img

অভাগা মেয়েটি!

প্রকাশিত :  ১৯:৫৬, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৫

অভাগা মেয়েটি!

রেজুয়ান আহম্মেদ

নিরুর জীবনে আলো বলে কিছু ছিল না। জন্ম থেকেই যেন সে এক অনিবার্য অন্ধকারের সন্তান। দরিদ্রতার শেকলে বাঁধা এক পরিবারে তার জন্ম। বাবা ছিলেন দিনমজুর, মা গৃহিণী। সংসারের প্রতিটি দিন ছিল যুদ্ধের মতো—ক্ষুধা, অনাহার, আর একটুখানি আশার সন্ধানে প্রতিনিয়ত লড়াই।

নিরুর বাবা রফিক মিয়া নির্মাণস্থলে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। সকাল হলেই কাঁধে বেলচা নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন, ফিরতেন সূর্য ডোবার পর, ক্লান্ত শরীরে। মায়ের শরীর ভালো ছিল না। দীর্ঘদিন ধরে কাশিতে ভুগছিলেন। কিন্তু ডাক্তার দেখানোর মতো সামর্থ্য ছিল না তাদের।

চারজনের সংসারে অভাবের ছাপ ছিল স্পষ্ট। নিরুর ছোট ভাই রাসেল সবেমাত্র তিন বছর পেরিয়েছে। ওর জন্যও দু’বেলা পর্যাপ্ত খাবার জোটানো কঠিন হয়ে পড়ত। নিরুর পেটপুরে খাওয়ার স্বপ্ন ছিল বিলাসিতা।

একদিন দুপুরে বাবা কাজে গিয়েছেন, মা অসুস্থ শরীরে রান্নার চেষ্টায় ব্যস্ত। নিরু ভাইকে কোলে নিয়ে দরজার কাছে বসে ছিল। হঠাৎ দূর থেকে একটা চিৎকার শুনে সে দৌড়ে বাইরে যায়।

লোকজন ছুটে যাচ্ছে নির্মাণস্থলের দিকে। নিরুর বুক কেঁপে ওঠে। কিশোরী মনেও এক অজানা আশঙ্কা দানা বাঁধে। সে রাসেলকে মায়ের কাছে রেখে দৌড়ে যায় বাবার কর্মস্থলে। সেখানে গিয়ে দেখে মাটির নিচে কয়েকজন লোক পড়ে আছে। কেউ কেউ চিৎকার করছে। চারদিকে ধুলো আর ধোঁয়ার কুণ্ডলী।

লোকেরা বলল, \"রফিক মিয়া পড়ে গেছে! উপরে উঠানোর চেষ্টা চলছে!\"

নিরুর মাথা ঘুরে যায়। তার পা কাঁপতে থাকে। কিছুক্ষণ পর বাবাকে রক্তমাখা অবস্থায় বের করে আনা হয়। তার শ্বাস চলছিল না, হাত-পা নিথর।

লোকেরা হাসপাতালে নিয়ে গেলেও তাকে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি। রফিক মিয়ার মৃত্যু যেন নিরুর পরিবারের জীবনে এক অন্ধকার অধ্যায়ের সূচনা করল।

বাবার মৃত্যুর পর সংসার যেন দিশেহারা হয়ে পড়ল। মা আরও অসুস্থ হয়ে পড়লেন, ঘর চালানোর কোনো উপায় রইল না। নিরু বুঝতে পারল, এখন তাকে কিছু একটা করতেই হবে। কিন্তু কিভাবে?

মাসখানেক পর মা আবার বিয়ে করলেন। নিরুর নতুন সৎ বাবা ছিল রুক্ষ, মদ্যপ, আর নিষ্ঠুর। তিনি প্রতিদিন মদ খেয়ে মাতাল হয়ে বাড়ি ফিরতেন, নিরুর মাকে মারধর করতেন। একদিন রাগের বশে নিরুকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেন।

\"এই বাড়িতে তোর জায়গা নেই! তোকে খাওয়ানোর দায় আমার না!\" চিৎকার করে বললেন তিনি।

নিরু সেই রাতে আর সহ্য করতে পারল না। মাকে বিদায় না জানিয়েই সে ঘর ছেড়ে পালিয়ে যায়।

বাইরের পৃথিবী কি তার জন্য নিরাপদ? সে কি নতুন জীবনের সূচনা করতে পারবে, নাকি আরও ভয়ংকর অন্ধকার অপেক্ষা করছে তার জন্য?

নিরুর জীবন যেন এক অনন্ত অন্ধকারের মধ্যে তলিয়ে যাচ্ছে। বাবার মৃত্যু, সৎ বাবার অত্যাচার, অনাহার, অবহেলা—সব মিলিয়ে তার শৈশবটা কেবল বেঁচে থাকার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। কিন্তু নিরুর কিশোর মন তখনো একটুখানি আশার আলো খুঁজতে চায়।

সেই আশায়ই একদিন সে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যায়, ভাবতে থাকে, বাইরে হয়তো কেউ তাকে সাহায্য করবে, একটু ভালোবাসবে। কিন্তু শহরের রাস্তাগুলো যেন আরও বেশি নির্মম। ক্ষুধার্ত নিরু দিনের পর দিন পথে পথে ঘুরতে থাকে। কখনো ভিক্ষা করে, কখনো আবর্জনার স্তূপ থেকে খাবার খুঁজে খায়।

একদিন সে এক বিশাল বিপদের সম্মুখীন হয়। এক মধ্যবয়স্ক নারী তার প্রতি সহানুভূতি দেখিয়ে তাকে খাওয়ানোর প্রস্তাব দেয়। নিরুর মনে একটুখানি আশার সঞ্চার হয়। সে ভাবতে পারে না যে দয়ালু চেহারার এই মানুষটিও তার জন্য ফাঁদ পেতে রেখেছে।

নারীটি তাকে নিয়ে যায় ঢাকা শহরের কাকরাইল এলাকার এক অন্ধকার গলির মধ্যে। সেখানে কয়েকজন পুরুষ আগে থেকেই অপেক্ষা করছিল। নিরু আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। তার ভেতরের সমস্ত চিৎকার যেন শব্দহীন হয়ে যায়। সে বোঝে, এখানে কেউ তাকে সাহায্য করবে না।

কিন্তু নিরু সহজে হার মানার মেয়ে না। সে প্রাণপণে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করে। এক সুযোগে সে পালিয়ে যায়। ছুটতে ছুটতে সে বেইলী রোডের এক ধনী ব্যক্তির বাড়ির সামনে এসে পড়ে। দরজায় কড়া নাড়তেই এক দয়ালু চেহারার নারী বেরিয়ে আসেন। নিরু কাঁদতে কাঁদতে বলে, \"আমাকে একটু সাহায্য করুন!\"

নারীটি তাকে ঘরে নিয়ে যান, খাবার দেন, পরিচ্ছন্ন কাপড় দেন। নিরু ভাবে, হয়তো এবার সে সত্যিই নিরাপদ। কিন্তু কিছুদিন পরেই সে বুঝতে পারে, এটি ছিল আরেকটি ফাঁদ। এই পরিবারও একদিন তাকে অন্য কারও কাছে বিক্রি করে দেবে।

নিরু আরেকবার পালিয়ে যায়। সে বুঝতে পারে, এই ঢাকা শহর তার জন্য নয়। এখানে শুধু শোষণ আর প্রতারণা।

সে একদিন কমলাপুর রেলওয়ে এক এনজিও স্কুলের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। স্কুলের ভিতর থেকে শিশুদের হাসির শব্দ শুনতে পায়। মনে পড়ে যায় নিজের ফেলে আসা শৈশবের কথা। তখন এক শিক্ষিকা তাকে দেখে এগিয়ে আসেন।

\"তুমি কে? এখানে কী করছো?\"

নিরু কান্নায় ভেঙে পড়ে। শিক্ষিকা তাকে স্কুলে নিয়ে যান, খেতে দেন, পড়াশোনা করার সুযোগ দেন। নিরু ভাবে, হয়তো এবার সে সত্যিই মুক্তি পাবে। কিন্তু কিছুদিন পর জানতে পারে, স্কুলটি আসলে শিশুদের শ্রমে বাধ্য করে।

নিরু আবারও প্রতারিত হয়। তার হৃদয় ভেঙে যায়, কিন্তু সে হাল ছাড়ে না। সে জানে, তার লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। এই নিষ্ঠুর বাস্তবতার মধ্যেও তাকে নিজের জন্য পথ খুঁজে নিতে হবে।

একদিন তার দেখা হয় এক এনজিও কর্মীর সাথে। তিনি নিরুকে সত্যিকারের সাহায্য করতে চান। নিরু প্রথমে বিশ্বাস করতে চায় না, কিন্তু ধীরে ধীরে বোঝে, এবার হয়তো তার জীবনে সত্যিকার পরিবর্তন আসতে চলেছে।

নিরু পড়াশোনা শুরু করে। কিন্তু অতীতের ক্ষত তাকে ভুলতে দেয় না। তবুও সে সিদ্ধান্ত নেয়, আর কোনো মেয়েকে যেন তার মতো কষ্ট সহ্য করতে না হয়।

নিষ্ঠুর বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েও নিরু নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করে।

রাত গভীর হয়েছে। আকাশের তারা মিটমিট করে জ্বলছে, কিন্তু সে আলো যেন নিরুর জীবনে কোনো স্বস্তি আনতে পারছে না। পেটের ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠে ক্ষুধার তীব্র জ্বালা। সারাদিন কিছুই খায়নি। সকালে কয়েকজনের কাছে সাহায্য চেয়েছিল, কিন্তু তারা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। কেউ বলেছিল, “চলে যা, প্রতারকদের জায়গা এখানে নেই!” কেউ বা কটূক্তি করেছিল, “কাজ করবি না, ফকিরি করবি?”

নিরুর গলা শুকিয়ে কাঠ। ফুটপাতের এক পাশে বসে সে হাঁপাচ্ছে। শরীরে জড়ানো ছেঁড়া জামাটা ঠান্ডা বাতাসে উড়তে চাইছে, আর সে শক্ত করে ধরে রেখেছে। এই শহর বড় নিষ্ঠুর। কাউকে বিশ্বাস করতে ভয় লাগে, কাউকে আপন ভাবতে গেলে প্রতারণার কষাঘাতে দগ্ধ হতে হয়।

একটি চায়ের দোকানের সামনে কয়েকজন লোক বসে গল্প করছে। দোকানের দক্ষিণ পাশে এক থালা বাসি ভাত পড়ে আছে। নিরু দ্বিধা নিয়ে সামনে এগিয়ে যায়। হাত বাড়িয়ে নিতে গিয়েও থেমে যায়। দোকানদার চিৎকার করে ওঠে, “এই! চুরি করবি? যা এখান থেকে!”

নিরু পিছু হটে। তার চোখে জল জমে আসে। ক্ষুধার্ত হওয়া কি পাপ?

রাস্তার পাশে একটা পুরোনো গুদামের সামনে এসে দাঁড়ায় সে। এখানে কয়েকজন পথশিশু ঘুমিয়ে আছে। নিরুও এক পাশে বসে পড়ে। চোখ বুজে কিছুক্ষণ থাকার চেষ্টা করে, কিন্তু পেটের জ্বালা, শরীরের ক্লান্তি আর মনের যন্ত্রণা তাকে শান্তি দেয় না।

হঠাৎ কেউ একজন ধাক্কা দিয়ে তাকে সরিয়ে দেয়। “এখানে বসবি না! জায়গা নেই।”

নিরু চুপচাপ উঠে দাঁড়ায়। সে বোঝে, পথের জীবন শুধুই যন্ত্রণা। এখানে কারও জন্য জায়গা নেই, ভালোবাসা নেই, সহানুভূতি নেই।

একটু দূরে সরওয়ার্দী পার্কের বেঞ্চে গিয়ে বসে সে। কিছুক্ষণ পর সেখানে এক মধ্যবয়সী লোক এসে বসে। লোকটি তাকে লক্ষ্য করছে, একটু পরেই হাসিমুখে বলে, “কোথায় যাবে, মেয়ে?”

নিরু ভয় পায়। কিছু না বলে উঠে চলে যেতে চায়, কিন্তু লোকটি হাত ধরে টেনে বসায়। “ভয় পাস না। ক্ষুধার্ত না? খাবার দেবো।”

খাবারের কথা শুনে নিরুর চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। কিন্তু মনে এক অজানা আশঙ্কাও জাগে। লোকটি তাকে একটা অন্ধকার গলির মধ্যে নিয়ে যেতে চায়। নিরু এবার দৃঢ়ভাবে বলে, “না, আমি যাবো না!”

লোকটি বিরক্ত হয়, “বড় সাহস হয়েছে! খেতে চাস, অথচ সাহায্য নিতে চাস না?”

নিরু দৌড় দেয়। পেছন ফিরে তাকায় না। তার হৃদয় দ্রুত লাফিয়ে ওঠে। আজ সে আরেকটি অন্ধকার থেকে পালিয়েছে, কিন্তু কতদিন এভাবে পালাতে পারবে?

অবশেষে সে এসে দাঁড়ায় রমনা কালী মন্দিরের সামনে। রাত গভীর, মন্দিরের দরজার সামনে কয়েকজন ভিখারি বসে আছে। তাদের মধ্যেই একটা কর্নারে নিরু গুটিসুটি মেরে বসে পড়ে।

এক বৃদ্ধ মহিলা পাশে বসে জানতে চান, “কোথা থেকে এসেছিস, মা?”

নিরু কোনো উত্তর দেয় না। সে কেবল চাঁদের দিকে তাকিয়ে ভাবে—আকাশের এই চাঁদ কি তার ভাগ্যেও কোনো আলো ফেলবে? নাকি তার জীবনপথের এই যন্ত্রণাতেই শেষ হয়ে যাবে?

নিরু রাতের অন্ধকারে হাইকোর্টের সামনে ফুটপাথে বসে কাঁদছিল। ক্ষুধা, ক্লান্তি, আর নিরাপত্তাহীনতা তাকে ঘিরে ধরেছে। তার চারপাশে ছুটে চলা মানুষের ভিড়, কিন্তু কেউ তাকে দেখেও দেখছে না। শহর যেন অচেনা, আর মানুষগুলো যেন পাথর।

হঠাৎ এক মধ্যবয়সী নারী তার সামনে এসে দাঁড়ায়। নারীটি শান্ত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করে, “কাঁদছিস কেন, মা? ক্ষুধা লেগেছে?”

নিরু চোখ মুছে মাথা নাড়ে। তার শুকনো ঠোঁট সামান্য কাঁপছিল। নারীটি করুণার দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, “চলো, তোমাকে খেতে দিচ্ছি।”

আশার আলো মনে জ্বলে ওঠে নিরুর। অনেকদিন পর কেউ তাকে সাহায্য করতে চাইছে! সে উঠে দাঁড়ায়। কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পর নারীটি তাকে একটি সরু গলিতে নিয়ে যায়। চারপাশে আলো কম, লোকজনও নেই। নিরুর ভেতরে অস্বস্তি হতে থাকে।

“আপনি কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমাকে?” নিরু জিজ্ঞেস করে কাঁপা গলায়।

নারীটি মুচকি হেসে বলে, “ভয় পাবার কিছু নেই, মা! ভালো খাবার পাবে, একটু আরামও করবি।”

নিরুর মনে সন্দেহ দানা বাঁধতে থাকে, কিন্তু ক্ষুধা আর ক্লান্তি তাকে বাধ্য করে নারীটির সঙ্গে যেতে। কিছুক্ষণ পর তারা বনশ্রী এলাকার একটি ফ্ল্যাটে পৌঁছায়, যেখানে কয়েকজন পুরুষ বসে আছে। তাদের চোখে এক অদ্ভুত দৃষ্টি।

“কে এই মেয়ে?” একজন কড়া গলায় প্রশ্ন করে।

“নতুন! পথ থেকে কুড়িয়ে এনেছি,” নারীটি সহজভাবে বলে।

নিরুর শরীর ঘামতে শুরু করে। সে বুঝতে পারে, এটি কোনো সাহায্য নয়—এটি একটি ফাঁদ! তার মন চিৎকার করে ওঠে, কিন্তু গলায় কোনো আওয়াজ বের হয় না।

তারপরই একজন পুরুষ বলে, “বেশ, আজ রাত থেকেই কাজে নামুক!”

নিরুর চোখ ছলছল করে ওঠে। সে বুঝতে পারে, এ শহরে করুণা নামে কিছু নেই—শুধু প্রতারণা আর শোষণের ফাঁদ।

কিন্তু নিরু সহজে হার মানার মেয়ে নয়। সে কৌশলে দরজার দিকে এগোয়, সুযোগ বুঝে বের হয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে পড়ে। রাস্তার দিকে দৌড় দেয়। পেছন থেকে শোনা যায়, “ধরো ওকে!”

নিরু ছুটতে থাকে প্রাণপণে। পেছনের পায়ের আওয়াজ ধীরে ধীরে দূরে যেতে থাকে। সে বুঝতে পারে, সে মুক্ত, আপাতত!

কিন্তু এরপর কোথায় যাবে? এই শহরে তার মতো মেয়েদের জন্য কি কোনো নিরাপদ আশ্রয় আছে?

সেই রাতেই সে রামপুরা মোল্লা বাড়ির সামনে এসে পড়ে। ক্লান্ত, বিধ্বস্ত, রক্তাক্ত পা নিয়ে সে দরজায় কড়া নাড়ে। কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে যায়। এক ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করেন, “কে তুমি?”

নিরু কাঁদতে কাঁদতে বলে, “আমি সাহায্য চাই… আমাকে বাঁচান!”

ভদ্রলোক তার স্ত্রীর কাছে ডেকে নেন। নারীটি নিরুকে ঘরে নিয়ে যান, খাবার ও পরিষ্কার কাপড় দেন। নিরু কাঁদতে কাঁদতে বলে, “এতোদিন পর কেউ আমাকে মানুষ হিসেবে দেখল!”

কিন্তু এও ছিল আরেকটি ফাঁদ। কয়েকদিন পরই সে বুঝতে পারে, এই মানুষগুলোও একদিন তাকে অন্য কারও কাছে বিক্রি করে দেবে।

নিরু আবার পালিয়ে যায়। এ শহর যেন শুধুই প্রতারণার এক ফাঁদ। কিন্তু এরপর কী? কোথায় সে পাবে প্রকৃত আশ্রয়?

রাত তখন গভীর। শহরের এক প্রান্তে একটি সরু গলিতে ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত নিরু ঠাঁই নিয়েছে। রাস্তার পাশের এক পরিত্যক্ত দোকানের সামনে গুটিসুটি মেরে বসে আছে সে। তার চোখে জল, মনে ভয়—কোথায় যাবে, কী করবে কিছুই জানে না।

হঠাৎ, এক নারীর কণ্ঠস্বর শোনা যায়।

— \"এই মেয়ে, এখানে বসে আছিস কেন?\"

নিরু চমকে তাকায়। এক মধ্যবয়সী নারী, পরনে শাল, চোখে একরকম সহানুভূতি ঝলমল করছে।

— \"আমি অনেক  ক্ষুধার্ত,\" নিরু জবাব দেয় কাঁপা কণ্ঠে।

নারী একটু এগিয়ে এসে বললেন, \"তোর আর ভয় নেই মা। আমি তোকে খেতে দেব, মাথা গোঁজার ঠাঁই দেব।\"

এই কথাগুলো নিরুর মনে আশার আলো জ্বালিয়ে দেয়। বহুদিন পর কেউ তাকে মমতা দেখাল।

নারী নিরুকে তার সঙ্গে নিয়ে যায় নয়া পল্টনের এক পুরোনো দোতলা বাড়িতে। ভেতরে কয়েকজন মেয়ে বসে গল্প করছে। তারা নিরুকে দেখে হাসল।

— \"নতুন এসেছে নাকি? বেশ দেখতে মিষ্টি!\"

নারী নিরুকে খাবার দেয়, নরম বিছানায় বসতে বলে। নিরু বিস্মিত, এতদিন পর কেউ তাকে ভালোবাসা দিল! মনে মনে ভাবে, এতদিনে হয়তো সে নিরাপদ আশ্রয় পেল।

কিন্তু রাত বাড়ার সাথে সাথে ধীরে ধীরে সে টের পায়, এই আশ্রয় এতটা নিরাপদ নয়।

একজন মোটা লোক এসে ঘরে ঢোকে। মেয়েগুলো একে একে তার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। লোকটি তাদের গায়ে হাত দেয়, হাসে। নিরুর গা শিউরে ওঠে। লোকটি তাকে দেখে সন্দেহভরে প্রশ্ন করে,

— \"নতুন মেয়ে? কেমন লাগছে এখানে?\"

নিরু কোনো উত্তর দেয় না। তার বুক কাঁপতে থাকে। পাশের মেয়েরা চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে।

নারী এবার এগিয়ে এসে বলে, \"নিরু, ভয় নেই। উনি আমাদের বড় ক্লায়েন্ট। উনি যা বলবেন, তাই করতে হবে। আমরা সবাই এখানে ভালো আছি। তুইও থেকে যা, সুখে থাকবি।\"

নিরুর মাথায় বজ্রপাত হয়। সে বুঝতে পারে, এটি কোনো আশ্রয় নয়, এটি এক বিভীষিকার ঘর। এখান থেকে বের হওয়া মানেই মৃত্যু! কিন্তু সে কি আরেকবার পালাতে পারবে?

রাত গভীর হয়। নিরু জানলার ধারে গিয়ে ভাবে, এবার সে কী করবে? সত্যিই কি তার আর কোনো মুক্তি নেই? 

নিরুর জীবন ছিল এক অন্ধকার গহ্বরে নিমজ্জিত। প্রতিটি মুহূর্তে সে ভেবেছে, এই পৃথিবীতে তার জন্য কোনো স্থান নেই। সে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হয়েছে, যেখানে প্রতারণা, নিপীড়ন এবং অবহেলা তার একমাত্র সঙ্গী। কিন্তু তারপরও কোথাও না কোথাও একটি ক্ষীণ আলো ছিল, যা তাকে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়তে দেয়নি।

পালিয়ে বেড়ানোর ক্লান্তি, না খেয়ে থাকার কষ্ট, মানুষের নিষ্ঠুরতা—এসব কিছুই নিরুকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দিয়েছিল। কিন্তু একদিন, এক মহিলার সঙ্গে দেখা হলো, যিনি বদলে দিতে পারেন তার ভাগ্য।

এক বিকেলে, যখন সূর্যের আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছিল, নিরু ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত অবস্থায় একটি পার্কের বেঞ্চে বসে ছিল। চারপাশে ছিল ব্যস্ত শহরের কোলাহল, কিন্তু তার মনে হচ্ছিল, এই জনসমুদ্রে সে একেবারে একা। ঠিক তখনই এক নারী এসে তার পাশে বসেন।

নারীটির চোখে মায়ার ছোঁয়া ছিল। তিনি কোমল কণ্ঠে বললেন, “মা, তুমি এখানে একা বসে আছো কেন?”

নিরু প্রথমে কিছু বলল না, কারণ বহুবার সে এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে, যেখানে তার দুর্দশা দেখেই মানুষ সহানুভূতি দেখিয়েছে, কিন্তু পরে সরে গেছে। কিন্তু এই নারীটি অপেক্ষা করলেন, তার চোখে ছিল সত্যিকারের আন্তরিকতা।

অবশেষে নিরু আস্তে আস্তে বলল, “আমি কোথাও যেতে পারি না। কেউ আমাকে বিশ্বাস করে না, কেউ সাহায্য করতে চায় না।”

নারীটি গভীর দৃষ্টিতে নিরুর দিকে তাকালেন এবং বললেন, “তুমি যদি চাও, আমি তোমাকে সাহায্য করতে পারি।”

নিরু প্রথমে দ্বিধায় পড়ে গেল। কতবার সে সাহায্যের হাতকে বিশ্বাস করে প্রতারিত হয়েছে! কিন্তু নারীর চোখের দৃষ্টি এতটাই আন্তরিক ছিল যে নিরু ভেতর থেকে একটু সাহস পেল।

নারীটির নাম ছিল শীলা আপা। তিনি একজন সমাজকর্মী, যিনি পথশিশুদের পুনর্বাসনের জন্য কাজ করতেন। তিনি নিরুকে তার আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে গেলেন। সেখানে গিয়ে নিরু প্রথমবারের মতো নিরাপদ বোধ করল।

আশ্রয়কেন্দ্রের পরিবেশ ছিল একেবারেই আলাদা। সেখানে অনেক শিশু ছিল, যারা একই রকম দুর্ভাগ্যের শিকার হয়েছিল। তারা সবাই পড়াশোনা করত, খেলাধুলা করত, গান গাইত। নিরু প্রথমদিকে বিশ্বাস করতে পারেনি যে এমন একটি জায়গা সত্যিই আছে, যেখানে সে নিজের মতো করে থাকতে পারবে, ভয় ছাড়া, শঙ্কা ছাড়া।

শীলা আপা তাকে শিক্ষার গুরুত্ব বোঝালেন, তাকে বই পড়তে দিলেন, তাকে নতুন স্বপ্ন দেখালেন। ধীরে ধীরে নিরু নিজেকে ফিরে পেতে লাগল। সে পড়াশোনায় মন দিল, নতুন নতুন জিনিস শিখতে লাগল। তার চোখে আবার স্বপ্নের আলো ফুটে উঠল।

অনেক বছর পর, নিরু নিজেই একজন সমাজকর্মী হয়ে উঠল। তার অতীতের কষ্ট তাকে আরও শক্তিশালী করে তুলেছিল। সে ঠিক করল, আর কোনো শিশু যেন তার মতো দুর্ভাগ্যের শিকার না হয়। তাই সে নিজের মতো করে পথশিশুদের সাহায্য করতে শুরু করল।

নিরুর গল্প এখানেই শেষ নয়, বরং এটি একটি নতুন সূচনার ইঙ্গিত। সে বুঝতে পারল, জীবনে যতই প্রতিকূলতা আসুক, যদি কারো বিশ্বাস থাকে, তাহলে একদিন আলো আসবেই।

সে আর শুধু একজন ‘অভাগা মেয়ে’ নয়, বরং এক আশার প্রদীপ, যে অন্যদের জন্য পথ দেখাবে।

এবং এইভাবেই নিরুর জীবনে শেষ আশার আলো সত্যিকারের রূপ পেল।

নিরুর জীবন ছিল এক অন্ধকার সুড়ঙ্গের মতো, যেখানে আলো খুঁজতে গিয়ে বারবার প্রতারিত হয়েছে সে। কিন্তু প্রতিবারই সে নতুন করে উঠে দাঁড়িয়েছে, লড়াই করেছে নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য। আজ, বহু বছর পর, সেই দুঃসহ স্মৃতিগুলো তাকে কষ্ট দিলেও, আর ভীত করে না। কারণ সে এখন আর সেই অসহায় নিরু নয়।

এনজিওতে আসার পর নিরুর জীবন বদলে যেতে শুরু করে। প্রথমদিকে বিশ্বাস করতে পারত না যে, এখানে কেউ তাকে বিক্রি করবে না বা ব্যবহার করবে না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারল, এখানকার মানুষ সত্যিই তাকে ভালোবেসে, সম্মান দিয়ে বড় করতে চায়। তার জন্য বই, খাতা, নতুন পোশাক—সব কিছুই দেওয়া হয়। কিন্তু সবচেয়ে বড় উপহার ছিল নিরাপত্তা ও শিক্ষার সুযোগ।

প্রথমদিকে পড়াশোনা করা তার জন্য সহজ ছিল না। কারণ সে কখনো স্কুলে যায়নি। অক্ষরগুলো ছিল অচেনা, অজানা এক ধাঁধার মতো। তবু সে হাল ছাড়েনি। কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে ধীরে ধীরে পড়তে শিখল, লিখতে শিখল। শিক্ষকদের উৎসাহ আর ভালোবাসায় তার আত্মবিশ্বাস বাড়তে লাগল।

দিন গড়িয়ে বছর পেরিয়ে গেল। নিরু স্কুল শেষ করে কলেজে ভর্তি হলো। সেই ছোট্ট, অভাগা মেয়েটি এখন নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখতে শিখেছে। কলেজে পড়ার সময় সে সিদ্ধান্ত নিল, সে সমাজসেবা করবে। বিশেষ করে, যারা একসময় তার মতো অসহায় ছিল, তাদের পাশে দাঁড়াবে।

কলেজের পড়াশোনা শেষ করে নিরু সমাজকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করে। প্রথমে ছোট পরিসরে কাজ করলেও, তার আন্তরিকতা, নিষ্ঠা আর অভিজ্ঞতার জন্য দ্রুত পরিচিতি লাভ করে। সে বিশেষভাবে পথশিশুদের নিয়ে কাজ শুরু করে, কারণ সে জানত, এই শিশুগুলোই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে।

নিরু বুঝতে পারল, শুধুমাত্র খাদ্য ও আশ্রয় দিলেই সমস্যার সমাধান হয় না। তাদের জন্য চাই শিক্ষা, ভালোবাসা, এবং সর্বোপরি নিরাপদ ভবিষ্যৎ। তাই সে একটি ছোট স্কুল গড়ে তোলে, যেখানে পথশিশুরা বিনামূল্যে পড়াশোনা করতে পারে। তার প্রচেষ্টায় বহু পথশিশুর জীবন বদলে যেতে থাকে।

একদিন নিরু তার পুরনো এলাকার এক রাস্তার ধারে কিছু শিশু দেখে, যারা ভিক্ষা করছে। তাদের মধ্যে একটি মেয়েকে দেখে তার নিজের ছোটবেলার কথা মনে পড়ে যায়। সে এগিয়ে গিয়ে শিশুটির সঙ্গে কথা বলে।

— \"তোমার নাম কী?\"

— \"ছোয়া,\" মেয়েটি মাথা নিচু করে উত্তর দেয়।

— \"তুমি এখানে কেন?\"

— \"মা অসুস্থ, বাবা নেই। খাবারের জন্য ভিক্ষা করি,\" চোখের কোণে জল চিকচিক করে ওঠে।

নিরুর মনে পড়ে যায় সেই দিনগুলোর কথা, যখন সে নিজেও রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে মানুষের দয়ার অপেক্ষায় থাকত। আজ, সে জানে কী করতে হবে। সে মেয়েটিকে নিয়ে যায় তার স্কুলে। তাকে পড়াশোনার সুযোগ দেয়, ভালো খাবার দেয়, নতুন পোশাক দেয়। ছোয়ার চোখে আনন্দের অশ্রু দেখা যায়।

এভাবেই নিরুর জীবন এক নতুন সূর্যোদয়ের সাক্ষী হয়। তার জীবনের অন্ধকার অধ্যায়ের ইতি ঘটে, আর শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়—আলোয় ভরা, আশায় পূর্ণ।

নিরু এখন জানে, একজন মানুষের লড়াই শুধু তার নিজের জন্য নয়, বরং অসংখ্য মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনার জন্য। সে তার অতীতকে ভুলে যায়নি, বরং সেই কষ্টের অভিজ্ঞতাকে শক্তিতে পরিণত করে এগিয়ে চলেছে, এক নতুন পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন নিয়ে।

সাহিত্য-সংস্কৃতি এর আরও খবর

img

বাঙালির জাতিসত্তা ও পহেলা বৈশাখ: ঐতিহ্য অন্বেষণে এক মহাকাব্যিক পথরেখা

প্রকাশিত :  ০৯:০৯, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

​বাঙালির পহেলা বৈশাখ কেবল পঞ্জিকার আবর্তন নয়, বরং এটি একটি জাতির সহস্রাব্দের আত্মপরিচয়ের দর্পণ। এই দিনটি আমাদের প্রাণের স্পন্দন এবং অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পহেলা বৈশাখ মানেই আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের শিকড় ও হাজার বছরের ঐতিহ্যের এক নিরন্তর স্মৃতিচারণা। বাঙালির আত্মপরিচয়ের এই উৎসব মূলত একটি অসাম্প্রদায়িক ও সর্বজনীন লোকউৎসব, যার গভীরতা মিশে আছে এ দেশের মাটি ও মানুষের দীর্ঘশ্বাসের সাথে। তবে বর্তমানের এই আনন্দধারার সমান্তরালে একটি গূঢ় কষ্টের সুরও অনুরণিত হচ্ছে, যা আমাদের অবচেতন মনকে বিদ্ধ করে। আমাদের অনেক সুন্দর ঐতিহ্য আজ সময়ের নিষ্ঠুর আবর্তে চোখের সামনে হারিয়ে যাচ্ছে। যে জমজমাট বৈশাখী মেলা একসময় গ্রামবাংলার প্রাণকেন্দ্র ছিল, আজ তা শহুরে কৃত্রিমতার চাপে ম্লান। লাঠিখেলা, নৌকাবাইচ কিংবা হাডুডুর মতো শৌর্য-বীর্যের প্রতীকগুলো আজ ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই খুঁজছে। লোকসংগীত, বাউলগান বা পালাগানের সেই আধ্যাত্মিক মদিরা আজ নতুন প্রজন্মের কাছে এক অচেনা সুর। গ্রামবাংলার সেই সহজ-সরল সংস্কৃতি আজ বিশ্বায়ন ও নগরায়ণের জটিলতায় পর্যুদস্ত। তবুও বাঙালির অন্তরের বিশ্বাস এই যে—এই ঐতিহ্যই আমাদের প্রকৃত পরিচয় এবং আমাদের অস্তিত্বের মূল ভিত্তি। এই শিকড়কে বাঁচিয়ে রাখা কেবল নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠী বা অঞ্চলের নয়, বরং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রতিটি বাঙালির পবিত্র দায়িত্ব।

​ঐতিহ্য অন্বেষণের এই মহাকাব্যিক পথরেখায় আমরা দেখতে পাই, বাঙালির পহেলা বৈশাখ কোনো একক ধর্ম বা গোষ্ঠীর সম্পদ নয়। এটি একটি বহুত্ববাদী সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ, যেখানে হিন্দু জমিদারের পুণ্যাহ আর মুসলিম কৃষকের নবান্ন একাকার হয়ে গিয়েছিল। কালানুক্রমিক বিবর্তনে এই দিনটি রাজনৈতিক প্রতিরোধের হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। বিশেষ করে ১৯৬০-এর দশকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বাঙালি যে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল, তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল এই বর্ষবরণ উৎসব। ১৯৬৭ সালে রমনার বটমূলে ছায়ানটের যে আয়োজন শুরু হয়, তা মূলত ছিল বাঙালির আত্মমর্যাদা রক্ষার এক শৈল্পিক লড়াই। এই প্রবন্ধে পহেলা বৈশাখের ঐতিহাসিক বিবর্তন, বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বর্তমান সংকট এবং আগামীর পথরেখা নিয়ে একটি নিবিড় বিশ্লেষণ উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে।

​নববর্ষের ঐতিহাসিক পটভূমি: ফসলি সন থেকে জাতীয় উৎসব

​বাংলা নববর্ষের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এর মূলে রয়েছে কৃষি ও অর্থনীতির এক গভীর মেলবন্ধন। মুঘল সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে কৃষিকাজের সুবিধার্থে এবং রাজস্ব আদায়ের একটি সুশৃঙ্খল পদ্ধতি প্রবর্তনের লক্ষ্যে ‘ফসলি সন’ হিসেবে বাংলা সনের গণনা শুরু হয়। ১৫৫৬ থেকে ১৬০৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে আকবর যখন এই ভূখণ্ডের খাজনা আদায়ের পদ্ধতিকে সহজতর করতে চেয়েছিলেন, তখন তিনি সৌর ও চন্দ্র বছরের সংমিশ্রণে একটি নতুন সময়রেখা তৈরি করেন। হিজরি সন চন্দ্রকেন্দ্রিক হওয়ায় তা ঋতু পরিবর্তনের সাথে মিলত না, ফলে কৃষকদের কর দিতে সমস্যা হতো। ঐতিহাসিক আবুল ফজল তাঁর ‘আইন-ই-আকবরী’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, সম্রাট আকবর ৯৬৩ হিজরিতে (১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ) এই সনের প্রবর্তন করেন, যা তৎকালীন সময়ে ‘তারিখ-ই-ইলাহি’ নামে পরিচিত ছিল। পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে ‘হালখাতা’ বা ব্যবসায়িক নতুন খাতা খোলার যে রীতি, তা এই অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটেরই এক শৈল্পিক রূপ।

​ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে নববর্ষ উদযাপনের বিবর্তনকে তিনটি প্রধান কালখণ্ডে বিভক্ত করা যায়। প্রথমত, প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় প্রেক্ষাপট, যেখানে এটি ছিল মূলত কৃষি উৎসব ও পুণ্যাহের দিন। সম্রাট আকবরের সময় থেকে এটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। দ্বিতীয়ত, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল, যখন বাঙালির চিত্তে স্বাদেশিকতা ও জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটে। এই সময়ে পহেলা বৈশাখ বাঙালির সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য প্রকাশের একটি প্রধান হাতিয়ার হয়ে ওঠে। তৃতীয়ত, পাকিস্তান আমল—যা ছিল বাঙালির সাংস্কৃতিক সংগ্রামের এক অগ্নিপরীক্ষার কাল। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি যে অস্তিত্বের জানান দিয়েছিল, ১৯৬০-এর দশকে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের মাধ্যমে তা এক পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক বিপ্লবে রূপ নেয়। তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিবাদে ১৯৬৭ সালে রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান শুরু হয়েছিল, যা আজ বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার আলোকবর্তিকা।

​স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পহেলা বৈশাখকে একটি সর্বজনীন জাতীয় উৎসবে রূপান্তর করেন এবং দিনটিকে সরকারি ছুটি ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রদর্শন ও আদর্শের অন্যতম ভিত্তি ছিল দেশীয় সংস্কৃতির বিকাশ। তবে পহেলা বৈশাখের ছুটির ইতিহাসের পেছনে ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট সরকারেরও একটি বড় অবদান ছিল। মুখ্যমন্ত্রী এ কে ফজলুল হক সেই সময় প্রথম এই দিনটিকে সরকারি ছুটি হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন, যদিও তৎকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। বর্তমানে এই উৎসব কেবল একটি দিন উদযাপনে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃত ‘বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের পরিচয়কে মহিমান্বিত করেছে।

​বাংলা ভাষার ধ্রুপদী মহিমা: আড়াই হাজার বছরের শিকড়

​বাঙালির নববর্ষ উদযাপনের সঙ্গে তার ভাষার মর্যাদা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলা ভাষা বিশ্বের দরবারে একটি সমৃদ্ধ ও প্রাচীন ভাষা হিসেবে স্বীকৃত। ২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর ভারত সরকার বাংলাকে ‘ধ্রুপদী ভাষা’র (Classical Language) মর্যাদা প্রদান করেছে। এই স্বীকৃতির প্রধান মানদণ্ড হলো ভাষাটির ইতিহাস হতে হবে অন্তত দেড় থেকে দুই হাজার বছরের প্রাচীন এবং এর একটি সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ঐতিহ্য থাকতে হবে। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, বাংলা ভাষার বয়স আড়াই হাজার বছরেরও বেশি। এর আদি উৎস হিসেবে মাগধী প্রাকৃত বা পূর্বী অপভ্রংশকে চিহ্নিত করা যায়, যেখান থেকে পর্যায়ক্রমে বাংলা, অসমীয়া ও ওড়িয়া ভাষার উদ্ভব হয়েছে।

​বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন হলো ‘চর্যাপদ’, যা মূলত অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে রচিত বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের আধ্যাত্মিক গানের সংকলন। ১৯০৭ সালে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজদরবার থেকে এই অমূল্য পাণ্ডুলিপি আবিষ্কার করেন, যা প্রমাণ করে যে হাজার বছর আগেই বাংলা ভাষা তার কাব্যিক ও দার্শনিক গভীরতা অর্জন করেছিল। চর্যাপদ থেকে শুরু করে মধ্যযুগের মুকুন্দরাম চক্রবর্তী, ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর এবং আধুনিক যুগের রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ও জীবনানন্দের সাহিত্যকর্ম আমাদের এই ভাষাকে ধ্রুপদী সৌন্দর্যে মণ্ডিত করেছে। বিশেষ করে ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল বিজয় বাংলা ভাষাকে বিশ্বসাহিত্যের শিখরে আসীন করে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, ভাষার এই ধ্রুপদী শিকড় নিয়ে গর্ব করলেও বাস্তব জীবনে আমরা বাংলা ভাষার শুদ্ধ প্রয়োগে অনেক ক্ষেত্রে উদাসীন। ইংরেজি মাধ্যমের আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষিত প্রজন্মের অনেকেই তাদের মাতৃভাষা এবং সাহিত্যিক ঐতিহ্য সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান রাখে না। এই উদাসীনতা আমাদের দীর্ঘস্থায়ী পরিচয় সংকটের একটি বড় কারণ।

​পুণ্যাহ ও হালখাতা: রাজা-প্রজা থেকে ব্যবসায়ীর মেলবন্ধন

​বাংলা সনের প্রবর্তনের সাথে সাথে এর অর্থনৈতিক ভিত্তি হিসেবে ‘পুণ্যাহ’ উৎসবের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। মুঘল ও নবাবী আমলে চৈত্র মাসের শেষ দিকে কৃষকরা ফসল ঘরে তুলতেন এবং বৈশাখের প্রথম দিনে জমিদারের কাঁচারিতে খাজনা পরিশোধ করতে যেতেন। এই অনুষ্ঠানকেই বলা হতো পুণ্যাহ। জমিদাররা প্রজাদের মিষ্টি ও পানের মাধ্যমে আপ্যায়ন করতেন, যা রাজা ও প্রজার মধ্যে একটি সামাজিক সেতুবন্ধন তৈরি করত। ব্রিটিশ আমলের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর এই উৎসবটি আরও ব্যাপকতা লাভ করে। নবাব মুর্শিদকুলী খাঁ এই উৎসবের একটি সুনির্দিষ্ট রীতি প্রচলন করেছিলেন। জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির সাথে সাথে পুণ্যাহ উৎসব আজ বিলুপ্তপ্রায় হলেও তার রেশ আজও টিকে আছে ব্যবসায়ীদের ‘হালখাতা’র মধ্যে।

​হালখাতা হলো বাঙালির এক অনন্য অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। বৈশাখের প্রথম দিনে ব্যবসায়ীরা তাঁদের পুরনো হিসাবের খাতা বন্ধ করে নতুন খাতা খোলেন। এই দিনে ক্রেতাদের মিষ্টিমুখ করানো হয় এবং বকেয়া পরিশোধের মাধ্যমে সম্পর্কের নবায়ন করা হয়। কলকাতা থেকে শুরু করে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত এই ঐতিহ্য আজও অমলিন। হালখাতা কেবল দেনা-পাওনার হিসাব নয়, বরং এটি বাঙালির সামাজিক সংহতির এক অনন্য উদাহরণ। আধুনিক শপিং মল ও অনলাইন কেনাকাটার যুগেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা আজও এই হালখাতার ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে আছেন।

​বিলুপ্তপ্রায় গ্রাম্য সংস্কৃতি: হারানোর দীর্ঘশ্বাস ও আধুনিকতার ঘাত-প্রতিঘাত

​বাঙালির সংস্কৃতির প্রধান উৎসস্থল হলো তার পল্লীপ্রকৃতি। হাজার বছরের গ্রামীণ সংস্কৃতিই আমাদের ঐতিহ্যের মূল কাঠামো। কিন্তু এই ডিজিটাল যুগে বিশ্বায়নের প্রবল স্রোতে আমাদের সেই পরিচিত গ্রামগুলো আজ আর আগের মতো নেই। আকাশ সংস্কৃতির প্রভাবে আমাদের হাজার বছরের লোকজ খেলাধুলা এবং সংগীত আজ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। একসময় বৈশাখী মেলা ছিল গ্রামের মানুষের চিত্তবিনোদনের একমাত্র ভরসা। মেলার সেই ধুলোমাখা পথ, মাটির পুতুলের বাঁশি, নাগরদোলার শব্দ আজ স্মৃতিতে ফিকে হয়ে আসছে।

​গ্রামের মেলার দৃশ্য ছিল শৈল্পিক ও প্রাণবন্ত। সেখানে কামারদের তৈরি দা-বঁটি থেকে শুরু করে কুমোরদের তৈরি মাটির হাঁড়ি ও পুতুলের এক অপূর্ব সমাহার দেখা যেত। শিশুদের জন্য ছিল তালপাতার বাঁশি কিংবা মাটির ঘোড়া। কিন্তু আজ প্লাস্টিকের সস্তা খেলনা এবং আধুনিক প্রযুক্তির আগ্রাসনে মাটির পুতুল ও বাঁশি তৈরির কারিগররা পেশা বদলে ফেলছেন। বায়োস্কোপের মতো ভ্রাম্যমাণ বিনোদন আজ টেলিভিশন ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতায় সম্পূর্ণ বিলুপ্ত। শোলার তৈরি খেলনা ও অলঙ্কার আজ কাঁচামালের অভাব ও কারিগরদের অনাগ্রহে হারিয়ে যেতে বসেছে। শহুরে বৈশাখী মেলাগুলোতে জৌলুস থাকলেও গ্রামীণ মেলার সেই প্রাণের টান আজ অনুপস্থিত।

​ঐতিহ্যবাহী ক্রীড়া ও বাঙালির শৌর্য: মাঠ থেকে স্মার্টফোনে স্থানান্তর

​বাঙালির শৌর্য-বীর্য এবং সাহসিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটত তার নিজস্ব খেলাধুলার মাধ্যমে। পহেলা বৈশাখ এবং মেলার অন্যতম আকর্ষণ ছিল লাঠিখেলা, নৌকাবাইচ ও হাডুডু। বিশেষ করে হাডুডু বা কাবাডি, যা আমাদের জাতীয় খেলা, তা একসময় গ্রামবাংলার প্রতিটি জনপদে জনপ্রিয় ছিল। ১৯৭২ সাল থেকে এটি বাংলাদেশের জাতীয় খেলার মর্যাদা পেলেও বর্তমান প্রজন্মের কাছে এটি অনেকটা অচেনা। আধুনিক প্রজন্মের কিশোররা আজ স্মার্টফোনের স্ক্রিনে ভিডিও গেমে আসক্ত হয়ে মাঠের ধুলোবালি থেকে দূরে সরে গেছে।

​নৌকাবাইচ ছিল বর্ষা ও বৈশাখের এক অনন্য উন্মাদনা। গ্রামবাংলার নদ-নদীগুলো যখন বর্ষায় টইটম্বুর থাকত, তখন আয়োজিত এই প্রতিযোগিতায় হাজার হাজার মানুষের সমাগম ঘটত। একইভাবে লাঠিখেলা, যা আমাদের পূর্বপুরুষদের আত্মরক্ষার এক শৈল্পিক কৌশল ছিল, তা আজ নিয়মিত চর্চার অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে। দাঁড়িয়াবান্ধা, গোল্লাছুট, বৌছি কিংবা কানামাছির মতো খেলাগুলো গ্রামীণ কিশোর-কিশোরীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে সহায়ক ছিল। আধুনিক যুগের অভিভাবকরা আজ শিশুদের ধুলোবালি ও কাদা থেকে দূরে রাখতে গিয়ে তাদের এই প্রাকৃতিক আনন্দ থেকে বঞ্চিত করছেন। এর ফলে শিশুরা একাকিত্ব ও যান্ত্রিকতায় ভুগছে, যা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় হুমকি।

​লোকসংগীতের আধ্যাত্মিক ধারা: বাউল ও পালাগানের সংকট

​বাঙালির সংগীতের প্রাণভোমরা হলো তার লোকসংগীত। বাউল গান, পালাগান ও লোকগাঁথা আমাদের মাটির গন্ধমাখা সুর। বাউল দর্শন কেবল গান নয়, এটি এক গূঢ় আধ্যাত্মিক সাধনা। বাউলরা বিশ্বাস করেন যে, মানুষের দেহের মধ্যেই স্রষ্টা বা ‘মনের মানুষ’-এর অবস্থান। ফকির লালন শাহের মতো সাধকরা এই দর্শনের মাধ্যমে মানুষে মানুষে বিভেদ দূর করার এবং মানবতার জয়গান গেয়েছেন। কিন্তু বর্তমান সময়ের ‘আকাশ সংস্কৃতি’ ও আধুনিক পপ মিউজিকের প্রভাবে এই সুরগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। পালাগান বা যাত্রাপালার সেই জমজমাট রাত জাগা আসর আজ টিভির সিরিয়াল কিংবা ইন্টারনেটের ভিডিওর দাপটে বিলুপ্তির পথে। লোকসংগীতের এই ক্ষয়িষ্ণু অবস্থা আমাদের সংস্কৃতির মেরুদণ্ডকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

​মঙ্গল শোভাযাত্রা: ইউনেস্কো স্বীকৃতি ও অসাম্প্রদায়িকতার জয়গান

​পহেলা বৈশাখের আধুনিক উদযাপনের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হলো ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’। ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে প্রথম এই শোভাযাত্রা বের করা হয়। তৎকালীন সামরিক শাসনের অন্ধকার থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে এবং মানুষের মনে নতুন আশা জাগানোর জন্য এই বর্ণাধ্য মিছিলের সূচনা হয়েছিল। ১৯৯৬ সাল থেকে এটি ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামে পরিচিতি পায়। এই শোভাযাত্রায় ব্যবহৃত বাঘ (শৌর্য), হাতি (সম্পদ), পেঁচা (প্রজ্ঞা) এবং সূর্যমুখীর মতো লোকজ মোটিফগুলো বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরই প্রতিফলন। ২০১৬ সালে ইউনেস্কো এই শোভাযাত্রাকে ‘মানবতার বিমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে।

​মঙ্গল শোভাযাত্রার মূল আবেদন হলো এর অসাম্প্রদায়িকতা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই শোভাযাত্রার নাম ও বিষয়বস্তু নিয়ে বিভিন্ন মহলে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সাময়িকভাবে এর নাম ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই ধরনের নাম পরিবর্তনকে বাঙালির দীর্ঘদিনের অসাম্প্রদায়িক পরিচয়ের ওপর আঘাত হিসেবে দেখছেন অনেক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। তবুও এটি আজও বাঙালির প্রতিরোধের এক সৃজনশীল রূপ হিসেবে টিকে আছে।

​নগরায়ণ ও বিশ্বায়নের প্রভাব: আত্মপরিচয়ের নব্য সংকট

​বর্তমানে নগরায়ণ বলতে কেবল দালানকোঠা নির্মাণ নয়, বরং এটি জীবনযাত্রার আমূল পরিবর্তনকে বোঝায়। শিল্পের প্রসারে গ্রামের মানুষ আজ কাজের খোঁজে শহরে ভিড় করছে, যার ফলে যৌথ পরিবার প্রথা ভেঙে যাচ্ছে। বিশ্বায়ন সারা বিশ্বকে একটি কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত করলেও এর ফলে ক্ষুদ্র ও আঞ্চলিক সংস্কৃতিগুলো হুমকির মুখে পড়ছে। পহেলা বৈশাখ আজ অনেক ক্ষেত্রে কেবল পান্তা-ইলিশ খাওয়ার একটি ‘ফ্যাশন’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শহুরে উৎসবের জৌলুসে গ্রামীণ ঐতিহ্যের সেই প্রাণের টান অনুপস্থিত। পহেলা বৈশাখকে ঘিরে যে করপোরেট বাণিজ্যিকীকরণ শুরু হয়েছে, তা এই উৎসবের মূল নির্যাসকে অনেক ক্ষেত্রে ম্লান করে দিচ্ছে।

​প্রবাসে বাঙালির লড়াই: পরবাসে শিকড়ের অস্তিত্ব রক্ষা

​জীবিকার তাগিদে দেশান্তরী হলেও প্রবাসে বসবাসরত বাঙালিরা তাঁদের হৃদয়ে বাংলাদেশকেই লালন করেন। লন্ডন, নিউইয়র্ক কিংবা আমস্টারডামের মতো শহরগুলোতে আজ নিয়মিত বৈশাখী মেলা আয়োজিত হয়। প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মকে বাংলাদেশের ভাষা ও সংস্কৃতি জানানো আজ এক বড় চ্যালেঞ্জ। ড. হুমায়ুন আজাদের ‘মাই বিউটিফুল বাংলাদেশ’-এর মতো বই কিংবা বিভিন্ন বাংলা স্কুলের মাধ্যমে তাদের শিকড়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রবাসীরাই বাংলা ভাষাকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদায় আসীন করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।

​ঐতিহ্যের প্রবহমানতা ও আবহমান বাংলা

​বাঙালির শিকড় ও ঐতিহ্যের কথা বলতে গেলে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ‘আবহমান’ কবিতার কথা মনে পড়ে। কবি সেখানে দেখিয়েছেন যে, মানুষ যতই আধুনিক হোক না কেন, তার অস্তিত্বের সত্য নিহিত আছে মাটির গহীন শিকড়ে। তাঁর কবিতায় লাউমাচা আর সন্ধ্যার বাতাসে দুলতে থাকা ফুলের যে চিত্রকল্প, তা বাঙালির চিরন্তন ঐতিহ্যের প্রতীক। ঐতিহ্যের মৃত্যু নেই, এটি কেবল রূপান্তর লাভ করে। জীবনানন্দ দাশের দর্শনেও আমরা আমাদের ‘নীল বাংলা’র সাথে এক আত্মিক সংযোগ অনুভব করি, যা পহেলা বৈশাখের চেতনায় আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

​সাহিত্যে বৈশাখ: মুকুন্দরাম থেকে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল

​বাংলা সাহিত্যে বৈশাখ কেবল একটি মাস নয়, বরং এটি রুদ্র ও নতুনের সংমিশ্রণ। ষোড়শ শতাব্দীর কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তী বৈশাখকে বর্ণনা করেছেন দাবদাহ আর প্রাকৃতিক বিক্ষুব্ধতার মাস হিসেবে। অন্যদিকে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বৈশাখকে দেখেছেন এক নতুনের আবাহন হিসেবে। তাঁর ‘এসো হে বৈশাখ’ গানটি আজ বাঙালির জাতীয় ঐতিহ্যের অংশে পরিণত হয়েছে, যা জীর্ণ ও পুরনোকে ধুয়ে-মুছে ফেলার আহ্বান জানায়। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম বৈশাখকে দেখেছেন ধ্বংসের নকীব এবং অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে এক প্রচণ্ড বিপ্লব হিসেবে। এভাবে সাহিত্য ও সংস্কৃতির মাধ্যমে বৈশাখ বাঙালির জাতীয়তাবোধের এক প্রধান স্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

​আগামীর অঙ্গীকার: শিকড়কে শক্ত রাখার উপায়

​পহেলা বৈশাখ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বিশ্বে বাংলাদেশকে তুলে ধরতে হলে আগে আমাদের নিজেদের শিকড়কে শক্ত রাখতে হবে। আজ আমাদের প্রধান কাজ হলো হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যগুলোকে পুনরুদ্ধার করা। কেবল বছরে একদিন পান্তা-ইলিশ খেয়ে নয়, বরং প্রতিদিনের জীবনে বাঙালি সংস্কৃতিকে চর্চা করতে হবে। আমাদের সন্তানদের ঐতিহ্যের গল্প শোনাতে হবে; পরিচয় করিয়ে দিতে হবে হাডুডু কিংবা নৌকাবাইচের রোমাঞ্চের সঙ্গে। রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত উভয় পর্যায়ের উদ্যোগের মাধ্যমেই আমাদের গৌরবময় সংস্কৃতিকে ধারণ করতে হবে। পহেলা বৈশাখ যেন কেবল একটি ক্যালেন্ডারের তারিখ হয়ে না থাকে, বরং এটি যেন বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার জয়গান গেয়ে আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার শপথের দিনে পরিণত হয়।