img

প্রধানমন্ত্রীর সামনে এমপি নাসের রহমানের চার দাবি

প্রকাশিত :  ১০:১৮, ১৮ জুন ২০২৬

মেডিকেল কলেজ, বিমানবন্দর, বিশ্ববিদ্যালয় ও আন্তনগর ট্রেন

প্রধানমন্ত্রীর সামনে এমপি নাসের রহমানের চার দাবি
সংগ্রাম দত্ত: মৌলভীবাজার জেলার দীর্ঘদিনের চারটি জনদাবি—মেডিকেল কলেজ স্থাপন, শমশেরনগর বিমানবন্দর চালু, সরকারি কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর এবং ঢাকা-শ্রীমঙ্গল রুটে একটি আন্তনগর ট্রেন চালুর প্রস্তাব—প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে সরাসরি তুলে ধরেছেন মৌলভীবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য এম. নাসের রহমান। এসব দাবিকে ঘিরে জেলা জুড়ে চলছে আলোচনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নানা বিশ্লেষণে উঠে আসছে উন্নয়ন ও জনস্বার্থের বিষয়গুলো।

বুধবার (১৭ জুন) মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চবিদ্যালয় মাঠে তৃতীয় পর্যায়ের ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে এমপি নাসের রহমান জেলার মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতেই তিনি চারটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন উদ্যোগ বাস্তবায়নের অনুরোধ জানান।

বর্তমান হাসপাতালেই মেডিকেল কলেজের প্রস্তাব

বক্তব্যে নাসের রহমান বলেন, জেলার সবচেয়ে বড় দাবি একটি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা। নতুন জমি অধিগ্রহণ ছাড়াই বর্তমান মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালের অবকাঠামোর মধ্যেই এটি গড়ে তোলা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।

তিনি জানান, এ বিষয়ে একটি পরিকল্পনা তৈরি করে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর সবুজ সংকেত মিললে আগামী অর্থবছরেই কাজ শুরু করা সম্ভব হবে।

শমশেরনগর বিমানবন্দর চালুর দাবি

প্রবাসী অধ্যুষিত মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি হিসেবে শমশেরনগর বিমানবন্দর পুনরায় চালুর বিষয়টি তুলে ধরেন তিনি। তাঁর মতে, বর্তমানে সিলেট বা ঢাকায় নেমে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে জেলায় পৌঁছাতে হয়। বিমানবন্দরটি চালু হলে প্রবাসী ও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমবে।
নাসের রহমান বলেন, বিদ্যমান রানওয়ে সংস্কার এবং একটি ছোট টার্মিনাল ভবন নির্মাণ করলেই বিমানবন্দরটি চালু করা সম্ভব। এতে তুলনামূলক কম ব্যয় হবে।

সরকারি কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করার প্রস্তাব

মৌলভীবাজার সরকারি কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের দাবিও তুলে ধরেন সংসদ সদস্য। তাঁর ভাষ্য, কলেজটির নিজস্ব জায়গা ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা রয়েছে। ফলে নতুন করে জমি অধিগ্রহণ ছাড়াই এটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করা সম্ভব।

পর্যটননগরীর জন্য ঢাকা-শ্রীমঙ্গল আন্তনগর ট্রেনের দাবি

প্রধানমন্ত্রীর সামনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি উত্থাপন করেন এমপি নাসের রহমান। দেশের সাবেক সফল অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের সন্তান ও জেলার স্থানীয় সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি ঢাকা-শ্রীমঙ্গল রুটে একটি আন্তনগর ট্রেন চালুর প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, দেশের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র শ্রীমঙ্গলে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক পর্যটক আসেন। কিন্তু ঢাকা থেকে সরাসরি শ্রীমঙ্গলের জন্য ট্রেনের টিকিট পাওয়া কঠিন। একইভাবে শ্রীমঙ্গল ও মৌলভীবাজারের বাসিন্দাদেরও ঢাকাগামী ট্রেনের টিকিট সংগ্রহে ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়।

চা-বাগান, হাওর, পাহাড়, বনাঞ্চল ও নানা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ মৌলভীবাজারকে দেশের অন্যতম পর্যটন জেলা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, শ্রীমঙ্গল পর্যটনের প্রাণকেন্দ্র। জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও শ্রীমঙ্গলে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য পর্যটন স্পট ঘিরে সারা বছর দেশ-বিদেশের দর্শনার্থীরা আসেন। সহজ ও নির্ভরযোগ্য রেল যোগাযোগ নিশ্চিত হলে পর্যটন শিল্পের বিকাশে নতুন গতি আসবে।

আলোচনা জনস্বার্থের দাবিগুলো নিয়েই

প্রধানমন্ত্রীর সামনে জেলার উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট চারটি দাবি উপস্থাপনের পর থেকেই মৌলভীবাজারে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এসব বিষয় নিয়ে মতামত ও বিশ্লেষণ করছেন অনেকে। স্থানীয়দের একটি অংশ মনে করছেন, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, উচ্চশিক্ষা ও পর্যটন—এই চারটি ক্ষেত্রের দাবিই জেলার দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার প্রতিফলন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দাবিগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন বলে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। এখন জেলার মানুষের প্রত্যাশা, মৌলভীবাজারের উন্নয়ন ও জনস্বার্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

স্বাস্থ্যসেবায় মেডিকেল কলেজ, যোগাযোগে বিমানবন্দর ও আন্তনগর ট্রেন এবং উচ্চশিক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মতো উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে মৌলভীবাজারের আর্থসামাজিক উন্নয়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণের আশায় এখন অপেক্ষা জেলার মানুষের।

সিলেটের খবর এর আরও খবর

img

৭০ বছরের অপেক্ষা: একটি সেতুর স্বপ্নে বদলে যেতে পারে কমলগঞ্জ–রাজনগরের হাজারো মানুষের জীবন

প্রকাশিত :  ১১:১০, ১৮ জুন ২০২৬

সংগ্রাম দত্ত: মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ ও রাজনগর উপজেলার সীমান্তবর্তী জনপদের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি—লাঘাটা নদীর ওপর একটি স্থায়ী সেতু। স্বাধীনতারও আগে থেকে নদীটি দুই উপজেলার মানুষের যাতায়াত ও যোগাযোগের পথে বড় বাধা হয়ে আছে। প্রায় ৭০ বছর ধরে স্থায়ী সেতুর অভাবে এলাকার কয়েক হাজার মানুষকে এখনো একটি জরাজীর্ণ বাঁশের সাঁকোর ওপর নির্ভর করে চলাচল করতে হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থার যুগে দাঁড়িয়ে এখনো তারা মৌলিক অবকাঠামোগত সুবিধা থেকে বঞ্চিত। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সামাজিক যোগাযোগ—সব ক্ষেত্রেই তাদের নানামুখী দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

একটি সাঁকো, হাজারো মানুষের ভরসা

লাঘাটা নদীর পশ্চিম তীরে কমলগঞ্জ উপজেলার রকিব বাজার-গোপিনগর, উত্তর শ্রীরামপুর, রাধাগোবিন্দপুর, বৃন্দাবনপুর, কান্দিগাঁও, মাঝগাঁও, নোয়াগাঁও, নন্দগ্রাম, কোনাগাঁও, বৈরাগীচক ও রাজদিঘিরপার এলাকার মানুষ বসবাস করেন। অপরদিকে পূর্ব তীরে রয়েছে রাজনগর উপজেলার মৌলভীচক, নোয়াগাঁও, মিলের বাজার, চানহারাবেলী, পালপুর, আপসলগতি, মরিচা ও বাঘুয়া গ্রামের জনপদ।

এই দুই পাড়ের মানুষের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম একটি বাঁশের সাঁকো। বর্ষা মৌসুমে সাঁকোটি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতিদিন শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এটি ব্যবহার করেন।

স্বাস্থ্যসেবায় সময়ের সঙ্গে যুদ্ধ

এলাকাবাসীর মতে, সেতু না থাকায় জরুরি স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হতে হয় রোগীদের। বিশেষ করে মুমূর্ষু রোগী ও গর্ভবতী নারীদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

বর্তমানে বিকল্প পথ ব্যবহার করে জেলা সদর হাসপাতালে পৌঁছাতে প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লাগে। স্থানীয়দের ধারণা, লাঘাটা নদীর ওপর ২৫ থেকে ৩০ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি সেতু নির্মিত হলে এই সময় কমে প্রায় ৩০ মিনিটে নেমে আসবে। এতে জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি অনেক মূল্যবান জীবন রক্ষা করা সম্ভব হবে।

শিক্ষার্থীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ পথচলা

নদীর দুই পাড়ে রয়েছে একাধিক স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা। প্রতিদিন শত শত শিক্ষার্থী বাঁশের সাঁকো পার হয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করে। বর্ষাকালে সাঁকো পিচ্ছিল ও নড়বড়ে হয়ে পড়ায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেড়ে যায়।

অভিভাবকদের অভিযোগ, নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থার অভাবে অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে পারে না। ফলে শিক্ষার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হচ্ছে।

কৃষি ও বাণিজ্যের সম্ভাবনা বাধাগ্রস্ত

কৃষিনির্ভর এই অঞ্চলের অর্থনীতি মূলত ফসল উৎপাদন ও স্থানীয় বাজারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। কিন্তু সেতু না থাকায় কৃষকরা সহজে তাদের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করতে পারেন না। এতে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং ন্যায্য মূল্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

স্থানীয়দের মতে, সেতু নির্মিত হলে রকিব বাজার, রাজদিঘিরপার বাজার ও মিলের বাজারসহ আশপাশের বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলো নতুন গতি পাবে। একই সঙ্গে কৃষিপণ্য পরিবহন সহজ হবে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

দীর্ঘদিনের দাবিতে এলাকাবাসী

এলাকাবাসীর পক্ষে মো. রকিব মিয়া জেলা প্রশাসকের কাছে একটি আবেদনপত্র জমা দিয়েছেন। আবেদনে লাঘাটা নদীর ওপর ২৫ থেকে ৩০ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেবে। তাদের বিশ্বাস, একটি সেতু শুধু দুই পাড়কে সংযুক্ত করবে না; বরং দীর্ঘদিনের অবহেলায় পিছিয়ে থাকা একটি বিস্তীর্ণ জনপদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানবিক উন্নয়নের নতুন দ্বার উন্মোচন করবে।

লাঘাটা নদীর ওপর একটি স্থায়ী সেতু এখন শুধু অবকাঠামো নির্মাণের দাবি নয়; এটি হাজারো মানুষের নিরাপদ জীবন, উন্নত যোগাযোগ এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের স্বপ্নের প্রতীক হয়ে উঠেছে।


সিলেটের খবর এর আরও খবর