img

শ্রীমঙ্গলে চা-বাগানের ড্রেন থেকে নারী শ্রমিকের মরদেহ উদ্ধার

প্রকাশিত :  ১৬:১৫, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শ্রীমঙ্গলে চা-বাগানের ড্রেন থেকে নারী শ্রমিকের মরদেহ উদ্ধার

সংগ্রাম দত্ত: মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভাড়াউড়া চা-বাগানের একটি ড্রেন থেকে মীরা হাজরা (৪০) নামে এক নারী চা শ্রমিকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

সোমবার (৩১ আগস্ট) সকালে প্রতিদিনের মতো চা পাতা তুলতে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন মীরা হাজরা। কিন্তু রাতে আর বাড়ি ফেরেননি তিনি। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তাঁর কোনো খোঁজ না পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। পরে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বাগানের অন্য শ্রমিকেরাও তাঁকে খুঁজতে বের হন।

খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে রাতে ভাড়াউড়া চা-বাগানের ২৯ নম্বর সেকশনের একটি ড্রেনের ভেতর মীরা হাজরার মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন তাঁরা। পরে সেখান থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

তবে মীরা হাজরার কীভাবে মৃত্যু হয়েছে, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তাঁর মৃত্যুর কারণও জানা যায়নি।

সিলেটের খবর এর আরও খবর

img

বিদ্যুতের লুকোচুরিতে মৌলভীবাজারের চা শিল্পে শঙ্কা, বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়

প্রকাশিত :  ১৬:১৭, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৬:২০, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সংগ্রাম দত্ত: ভরা মৌসুমে মৌলভীবাজারের চা-বাগানগুলোতে এখন ব্যস্ততা চরমে। ভোরের আলো ফুটতেই শ্রমিকেরা ছুটছেন সারি সারি চাগাছের দিকে। কচি দুটি পাতা ও একটি কুঁড়ি সংগ্রহ করে দ্রুত তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে কারখানায়। কিন্তু কারখানায় কাঁচা পাতা পৌঁছানোর পরই শুরু হচ্ছে নতুন সংকট—বিদ্যুতের লুকোচুরি।

ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও লোডশেডিংয়ে জেলার চা কারখানাগুলোতে ব্যাহত হচ্ছে পাতা প্রক্রিয়াজাতকরণ। সময়মতো পাতা শুকানো, রোলিং, জারণ ও পুনরায় শুকানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলো সম্পন্ন করা যাচ্ছে না। এতে একদিকে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে চায়ের গুণগত মান নিয়েও তৈরি হয়েছে শঙ্কা। জেনারেটর চালিয়ে উৎপাদন সচল রাখার চেষ্টা করা হলেও বাড়ছে জ্বালানি ব্যয়, ফলে বাড়ছে সামগ্রিক উৎপাদন খরচ।

মৌলভীবাজার জেলার সাতটি উপজেলায় ছোট-বড় ৯৩টি চা-বাগান রয়েছে। বছরের এই সময়টি চা উৎপাদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মৌসুম। এ সময়ে বাগান থেকে পাতা সংগ্রহের পর দ্রুত কারখানায় নিয়ে প্রক্রিয়াজাত করা না গেলে পাতার স্বাভাবিক গুণাগুণ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রভাব শুধু কারখানার উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; তা ছড়িয়ে পড়ছে পুরো চা উৎপাদন ব্যবস্থায়।

চা কারখানায় কাঁচা পাতা পৌঁছানোর পর নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ও সময় মেনে কয়েকটি ধাপে তা প্রক্রিয়াজাত করা হয়। প্রথমে পাতাকে শুকানো হয়। এরপর রোলিং মেশিনে পাতা ভেঙে দেওয়া হয়। পরে জারণ প্রক্রিয়া শেষে আবারও শুকানো হয়। পুরো প্রক্রিয়াটিই যন্ত্রনির্ভর। ফলে উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুতের ঘন ঘন আসা-যাওয়ায় কারখানার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেলে মাঝপথে থেমে যাচ্ছে উৎপাদন। আবার বিদ্যুৎ ফিরে এলে মেশিন চালু করতে সময় লাগছে। এতে উৎপাদনের ধারাবাহিকতা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি মূল্যবান যন্ত্রপাতির ওপরও বাড়তি চাপ পড়ছে।

চা-বাগান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিদ্যুৎ সংকটের কারণে অনেক সময় জেনারেটর ব্যবহার ছাড়া বিকল্প থাকছে না। কিন্তু জেনারেটরে উৎপাদন চালু রাখার ব্যয় অনেক বেশি। ফলে উৎপাদন সচল রাখা গেলেও বাড়তি জ্বালানি খরচের কারণে চায়ের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।

বিশিষ্ট চা-বিশেষজ্ঞ ও ফিনলে চা কোম্পানির চিফ অপারেটিং অফিসার তাহসিন আহমদ চৌধুরীসহ একাধিক বাগান ব্যবস্থাপক ও টি প্ল্যান্টার গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, অব্যাহত লোডশেডিংয়ের কারণে চায়ের গুণগত মান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় চলতি বছরের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়েও সংশয় তৈরি হয়েছে।

ক্লোনেল চা-বাগানের ব্যবস্থাপক রনি ভৌমিক গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, বিদ্যুৎ সংকটের কারণে জেনারেটর দিয়ে কারখানা সচল রাখতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি বাগান পরিচালনাতেও চাপ তৈরি হচ্ছে।

বাংলাদেশ টি অ্যাসোসিয়েশন সিলেট শাখার চেয়ারম্যান ও দেশের সিনিয়র চা প্ল্যান্টার জিএম শিবলী গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, উৎপাদন চালু রাখা গেলেও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না থাকায় চায়ের গুণগত মান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।

চা উৎপাদনে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রভাবের কথা স্বীকার করেছেন বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মিসআহউদ্দিন আহমদ। তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, সমস্যা সমাধানে সরকার কাজ করছে এবং শিগগিরই পরিস্থিতির উন্নতি হবে।

মৌলভীবাজার বিউবো পরিচালন ও সংরক্ষণ বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ইন্দ্রোজিৎ দেবনাথ গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, কিছু দিনের মধ্যেই বিদ্যুৎ সংকট কেটে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

মৌলভীবাজার পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী সুজিত কুমার বিশ্বাস গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, জেলার সাতটি উপজেলায় প্রায় ৫ লাখ গ্রাহকের জন্য বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে ১১২ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ৭০ থেকে ৮০ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি সামাল দিতে বিভিন্ন এলাকায় সমহারে লোডশেডিং করে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চলছে। চা-বাগানের উৎপাদন যাতে ব্যাহত না হয়, সেদিকেও বিশেষভাবে নজর দেওয়া হচ্ছে।

তবে বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব শুধু শিল্পকারখানা কিংবা চা-বাগানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে সাধারণ মানুষও ভোগান্তিতে পড়েছেন। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকাকে কেন্দ্র করে শ্রীমঙ্গলসহ বিভিন্ন এলাকায় বাসাবাড়িতে চুরির ঘটনাও ঘটছে বলে খবর পাওয়া গেছে। সুযোগ নিয়ে একশ্রেণির সংঘবদ্ধ দুষ্কৃতকারী ও সুযোগসন্ধানীরা বিভিন্ন বাসাবাড়িতে চুরির ঘটনা ঘটাচ্ছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এতে বিদ্যুৎ সংকটের সঙ্গে নিরাপত্তা নিয়েও নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

চা শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুৎ সংকট দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব শুধু চলতি মৌসুমের উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; চায়ের গুণগত মান, উৎপাদন ব্যয় এবং বাজার প্রতিযোগিতার ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে ভরা মৌসুমে প্রতিদিনের উৎপাদন ঘাটতি পরবর্তী সময়ে আর পূরণ করা কঠিন।

বাংলাদেশ চা বোর্ডের তথ্যমতে, ২০২৬ সালে দেশে ১০ কোটি ৪০ লাখ কেজি চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে মৌলভীবাজারের চা-বাগানগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তাই ভরা মৌসুমে বিদ্যুৎ সরবরাহে স্থিতিশীলতা না ফিরলে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন ও মান—দুটিই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সবুজ চাগাছের সারির ভেতর এখন তাই শুধু ভালো ফলনের প্রত্যাশা নেই; আছে কারখানার মেশিন সচল রাখার দুশ্চিন্তাও। শ্রমিকেরা নিয়মিত পাতা তুলছেন, কারখানায় তা প্রক্রিয়াজাত করার প্রস্তুতিও থাকছে। কিন্তু বিদ্যুতের অনিশ্চিত সরবরাহ সেই উৎপাদনচক্রে তৈরি করছে ছন্দপতন। বিদ্যুতের সংকট দ্রুত কেটে গিয়ে চা উৎপাদনের স্বাভাবিক গতি ফিরবে—এটাই এখন চা শিল্পের সঙ্গে জড়িত হাজারো মানুষের প্রত্যাশা।