। এই স্বল্প সময়ে সংবিধান-সংবিধান নিয়ে এত এত কথা শুনেছি যে, সংবিধানের প্রতি একধরনের বিরক্তিই সৃষ্টি হয়ে গেছে। শেখ হাসিনার শাসনের বিগত প্রায় ১৬ বছর সংবিধান বিষয়ে যত কথা শুনেছিলাম, অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর আর বর্তমান সরকারের এই দেড় মাসে যেন তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি শুনে ফেললাম।

আসলে কি আমরা সংবিধান মেনেই রাষ্ট্র চালাই? শেখ হাসিনা কি সংবিধানের প্রতি অনুচ্ছেদ, ধারা, উপধারা ধরে ধরে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছিলেন? আমার তো মনে হয়, সেটা তিনি করেননি। তার মত করে চালাতে গিয়ে যখন যে যে অংশ প্রয়োজন, তিনি সেটুকু ব্যবহার করে তার মতই চালিয়েছেন। সংবিধানের কোথাও কি লেখা আছে কলাকৌশল করে অনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে দেশ পরিচালনা করা যাবে? ২০১৪ সালে ১৫৩ আসনেই অনির্বাচিত সংসদ সদস্য ছিলেন!

২০১৮ সালে তো বিএনপিও নির্বাচনে অংশ নিল। কিন্তু এমন কৌশল করে নিশিবেলায় ভোটের কাজ সেরে ফেলা হলো। সেই সংসদ পূর্ণ মেয়াদ কাজ শেষ করল! আর ২০২৪-এ  নিজেরা নিজেরা নিজেদের মত যাকে চেয়েছেন তাকেই সংসদ সদস্য বানিয়ে এনে দেশটা নিয়ে এগোতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু ছাত্রদের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে যখন বিপ্লব বলুন আর গণঅভ্যুত্থাই বলুন, সেই রূপ যখন নিলো, তখন শেখ হাসিনা শাসক ‘ইয়াজিদ’-এর সেই সীমারের মত নির্দয় হয়ে হাজারের ওপর লাশ ফেলে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করল। শরীরের অঙ্গ-পতঙ্গ হারিয়ে কত হাজার হলেন পঙ্গু।

অবশেষে শেখ হাসিনা তার সভাসদ আত্মীয়-স্বজন সবাইকে নিয়ে পালিয়ে প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু সবাই রক্ষা পেল না। পাঁচশতাধিক জন সেনানিবাসে আশ্রয় নিলেন। সেনাবাহিনী তাদের প্রাণে বাঁচিয়ে দিয়ে সুযোগে সুযোগে সরে যাওয়ার পথ করে দিল! কেউ কেউ নিরাপদে সরে গেলেন। কিন্তু অনেকেই এখন জালে আটকা পড়ছেন। এইতো সেদিন দেখলাম গত সংসদের স্পিকারকে পুলিশ ধরে এনে কারাগারে পাঠালো!

আমি সংবিধান বিশেষজ্ঞ নই। কিন্তু সংবিধানের প্রসঙ্গ টেনে লেখার সূত্রপাত করেছি। আমার মত অক্ষরজ্ঞানওয়ালা বেয়াক্কেলকেও অতীতে কয়েকবার সংবিধান ঘাঁটাঘাঁটি করতে হয়েছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে দেশে যখন সংঘাতময় একটা অবস্থা চলছিল, তখন সেই সংবিধান ঘাঁটাঘাঁটি করে আমি লিখেছিলাম ‘সংঘাত এড়াতে একটি নির্বাচনী ফর্মূলা’। সেই লেখা প্রকাশ হওয়ার পর বেশ সাড়া পড়েছিল।

গত কদিন ধরে সংবিধান আর সংবিধান শুনতে শুনতে আবার ঘাঁটাচ্ছি। ঘাঁটাতে গিয়ে সংবিধানের প্রথম ভাগের  ‘৭খ’ পড়েই আমি থেমে গেছি। এই ‘৭খ’-তে যে কথাগুলো বলা আছে সেগুলো যদি বহাল রেখে দেওয়া হয় তাহলে এই দেশের ক্ষমতায় যে দলই যাক না কেন, সেই দলই শেখ হাসিনার মত ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠবেই। নিশ্চয়ই পাঠকরা জানতে চাচ্ছেন ‘৭খ’-তে কি আছে?

‘৭খ’-তে আছে “সংবিধানে ১৪২ অনুচ্ছেদে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, সংবিধানের প্রস্তাবনা, প্রথম ভাগের সকল অনুচ্ছেদ, দ্বিতীয় ভাগের সকল অনুচ্ছেদ, নবম-ক ভাগে বর্ণিত অনুচ্ছেদসমূহের বিধানাবলী সাপেক্ষে তৃতীয় ভাগের সকল অনুচ্ছেদ এবং একাদশ ভাগের ১৫০ অনুচ্ছেদসহ সংবিধানের অন্যান্য মৌলিক কাঠামো সংক্রান্ত অনুচ্ছেদ সমূহের বিধানাবলী সংযোজন, পরিবর্তন, প্রতিস্থাপণ, রহিতকরণ কিংবা অন্য কোন পন্থায় সংশোধনের অযোগ্য হইবে।”

যেসব বিষয় “সংশোধন অযোগ্য হইবে” উল্লেখ করে সংবিধানে ঢোকার পথেই সীলমোহর মেরে রাখা হয়েছে, সেগুলো আর এখানে দিলাম না। দিলে এই লেখা অনেক বড় হয়ে যাবে। আমি মনে করি আমার এই লেখার পাঠক সকলেই ‘গুগল’ সার্চ করতে জানেন। কেউ যদি পুরোটা পড়তে চান, তবে গুগলে সার্চ করে সংবিধানের সেই অংশগুলো পড়ে নেবেন।  

সংবিধানে লিখে রাখা এই সাড়ে পাঁচ লাইন সারা সংবিধানের রক্ষক হয়ে আছে! এবার একজন সাধারন মানুষ হিসাবে ভাবুন, সংবিধানের এই অংশ থাকা অবস্থায় কোন পরিষদের কি ক্ষমতা আছে সংবিধানে মৌলিক পরিবর্তন কিংবা সংশোধন ঘটানোর? আমি জানিনা আমাদের আইন ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী সংসদের বিরোধীদলীয় নেতার মুলতবী প্রস্তাব আলোচনার জন্য উত্থাপিত হলে, তিনি এত এত বই সামনে আনার জন্য বলেছিলেন কেন? তিনি যখন ‘জুলাই সনদ’ প্রসঙ্গে বক্তব্য রাখলেন, তখন তো আমার মনে হল বক্তব্যটি তিনি সংসদে নয় পল্টন ময়দানে দিচ্ছেন। তিনি যেসব বইয়ের কথা বলেছিলেন, এমন কি মদীনা সনদের প্রসঙ্গ থেকেও তো তেমন কোনো উদ্ধৃতি দিতে দেখলাম না! তাহলে কি একজন আমজনতা হিসেবে ধরে নেব, আমাদের লেখালেখির শুরুর দিকে কোনো কোনো বন্ধু ইংরেজি সাহিত্যের বই বগলে নিয়ে ঘুরাঘুরি করতো। তারা আমাদের বোঝাত ওইসব ইংরেজি বই তারা পড়ে নতুন নতুন সাহিত্য শিখছে। আমরা তাদের আঁতেল বলতাম! আইনমন্ত্রী তার পাণ্ডিত্য দেশবাসীকে জানান দেওয়ার জন্য কি ওইসব বইয়ের কথা বলেছিলেন?

আমি জানি এই আইনমন্ত্রী খুবই পণ্ডিত একজন মানুষ। আইনের এমন কোন বিষয় নেই, যা তিনি জানেন না। তিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু যেসব বইয়ের কথা বললেন, অথচ তার বক্তব্যেই সেসব বই থেকে তেমন কিছুই উদ্ধৃত হলো না! তাই আমি প্রসঙ্গটি টেনে আনলাম।

গত (০৭ এপ্রিল ২০২৬) মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়ন কেন অপরিহার্য?’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রবন্ধে বিচারপতি এম এ মতিন আমাদের আইন ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রীর বক্তব্যের জবাব দেন। প্রথম আলোর রিপোর্ট অনুযায়ী বিচারপতি এম এ মতিন বলেন, ‘শোনা যাচ্ছে, জাতীয় সংসদে আইনমন্ত্রী সংসদ সদস্যগণকে হবস পড়ার উপদেশ দিয়েছেন। হবসের দর্শন হচ্ছে দেশের শাসক হবেন এমন একজন, যিনি হবেন সর্বশক্তিমান এবং সকল আইনের ঊর্ধ্বে। যেমন রোমান সম্রাটরা ছিল। হবসের দর্শন অনুসরণ করে সে যুগে স্বৈরাচার জন্ম নিয়েছিল। আমরা কি আবার স্বৈরশাসক চাচ্ছি?’

প্রবন্ধে বলা হয়, আগের আইনমন্ত্রীরা শেখ হাসিনাকে হবস পড়িয়েছিলেন। তাঁকে জন অস্টিনের ‘কমান্ড থিওরি’ ভালো করে পড়িয়েছিলেন। ফলে তাঁকে শেখানো হয়েছে শাসকের আদেশই আইন। অথচ অস্টিনের জায়গা এইচ এল হার্ট দখল করার পর ইউরোপের আইনের জগতে সন্নিবেশিত হয়, আদেশ নয়, বিধিই আইন। কিন্তু হাসিনাকে সেই আইন পড়ানো হয়নি। হাসিনাসহ তাঁর আইনমন্ত্রী ‘হায়ার ল’ অমান্য করেছিলেন। তাঁরা আজ কোথায়?

তিনি জন লকের একটি মতবাদকে উদ্ধৃত করে বলেন, শাসক যখন নির্যাতক হয়ে যায়, তখন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাকে সরিয়ে দেওয়া মানুষের স্রষ্টা প্রদত্ত অধিকার।

আইনমন্ত্রীর বক্তব্যে যে তিনজন রাষ্ট্রচিন্তাবিদের ‘সামাজিক চুক্তি মতবাদ’ নিয়ে আলোচনা এসেছে, তাঁদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় নিচে দেওয়া হলো:

ইংরেজ দার্শনিক থমাস হবস (১৫৮৮-১৬৭৯) আধুনিক রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘লেভিয়াথান’ (১৬৫১)। তিনি মনে করতেন, মানুষ জন্মগতভাবে স্বার্থপর ও বিশৃঙ্খল। তাই সমাজকে শান্ত রাখতে একজন ‘নিরঙ্কুশ’ বা সর্বশক্তিমান শাসকের প্রয়োজন। তাঁর মতে, জনগণ নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে শাসকের কাছে সব ক্ষমতা সঁপে দেয় এবং শাসকের আদেশ অমান্য করার অধিকার তাদের থাকে না।

ইংল্যান্ডের চিকিৎসক এবং দার্শনিক জন লককে (১৬৩২-১৭০৪) বলা হয় ‘উদারতাবাদের জনক’। তাঁর প্রধান কাজ ‘টু ট্রিটিজেস অব গভর্নমেন্ট’ (১৬৮৯)। হবসের উল্টো পথে হেঁটে লক বলেন, মানুষের জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তির অধিকার হলো প্রাকৃতিক বা জন্মগত অধিকার। সরকার গঠিত হয় জনগণের সম্মতিতে এই অধিকারগুলো রক্ষার জন্য। যদি কোনো শাসক এই অধিকার রক্ষা করতে ব্যর্থ হন বা অত্যাচারী হন, তবে সেই সরকারকে উৎখাত করার অধিকার জনগণের রয়েছে।

জেনেভায় জন্ম নেওয়া জঁ-জাক রুশো (১৭১২-১৭৭৮) একজন ফরাসি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তিনি ‘দ্য সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট’ (১৭৬২) গ্রন্থের জন্য বিশ্বখ্যাত। তিনি বলেছিলেন, ‘মানুষ স্বাধীন হয়ে জন্মায়, কিন্তু সর্বত্র সে শৃঙ্খলিত।’ রুশোর মতে, রাষ্ট্র পরিচালিত হওয়া উচিত ‘সাধারণ ইচ্ছা’ বা জনগণের সামষ্টিক মতের ভিত্তিতে। তাঁর এই দর্শনেই আধুনিক গণতন্ত্র ও ফরাসি বিপ্লবের বীজ নিহিত ছিল।’

সংসদে বিএনপি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ অক্ষরে অক্ষরে প্রতিপালিত হবে। আমাদের  আইনমন্ত্রীও একই কথা বলেছেন। কিন্তু আমার কথা হচ্ছে সংবিধানে ‘৭খ’ বহাল থাকা অবস্থায় কি করে মূল (জুলাই জাতীয় সনদে থাকা) জায়গাগুলোতে পরিবর্তন কিংবা সংশোধন আনবেন? শেখ হাসিনা কিন্তু সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে দিয়ে কুটিল বুদ্ধিতে খুবই জটিল ভাবে সংবিধান সংশোধন করিয়েছে। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ দিয়েও সংবিধানের মূল বিষয়গুলো সংশোধনের পথ বন্ধ করে রেখেছে। অবশ্য বর্তমান সংসদের কাছে গণভোটের ফলাফল আছে। এই ফলাফল জনগণের অভিমতের প্রকাশ। এটাকে মূল্যায়ন করেই একমাত্র সংবিধানের ভিতরে প্রবেশ করার পথ খুলতে হবে। আর সংবিধান এভাবে রেখেই যদি বর্তমান সরকার এগোতে চায়, তা হলে শেখ হাসিনার মত যখন প্রয়োজন, সংবিধানের যে অংশ পক্ষে পাওয়া যাবে, সে অংশ মানব। আর যে অংশ পক্ষে পাওয়া যাবেনা সেটা লংঘন করব!

উপরের শেষ দুই বাক্যের মতোই কি দেশটা চলবে? যদি এভাবে চলে; তাহলে আগামীতেও আমরা দেখব রাষ্ট্র ক্ষমতায় ফ্যাসিস্ট বসে আছে। জনতা কি তখন চুপ করে থাকবে? নব্বই এবং চব্বিশ বুঝিয়ে দিয়েছে একটা সময় পর্যন্ত আমজনতাকে ঠেকিয়ে রাখা যায়। কিন্তু কোনো না কোনো সময় এই জনতা বিস্ফোরণে গর্জে উঠে সব তোলপাড় করে দেয়। আমরা কি একটা স্থিতিশীল রাষ্ট্রের পথে হাঁটবো না? এই দেশের মানুষ কি কেবল নব্বই কিংবা চব্বিশ ঘটানো নিয়েই ব্যস্ত থাকবে?

আমি এই লেখা যখন লিখছি আমার মাথায় গুনগুন করছে লালনের সেই বিখ্যাত একটি চরণ, ‘সময় গেলে সাধন হবে না’। বিষয় সংবিধান; কিন্তু মাথায় কেনো ‘সময় গেলে সাধন হবে না’ ঘুরছে বুঝতে পারছি না! আমার মনে হচ্ছে; আমরা কেবল সময়কে যেতেই দিচ্ছি, যেতেই দিচ্ছি! আমরা কি সময় যেতেই দেবো? এভাবে যেতেই দেবো? সময় যেতে যেতে আমরা কোন সীমানায় গিয়ে পৌঁছাবো? তাই বলি সকলের শুভ বুদ্ধির উদয় হোক।  

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক। সাবেক সভাপতি: মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব। সাংবাদিকতা বিষয়ক প্রকাশিত গ্রন্থ: ‘গণমাধ্যম সাংবাদিকতা দেশ দশের আমার কথা’।


আবদুল হামিদ মাহবুব: মৌলভীবাজার,  ই-মেইল:  [email protected]

মতামত এর আরও খবর

img

ডলারের আধিপত্য ধ্বংস করতে চীনের ‘ট্রেজারি–কৌশল’

প্রকাশিত :  ১৩:৩৪, ০১ জুন ২০২৬

জাসিম আল-আজ্জাউই

 চীন যখন ২০২৬ সালের বসন্তে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সিকিউরিটিজে নিজেদের বিনিয়োগ কমাতে শুরু করল, তখন ওয়াশিংটনের মূলধারার অনেক বিশ্লেষক স্বভাবগতভাবেই একে ‘স্বাভাবিক’ বা ‘রুটিন’ ঘটনা বলে আখ্যা দেন। কিন্তু তাঁদের তা করা উচিত ছিল না। যা ঘটছে, তা আসলে এক দশকব্যাপী কৌশলের চূড়ান্ত পরিণতি; একটি পরিকল্পনা, যা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে গড়ে তোলা হয়েছে, যাতে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার সর্বোচ্চ মুহূর্তে চীন চাইলে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ গ্রহণ ব্যয়কে কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।

পরিসংখ্যানগুলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ২০১৩ সালে চীনের হাতে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সিকিউরিটিজের পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তা নেমে আসে ৬৯৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে এবং পরের মাসে আরও কমে দাঁড়ায় ৬৫২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে।

শুধু ২০২৬ সালের মার্চ মাসেই বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মোট মার্কিন ট্রেজারি ধারণ ১৩৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার কমে যায়। একই সময়ে শীর্ষ ১০ বিদেশি ধারকের মধ্যে জাপান, চীন, বেলজিয়াম, কানাডা, ফ্রান্সসহ সাতটি দেশ একযোগে তাদের ঝুঁকি বা এক্সপোজার কমিয়ে আনে।

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ এল-এরিয়ান এ পরিবর্তনকে সরাসরি একটি কাঠামোগত রূপান্তর হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বাজারে চীনের অংশীদারত্ব এখন মাত্র ৭ শতাংশে নেমে এসেছে, যা ‘১৫ বছর আগে অর্জিত ২৮ শতাংশের সর্বোচ্চ অবস্থানের এক-চতুর্থাংশ মাত্র।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ধারাবাহিকভাবে নতুন ঋণপত্র ইস্যুর পরিপ্রেক্ষিতে এই পতন আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক কাঠামো মূলত ধারাবাহিকভাবে আগ্রহী ঋণদাতাদের ওপর নির্ভরশীল। ওয়াশিংটন সামরিক ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, ফেডারেল কর্মচারীদের বেতন এবং বৈদেশিক প্রতিশ্রুতিগুলোর অর্থায়নের জন্য নিয়মিত বাজেটঘাটতি পরিচালনা করে এবং সেই ঘাটতি পূরণ করে নতুন ঋণ ইস্যুর মাধ্যমে।

এমন পরিস্থিতিতে চীনের মতো বড় ঋণদাতা যখন পিছু হটতে শুরু করে, তখন এর গাণিতিক প্রভাব অত্যন্ত কঠোর হয়। এর ফলে ট্রেজারির সুদের হার (ইয়িল্ড) বাড়ে, পুরোনো ঋণ নবায়নের ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং বিদেশি চাহিদা কমে যাওয়ায় ডলারের ওপরও চাপ সৃষ্টি হয়।

    প্রকৃত প্রশ্নটি আসলে এই নয় যে মার্কিন ডলার রাতারাতি তার বৈশ্বিক আধিপত্য হারাবে কি না। তা হবে না। আসল প্রশ্ন হলো, চীনের পদক্ষেপগুলো কি অন্য দেশগুলোকে একই সময়ে ডলারভিত্তিক ব্যবস্থার বাইরে সরে যেতে উৎসাহিত করবে?

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে চীন যখন নিজেদের ব্যাংকগুলোকে ট্রেজারি বিনিয়োগ কমানোর পরামর্শ দেয়, তখন অর্থনীতিবিদ পিটার শিফ বিষয়টি নিয়ে তাঁর স্বভাবসুলভ সরাসরি মন্তব্য করেন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের সাবেক কর্মকর্তা এবং বর্তমানে কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের গবেষক ব্র্যাড সেটসারের মতে, যদি চীন তাদের পুরো ট্রেজারি পোর্টফোলিও বিক্রি করে দেয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি সুদের হার প্রায় ৩০ বেসিস পয়েন্ট পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই হিসাব কেবল সরাসরি বাজারগত প্রভাবকে বিবেচনায় নেয়; অন্য বৈশ্বিক ঋণদাতাদের মধ্যে সম্ভাব্য আতঙ্ক বা চেইন-রি–অ্যাকশনের প্রভাব এতে ধরা হয়নি।

বহু বছর ধরে চীন নীরবে একটি বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তুলছে। তাদের লক্ষ্য হলো, যদি কখনো তারা মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতে বা তা থেকে সরে আসতে চায়, তাহলে যেন নিজেদের অর্থনীতি কোনো বড় ধাক্কা না খায়। এটিকে এমনভাবে ভাবা যায় যে চীন একটি সম্পূর্ণ নতুন আর্থিক ‘এলাকা’ গড়ে তুলছে, যাতে ভবিষ্যতে আর যুক্তরাষ্ট্রের ‘বাড়িতে’ বসবাস করতে না হয়। তারা এটি যেভাবে করছে:

বৈশ্বিক অবকাঠামো তৈরির ‘মহাযাত্রা’: চীন বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) নামে একটি বিশাল প্রকল্প শুরু করেছে, যা ১৪০টির বেশি দেশকে অন্তর্ভুক্ত করে। সারা বিশ্বে সড়ক, বন্দর, সেতু ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণে তারা প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। উদ্দেশ্য হলো, এসব দেশ যেন যুক্তরাষ্ট্রের ডলার ব্যবহার না করেও সরাসরি চীনের সঙ্গে বাণিজ্য করতে পারে।

নিজস্ব আন্তর্জাতিক অর্থপ্রদানের ব্যবস্থা: চীন সীমান্তের বাইরে লেনদেনের জন্য সিআইপিএস নামে নিজস্ব অর্থ প্রদানের নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। ২০২৪ সালে এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ২৪ দশমিক ৪৭ ট্রিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ চীনা মুদ্রা ইউয়ানে লেনদেন সম্পন্ন হয়, যা আগের বছরের তুলনায় ৪২ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। এর পাশাপাশি চীন বিশ্বের ৪০টির বেশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে বিশেষ মুদ্রা বিনিময় (কারেন্সি সোয়াপ) চুক্তি করেছে।

বন্ধুদের সঙ্গে ডলারবিহীন বাণিজ্য: এটি আর কেবল তাত্ত্বিক পরিকল্পনা নয়; বাস্তবেও এর প্রয়োগ শুরু হয়ে গেছে। বর্তমানে চীন ও রাশিয়ার মধ্যকার প্রায় ৯৫ শতাংশ বাণিজ্য তাদের নিজস্ব স্থানীয় মুদ্রায় সম্পন্ন হয়। একইভাবে ২০২৪ সালে ব্রাজিল ও চীনের মধ্যকার প্রায় অর্ধেক বাণিজ্য ইউয়ানে পরিচালিত হয়েছে।

বিকল্প অর্থনৈতিক জোট গঠন: চীন ব্রিকস জোট সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এই জোটে এখন সৌদি আরব, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসর ও ইথিওপিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ তেলসমৃদ্ধ ও অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী দেশ যুক্ত হয়েছে। এই দেশগুলোকে একত্র করার মাধ্যমে চীন একটি সমান্তরাল বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার কাঠামোগত ভিত্তি নির্মাণ করছে; অর্থাৎ যদি কখনো মার্কিন নেতৃত্বাধীন আর্থিক ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে কিংবা চীন ইচ্ছাকৃতভাবে সেই ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্ক সীমিত করার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে তাদের কাছে ইতোমধ্যেই একটি বিকল্প বৈশ্বিক অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক প্রস্তুত থাকবে, যা স্বাধীনভাবে পরিচালিত হতে পারবে।

এসব কোনো আকস্মিক বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলো একটি ধারাবাহিক কৌশলগত পরিকল্পনার অংশ; প্রথমে বিকল্প পথ বা ‘প্রস্থানদ্বার’ তৈরি করা, তারপর ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং শেষ পর্যন্ত এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করা, যেখানে মার্কিন ট্রেজারি বাজারে একটি বড় পদক্ষেপ নেওয়া যাবে—যার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বার্তা হবে অত্যন্ত শক্তিশালী। কিন্তু এর ফলে চীনের নিজের অর্থনীতির জন্য বিপর্যয়কর ক্ষতি হবে না।

এই কৌশলের অংশ হিসেবেই পিপল’স ব্যাংক অব চায়না তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ক্রমশ সোনার দিকে সরিয়ে নিয়েছে। টানা ১৫ মাস ধরে সোনা কেনার পর চীনের স্বর্ণ মজুত রেকর্ড ২ হাজার ৩০৮ টনে পৌঁছেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই নীতির উদ্দেশ্য, স্পষ্টভাবে চীনের অর্থনীতিকে ‘নিষেধাজ্ঞা-প্রতিরোধী’ (স্যাংশন প্রুফ) করে তোলা। ২০২২ সালে রাশিয়ার সম্পদ জব্দ করার অভিজ্ঞতার সরাসরি প্রতিক্রিয়া হিসেবেই এই কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে।

এখানে ঝুঁকি শুধু অর্থের প্রবাহে নয়; বরং চীনের এই পদক্ষেপ অন্য দেশগুলোকে একই পথ অনুসরণ করার মনস্তাত্ত্বিক অনুমতি দিতে পারে। জাপান উদ্বেগের সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে; উপসাগরীয় তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো নীরবে তাদের সম্পদ বৈচিত্র্যময় করছে; আর দীর্ঘদিন ধরে ডলারকেন্দ্রিক আর্থিক ব্যবস্থার বিষয়ে সতর্ক থাকা তথাকথিত ‘গ্লোবাল সাউথ’ বা বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলো ক্রমেই ওয়াশিংটনের মুদ্রানীতির আধিপত্য থেকে প্রাতিষ্ঠানিক দূরত্ব খুঁজছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ)  তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে বৈশ্বিক বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে মার্কিন ডলারের অংশীদারত্ব নেমে এসেছে ৫৭ দশমিক ৮ শতাংশে, যেখানে ২০০১ সালে তা ছিল ৭২ শতাংশ। একই সময়ে বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তিন বছর ধরে প্রতিবছর এক হাজার টনের বেশি স্বর্ণ ক্রয় করেছে।

প্রকৃত প্রশ্নটি আসলে এই নয় যে মার্কিন ডলার রাতারাতি তার বৈশ্বিক আধিপত্য হারাবে কি না। তা হবে না। আসল প্রশ্ন হলো, চীনের পদক্ষেপগুলো কি অন্য দেশগুলোকে একই সময়ে ডলারভিত্তিক ব্যবস্থার বাইরে সরে যেতে উৎসাহিত করবে?

এই মুহূর্তে অনেক দেশ দ্বিধাগ্রস্ত। কিন্তু তারা যদি বুঝতে পারে যে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানো নিরাপদ, তাহলে সেটিই একটি ভবিষ্যদ্বাণীতে পরিণত হতে পারে। প্রথম কয়েকটি ‘ডমিনো’ যখন পড়ে যাবে, তখন বাকিগুলোও একে একে অনুসরণ করবে।

ওয়াশিংটনের পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ বাস্তবে রাজনৈতিক বক্তব্যে যতটা বড় করে দেখানো হয়, ততটা নয়। চীনের বিরুদ্ধে ব্যাপক আর্থিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে তার অভিঘাত যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাপর্যায়ে মূল্য, করপোরেট মুনাফা এবং সরবরাহব্যবস্থার ওপর সরাসরি পড়বে।

অ্যাপল, নাইকি ও টেসলার মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো গভীরভাবে চীনা উৎপাদন নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত। এ ছাড়া ইউএস–চায়না ইকোনিমক অ্যান্ড সিকিউরিটি রিভিউ কমিশন ইতিমধ্যেই উল্লেখ করেছে যে বেইজিংয়ের হাতে এসব পারস্পরিক নির্ভরশীলতাকে কৌশলগত অস্ত্রে পরিণত করার সক্ষমতা ক্রমশ বাড়ছে।

চীনকে আবার ট্রেজারি কেনায় ফিরিয়ে আনা বা বিক্রি বন্ধ করতে বাধ্য করার জন্য হয় এমন বাজার-প্রণোদনা প্রয়োজন, যা ওয়াশিংটন বর্তমানে দিতে পারছে না; অথবা এমন চাপ প্রয়োগের ব্যবস্থা প্রয়োজন, যার সবচেয়ে বড় মূল্য পরিশোধ করতে হবে মার্কিন ভোক্তাদেরই।

২০২৬ সালের বসন্তে সংঘটিত ব্যাপক বাজারপতন হয়তো একক কোনো বিস্ফোরণ নয়, যা মার্কিন ডলারকে ধ্বংস করে দেবে। কিন্তু এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় সতর্কসংকেত। বহু বছর ধরেই যাঁরা মনোযোগ দিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছেন, তাঁরা এই প্রবণতা আসতে দেখেছেন।

আগামী দিনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনিশ্চয়তা চীনের পরবর্তী পদক্ষেপ নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, জাপান, সৌদি আরব এবং গ্লোবাল সাউথের অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশ কি এই মুহূর্তকে নিজেদের অবস্থান পুনর্বিন্যাসের উপযুক্ত সময় হিসেবে দেখবে? যদি তারা তা–ই করে, তাহলে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ গতিপথ দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে।

    জাসিম আল-আজ্জাউই এমবিসি গ্রুপ, আবুধাবি টিভি এবং আল–জাজিরা ইংলিশে সংবাদ উপস্থাপক, অনুষ্ঠান সঞ্চালক এবং নির্বাহী প্রযোজক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।


(মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া)

মতামত এর আরও খবর