img

শেখ হাসিনার ‘জেদ’ এর কারণেই পদ্মা সেতুর স্বপ্ন আজ বাস্তব

প্রকাশিত :  ১৩:৩০, ০৭ জুলাই ২০২২

শেখ হাসিনার ‘জেদ’ এর কারণেই পদ্মা সেতুর স্বপ্ন আজ বাস্তব

পদ্মা সেতু উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের বিস্তারিত লেখার আগে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে প্রমত্ত পদ্মার বুকে কি ভাবে পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলো তা আমি আজকের লেখায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংসদে দেয়া প্রশ্নোত্তর পর্বে বি্স্তারিত যা বলেছেন তা—ই আমি তুলে ধরছি। যার ফলে আমার পাঠকরা সত্যিকারের পদ্মা সেতুর ইতিহাস জানতে সুবিধা হবে। গত ২৯ জুন বুধবার জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তরে সরকারী দলের সংসদ সদস্য মেরিনা জাহানের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন — 

“ষড়যন্ত্রের কারণে আমাদের সেতু নির্মাণ দুই বছর বিলম্ব হয়েছে কিন্তু আমরা শেষ পর্যন্ত অন্ধকার ভেদ করে আলোর মুখ দেখেছি। দেশি ও বিদেশি সকল যড়যন্ত্র এবং বাধা — বিপত্তি পেরিয়ে পদ্মা সেতুর স্বপ্ন আজ বাস্তবে রূপ পেয়েছে।” 

এ সেতুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের আবেগ, আমাদের সৃজনশীলতা, আমাদের সাহসিকতা, সহনশীলতা এবং আমাদের প্রত্যয়। আমরা এ সেতু করবোই এই  ‘জেদ’। শেষ পর্যন্ত অন্ধকার ভেদ করে আমরা আলোর মুখ দেখেছি। পদ্মার বুকে জ্বলে উঠেছে লাল, নীল, সবুজ, সোনালী আলোর ঝলকানি। ৪২টি স্তম্ভ যেন স্পর্ধিত বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বলেছিলেন, বাঙালীকে কেউ দাবায়ে রাখতে পারবেনা, পারেনি। আমরা বিজয়ী হয়েছি। 

আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৬ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর পদ্মা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ  গ্রহণ করা হয়। ২০০১ সালের ৪ জুলাই মাওয়া  মাওয়া পয়েন্টে আনুষ্ঠানিক ভাবে আমি পদ্মা সেতুর ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করি। কিন্তু ২০০১ সালে বিএনপি জামাত জোট সরকার ক্ষমতায় এসে মাওয়া প্রান্তে সেতু নির্মাণের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। তারা জাপান সরকারকে পুনরায় মানিকগঞ্জের আরিচা প্রান্তে পদ্মা সেতুর জন্য সমীক্ষা করতে বলে। দ্বিতীয়বার সমীক্ষার পর জাপান মাওয়া প্রান্তকেই নির্দিষ্ট করে পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রতিবেদন পেশ করে। 

২০০৯ সালে দায়িত্ব গ্রহণের পর পদ্মা সেতু নির্মাণকে সর্বোচ্চ অধিকার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বল্পতম সময়ের মধ্যে সেতুর বিন্তারিত ডিজাইন প্রণয়নের লক্ষ্যে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং প্রকল্পের বিভিন্ন প্যাকেজে বিস্তারিত ডিজাইন চূড়ান্ত করা হয়। ২০১১ সালের এপ্রিল থেকে জুন মাসের মধ্যে সেতু প্রকল্পে অর্থায়নের বিষয়ে বিশ্ব ব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), জাইকা ও ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এর সাথে ঋন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রকল্পের বিভিন্ন প্যাকেজের নির্মাণ কাজ তদারকির জন্য পরামর্শক প্রতিণ্ঠান নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দূনীর্তির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনে বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাইকা এবং আইডিবি ঋণচুক্তি স্থগিত করে। সর্বশেষে ২০১৭ সালে কানাডার টরেন্টোর একটি আদালতে দুনীর্তির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে বিশ্বব্যাংক এ প্রকল্পে ফের ফিরে আসার ঘোষণা দিলেও দেশ ও জনগণের স্বার্থে বিশ্বব্যাংকের ঋণ গ্রহণ না করে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের সাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। বহু কাঙ্খিত পদ্মা সেতু প্রকল্পের সূচনালগ্নে দেশি, বিদেশী যড়যন্ত্র, চ্যালেঞ্জসমূহের উত্তরণ এবং হার না মানা সুদৃঢ় মনোবলের মাধ্যমে সব প্রতিকূলতাকে জয় করে এ সেতু আজ স্বপ্ন নয়, একটি দৃশ্যমান বাস্তবতা। 

শেখ হাসিনা বলেন, এতে কোটি কোটি দেশবাসীর সঙ্গে আমিও আনন্দিত, গর্বিত এবং উদ্বেলিত। অনেক বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে আর ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে প্রমত্ত পদ্মার বুকে আজ বহু—কাঙ্খিত সেতু দঁড়িয়ে গেছে। এ সেতু শুধু ইট—সিমেন্ট—ষ্টিল—লোহা—কংক্রিটের একটি অবকাঠামো নয় এ সেতু আমাদের অহংকার, আমাদের গর্ব, আমাদের সক্ষমতা আর মর্য্যাদার প্রতীক। এ সেতু বাংলাদেশের জনগণের। 

পদ্মা সেতু চালু হওয়ার ফলে দেশের দক্ষিণ—পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে অন্যান্য অঞ্চলের রেল যোগাযোগ সৃষ্টি, ব্যবসা—বাণিজ্যের বিকাশ, কৃষি, ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্প, ক্ষুদ্রশিল্প ইত্যাদির ক্ষেত্রে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, জাতীয় ও আঞ্চলিক অর্থনীতির বিস্তৃত ক্ষেত্রেও প্রভাব সৃষ্টি সহ দেশের বিভক্ত দুটি অঞ্চলকে একত্রিভূত করে রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক, সাংস্কৃতিক এবং সার্বিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করবে বলে প্রধানমন্ত্রী বলেন। তিনি বলেন, “পদ্মা সেতুকে ঘিরে সৃষ্ট অর্থনৈতিক কর্মকান্ড একদিকে যেমন বেকারত্ব হ্রাসে ভূমিকা পালন করবে তেমনি দারিদ্র দূরীকরণেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।” (সূত্র: ইউকেবিডিটিভি.কম) 

সেতু নিমার্ণের বিস্তারিত বিবারণ: 

মূল সেতু নির্মাণের কাজ করছে চীনের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানী ও নদী শাসনের কাজ করছে দেশটির আরেকটি প্রতিণ্ঠান সিনো হাইড্রো করপোরেশন। দুটি সংযোগ সড়ক ও অবকাঠামো নির্মাণ করেছে বাংলাদেশের আব্দুল মোমেন লিমিটেড। ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই বহুমুখী সেতুর মূল আকৃতি হচ্ছে দোতলা। কংক্রিট ও স্টিল দিয়ে নির্মিত হয়েছে সেতুর মূল কাঠামো। 

 সেতু নির্মাণের সকল  অনিশ্চয়তা কাটে ২০১৩ সালে,  যখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজম্ব অর্থায়নে সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেন। তবে এর আগে সেতুতে পরিবর্তন আসে। যুক্ত হয় রেলপথ। ২০১৫ সালের ১৫ই ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকার পদ্মা সেতু প্রকল্পের অবকাঠামো নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন। তখন পরিকল্পনা ছিলো ২০১৮ সালের নভেম্বরে সেতুর কাজ শেষ হবে। কিন্তু কারিগরি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দুই দফা বেড়েছে সেতুর নির্মাণ সময়। নদীর তলদেশে কাঙ্খিত পাথরের স্তর না থাকায় সেতুর ১১টি পিলারের নকশা পরিবর্তন করা হয়েছে। চূড়ান্ত নকশা হয় ২০১৮ সালের জানুয়ারীতে। এর পর থেকেই পর্য্যায়ক্রমে কাজ চলতে থাকে। বিভিন্ন চড়াই উৎরাই পেরিয়ে শেষ পর্য্যন্ত ২০২২ সালের ২২শে জুন কাজ সম্পুর্ণভাবে সেতুর কাজ শেষ করার পর বাংলাদেশের সেতু কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ। এরপর ২৫শে জুন শনিবার মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কষ্টের ফসল প্রমত্ত পদ্মার বুকে নির্মিত দ্বিতল বিশিষ্ট বহুমুখী পদ্মা সেতু প্রকল্পটির উদ্বোধনীর মধ্য দিয়ে সফল বাস্তবায়ন ঘটলো। জাতির পিতা মরহুম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বাংলাদেশের বুকে রেখে দিলেন তাঁর এক অনবদ্য কীর্তি পদ্মা সেতু।  মূলত: পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে বাংলাদেশ বিরোধী চক্রের কথিত দুনীর্তির অভিযোগ পাওয়ার পর  বিশ্বব্যাংক সরে যাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘জেদ’ ধরলেন যে, আমাদের নিজস্ব অর্থায়নেই পদ্মা সেতু নির্মাণ করবো। আর এই ‘জেদের’ ফসলই আজকের এই পদ্মা সেতু। ছোটবেলায় মুরুব্বিদের কাছে শুনেছি ভাল কাজ করার জন্য ‘জেদ’ ধরলে জীবনে কৃতকার্য্য হওয়া যায়। তার প্রমাণ আজ পেলাম আমাদের প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে। আর এ কারণেই আমি তাঁকে ‘লৌহ মানবী’ বলে আখ্যায়িত করি। 

পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান : 

বাংলাদেশের দীর্ঘতম পদ্মা সেতু গত ২৫শে জুন ২০২২ শনিবার লাখো মানুষের উপস্থিতিতে ফলক উন্মোচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ‘লৌহ মানবী’ শেখ হাসিনা শুভ উদ্বোধন করেন। এ সময় পদ্মার দু’পাড়ে মাওয়া ও জাজিরায় ছিলো লাখো মানুষের মধ্যে আনন্দের উৎসব। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী প্রথম টোল দিয়ে এ সেতু পার হন। এ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পদ্মা সেতুতে আনুষ্ঠানিক ভাবে গাড়ি চলাচল শুরু হলো। পরদিন ২৬শে জুন রবিবার থেকেই যান চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হয় পদ্মা সেতু। এই সেতু উদ্বোধনীর মধ্য দিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের জেলার সে্ঙ্গ ঢাকা সহ সারা দেশের সাথে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হলো। এর ফলে দক্ষিণাঞ্চলে যাতায়াতের সময় এবং খরচ দুই—ই কমেছে। ফেরির জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা আর অপেক্ষা করতে হবেনা। 

এক সময়ে ফেরিতে এই পদ্মা নদী পাড়ি দিতে এপার এবং পাড়ের মানুষের যে ভোগান্তি পোহাতে হয়েছিলো আজ তার অবসান ঘটলো। খরে¯্রাতা ভয়াল এই পদ্মা নদী পাড়ি দিতে গিয়ে ল্ঞ্চ ডুবিতে কত মানুষের যে অকাল মৃত্যু হয়েছে তা একমাত্র ভুক্তভোগিরাই জানে। 

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগ সহ বিভিন্ন দলের বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। বিএনপি নেতৃবৃন্দকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও তারা আসেননি। এ ছাড়াও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সংসদের  স্পীকার, প্রধান বিচারপতি, মন্ত্রি পরিষদের সদস্য, সংসদ সদস্য, বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর, কূটনীতিক সহ বিভিন্ন পেশাজীবি সংগঠনের প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষ। 

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সভাপতিত্বে এ সমাবেশে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, মন্ত্রি পরিষদ সচি্ব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম ও পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের পরিচালক মো: শফিকুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে ভাষণ শেষে স্মারক ডাক টিকিট, স্যুভেনির শিট, উদ্বোধনী খাম, সিলমোহর ও ১০০ টাকার স্বারক নোট উদ্বোধন করা হয়। 

সুধী সমাবেশে বক্তব্য প্রদানকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা সেতুকে ‘বাংলাদেশের গর্ব, সম্মান ও মর্যাদার প্রতীক’ আখ্যায়িত করে বলেন, “সব ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে বহুল প্রতীক্ষিত সেতুটি এখন প্রমত্তা পদ্মার বুকে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, লাল, নীল, সবুজ, সোনালী আলোর ঝলকানী। ৪১টি স্প্যান যেন স্পর্ধিত বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি।” 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আজকে বাংলাদেশের মানুষ গর্বিত। সেই সঙ্গে আমিও আনন্দিত এবং উদ্বেলিত। অনেক বাঁধা — বিপত্তি উপেক্ষা করে এবং ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে আজকে আমরা এই পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে সমর্থ হয়েছি।” 

এই সেতু শুধু একটি সেতু নয়, এই সেতু দুই পারের যে বন্ধন সৃষ্টি করেছে, তাই নয়, এই সেতু শুধু ইট— সিমেন্ট— স্টিল— লোহার কংক্রিটের একটি অবকাঠামো নয— এ সেতু আমাদের অহঙ্কার, আমাদের গর্ব, আমাদের সক্ষমতা আর মর্যাদার প্রতীক। 

তিনি আরও বলেন, পদ্মা সেতু নির্মান কাজের গুণগত মান নিয়ে কোনো আপোস করা হয়নি। এই সেতু নির্মাণে রয়েছে বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও উপকরণ দিয়ে, সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা বজায় রেখে। 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই সেতুর উপরের ডেক দিয়ে যানবাহন এবং নীচের ডেক দিয়ে চলাচল করবে ট্রেন। সেতুর রেল লাইন চালু হলে পর সড়ক ও রেলপথে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলার সঙ্গে রাজধানী ঢাকার সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে। এর ফলে একদিকে যেমন এ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘ দিনের ভোগান্তি লাঘব হবে অন্যদিকে অর্থনীতি হবে বেগবান। তাদের ব্যবসা বানিজ্যের প্রসার ঘটবে এবং জীবন যাত্রার মানোন্নয়ন হবে। আশা করা যাচ্ছে, এ সেতু জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে ১ দশমিক ২৩ শতাংশের বেশি হারে অবদান রাখবে এর ফলে দারিদ্র নিরসন হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এ সেতুকে ঘিরে গড়ে উঠবে অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্ক। ফলে দেশি বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে এবং দেশে শিল্পায়নের গতি ত্বরান্বিত হবে। পদ্মা সেতু এশিয়ান হাইওয়ের সাথে সংযোগের একটা বড় লিংক। তাই আঞ্চলিক বাণিজ্যে এই সেতুর ভূমিকা অপরিসীম। 

নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণকে বাংলাদেশের ‘বিশাল অর্জন’ বলে জানিয়েছেন বিশ্বব্যাংকের আবাসিক প্রতিনিধি মার্সি টেম্বন। 

শনিবার সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় উন্নয়ন অংশীদার। আমরা এই সেতুর গুরুত্ব বুঝতে পারি। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষ ব্যাপক ভাবে অর্থনৈতিক সুবিধা পাবে। পদ্মা সেতুর ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে,্ ভ্রমণের সময় কমে আসবে। কম সময়ে 

কৃষক খামারে উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করতে পারবেন। সব মিলিয়ে পদ্মা সেতু এই অঞ্চলের সমৃদ্ধি বয়ে আনবে এবং কমাবে দারিদ্রতাও। পদ্মা সেতু উদ্বোধন হওয়ায় তিনি আনন্দ প্রকাশ করে বলেন, এ সেতুর কাজ শেষ হওয়ায় বাংলাদেশ লাভবান হবে। উল্লেখ্য যে, পদ্মা সেতুতে অর্থায়নে বিশ্বব্যাঙ্ক চুক্তিবদ্ধ হওয়ার পর দুনীর্তির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে পিছু হঠেছিলো বিশ্বব্যাংক। এ নিয়ে দীর্ঘ টানাপোড়নের পর সরকার নিজ অর্থায়নে এই সেতু নির্মাণের পথে এগিয়ে যায়। ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকায় (৩.৮৭ বিলিয়ন ডলার) নির্মিত এই সেতুর উদ্বোধন হয়েছে গত শনিবার ২৫শে জুন।   

পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান দেখে দেশের মানুষ খুশীতে আবেগ আপ্লুত হয়ে পরে,্ বিশেষ করে পদ্মা পারের মানুষের আনন্দটাই  ছিলো বেশি। কারণ এই ভয়ঙ্কর পদ্মাই ছিলো তাদের জন্য কাল। তাদের অনেকেই বংশ পরম্পরায় হারিয়েছে মা বাবা, ভাই বোন , স্বামী, ছেলে— মেয়ে, আত্মীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধব এই পমত্তা পদ্মার পানিতে। আর তাদের আনন্দ এখানেই যে, পদ্মার পানিতে পড়ে আর মরতে হবেনা। এখন এই সেতুর ্উপর দিয়েই হবে তাদের নিরাপদ চলাচল। 

আমার কাছে একটি ব্যাপার খুবই বেমানান লাগছে যে, ২৫জুন সেতু উদ্বোধন হলো। সবাই আনন্দ উল্লাস করলো কিন্তু পদ্মা পারের যে মানুষগুলো বেশি খুশী হলো তাদের কাঙ্খিত সে্ই পদ্মা সেতুটি উপরে ওঠার কোন সুযোগ দেয়া হলো না। আমার মতে সেতু কর্তৃপক্ষ এটা খুবই অন্যায় কাজ করেছেন। 

২৫জুন জনগণের আকাঙ্খিত পদ্মা সেতু উদ্বোধন করে্ই তড়িঘরি করে পরদিন ২৬ তারিখ থেকেই যান চলাচল শুরু করে দেয়ার কারণ আমার বোধগম্য হলো না। শুধুমাত্র পদ্মার দু’পারের মানুষই নয়, বহু দূর দূরান্ত থেকে মানুষ তাদের দীর্ঘ দিনের প্রতিক্ষিত এই সেতুটি দেখার জন্য এসেছিলেন। তাদের আশা ছিলো, সেখানে গিয়ে পরিবার পরিজন, বন্ধু — বান্ধব নিয়ে একটা ফটো তুলবে, ভিডিও করবে, বাড়িতে গিয়ে সবাইকে আনন্দ করে দেখাবে। আর এই ছবি এবং ভিডিওগুলো হতো তাদের বংশ পরম্পরার জন্য একটা ইতিহাস। তাদের সে আশা হলো গুড়ে বালি! 

আমার মতে, সেতু উদ্বোধন হওয়ার পর অন্তত: কয়েকটা দিন সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত রাখা দরকার ছিলো্। তখন মানুষগুলো তাদের শখ মিটিয়ে সেতুটি দেখতে পারতো। মনের আশা পূরণ করতে পারতো। 

এ দিকে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পরদিনই দেখা গেলো ব্রিজের একপাশের একটি জায়গায় একজন লোক একটি নাটবল্টু হাত দিয়ে খুলছে। এ সময় আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোকজন তাকে  ধরে ফেলে। বিচারের আওতায় তাকে নেয়া হবে। তবে সেতুতে যারা কর্মরত তারা বলছেন, সেতুর ছোট ছোট কিছু কাজ বাকি রয়েছে ঐ কাজগুলো যানবাহন চলাচল থাকলেও আমাদের কাজ চলবে। কিন্তু কথা হচ্ছে, তাদের যদি জানা ই থাকে, তাহলে যে সব জায়গার কাজ শেষ হয়নি সে সব জায়গাগুলোতে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে টহলে রাখা হলো না কেন। সরকার এবং রেল কর্তৃপক্ষ ভালো করেই জানেন যে, সেতুটি এখন চক্রান্তকারীদের নজরে। তারা যেখানেই সুযোগ পাবে, একটা কিছু ঘটাতে মারিয়া হয়ে কাজ করবে। সুতরাং সেতুটি নিরাপদ রাখার স্বার্থে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সর্বদা সতর্ক অবস্থায় রাখতে হবে। সেতুতে চলাচলে জনসাধারণের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হলে, এর দায়ভার সরকারের উপরই পরবে। অতএব সময় থাকতে সাবধান হতে হবে। 


মতামত এর আরও খবর

img

ডলারের আধিপত্য ধ্বংস করতে চীনের ‘ট্রেজারি–কৌশল’

প্রকাশিত :  ১৩:৩৪, ০১ জুন ২০২৬

জাসিম আল-আজ্জাউই

 চীন যখন ২০২৬ সালের বসন্তে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সিকিউরিটিজে নিজেদের বিনিয়োগ কমাতে শুরু করল, তখন ওয়াশিংটনের মূলধারার অনেক বিশ্লেষক স্বভাবগতভাবেই একে ‘স্বাভাবিক’ বা ‘রুটিন’ ঘটনা বলে আখ্যা দেন। কিন্তু তাঁদের তা করা উচিত ছিল না। যা ঘটছে, তা আসলে এক দশকব্যাপী কৌশলের চূড়ান্ত পরিণতি; একটি পরিকল্পনা, যা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে গড়ে তোলা হয়েছে, যাতে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার সর্বোচ্চ মুহূর্তে চীন চাইলে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ গ্রহণ ব্যয়কে কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।

পরিসংখ্যানগুলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ২০১৩ সালে চীনের হাতে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সিকিউরিটিজের পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তা নেমে আসে ৬৯৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে এবং পরের মাসে আরও কমে দাঁড়ায় ৬৫২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে।

শুধু ২০২৬ সালের মার্চ মাসেই বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মোট মার্কিন ট্রেজারি ধারণ ১৩৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার কমে যায়। একই সময়ে শীর্ষ ১০ বিদেশি ধারকের মধ্যে জাপান, চীন, বেলজিয়াম, কানাডা, ফ্রান্সসহ সাতটি দেশ একযোগে তাদের ঝুঁকি বা এক্সপোজার কমিয়ে আনে।

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ এল-এরিয়ান এ পরিবর্তনকে সরাসরি একটি কাঠামোগত রূপান্তর হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বাজারে চীনের অংশীদারত্ব এখন মাত্র ৭ শতাংশে নেমে এসেছে, যা ‘১৫ বছর আগে অর্জিত ২৮ শতাংশের সর্বোচ্চ অবস্থানের এক-চতুর্থাংশ মাত্র।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ধারাবাহিকভাবে নতুন ঋণপত্র ইস্যুর পরিপ্রেক্ষিতে এই পতন আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক কাঠামো মূলত ধারাবাহিকভাবে আগ্রহী ঋণদাতাদের ওপর নির্ভরশীল। ওয়াশিংটন সামরিক ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, ফেডারেল কর্মচারীদের বেতন এবং বৈদেশিক প্রতিশ্রুতিগুলোর অর্থায়নের জন্য নিয়মিত বাজেটঘাটতি পরিচালনা করে এবং সেই ঘাটতি পূরণ করে নতুন ঋণ ইস্যুর মাধ্যমে।

এমন পরিস্থিতিতে চীনের মতো বড় ঋণদাতা যখন পিছু হটতে শুরু করে, তখন এর গাণিতিক প্রভাব অত্যন্ত কঠোর হয়। এর ফলে ট্রেজারির সুদের হার (ইয়িল্ড) বাড়ে, পুরোনো ঋণ নবায়নের ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং বিদেশি চাহিদা কমে যাওয়ায় ডলারের ওপরও চাপ সৃষ্টি হয়।

    প্রকৃত প্রশ্নটি আসলে এই নয় যে মার্কিন ডলার রাতারাতি তার বৈশ্বিক আধিপত্য হারাবে কি না। তা হবে না। আসল প্রশ্ন হলো, চীনের পদক্ষেপগুলো কি অন্য দেশগুলোকে একই সময়ে ডলারভিত্তিক ব্যবস্থার বাইরে সরে যেতে উৎসাহিত করবে?

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে চীন যখন নিজেদের ব্যাংকগুলোকে ট্রেজারি বিনিয়োগ কমানোর পরামর্শ দেয়, তখন অর্থনীতিবিদ পিটার শিফ বিষয়টি নিয়ে তাঁর স্বভাবসুলভ সরাসরি মন্তব্য করেন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের সাবেক কর্মকর্তা এবং বর্তমানে কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের গবেষক ব্র্যাড সেটসারের মতে, যদি চীন তাদের পুরো ট্রেজারি পোর্টফোলিও বিক্রি করে দেয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি সুদের হার প্রায় ৩০ বেসিস পয়েন্ট পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই হিসাব কেবল সরাসরি বাজারগত প্রভাবকে বিবেচনায় নেয়; অন্য বৈশ্বিক ঋণদাতাদের মধ্যে সম্ভাব্য আতঙ্ক বা চেইন-রি–অ্যাকশনের প্রভাব এতে ধরা হয়নি।

বহু বছর ধরে চীন নীরবে একটি বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তুলছে। তাদের লক্ষ্য হলো, যদি কখনো তারা মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতে বা তা থেকে সরে আসতে চায়, তাহলে যেন নিজেদের অর্থনীতি কোনো বড় ধাক্কা না খায়। এটিকে এমনভাবে ভাবা যায় যে চীন একটি সম্পূর্ণ নতুন আর্থিক ‘এলাকা’ গড়ে তুলছে, যাতে ভবিষ্যতে আর যুক্তরাষ্ট্রের ‘বাড়িতে’ বসবাস করতে না হয়। তারা এটি যেভাবে করছে:

বৈশ্বিক অবকাঠামো তৈরির ‘মহাযাত্রা’: চীন বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) নামে একটি বিশাল প্রকল্প শুরু করেছে, যা ১৪০টির বেশি দেশকে অন্তর্ভুক্ত করে। সারা বিশ্বে সড়ক, বন্দর, সেতু ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণে তারা প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। উদ্দেশ্য হলো, এসব দেশ যেন যুক্তরাষ্ট্রের ডলার ব্যবহার না করেও সরাসরি চীনের সঙ্গে বাণিজ্য করতে পারে।

নিজস্ব আন্তর্জাতিক অর্থপ্রদানের ব্যবস্থা: চীন সীমান্তের বাইরে লেনদেনের জন্য সিআইপিএস নামে নিজস্ব অর্থ প্রদানের নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। ২০২৪ সালে এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ২৪ দশমিক ৪৭ ট্রিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ চীনা মুদ্রা ইউয়ানে লেনদেন সম্পন্ন হয়, যা আগের বছরের তুলনায় ৪২ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। এর পাশাপাশি চীন বিশ্বের ৪০টির বেশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে বিশেষ মুদ্রা বিনিময় (কারেন্সি সোয়াপ) চুক্তি করেছে।

বন্ধুদের সঙ্গে ডলারবিহীন বাণিজ্য: এটি আর কেবল তাত্ত্বিক পরিকল্পনা নয়; বাস্তবেও এর প্রয়োগ শুরু হয়ে গেছে। বর্তমানে চীন ও রাশিয়ার মধ্যকার প্রায় ৯৫ শতাংশ বাণিজ্য তাদের নিজস্ব স্থানীয় মুদ্রায় সম্পন্ন হয়। একইভাবে ২০২৪ সালে ব্রাজিল ও চীনের মধ্যকার প্রায় অর্ধেক বাণিজ্য ইউয়ানে পরিচালিত হয়েছে।

বিকল্প অর্থনৈতিক জোট গঠন: চীন ব্রিকস জোট সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এই জোটে এখন সৌদি আরব, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসর ও ইথিওপিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ তেলসমৃদ্ধ ও অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী দেশ যুক্ত হয়েছে। এই দেশগুলোকে একত্র করার মাধ্যমে চীন একটি সমান্তরাল বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার কাঠামোগত ভিত্তি নির্মাণ করছে; অর্থাৎ যদি কখনো মার্কিন নেতৃত্বাধীন আর্থিক ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে কিংবা চীন ইচ্ছাকৃতভাবে সেই ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্ক সীমিত করার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে তাদের কাছে ইতোমধ্যেই একটি বিকল্প বৈশ্বিক অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক প্রস্তুত থাকবে, যা স্বাধীনভাবে পরিচালিত হতে পারবে।

এসব কোনো আকস্মিক বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলো একটি ধারাবাহিক কৌশলগত পরিকল্পনার অংশ; প্রথমে বিকল্প পথ বা ‘প্রস্থানদ্বার’ তৈরি করা, তারপর ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং শেষ পর্যন্ত এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করা, যেখানে মার্কিন ট্রেজারি বাজারে একটি বড় পদক্ষেপ নেওয়া যাবে—যার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বার্তা হবে অত্যন্ত শক্তিশালী। কিন্তু এর ফলে চীনের নিজের অর্থনীতির জন্য বিপর্যয়কর ক্ষতি হবে না।

এই কৌশলের অংশ হিসেবেই পিপল’স ব্যাংক অব চায়না তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ক্রমশ সোনার দিকে সরিয়ে নিয়েছে। টানা ১৫ মাস ধরে সোনা কেনার পর চীনের স্বর্ণ মজুত রেকর্ড ২ হাজার ৩০৮ টনে পৌঁছেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই নীতির উদ্দেশ্য, স্পষ্টভাবে চীনের অর্থনীতিকে ‘নিষেধাজ্ঞা-প্রতিরোধী’ (স্যাংশন প্রুফ) করে তোলা। ২০২২ সালে রাশিয়ার সম্পদ জব্দ করার অভিজ্ঞতার সরাসরি প্রতিক্রিয়া হিসেবেই এই কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে।

এখানে ঝুঁকি শুধু অর্থের প্রবাহে নয়; বরং চীনের এই পদক্ষেপ অন্য দেশগুলোকে একই পথ অনুসরণ করার মনস্তাত্ত্বিক অনুমতি দিতে পারে। জাপান উদ্বেগের সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে; উপসাগরীয় তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো নীরবে তাদের সম্পদ বৈচিত্র্যময় করছে; আর দীর্ঘদিন ধরে ডলারকেন্দ্রিক আর্থিক ব্যবস্থার বিষয়ে সতর্ক থাকা তথাকথিত ‘গ্লোবাল সাউথ’ বা বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলো ক্রমেই ওয়াশিংটনের মুদ্রানীতির আধিপত্য থেকে প্রাতিষ্ঠানিক দূরত্ব খুঁজছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ)  তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে বৈশ্বিক বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে মার্কিন ডলারের অংশীদারত্ব নেমে এসেছে ৫৭ দশমিক ৮ শতাংশে, যেখানে ২০০১ সালে তা ছিল ৭২ শতাংশ। একই সময়ে বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তিন বছর ধরে প্রতিবছর এক হাজার টনের বেশি স্বর্ণ ক্রয় করেছে।

প্রকৃত প্রশ্নটি আসলে এই নয় যে মার্কিন ডলার রাতারাতি তার বৈশ্বিক আধিপত্য হারাবে কি না। তা হবে না। আসল প্রশ্ন হলো, চীনের পদক্ষেপগুলো কি অন্য দেশগুলোকে একই সময়ে ডলারভিত্তিক ব্যবস্থার বাইরে সরে যেতে উৎসাহিত করবে?

এই মুহূর্তে অনেক দেশ দ্বিধাগ্রস্ত। কিন্তু তারা যদি বুঝতে পারে যে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানো নিরাপদ, তাহলে সেটিই একটি ভবিষ্যদ্বাণীতে পরিণত হতে পারে। প্রথম কয়েকটি ‘ডমিনো’ যখন পড়ে যাবে, তখন বাকিগুলোও একে একে অনুসরণ করবে।

ওয়াশিংটনের পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ বাস্তবে রাজনৈতিক বক্তব্যে যতটা বড় করে দেখানো হয়, ততটা নয়। চীনের বিরুদ্ধে ব্যাপক আর্থিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে তার অভিঘাত যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাপর্যায়ে মূল্য, করপোরেট মুনাফা এবং সরবরাহব্যবস্থার ওপর সরাসরি পড়বে।

অ্যাপল, নাইকি ও টেসলার মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো গভীরভাবে চীনা উৎপাদন নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত। এ ছাড়া ইউএস–চায়না ইকোনিমক অ্যান্ড সিকিউরিটি রিভিউ কমিশন ইতিমধ্যেই উল্লেখ করেছে যে বেইজিংয়ের হাতে এসব পারস্পরিক নির্ভরশীলতাকে কৌশলগত অস্ত্রে পরিণত করার সক্ষমতা ক্রমশ বাড়ছে।

চীনকে আবার ট্রেজারি কেনায় ফিরিয়ে আনা বা বিক্রি বন্ধ করতে বাধ্য করার জন্য হয় এমন বাজার-প্রণোদনা প্রয়োজন, যা ওয়াশিংটন বর্তমানে দিতে পারছে না; অথবা এমন চাপ প্রয়োগের ব্যবস্থা প্রয়োজন, যার সবচেয়ে বড় মূল্য পরিশোধ করতে হবে মার্কিন ভোক্তাদেরই।

২০২৬ সালের বসন্তে সংঘটিত ব্যাপক বাজারপতন হয়তো একক কোনো বিস্ফোরণ নয়, যা মার্কিন ডলারকে ধ্বংস করে দেবে। কিন্তু এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় সতর্কসংকেত। বহু বছর ধরেই যাঁরা মনোযোগ দিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছেন, তাঁরা এই প্রবণতা আসতে দেখেছেন।

আগামী দিনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনিশ্চয়তা চীনের পরবর্তী পদক্ষেপ নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, জাপান, সৌদি আরব এবং গ্লোবাল সাউথের অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশ কি এই মুহূর্তকে নিজেদের অবস্থান পুনর্বিন্যাসের উপযুক্ত সময় হিসেবে দেখবে? যদি তারা তা–ই করে, তাহলে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ গতিপথ দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে।

    জাসিম আল-আজ্জাউই এমবিসি গ্রুপ, আবুধাবি টিভি এবং আল–জাজিরা ইংলিশে সংবাদ উপস্থাপক, অনুষ্ঠান সঞ্চালক এবং নির্বাহী প্রযোজক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।


(মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া)

মতামত এর আরও খবর