চাপের মুখে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্টারমার, নিজ দলের এমপিরাই চাচ্ছেন পদত্যাগ
প্রকাশিত :
০৭:০১, ১২ মে ২০২৬ সর্বশেষ আপডেট: ১০:৩০, ১২ মে ২০২৬
ক্রমেই চাপ বাড়ছে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার-এর ওপর। ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির ভেতরেই এখন তার পদত্যাগের দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে। দলটির বহু সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী চাইছেন, স্টারমার যেন তার পদত্যাগের সময়সূচি ঘোষণা করেন।
এই চাপের মধ্যেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদসহ কয়েকজন মন্ত্রী স্টারমারের বিদায়ের সময়সূচি নির্ধারণের আহ্বান জানিয়েছেন। মঙ্গলবার সকালে আনুষ্ঠানিক মন্ত্রিসভা বৈঠকের আগে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে এই বিভাজন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তবে জানা গেছে, মন্ত্রিসভায় শাবানা মাহমুদ এ দাবির পক্ষে সংখ্যালঘু অবস্থানে রয়েছেন।
এদিকে সরকারের ছয়জন মন্ত্রীসভার সহকারীকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তারা কেউ পদত্যাগ করেছেন, আবার কেউ প্রকাশ্যে স্টারমারের সরে যাওয়ার সময়সূচি ঘোষণার আহ্বান জানিয়েছেন।
এ পর্যন্ত লেবার পার্টির বাহাত্তর জন সংসদ সদস্য স্টারমারের পদত্যাগ অথবা নির্দিষ্ট সময়সূচি ঘোষণার দাবি তুলেছেন।
পদত্যাগকারীদের মধ্যে রয়েছেন স্বাস্থ্যবিষয়ক মন্ত্রীর সহকারী জো মরিস। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী জনগণের আস্থা হারিয়েছেন। আরও পদত্যাগ করেছেন উপপ্রধানমন্ত্রীর সহকারী মেলানি ওয়ার্ড, মন্ত্রিপরিষদবিষয়ক মন্ত্রীর সহকারী নওশাবাহ খান এবং পরিবেশবিষয়ক মন্ত্রীর সহকারী টম রাটল্যান্ড।
এর আগে এক ভাষণে স্টারমার বলেন, তিনি পদত্যাগ করবেন না এবং সমালোচকদের ভুল প্রমাণ করবেন। তিনি স্বীকার করেন যে সরকার কিছু ভুল করেছে, তবে বড় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো সঠিক ছিল বলে দাবি করেন।
স্থানীয় নির্বাচনে ভরাডুবির পর থেকেই তার ওপর চাপ বাড়ছে। ইংল্যান্ডজুড়ে লেবার পার্টি প্রায় দেড় হাজার কাউন্সিলর পদ হারিয়েছে। একই সঙ্গে সংস্কারপন্থী দল ও সবুজ দলের উত্থানে দলটির সমর্থন কমেছে।
ওয়েলসেও শত বছরের রাজনৈতিক আধিপত্য হারিয়েছে লেবার পার্টি। স্কটিশ পার্লামেন্ট নির্বাচনে তারা একশ ঊনত্রিশটি আসনের মধ্যে মাত্র সতেরোটি পেয়েছে, যা দলটির ইতিহাসে সবচেয়ে খারাপ ফল।
জো মরিস বলেন, 'ভোটাররা আর বিশ্বাস করেন না যে স্টারমার তাদের প্রত্যাশিত পরিবর্তন আনতে পারবেন।'
পূর্ব ওয়ার্থিং এলাকার সংসদ সদস্য টম রাটল্যান্ড বলেন, প্রধানমন্ত্রী শুধু দলীয় সংসদ সদস্যদের নয়, গোটা দেশের আস্থাও হারিয়েছেন।
নওশাবাহ খান বলেন, 'আমি ব্যর্থতা দেখে চুপ থাকার জন্য রাজনীতিতে আসিনি। এখনই নেতৃত্বে পরিবর্তন দরকার।'
এদিকে সম্ভাব্য নতুন নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা রেনার এবং গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহ্যাম-এর নাম সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে আলোচনায় রয়েছে।
একসময় লেবার পার্টিতে উপেক্ষিত অ্যান্ডি বার্নহাম এখন ব্রিটিশ রাজনীতির কেন্দ্রে
প্রকাশিত :
১৪:৪৬, ২৫ জুন ২০২৬
অ্যান্ডি বার্নহামকে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত দলীয় কাউন্সিলের মূল মঞ্চে বক্তব্য দেওয়া থেকে বারবার বঞ্চিত করা হয়েছিল। গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র হিসেবে এটি ছিল তাঁর পদের প্রতি চরম অসম্মান।
লেবার পার্টির অন্যতম জনপ্রিয় এই রাজনীতিকের প্রতি তখন অনেকেরই সহানুভূতি ছিল। তবে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে থাকা বার্নহামকে এখন প্রমাণ করতে হবে, তিনি সত্যিই মূল মঞ্চের যোগ্য। একই সঙ্গে ক্ষুব্ধ ভোটারদের মন জয় করা এবং অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে ওঠার বড় চ্যালেঞ্জও এখন তাঁর সামনে।
যুক্তরাজ্যে গত এক দশকের মধ্যে সপ্তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিতে চলেছেন নতুন নেতা। আর এই দৌড়ে এগিয়ে আছেন অ্যান্ডি বার্নহাম।
বার্নহামের দাবি, লেবার পার্টির মধ্যে একমাত্র তাঁরই ভোটারদের মন জয় করে রিফর্ম ইউকে পার্টিকে পরাজিত করার দূরদর্শিতা রয়েছে। নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন জনতুষ্টিবাদী ও অভিবাসনবিরোধী রিফর্ম ইউকে পার্টি গত বছরের শুরু থেকেই প্রতিটি জনমত জরিপেই এগিয়ে আছে।
গত সপ্তাহে পার্লামেন্টের মেকারফিল্ড আসনের উপনির্বাচন অ্যান্ডি বার্নহাম নিরঙ্কুশ জয়লাভ করেন। এই জয় লেবার পার্টির অনেক আইনপ্রণেতাকে তাঁর পক্ষে নিয়ে এসেছে। অথচ ওই এলাকায় সাম্প্রতিক স্থানীয় নির্বাচনে রিফর্ম ইউ পার্টি বেশ শক্তিশালী অবস্থানে ছিল। গতকাল সোমবার স্টারমার পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার পর দলের ভেতরে বার্নহামের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে।
লেবার পার্টির পার্লামেন্ট সদস্য অ্যালেক্স সোবেল বলেন, ভোটারদের সামনে লেবার পার্টির ভবিষ্যৎ ভাবনা তুলে ধরার ক্ষেত্রে বার্নহাম নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছেন।
সমর্থকদের প্রশংসা, সমালোচকদের প্রশ্ন
কোভিড-১৯ মহামারির সময়ে নিজ এলাকার স্বার্থ রক্ষায় জোরালো ভূমিকা রেখে ‘কিং অব দ্য নর্থ’ (উত্তরাঞ্চলের রাজা) উপাধি পেয়েছিলেন বার্নহাম। তাঁর সমর্থকেরা মনে করেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় যুক্তরাজ্যের কয়েকটি আঞ্চলিক সাফল্যের নেপথ্যে ছিলেন এই নেতা।
তবে সমালোচকদের চোখে বার্নহাম এমন এক ব্যক্তি, যিনি বারবার নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ও নীতি পরিবর্তন করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, বার্নহাম একজন উচ্চশিক্ষিত পেশাদার রাজনীতিক হওয়া সত্ত্বেও নিজেকে সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেন।
যুক্তরাজ্যের সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং দলীয় নেতৃত্বের লড়াই থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেওয়ায় এখন বার্নহামেরই স্টারমারের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
স্ট্রিটিং বলেছেন, সাম্প্রতিক দিনগুলোয় বার্নহামের সঙ্গে তাঁর লম্বা আলোচনা হয়েছে। এতে রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন ছড়িয়েছে যে পরবর্তী সরকারে বড় কোনো পদের প্রতিশ্রুতি পেয়েই হয়তো স্ট্রিটিং প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। তবে এ গুঞ্জন অস্বীকার করেছেন স্ট্রিটিং।
গতকাল পার্লামেন্টে লেবার পার্টির ১০০ জনের বেশি আইনপ্রণেতার সঙ্গে ক্যামেরার সামনে পোজ দিলেও সেখানে অপেক্ষায় থাকা সাংবাদিকদের সঙ্গে কোনো কথা বলেননি বার্নহাম।
অ্যান্ডি বার্নহাম যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী হলে তাঁর মূল কর্মপরিকল্পনা কী হবে, সে বিষয়ে তিনি এখন পর্যন্ত খুব অল্প আভাস দিয়েছেন।
লন্ডনকেন্দ্রিক রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে ২০১৭ সালে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়রের দায়িত্ব নিয়েছিলেন বার্নহাম। মেয়র হিসেবে তাঁর কর্মকাণ্ড দেখলেই মূলত এই রাজনীতিকের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো ধারণা পাওয়া যাবে।
২০২০ সালে কঠোর করোনা মহামারির বিধিনিষেধ নিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের বিরুদ্ধে বার্নহামের রাজনৈতিক লড়াই ম্যানচেস্টারের বাইরেও দেশজুড়ে তাঁর জনপ্রিয়তা ও পরিচিতি অনেক বাড়িয়ে দিয়েছিল।
কোভিড-১৯ বিধিনিষেধ নিয়ে বিরোধের সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ক্ষতিপূরণ হিসেবে ২ কোটি ২০ লাখ পাউন্ড দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু বার্নহাম তা প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর দাবি ছিল, এই অর্থ তাঁর চাওয়া ন্যূনতম অঙ্কের এক-তৃতীয়াংশ।
টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারিত সেই বিরোধ বার্নহামকে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে নিজের অঞ্চলের পক্ষে দাঁড়ানো একজন নেতার ভাবমূর্তি এনে দেয়।
বার্নহাম দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের পক্ষে। তিনি মনে করেন, লন্ডনের হাতে কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর হাতে আরও বেশি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া উচিত।
অ্যান্ডি বার্নহামের মতে, এতে পরিবহন, জনসেবা এবং স্থানীয় উন্নয়নসংক্রান্ত বিষয়ে অঞ্চলগুলো নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।
লিভারপুলে জন্ম নেওয়া বার্নহামের বাবা ছিলেন একজন টেলিফোন প্রকৌশলী। তাঁর মা কাজ করতেন রিসেপশনিস্ট হিসেবে।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে পড়াশোনা করেন বার্নহাম। স্নাতক শেষ করে প্রথমে গবেষক এবং পরে পার্লামেন্টে উপদেষ্টা হিসেবে কাজ শুরু করেন।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের সরকারের সময় তিনি জুনিয়র মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে গর্ডন ব্রাউনের মন্ত্রিসভায় সংস্কৃতিবিষয়ক ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।
২০১০ ও ২০১৫ সালে লেবার পার্টির নেতৃত্বের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন বার্নহাম। তবে দুবারই পরাজিত হন।
সমালোচকদের অভিযোগ, রাজনৈতিক জীবনে বার্নহাম একাধিকবার নিজের অবস্থান পরিবর্তন করেছেন।
গত বছর বার্নহাম অভিযোগ করেছিলেন, সরকার কার্যত বন্ডবাজারের নির্দেশনায় পরিচালিত হচ্ছে। পরে অবশ্য দাবি করেন, তাঁর বক্তব্য ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
অতীতে বার্নহাম গুরুত্বপূর্ণ শিল্প খাত রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। একই সঙ্গে যুক্তরাজ্যের আবার ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেওয়ার পক্ষেও মত দিয়েছিলেন।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে বার্নহাম তুলনামূলক মধ্যমপন্থী অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর মতে, দেশের বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতিতে বড় পরিসরে জাতীয়করণ সম্ভব নয়। একইভাবে অদূর ভবিষ্যতে ইউরোপীয় ইউনিয়নে আবার যোগ দেওয়ারও বাস্তব সম্ভাবনা নেই।
২০২২ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের সময় কিয়ার স্টারমার মজা করে বলেছিলেন, বার্নহামের রাজনৈতিক অবস্থান বদলানোর প্রবণতা অনেকটা বিশ্বকাপে জিততে থাকা দলের সমর্থক হওয়ার মতো।
স্টারমার বলেছিলেন, ‘বার্নহাম তাঁর শৈশবের দল আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জিততে দেখেছেন। আবার তাঁর শৈশবের দল ফ্রান্সকে ফাইনালে হারতেও দেখেছেন। এমনকি তাঁর শৈশবের দল মরক্কো ও ক্রোয়েশিয়াকেও সেমিফাইনালে বিদায় নিতে দেখেছেন।’
তবে সমর্থকদের আস্থা ধরে রাখতে এবং সমালোচকদের ভুল প্রমাণ করতে হলে বার্নহামকে দেখাতে হবে, তিনি সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং স্টারমারের চেয়ে ভিন্নধর্মী নেতৃত্ব দিতে সক্ষম।
অন্যথায় দুই বছরের মধ্যেই অ্যান্ডি বার্নহামকে ক্ষমতা থেকে বিদায় নিতে হতে পারে বলে মনে করছেন লেবার পার্টির এক আইনপ্রণেতা।