img

স্টারমারকে ঘিরে বাড়ছে জল্পনা, ব্রিটেন কি ফের রাজনৈতিক পালাবদলের দ্বারপ্রান্তে?

প্রকাশিত :  ১৭:৩৮, ২৪ জুন ২০২৬

স্টারমারকে ঘিরে বাড়ছে জল্পনা, ব্রিটেন কি ফের রাজনৈতিক পালাবদলের দ্বারপ্রান্তে?
সংগ্রাম দত্ত
এক সময় বিশ্বের কাছে সংসদীয় গণতন্ত্রের আদর্শ ছিল ব্রিটেন। ওয়েস্টমিনস্টারের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, দীর্ঘমেয়াদি নীতি এবং স্থিতিশীল নেতৃত্বকে অনুসরণ করেছে অসংখ্য দেশ। কিন্তু গত এক দশকের ব্রিটেন যেন সেই পরিচিত ছবির সম্পূর্ণ বিপরীত এক বাস্তবতার মুখোমুখি।

প্রধানমন্ত্রী বদল এখন আর বিরল ঘটনা নয়, বরং প্রায় নিয়মিত রাজনৈতিক অধ্যায়। ডেভিড ক্যামেরন থেকে থেরেসা মে, বরিস জনসন, লিজ ট্রাস, ঋষি সুনাক হয়ে আজ কিয়ার স্টারমার—নেতৃত্বের এই দ্রুত পালাবদল ব্রিটিশ রাজনীতির গভীরে জমে থাকা অস্থিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে আবারও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে—কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্ব কি চাপের মুখে? লেবার পার্টি-র অন্দরমহলে কি নতুন নেতৃত্বের আলোচনা শুরু হয়েছে? যদিও দলীয় নেতৃত্ব এ ধরনের জল্পনাকে গুরুত্ব দিতে নারাজ, তবুও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ মনে করছেন, অর্থনৈতিক বাস্তবতা যদি দ্রুত না বদলায়, তাহলে স্টারমারের জন্য পথ সহজ হবে না।

আসলে ব্রিটেনের বর্তমান সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে অর্থনীতি। ব্রেক্সিটের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, কোভিড-পরবর্তী পুনরুদ্ধারের ধাক্কা, ইউক্রেন যুদ্ধজনিত জ্বালানি সংকট এবং দীর্ঘ সময়ের উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনে বড় চাপ তৈরি করেছে। বাড়িভাড়া, বিদ্যুৎ-গ্যাসের বিল, খাদ্যদ্রব্যের দাম থেকে শুরু করে দৈনন্দিন যাতায়াতের খরচ—সব ক্ষেত্রেই ব্যয় বেড়েছে। ফলে ‘জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট’ এখন শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক সংকটেও পরিণত হয়েছে।

অর্থনীতির পাশাপাশি অভিবাসন প্রশ্নও ব্রিটিশ রাজনীতির অন্যতম বিস্ফোরক ইস্যু হয়ে উঠেছে। ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে প্রবেশ, আশ্রয়প্রার্থীদের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে। এই পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মেরুকরণও তীব্র হচ্ছে।

এই আবহেই নতুন করে আলোচনায় উঠে আসছে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের প্রভাবশালী নেতা অ্যান্ডি বার্নহামের নাম। যদিও তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে নেতৃত্বের দৌড়ে নেই, তবুও লেবার পার্টি-র ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনায় তাঁর উপস্থিতি ক্রমশ দৃশ্যমান। স্বাস্থ্যসেবা, আঞ্চলিক উন্নয়ন এবং সামাজিক ন্যায়বিচার নিয়ে তাঁর অবস্থান তাঁকে দলের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুখে পরিণত করেছে।

অন্যদিকে, ব্রিটিশ রাজনীতির প্রচলিত সমীকরণকে সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন নাইজেল ফারাজ। তাঁর নেতৃত্বে রিফর্ম ইউকে অভিবাসন, জাতীয় পরিচয় এবং প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের প্রতি অসন্তোষকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে। এক সময় যে ক্ষোভ মূলত কনজারভেটিভ পার্টি-র ভোটব্যাঙ্কে সীমাবদ্ধ ছিল, তা এখন বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিসরে ছড়িয়ে পড়ছে।

ফলে আজ লেবার পার্টি এবং কনজারভেটিভ পার্টি—দুই প্রধান দলই এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। ভোটারদের একটি অংশ গ্রীন পার্টি, লিবারেল ডেমোক্র্যাটস কিংবা রিফর্ম ইউকে-এর মতো বিকল্প শক্তির দিকে ঝুঁকছে। ঐতিহ্যগত দুই-দলীয় রাজনীতির ভিত্তি আগের তুলনায় অনেকটাই নড়বড়ে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

তবে এই মুহূর্তে একটি বিষয় স্পষ্ট—ব্রিটেনের সংকট কেবল কোনও এক নেতা বা এক দলের সংকট নয়। এটি অর্থনৈতিক স্থবিরতা, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, অভিবাসন বিতর্ক, রাজনৈতিক বিভাজন এবং প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার প্রতি ক্রমবর্ধমান অনাস্থার সম্মিলিত ফল।

সেই কারণেই কিয়ার স্টারমারের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্ককে শুধু ব্যক্তিগত নেতৃত্বের প্রশ্ন হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে একটি বড় সত্য—ব্রিটেন আজ নতুন রাজনৈতিক পরিচয় খুঁজছে। আর সেই সন্ধানের পথ কোথায় গিয়ে শেষ হবে, তার উত্তর এখনও ওয়েস্টমিনস্টারের করিডরেও স্পষ্ট নয়।


যুক্তরাজ্য এর আরও খবর

ইংলিশ চ্যানেলে নৌকা ডুবে শিশুসহ নিহত ৫ | JANOMOT | জনমত

img

পদত্যাগ করলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী

প্রকাশিত :  ০৯:৩০, ২২ জুন ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৫:০৭, ২২ জুন ২০২৬

ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার পদত্যাগ করেছেন। আজ সোমবার (২২ জুন) তিনি পদত্যাগ করেন। এর ফলে গত এক দশকে দেশটি সপ্তম প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্ব পেতে যাচ্ছে। খবর দ্য ডনের।

পদত্যাগের পর লন্ডনের ১০ ডাউনিং স্ট্রিট-এর সামনে সাংবাদিকদের স্টারমার জানান,  তিনি দলের সিদ্ধান্তকে ‘সৌজন্যের সঙ্গে’ মেনে নেবেন এবং তার উত্তরসূরিকে পূর্ণ ও নিঃশর্ত সমর্থন দেবেন।

বিপুল ভোটে নির্বাচনে জয়ের মাধ্যমে ব্রিটেনের অস্থির রাজনীতির অবসান ঘটানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়ার দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে স্টারমারের এই পদত্যাগের ঘটনা ঘটল।

একটি সূত্র জানিয়েছে, তিনি গত সপ্তাহে নেতৃত্বের লড়াইয়ে অংশ নেবেন নাকি সরে দাঁড়াবেন—তা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করছিলেন।

সূত্রটি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানায়, ‘স্টারমার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিষয়গুলো নিয়ে অনেক ভাবতে পছন্দ করেন।’

স্টারমারের ওপর চাপ কয়েক মাস ধরেই বাড়ছিল। তবে শুক্রবার (১৯ জুন) পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে, যখন অ্যান্ডি বার্নহ্যাম একটি পার্লামেন্টারি উপনির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয়ী হয়ে আবারও ওয়েস্টমিনস্টারে ফেরার সুযোগ পান।

তিনি নাইজেল ফারাজ-এর দল রিফর্ম ইউকে সমর্থিত প্রার্থীকে পরাজিত করেন। দলটি এক বছরেরও বেশি সময় ধরে জাতীয় জনমত জরিপে এগিয়ে রয়েছে।

বার্নহ্যামের এই জয় লেবার পার্টির আইনপ্রণেতাদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। তাদের ধারণা, দক্ষ যোগাযোগ ক্ষমতার জন্য পরিচিত বার্নহ্যাম দলের হারানো জনপ্রিয়তা ফিরিয়ে আনতে পারেন। স্টারমারের জনপ্রিয়তা ইতোমধ্যে ব্রিটেনের যেকোনো বর্তমান বা সাম্প্রতিক নেতার তুলনায় সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে।

তবে নেতৃত্ব পরিবর্তন ঝুঁকিমুক্ত নয়।  বার্নহ্যাম এখন পর্যন্ত জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং দেশের মৌলিক পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথা বললেও পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে তার অবস্থান স্পষ্ট করেননি।

বিশ্লেষকদের মতে, স্টারমারের মতো তিনিও সীমিত সুযোগের মুখোমুখি হতে পারেন। একদিকে অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণে অনাগ্রহী বন্ড বাজারের বিনিয়োগকারীরা, অন্যদিকে দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে অসন্তুষ্ট ভোটাররা—উভয় দিক থেকেই চাপ থাকবে।

বর্তমানে উচ্চ ঋণ, সুদ পরিশোধের ব্যয়, দীর্ঘদিনের ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সরকারি ব্যয় কমানোর চ্যালেঞ্জ এবং প্রতিরক্ষাসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তার কারণে জি-৭ দেশগুলোর মধ্যে ব্রিটেনের ঋণ গ্রহণের খরচ সবচেয়ে বেশি।

বার্নহ্যাম গত বছরের সেপ্টেম্বরে বলেছিলেন, ব্রিটেনকে ‘বন্ড বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার মানসিকতা’ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। যদিও পরে তিনি দাবি করেন, তার বক্তব্য ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মতভেদ দেখা গেছে—বার্নহ্যাম বাজারকে আশ্বস্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখবেন কি না, তা নিয়ে।

যুক্তরাজ্য এর আরও খবর