img

সাপ লোকালয়ে, বন দখলে কারা? লাউয়াছড়া রক্ষায় জবাবদিহি কোথায়?

প্রকাশিত :  ১১:২৪, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১১:৩৯, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

সাপ লোকালয়ে, বন দখলে কারা? লাউয়াছড়া রক্ষায় জবাবদিহি কোথায়?

সংগ্রাম দত্ত: মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের পরিচয় শুধু চা-বাগানের সবুজে নয়। পাহাড়-টিলা, বনভূমি আর নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী মিলিয়ে এ অঞ্চল দেশের অন্যতম সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক ভূখণ্ড। এই প্রকৃতিকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে পর্যটনশিল্প, তৈরি হয়েছে স্থানীয় মানুষের জীবিকা ও সম্ভাবনা। কিন্তু সেই প্রকৃতির নিরাপত্তা নিয়েই এখন উদ্বেগ বাড়ছে।

বনভূমি দখল, মূল্যবান গাছ কাটা, অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ—এসব অভিযোগ নতুন নয়। এর সঙ্গে যখন লোকালয়ে সাপসহ নানা বন্যপ্রাণীর উপস্থিতির খবর সামনে আসে, তখন প্রশ্ন জাগে, প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্য কি কোনোভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে?

সম্প্রতি শ্রীমঙ্গলে মাত্র চার দিনে একটি বিষধর শঙ্খিনী ও তিনটি অজগর উদ্ধার করা হয়েছে। কোনোটি বসতবাড়ির পাশে, কোনোটি সড়কের ধারে, আবার কোনোটি জালে আটকে ছিল। বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের সদস্যরা সাপগুলো উদ্ধার করে বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করেন। উদ্ধার হওয়া একটি অজগরকে লাউয়াছড়া বনে অবমুক্ত করা হয়।

চার দিনে চারটি সাপ উদ্ধার হওয়ার ঘটনা একাই বন ধ্বংসের প্রমাণ নয়। তবে এ ধরনের ঘটনা বারবার ঘটলে তা গুরুত্ব দিয়ে দেখা জরুরি। প্রাণীরা কেন লোকালয়ে আসছে, তাদের স্বাভাবিক বিচরণক্ষেত্র কতটা নিরাপদ, মানুষের বসতি ও অবকাঠামো সম্প্রসারণে তাদের চলাচলের পথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা দরকার।

আর সেই অনুসন্ধানে কমলগঞ্জের ভানুগাছের পাহাড় ও লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান কেবল একটি বন নয়; এটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়স্থল। ১৯৯৬ সালে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষিত এ বনাঞ্চলে রয়েছে নানা প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী। স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়েও এর গুরুত্ব অনেক।

কিন্তু স্বাধীনতার পর গত পাঁচ দশকে ভানুগাছের পাহাড় ও আশপাশের বনাঞ্চল ঘিরে মূল্যবান বৃক্ষ নিধন, বনজ সম্পদ লুট এবং বনভূমি দখলের অভিযোগ বারবার আলোচনায় এসেছে। বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত সংবাদেও বনভূমি দখল, গাছ কাটা ও বনের জমিতে স্থাপনা গড়ে তোলার অভিযোগ উঠে এসেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, একসময় সংঘবদ্ধ প্রভাবশালী গোষ্ঠী আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে বনে প্রবেশ করে সেগুনসহ মূল্যবান গাছ কেটে নিয়ে গেছে। বনভূমির জায়গা দখল করে কোথাও বসতি, কোথাও রিসোর্ট, আবার কোথাও বিভিন্ন বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে।

এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ জরুরি। কারণ, অভিযোগগুলো সত্য হলে বিষয়টি শুধু পরিবেশ ধ্বংসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে সরকারি সম্পদ রক্ষা, বন আইন প্রয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব পালনের প্রশ্নও।

এখানেই মূল প্রশ্ন: এত বছর ধরে যদি বন দখল ও মূল্যবান বৃক্ষ নিধনের অভিযোগ উঠে থাকে, তাহলে সেগুলোর তদন্ত কত দূর এগিয়েছে? কতটুকু বনভূমি দখলের অভিযোগ পাওয়া গেছে? কতটি স্থাপনার বৈধতা যাচাই করা হয়েছে? কতটি মামলা হয়েছে, কতটির নিষ্পত্তি হয়েছে, আর কতটুকু জমি উদ্ধার করা গেছে?

এসব প্রশ্নের উত্তর অনুমান দিয়ে নয়, নথি ও তথ্য দিয়ে দিতে হবে। বন বিভাগের কাছে এ-সংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্য থাকা এবং তা জনসমক্ষে প্রকাশ করা জরুরি।

বন রক্ষার কাজ শুধু গাছ লাগানো কিংবা মাঝেমধ্যে অভিযান চালানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। সরকারি সম্পদ দখল বা বনজ সম্পদ লুটের অভিযোগ উঠলে তার সত্যতা যাচাই, অপরাধ প্রতিরোধ এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

লাউয়াছড়ার বনাঞ্চল ঘিরে স্থানীয়ভাবে আলোচিত অভিযোগগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়টিও রয়েছে। অভিযোগ আছে, বনভূমি দখল ও বনজ সম্পদ আহরণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে আলোচিত কিছু ব্যক্তি বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক মহলের সঙ্গে সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে নিজেদের প্রভাব ধরে রেখেছেন। রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলালেও তাঁদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি—এমন অভিযোগও স্থানীয়ভাবে শোনা যায়।

এ ছাড়া বনভূমি দখল ও বনজ সম্পদ পাচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে আলোচিত কয়েকজনের রাজনৈতিক উত্থান, অর্থবল ও পেশিশক্তির ব্যবহার এবং জনপ্রতিনিধি হওয়ার প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ভোট কেনা কিংবা রাজনৈতিক মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রভাব খাটানোর অভিযোগও এসব আলোচনায় উঠে আসে।

এ ধরনের অভিযোগ গুরুতর। কিন্তু অভিযোগ উঠলেই কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা যায় না। আবার প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ বলে সেটি এড়িয়ে যাওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়। প্রয়োজন স্বাধীন তদন্ত, ভূমির রেকর্ড যাচাই, মামলার নথি পর্যালোচনা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য গ্রহণ।

 রাজনৈতিক পরিচয় বা অর্থনৈতিক সামর্থ্য কারও জন্য আইনের বাইরে থাকার সুযোগ তৈরি করতে পারে না। সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ হবে, অথচ প্রভাবশালীদের ক্ষেত্রে তা থেমে যাবে—এমন বৈষম্য আইনের শাসনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

 সরকার কিংবা প্রশাসনের সদিচ্ছার আসল পরীক্ষা এখানেই। অভিযুক্ত ব্যক্তি যে রাজনৈতিক দলেরই হোন না কেন, তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা একই মানদণ্ডে পরিচালিত হচ্ছে কি না, সেটিই দেখার বিষয়।

 বন ধ্বংসের ক্ষতি কেবল কতটি গাছ কাটা হলো, সেই হিসাব দিয়ে বোঝা যায় না। একটি বন অসংখ্য প্রাণীর আশ্রয়, খাদ্য সংগ্রহের জায়গা ও প্রজননক্ষেত্র। অনেক প্রাণীর জন্য বনাঞ্চলের এক অংশ থেকে অন্য অংশে যাওয়ার প্রাকৃতিক পথও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব জায়গা নষ্ট হলে তার প্রভাব পড়ে পুরো বাস্তুতন্ত্রে।

 সাপের কথাই ধরা যাক। শঙ্খিনী বিষধর হলেও প্রকৃতির খাদ্যশৃঙ্খলে তার ভূমিকা রয়েছে। অজগরও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে। সাপসহ বিভিন্ন শিকারি প্রাণী ইঁদুর ও অন্যান্য প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। অথচ মানুষের চোখে সাপ প্রায়ই আতঙ্কের কারণ। লোকালয়ে দেখা গেলেই অনেক সময় তাকে মেরে ফেলা হয়।

 কিন্তু সাপ কেন লোকালয়ে আসছে, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। বন উজাড়, ঝোপঝাড় পরিষ্কার, পাহাড়-টিলা কাটা, সড়ক নির্মাণ কিংবা অপরিকল্পিত স্থাপনার কারণে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। খাদ্য ও আশ্রয়ের খোঁজে তারা মানুষের বসতির কাছাকাছিও চলে আসতে পারে।

 তবে শ্রীমঙ্গলে সাম্প্রতিক সময়ে উদ্ধার হওয়া প্রতিটি সাপের লোকালয়ে আসার কারণ যে আবাসস্থল সংকোচন, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না। এ জন্য প্রয়োজন মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান ও বৈজ্ঞানিক তথ্য। কোথায় বেশি বন্যপ্রাণী উদ্ধার হচ্ছে, কোন এলাকায় বনভূমির পরিবর্তন ঘটছে, কোথায় প্রাণীদের চলাচলের পথ বিচ্ছিন্ন হচ্ছে—এসব তথ্য মিলিয়ে দেখতে হবে।

 অর্থাৎ, সাপ উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে ছেড়ে দেওয়ার পাশাপাশি যে পরিবেশে তারা বাস করে, সেটি কতটা নিরাপদ আছে, তা নিয়েও ভাবতে হবে।

 শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের পর্যটনের সবচেয়ে বড় সম্পদ প্রকৃতি। চা-বাগান, পাহাড়, বনভূমি আর বন্যপ্রাণীর উপস্থিতিই এ অঞ্চলকে অন্য জায়গা থেকে আলাদা করেছে। অথচ পর্যটনের নামে যদি বনাঞ্চলের আশপাশে অপরিকল্পিত স্থাপনা গড়ে ওঠে, বনভূমি দখলের অভিযোগ উপেক্ষিত থাকে কিংবা বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে সেই উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত পর্যটনের ভিত্তিকেই দুর্বল করবে।

 রিসোর্ট বা পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণ মানেই অপরাধ নয়। কিন্তু কোনো স্থাপনা সংরক্ষিত বনভূমি দখল করে গড়ে উঠেছে কি না, প্রয়োজনীয় অনুমোদন রয়েছে কি না, কিংবা পরিবেশগত বিধিনিষেধ লঙ্ঘন করছে কি না—এসব যাচাই করা অপরিহার্য।

 লাউয়াছড়ার মতো সংবেদনশীল বনাঞ্চলের ক্ষেত্রে সীমানা নির্ধারণ, ভূমির নথি হালনাগাদ এবং বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সরকারি রেকর্ড মিলিয়ে দেখা দরকার। বনভূমির আশপাশে গড়ে ওঠা স্থাপনাগুলোর বৈধতা ও পরিবেশগত প্রভাবও খতিয়ে দেখতে হবে। কোনো স্থাপনা অবৈধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।

 প্রশ্নটি উন্নয়ন হবে কি না, তা নয়। প্রশ্ন হলো, সেই উন্নয়নের সুবিধা কারা পাচ্ছে আর ক্ষতির বোঝা বইছে কারা?

 কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি বনভূমি দখল করে আর্থিক সুবিধা পায়, অথচ ক্ষতিগ্রস্ত হয় জীববৈচিত্র্য, স্থানীয় পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, তাহলে তাকে জনস্বার্থের উন্নয়ন বলা যায় না।

 লোকালয়ে বন্যপ্রাণী দেখা গেলে উদ্ধারকাজে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের মতো সংগঠন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। খবর পেয়ে তাদের সদস্যরা ছুটে যাচ্ছেন, প্রাণী উদ্ধার করছেন এবং বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করছেন। এই উদ্যোগ প্রশংসার দাবিদার।

 কিন্তু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের পক্ষে বন দখল বন্ধ করা, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা কিংবা বন আইন কার্যকর করা সম্ভব নয়। এসব দায়িত্ব মূলত বন বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানের।

 গত সেপ্টেম্বর মাসে শ্রীমঙ্গল ও আশপাশের এলাকা থেকে ২৭টি বন্যপ্রাণী উদ্ধারের তথ্য জানিয়েছিল বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন। এর আগে আগস্ট মাসেও শঙ্খিনী ও অজগরসহ অন্তত ১৭টি সাপ উদ্ধারের কথা জানিয়েছিল সংগঠনটি। এসব তথ্য উদ্ধারকাজের পরিধি সম্পর্কে ধারণা দেয়। তবে শুধু উদ্ধারসংখ্যা দিয়ে কোনো এলাকার বন্যপ্রাণীর মোট সংখ্যা কিংবা আবাসস্থল সংকোচনের মাত্রা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

 তবু এসব তথ্য সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণের যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। কোন প্রজাতির প্রাণী কোথায়, কখন এবং কী পরিস্থিতিতে উদ্ধার হচ্ছে, তা নিয়মিত নথিভুক্ত করা হলে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা সহজ হবে। বন বিভাগ, গবেষক ও পরিবেশবিদেরা একসঙ্গে কাজ করলে এসব তথ্য সংরক্ষণ পরিকল্পনায় কাজে লাগাতে পারবেন।

 একই সঙ্গে বনভূমির সীমানা রক্ষা, অবৈধ দখল শনাক্ত করা, বনজ সম্পদ পাচার প্রতিরোধ এবং অভিযোগের তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি থাকতে হবে। শুধু প্রাণী উদ্ধার করে সাময়িক স্বস্তি দিলেই দীর্ঘমেয়াদি সংকটের সমাধান হবে না।

 লাউয়াছড়া রক্ষার জন্য নতুন করে বড় বড় প্রতিশ্রুতির চেয়ে প্রয়োজন কিছু স্পষ্ট ও বাস্তব পদক্ষেপ।

 প্রথমত, বনভূমির সীমানা ও মালিকানা-সংক্রান্ত সরকারি নথি হালনাগাদ করে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে। কোথায় দখলের অভিযোগ রয়েছে, কতটুকু জমি নিয়ে বিরোধ, কোন স্থাপনা কী অনুমোদনে গড়ে উঠেছে—এসব তথ্য যাচাই করে প্রকাশ করা জরুরি।

 দ্বিতীয়ত, মূল্যবান বৃক্ষ নিধন ও বনভূমি দখলের অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। অভিযোগের সঙ্গে প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত থাকলেও তদন্ত যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

 তৃতীয়ত, বনাঞ্চলের ভেতরে ও আশপাশে গড়ে ওঠা স্থাপনাগুলোর বৈধতা এবং পরিবেশগত প্রভাব যাচাই করতে হবে। অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি বৈধ স্থাপনাগুলোও পরিবেশগত শর্ত মেনে চলছে কি না, তা নজরদারিতে রাখতে হবে।

চতুর্থত, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ও চলাচলের পথ নিয়ে বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন প্রয়োজন। কোথায় প্রাণীদের আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, কোথায় মানুষের সঙ্গে সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ছে, তা চিহ্নিত করে সংরক্ষণের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে।

 পঞ্চমত, স্থানীয় মানুষকে বন সংরক্ষণের অংশীদার করতে হবে। বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের অভিযোগ জানানোর সুযোগ এবং কার্যকর প্রতিক্রিয়ার ব্যবস্থা থাকা জরুরি।

 সবচেয়ে বড় কথা, এসব উদ্যোগের অগ্রগতি জনসমক্ষে তুলে ধরতে হবে। কতটুকু বনভূমি উদ্ধার হলো, কতটি অভিযোগ তদন্ত করা হলো, কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল রক্ষায় কী অগ্রগতি হয়েছে—এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা দরকার।

 কারণ, স্বচ্ছতা ছাড়া জবাবদিহি আসে না। আর জবাবদিহি ছাড়া বন রক্ষার প্রতিশ্রুতি শেষ পর্যন্ত কাগজেই থেকে যায়।

 শ্রীমঙ্গলে চার দিনে চারটি সাপ উদ্ধারের ঘটনা একাই পরিবেশগত বিপর্যয়ের প্রমাণ নয়। কিন্তু লাউয়াছড়া ও ভানুগাছের পাহাড় ঘিরে দীর্ঘদিনের বনভূমি দখল, বৃক্ষ নিধন ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগের পাশাপাশি এ ধরনের ঘটনা গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। প্রকৃতির ওপর মানুষের চাপ কতটা বাড়ছে, আর সেই চাপ সামাল দিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখছে—তার উত্তর খুঁজতে হবে তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে।

 বন রক্ষার অর্থ শুধু গাছ লাগানো নয়। যে কারণে বন ধ্বংস হয়, যে কারণে সরকারি সম্পদ দখলের অভিযোগ ওঠে, যে কারণে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ঝুঁকির মুখে পড়ে—সেসব সমস্যারও সমাধান করতে হবে। আইন প্রয়োগে রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থবল কিংবা সামাজিক প্রভাব যেন বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

 লাউয়াছড়া শুধু কমলগঞ্জের নয়, শুধু শ্রীমঙ্গলের পর্যটন আকর্ষণও নয়। এটি বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের অংশ, অসংখ্য প্রাণের আশ্রয় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করে যাওয়ার মতো এক অমূল্য সম্পদ।

 আজ একটি অজগর উদ্ধার করে বনে অবমুক্ত করা যায়, একটি শঙ্খিনীকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়াও সম্ভব। কিন্তু তাদের আবাসস্থল যদি নিরাপদ না থাকে, তাহলে আগামীকাল আবারও বন্যপ্রাণী লোকালয়ে চলে আসতে পারে। তাতে প্রাণীদের যেমন ঝুঁকি বাড়বে, তেমনি মানুষের সঙ্গেও সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হবে।

 তাই প্রশ্ন শুধু কতটি সাপ উদ্ধার হলো, তা নয়। প্রশ্ন হলো, যে বন তাদের আশ্রয় দেওয়ার কথা, সেই বনকে নিরাপদ রাখতে আমরা কী করছি? বনভূমি দখল ও বৃক্ষ নিধনের যেসব অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে উঠে আসছে, সেগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করা যাচ্ছে কি না?

 লাউয়াছড়া রক্ষার লড়াই তাই শুধু পরিবেশ সংরক্ষণের লড়াই নয়। এটি সরকারি সম্পদ রক্ষা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পরিবেশ রেখে যাওয়ার লড়াই।

 বন বাঁচাতে হবে শুধু স্লোগানে নয়—দখলমুক্ত বনভূমি, সুরক্ষিত বৃক্ষ, নিরাপদ বন্যপ্রাণী এবং সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর আইনের মধ্য দিয়ে।



img

আত্মপরিচয়ের রাজনীতি: বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ সার্বভৌমত্বের রক্ষাকবচ

প্রকাশিত :  ০৮:৫২, ২৮ অক্টোবর ২০২৬

সাইফুল খান 

\"একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র যখন তিন দিক থেকে একটি বৃহৎ প্রতিবেশী দ্বারা আবৃত, তখন তার রাষ্ট্রীয় আত্মপরিচয়ই হয়ে ওঠে তার সবচেয়ে শক্তিশালী ঢাল। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ঠিক সেই ঢাল। রাষ্ট্রতত্ত্বের আলোকে পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ।\"

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন রাজনৈতিক নেতৃত্ব কেবল সরকারই পরিচালনা করেন না রাষ্ট্রের অস্তিত্বের দার্শনিক ভিত্তিটাই নতুন করে নির্মাণ করেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ঠিক এই কাজটি করেছিলেন। \'বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ\' কেবল একটি রাজনৈতিক মতবাদ হিসেবে তিনি হাজির করেননি,  এটি ছিল ভূগোলের নিষ্ঠুর বাস্তবতার মুখে একটি অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র জাতি-রাষ্ট্রের আত্মপরিচয় রক্ষার সুচিন্তিত কৌশল, রাষ্ট্রতত্ত্বের ভাষায় যাকে বলা যায় \'সার্বভৌমত্বের অন্তর্বর্তী রক্ষাকবচ\'।

বাংলাদেশের ভূগোলটা একবার মানচিত্রে দেখুন। তিন দিক - উত্তর, পশ্চিম এবং পূর্ব  ভারত দ্বারা আবৃত। কেবল দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। ১৪৭,৫৭০ বর্গকিলোমিটারের এই ভূখণ্ডটি ভূরাজনৈতিক দিক থেকে বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানগুলোর একটিতে বিদ্যমান। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মার্শাল সিঙারের \'এনক্লেভ থিওরি\' বলে, যে রাষ্ট্র চারপাশ থেকে বড় শক্তির দ্বারা আবৃত, তার সার্বভৌমত্ব সর্বদাই \'কন্ডিশনাল\' বা শর্তযুক্ত ;  যদি না সে রাষ্ট্র নিজের একটি শক্তিশালী, স্বতন্ত্র পরিচয় নির্মাণ করতে সক্ষম হয়। জিয়াউর রহমান সেই পরিচয় নির্মাণ করেছিলেন।

ভূ-রাজনীতির ফাঁদ: কেন বাংলাদেশের জন্য পরিচয়ই সুরক্ষা

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের \'নিও-রিয়েলিস্ট\' ধারায় কেনেথ ওয়ালজ দেখিয়েছেন, দুর্বল রাষ্ট্রগুলো শক্তিশালী প্রতিবেশীর পাশে দুটি উপায়ে টিকে থাকতে পারে ; \'ব্যান্ডওয়াগনিং\' (প্রভাবশালী শক্তির অনুগামী হয়ে যাওয়া) অথবা \'ব্যালেন্সিং\' (পাল্টা জোট বা কৌশল তৈরি করা)। কিন্তু বাংলাদেশের মতো একটি রাষ্ট্রের জন্য এই দুটি বিকল্পের কোনোটিই যথেষ্ট নয়।

ব্যান্ডওয়াগনিং মানে ভারতের কক্ষপথে পরিণত হওয়া  যা স্বাধীনতাকে আনুষ্ঠানিক রেখে বাস্তবে রাষ্ট্রীয় স্বায়ত্তশাসন বিলুপ্ত করে। আর ব্যালেন্সিং-এর জন্য  ভূ-রাজনৈতিক গভীরতা দরকার।  সেজন্য তুলনামূলক  বন্ধু-রাষ্ট্র, কৌশলগত গভীরতা, নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা প্রয়োজন যা  বাংলাদেশের ভূগোল অনুমোদন করে না। এই দ্বিধার মধ্যে জিয়াউর রহমান একটি তৃতীয় পথ বেছে নিয়েছিলেন: \'আইডেন্টিটি-বেইজড সভারেইন্টি\' বা পরিচয়ভিত্তিক সার্বভৌমত্ব।

তাত্ত্বিক ধারণা / আইডেন্টিটি-বেইজড সভারেইন্টি

যখন কোনো রাষ্ট্র সামরিক বা অর্থনৈতিক শক্তিতে নিজের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে পারে না, তখন সে একটি শক্তিশালী, স্বতন্ত্র জাতীয় পরিচয় তৈরি করে যা বাইরের শক্তির কাছে একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক বাধা তৈরি করে। এই পরিচয় যত স্পষ্ট ও গভীরে প্রোথিত, বাইরের শক্তির কাছে তা গ্রাস করা তত কঠিন হয়।

বাল্টিক রাষ্ট্রগুলো যেমন- এস্তোনিয়া, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া  সোভিয়েত অধিভুক্তির পরেও পাঁচ দশক নিজেদের জাতীয় পরিচয় টিকিয়ে রেখেছিল। সেই পরিচয়ই তাদের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের ভিত্তি হয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ভিন্ন ঐতিহাসিক বাস্তবতা, কিন্তু যুক্তির কাঠামো একই: পরিচয় হারালে রাষ্ট্র থাকলেও সত্তা থাকে না।

বাংলা ভাষা বনাম বাংলাদেশি জাতিসত্তা: দুটি ধারণার মৌলিক পার্থক্য

এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিশ্লেষণ করা দরকার। \'বাঙালি জাতীয়তাবাদ\' এবং \'বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ\'  এই দুটি ধারণার মধ্যে পার্থক্যটা কেবল শব্দের নয়, এটা রাষ্ট্রদর্শনের মূলগত পার্থক্য।

রেনান ১৮৮২ সালে তাঁর বিখ্যাত বক্তৃতায় জিজ্ঞেস করেছিলেন: জাতি কী? তাঁর উত্তর ছিল  জাতি কেবল ভাষা, জাতি বা ধর্মের ঐক্য নয়; জাতি হলো একটি \'দৈনিক গণভোট\'  প্রতিদিনের সিদ্ধান্ত একসাথে থাকব। \'বাঙালি জাতীয়তাবাদ\' যদি ভাষাকে কেন্দ্রে রাখে, তাহলে সেটা স্বাভাবিকভাবেই পশ্চিমবঙ্গের বাংলাভাষীদের সাথে একটি সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক অভিন্নতার ধারণা তৈরি করে। ভারতের লক্ষ্য যদি হয় এই অভিন্নতাকে রাজনৈতিক মেরুকরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা, তাহলে \'বাঙালি পরিচয়\' হয়ে পড়ে বাংলাদেশের স্বাধীন অস্তিত্বের বিরুদ্ধে একটি কৌশলগত অস্ত্র।

\"একটি জাতির পরিচয় যদি তার নিজের সীমানার বাইরে অন্য একটি রাষ্ট্রের সংজ্ঞার সাথে অভিন্ন হয়ে পড়ে, তাহলে সেই পরিচয় আর সুরক্ষা নয় স্পষ্টত ফাঁদ।\"

বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন, Imagined Communities (১৯৮৩)

বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসনের \'ইমাজিন্ড কমিউনিটিজ\' তত্ত্ব বলে, জাতি একটি \'কল্পিত সম্প্রদায়\' যার সদস্যরা পরস্পরকে চেনেন না, কিন্তু একটি অভিন্ন ধারণায় নিজেদের যুক্ত মনে করেন। এই ধারণাটি নির্মিত হয় ছাপাখানা, সংবাদপত্র, সাহিত্য এবং রাজনৈতিক আখ্যানের মাধ্যমে। জিয়াউর রহমান \'বাংলাদেশি\' পরিচয়ের এই নির্মাণে সচেতনভাবে হাত দিয়েছিলেন। এমন একটি পরিচয়, যার কেন্দ্রে আছে ভূখণ্ড, ইতিহাস, সংস্কৃতির সমন্বয় এবং সর্বোপরি একটি আলাদা রাষ্ট্রিক অস্তিত্বের চেতনা।

এই পরিচয়ে ভাষা আছে, কিন্তু ভাষাই একমাত্র নয়। ধর্ম আছে, কিন্তু ধর্ম আধিপত্য করে না। ইতিহাস আছে,  যুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাস, যা বাংলাদেশকে অনন্য করে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ: এই পরিচয়ের ভৌগোলিক সীমানা সুনির্দিষ্ট এবং তা পশ্চিমবঙ্গের সীমানায় গিয়ে শেষ হয়।

ওয়েস্টফালিয়ান সার্বভৌমত্ব ও বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ

আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি ১৬৪৮ সালের ওয়েস্টফালিয়া চুক্তিতে। যেখানে প্রথমবারের মতো প্রতিটি রাষ্ট্রের নিজের সীমানার মধ্যে সার্বভৌমত্ব স্বীকৃত হয়। এই সার্বভৌমত্বের তিনটি স্তম্ভ: ভূখণ্ডের অখণ্ডতা, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে রাষ্ট্রের আইনগত সমতা।

কিন্তু বাস্তব রাজনীতিতে এই তিনটি স্তম্ভের কোনোটিই শুধু আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিতে টেকে না। হ্যান্স মর্গেনথাউর \'পলিটিক্স অ্যামং নেশনস\' তত্ত্ব বলে, রাষ্ট্রের বাস্তব সার্বভৌমত্ব নির্ভর করে তার \'ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট\' বা জাতীয় স্বার্থকে সংজ্ঞায়িত ও রক্ষা করার ক্ষমতার ওপর। এই সংজ্ঞায়ন যদি নিজে না করতে পারেন, তাহলে অন্য কেউ করে দেবে।

ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্যকার অসামঞ্জস্য বোঝার জন্য কিছু তথ্য উল্লেখ প্রাসঙ্গিক: ভারতের আয়তন বাংলাদেশের প্রায় ২২ গুণ, জনসংখ্যা প্রায় ৮ গুণ, GDP প্রায় ১২ গুণ এবং সামরিক ব্যয় তুলনাতীতভাবে বেশি। এই বাস্তবতায় দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক সমতা আছে, কিন্তু বাস্তব সমতা নেই।

তাত্ত্বিক প্রয়োগ / \'পাওয়ার অ্যাসিমেট্রি\' ও ছোট রাষ্ট্রের কৌশল

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের \'পাওয়ার অ্যাসিমেট্রি\' তত্ত্ব বলে, যখন দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে শক্তির ব্যবধান অনেক বেশি, তখন দুর্বল রাষ্ট্রের কাছে \'হার্ড পাওয়ার\' (সামরিক-অর্থনৈতিক শক্তি) ব্যবহারের সুযোগ সীমিত। তখন তার প্রধান হাতিয়ার হয়ে ওঠে \'সফট পাওয়ার\' যেমন-জাতীয় পরিচয়, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য এবং আন্তর্জাতিক নীতির নৈতিক অবস্থান।

জোসেফ নাইয়ের \'সফট পাওয়ার\' তত্ত্বে (১৯৯০) বলা হয়, কোনো রাষ্ট্রের আকর্ষণীয়তা, তার মূল্যবোধ এবং বৈধতার ধারণা  এগুলো বলপ্রয়োগ ছাড়াই প্রভাব বিস্তার করতে পারে। বাংলাদেশের \'বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ\' এই সফট পাওয়ারের একটি প্রয়োগ,  একটি স্বতন্ত্র পরিচয় যা বাংলাদেশকে ভারতের \'কাল্চারাল হেজিমনি\' থেকে রক্ষা করে।

জিয়াউর রহমানের জাতীয়তাবাদের পাঁচটি স্তম্ভ: একটি রাষ্ট্রতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

স্তম্ভ ১: ভূখণ্ড-কেন্দ্রিক পরিচয় নির্মাণ

জিয়াউর রহমান বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের কেন্দ্রে রাখলেন বাংলাদেশের ভূখণ্ডকে। এটি ঠিক সেই কাজ যা রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা \'টেরিটোরিয়াল ন্যাশনালিজম\' বলেন। যেখানে জাতীয় পরিচয় নির্মিত হয় একটি সুনির্দিষ্ট ভূগোলকে কেন্দ্রে রেখে, শুধু ভাষা বা জাতিসত্তাকে নয়। এর ফলে \'বাংলাদেশি\' হওয়ার সংজ্ঞা স্পষ্ট হয়: যে এই ভূখণ্ডের বাসিন্দা, এই রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যশীল, সে বাংলাদেশি ধর্ম, ভাষা বা জাতিনির্বিশেষে।

স্তম্ভ ২: বহুত্ববাদী জাতি-সংজ্ঞা

জিয়াউর রহমান \'বাংলাদেশি\' পরিচয়ে একটি বহুত্ববাদী কাঠামো যোগ করেছিলেন  বাঙালি, চাকমা, মারমা, সাঁওতাল, গারো সকলেই \'বাংলাদেশি\'। এই অন্তর্ভুক্তিমূলক সংজ্ঞা একটি ছোট রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ  কারণ বৈচিত্র্যকে বিভাজনের হাতিয়ার বানানো হলে বাইরের শক্তি সেই বিভাজন ব্যবহার করতে পারে। উইল কিমলিকার \'মাল্টিকালচারাল সিটিজেনশিপ\' তত্ত্ব বলে, সংখ্যালঘুদের পরিচয়কে অন্তর্ভুক্ত করা রাষ্ট্রের বৈধতা ও স্থিতিশীলতা উভয়কেই শক্তিশালী করে।

স্তম্ভ ৩: ঐতিহাসিক স্বাতন্ত্র্যের দাবি

বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো স্বাধীনতার ইতিহাস। জিয়াউর রহমান নিজে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন,  এই ঐতিহাসিক সত্যটি তাঁর রাজনৈতিক বর্ণনায় কেন্দ্রীয় ছিল। রাষ্ট্রদার্শনিক হেগেলের \'ঐতিহাসিক চেতনা\' ধারণা বলে, একটি জাতি তখনই পূর্ণ পরিচয় পায়, যখন সে নিজের ইতিহাসকে নিজের দৃষ্টিতে ব্যাখ্যা করতে শেখে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসকে কেবল ভারত-সহায়তার ফসল হিসেবে নয়, বাংলাদেশের জনগণের নিজস্ব সংগ্রামের ফসল হিসেবে উপস্থাপন করা এই দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রকাশ। যে দৃষ্টিভঙ্গি দৃঢ়ভাবে পোষন করতেন জিয়াউর রহমান। 

স্তম্ভ ৪: বৈদেশিক নীতিতে ভারসাম্য

জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের সবচেয়ে ব্যবহারিক প্রকাশ ছিল বৈদেশিক নীতিতে। তিনি সক্রিয়ভাবে চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো এবং অন্যান্য প্রতিবেশীদের সাথে সম্পর্ক তৈরি করেছিলেন। এটি ছিল ওয়ালজের \'ব্যালেন্সিং\' কৌশলের একটি পরিশীলিত প্রয়োগ।  কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পদ্ধতি ভিন্ন, পূর্ণ সামরিক জোটের পরিবর্তে কূটনৈতিক বহুমুখিতার মাধ্যমে সম্পর্ক ।

SAARC প্রতিষ্ঠায় জিয়াউর রহমানের উদ্যোগ এই কৌশলের সবচেয়ে সৃজনশীল প্রকাশ। দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতার এই কাঠামো তৈরি করে তিনি ভারতকে একটি বহুপাক্ষিক সম্পর্কের মধ্যে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছিলেন।  যেখানে বাংলাদেশের কণ্ঠস্বর শুধু দ্বিপাক্ষিক নয়, আঞ্চলিক পরিসরেও শোনা যাবে।

স্তম্ভ ৫: ইসলামের রাজনৈতিক ব্যবহার বিচ্ছিন্নতার নয়, পার্থক্যের ভিত্তি হিসেবে

সংবিধানে \'বিসমিল্লাহ\' যোগ করা এবং ধর্মনিরপেক্ষতার স্থানে ইসলামি মূল্যবোধের স্বীকৃতি  এটি কেবল ধর্মীয় রাজনীতি ছিল না। এটি ছিল একটি স্বাতন্ত্র্য-নির্মাণের কৌশল। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাথে বাংলাদেশের ভাষার মিল আছে, কিন্তু মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা আলাদা। এই আলাদা অভিজ্ঞতাকে রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের অংশ করা বাংলাদেশের \'ইউনিক সেলিং পয়েন্ট\' তৈরি করে। এটা এমন একটি পার্থক্য যা ভারতের সাংস্কৃতিক আধিপত্যকে ঠেকায়।

হেজিমনি তত্ত্ব ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ

অ্যান্টোনিও গ্রামশির \'হেজিমোনি\' ধারণায় ক্ষমতা কেবল বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নয়, সাংস্কৃতিক ও মতাদর্শগত \'সম্মতি আদায়ের\' মাধ্যমেও প্রতিষ্ঠিত হয়। ভারতের বাংলাদেশের ওপর প্রভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা এই সাংস্কৃতিক হেজিমনির হিন্দি ও বাংলা চলচ্চিত্র, টেলিভিশন, সংগীত, সাহিত্য এবং উচ্চশিক্ষার আকর্ষণ।

এই সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের কার্যকর পথ সামরিক নয় সাংস্কৃতিক। নিজস্ব শক্তিশালী পরিচয়, নিজস্ব সাহিত্য-সংস্কৃতির সমৃদ্ধি এবং নিজস্ব বৈধতার আখ্যান এগুলোই বাইরের সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে দুর্গ। জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ এই দুর্গ নির্মাণের একটি রাজনৈতিক পরিকল্পনা।

\"প্রতিটি জাতিরাষ্ট্রের নিজস্ব একটি \'কাল্চারাল লজিক\' থাকে ।  নিজের অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নেওয়া একটি বোঝাপড়া, যা অন্য কেউ সম্পূর্ণ শেয়ার করতে পারে না। এই লজিকই জাতির টিকে থাকার মৌলিক শক্তি।\"

আন্থনি স্মিথ, The Ethnic Origins of Nations (১৯৮৬)

আন্থনি স্মিথের \'এথনো-সিম্বলিজম\' তত্ত্ব বলে, জাতি কেবল আধুনিক রাজনৈতিক নির্মাণ নয়  এর শিকড় আছে ঐতিহাসিক স্মৃতি, মিথ এবং প্রতীকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন এবং এই ভূখণ্ডের হাজার বছরের ইতিহাস এগুলো সেই \'এথনো-সিম্বল\', যা বাংলাদেশি পরিচয়কে গভীরতা দেয়। জিয়াউর রহমান এই প্রতীকগুলোকে একটি রাজনৈতিক আখ্যানে সংযুক্ত করেছিলেন।

ছোট রাষ্ট্রের কৌশলগত সংস্কৃতি: তুলনামূলক দৃষ্টান্ত

বাংলাদেশের পরিস্থিতি পৃথিবীতে অনন্য নয়। আরও কিছু ছোট রাষ্ট্র বড় প্রতিবেশীর পাশে টিকে থাকার একই সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে এবং পরিচয়-ভিত্তিক সার্বভৌমত্বের পথ বেছে নিয়েছে।

সিঙ্গাপুরের উদাহরণটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। মালয়েশিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর সিঙ্গাপুর একটি শক্তিশালী, স্বতন্ত্র জাতীয় পরিচয় নির্মাণে মনোযোগ দিয়েছিল। লি কুয়ান ইউর নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিল এমন একটি \'সিঙ্গাপুরিয়ান\' পরিচয়  যা চীনা, মালয় ও তামিল সকলকে একটি রাষ্ট্রীয় ছাদের নিচে একত্রিত করেছিল। এই পরিচয় সিঙ্গাপুরকে মালয়েশিয়ার বা চীনের প্রভাব বলয়ে হারিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করেছিল।

সুইজারল্যান্ড আরেকটি উদাহরণ। চারপাশে জার্মানি, ফ্রান্স ও ইতালির মতো বড় শক্তি, কিন্তু সুইজারল্যান্ড তার নিজস্ব \'সুইস পরিচয়\' তৈরি করেছে যেখানে চারটি ভাষা ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি একটি শক্তিশালী নিরপেক্ষতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের কাঠামোয় একত্রিত। এই পরিচয়ই সুইজারল্যান্ডকে সার্বভৌম রেখেছে, সামরিক শক্তি নয়।

বাল্টিক রাষ্ট্রগুলো সোভিয়েত দখলদারিত্বের পঞ্চাশ বছরেও নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি ও পরিচয় আঁকড়ে ধরে ছিল। ১৯৯১ সালে স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের সময় সেই পরিচয়ই তাদের \'রেজিলিয়েন্স\'-এর মূল শক্তি হয়েছিল।

\'বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ\' না থাকলে কী হতো: একটি কাউন্টারফ্যাকচুয়াল বিশ্লেষণ

রাষ্ট্রবিজ্ঞানে \'কাউন্টারফ্যাকচুয়াল বিশ্লেষণ\'  অর্থাৎ \'যদি এমন না হতো তাহলে কী হতো\' একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি। যদি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের বদলে কেবল \'বাঙালি জাতীয়তাবাদ\'ই রাষ্ট্রের মতাদর্শিক ভিত্তি থাকত, তাহলে কী ঘটতে পারত?

প্রথমত, ভারত একটি \'বৃহত্তর বাঙালি\' আখ্যান ব্যবহার করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের নৈতিক ভিত্তি পেত। সাংস্কৃতিক আধিপত্যের দাবি করা হতো সহজ। 

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের সাথে রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের একটি টানাপোড়েন তৈরি হতো। 

তৃতীয়ত, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো  যারা \'বাঙালি\' নয়  তারা রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের বাইরে পড়ে যেত, বিচ্ছিন্নতার ক্ষেত্র তৈরি হতো।

সিকিমের পরিণতি এখানে একটি সতর্ক দৃষ্টান্ত। ১৯৭৫ সালে ভারতীয় কূটনৈতিক চাপ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজনের সুযোগ নিয়ে সিকিমকে ভারতভুক্ত করা হয়। সিকিমের নিজস্ব শক্তিশালী জাতীয় পরিচয়ের অনুপস্থিতি এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সেই একীভূতকরণকে সম্ভব করেছিল। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একটি দুর্বল জাতীয় পরিচয় একই ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারত।

নব্য-সার্বভৌমত্ব তত্ত্ব: জাতীয়তাবাদ একুশ শতকে

একুশ শতকে সার্বভৌমত্বের ধারণা পরিবর্তিত হয়েছে। স্টিফেন ক্রাসনার দেখিয়েছেন, আধুনিক যুগে \'ওয়েস্টফালিয়ান সার্বভৌমত্ব\' অনেক ক্ষেত্রেই \'হাইপোক্রিটিক্যাল\'  অর্থাৎ নামে আছে, কিন্তু বাস্তবে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো দুর্বল রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে। এই বাস্তবতায় দুর্বল রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো একটি শক্তিশালী জনমত তৈরি করা  ভেতরে এবং বাইরে উভয় দিকে।

ভেতরে: জনগণের মধ্যে এমন একটি রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের বোধ তৈরি করা, যা বাইরের হস্তক্ষেপকে \'জাতীয় অবমাননা\' হিসেবে দেখে এবং প্রতিরোধ করে। 

বাইরে: আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একটি স্বতন্ত্র, সুনির্দিষ্ট পরিচয়ের রাষ্ট্র হিসেবে নিজেকে হাজির করা  যেটা অন্য কারো অনুপ্রাণিক সম্প্রসারণ নয়।

জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ঠিক এই দুটি কাজই করেছিল। \'বাংলাদেশ আমার\'  এই বোধটি কেবল আবেগীয় নয়, এটি রাজনৈতিক। এটি জনগণকে বলে: এই ভূখণ্ড তোমার, এই রাষ্ট্র তোমার, এর ভবিষ্যৎ তোমার হাতে। এই বোধ যখন গভীরে প্রোথিত হয়, তখন বাইরের শক্তির পক্ষে সেই জনগণকে ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়ে।

সমালোচনা ও সীমাবদ্ধতা: একটি সৎ মূল্যায়ন

যেকোনো বিশ্লেষণ সৎ হতে হলে সমালোচনাকে উপেক্ষা করা চলে না। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে কিছু সমালোচনা রয়েছে যা বিবেচনায় নেওয়া দরকার।

প্রথমত, এই জাতীয়তাবাদ সামরিক শাসনামলে জন্ম নিয়েছিল  ফলে এর গণতান্ত্রিক বৈধতা নিয়ে পরিকল্পিত প্রশ্ন ওঠানো হয়েছে। দ্বিতীয়ত, \'বাংলাদেশি\' পরিচয় কখনো কখনো সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়কে পরিচয়ের কেন্দ্র থেকে বাইরে রাখে কিনা  এই উদ্বেগও লক্ষ্যনীয়। তৃতীয়ত, এই জাতীয়তাবাদকে ব্যবহার করে কখনো অতিরিক্ত \'ভারত-বিরোধিতা\' উসকে দেওয়ার প্রবণতা দেখা যেতে পারে, যা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

কিন্তু এই সীমাবদ্ধতাগুলো মূল যুক্তিকে খণ্ডন করে না। একটি রাজনৈতিক মতবাদের জন্মের ক্ষন এবং তার মূল কার্যকারিতা আলাদা বিষয় তবে প্রসঙ্গ গুরুত্বপূর্ণ । বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি শক্তিশালী স্বতন্ত্র পরিচয়ের প্রয়োজন ছিল এবং এখনো আছে,  কীভাবে সেই পরিচয় আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গণতান্ত্রিক হবে, সেটা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে, কিন্তু পরিচয়ের প্রয়োজনীয়তা বিতর্কের উর্ধ্বে ।

উপসংহার:  রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রতিটি প্রধান ধারা যেমন- রিয়েলিজম, লিবারেলিজম, কনস্ট্রাক্টিভিজম  তার নিজস্ব ভাষায় একটি বিষয়কে সত্য বলে: দুর্বল রাষ্ট্রের শক্তি হলো তার  পরিচয়ে। যে রাষ্ট্র জানে সে কে, সে কোথায় যেতে চায় এবং সে কীসের জন্য দাঁড়িয়ে আছে সে রাষ্ট্র অনেক কঠিন পরিস্থিতিতেও নিজেকে হারিয়ে ফেলে না।

ভারতের পেটের ভেতরে  তিন দিক থেকে আবৃত একটি ছোট রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের সামনে দুটি পথ ছিল: নিজেকে হারিয়ে ফেলা অথবা নিজেকে আরও স্পষ্টভাবে আবিষ্কার করা। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান দ্বিতীয় পথটি বেছে নিয়েছিলেন। \'বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ\' সেই পথের দার্শনিক মানচিত্র।

এই মানচিত্রে হয়তো ভুলভ্রান্তি আছে, এতে সংশোধন দরকার আছে। কিন্তু এই মানচিত্র ছাড়া যাত্রাটা কখনোই সম্ভব ছিল না। ভূগোলের নিষ্ঠুরতাকে পরিচয়ের শক্তিতে মোকাবেলার এই কৌশল এটিই বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রকৃত রক্ষাকবচ।  একুশ শতকে, যখন সীমানা পেরিয়ে সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক প্রভাবের শক্তি আরও বেড়েছে, তখন এই রক্ষাকবচের প্রাসঙ্গিকতা আরও বেশি ।

লেখক- ইতিহাস, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক।