img

বাংলাদেশের জন্ম ২: এক বর্বরোচিত জেনোসাইড

প্রকাশিত :  ১৪:১৫, ২৮ অক্টোবর ২০২১

বাংলাদেশের জন্ম ২: এক বর্বরোচিত জেনোসাইড

আসছে ডিসেম্বরের ১৬ তারিখ বাংলাদেশ পঞ্চাশ বছর পূর্ণ  করে একান্ন বছরে পদার্পণ করবে, ছুটে চলবে শত বর্ষ পূর্তির মাইল ফলক আহরণের উদ্দীপনায় । শত বর্ষ আসার আগেই হয়ত স্বাধীনতা আহরণকারী প্রজন্ম বিদায় নিবে উদযাপন না দেখেই। আজকের যে যুবক, তরুণ কিংবা মধ্যবয়সী তাদের অনেকেই হয়ত ভুলে যেতে বসেছে – বাংলাদেশের জন্মটি কিভাবে হয়েছিল এবং ১৯৭১ সালের সেই কালোদিন গুলো কেমন ছিল! কি পরিমাণ ত্যাগ শিকার এর মাধ্যমে জন্ম নিয়েছিল – বাংলাদেশ। আমি ১৯৭১ সালের একজন ১১ বয়সী রিফ্যুজি (শরণার্থী) কিশোর আজ ৫০ বছর পর ১৯৭১ সালের সেই ত্রিপার্শ্ব (প্রিজমের) কাঁচ এর  ভিতর দিয়ে অবলোকন করে বর্ণনা করতে চেষ্টা করছি সেই বাংলাদেশের জন্ম। বাংলা পড়ুয়া জনগোষ্ঠী প্রবাসে দিন দিন ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে আসছে – বাংলাদেশের জন্ম আর আমাদের বাংলা ভাষা একে অপরের সাথে যুক্ত সম্পূরক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে। তাই, আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াসঃ 

চোখের পলকে সারা দেশে বিস্ফোরণের মত জেগে উঠলো মুক্তি বাহিনী – কিন্তু অস্ত্র নাই, গুলি নাই, বারুদ নাই, পোশাক আসাক নেই, দুরবিন নেই, গ্রেনেড নাই, এক্সপ্লোসিভ নাই, গাড়ী নাই, স্পিড বোট নাই, গোপন ঘাটি নেই, নতুন নতুন তরুণ, যুবক, বয়স্ক পুরুষ, শ্রমিক, কৃষাণ, পেশাজীবী বাংলা মায়ের সন্তানেরা দলে দলে সদলবলে যোগ দিতে থাকলো দেশকে শত্রু মুক্ত করতে, একটি স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে। উপায়ান্তর না পেয়ে আমাদের রাজনৈতিক এবং সমর নেতারা আমাদের নিকটতম দেশী ভারতের স্মরনাপন্ন হতে বাধ্য হল। আমাদের ব্যথায় ওঁরাই প্রথম ব্যাথিত হলো। এগিয়ে আসল সাহায্যের হাত নিয়ে। অন্য দিকে পাকিস্তানী মুসলিম হায়েনা পাঞ্জাবী ও পাঠান আর্মি চালিয়ে যেতে লাগলো তাদের অত্যাচার, জুলুম, লুটপাট, হত্যাযজ্ঞ শহর থেকে বন্দরে – বন্দর থেকে থানা হয়ে ইউনিয়ন – ইউনিয়ন থেকে গ্রামে গ্রামে চালাতে লাগলো ওরা তরুণীদের-মহিলাদের ধরে নিয়ে যেয়ে অমানবিক ধর্ষণ এবং যৌন দাসী বানাতে শুরু করলো হাজার হাজার অল্প বয়সী, মধ্য বয়সী মহিলাদেরকে। অন্যদিকে খেতে চাষ করতে না পেরে, জমির পাকা ধান, রবি শস্য জমি থেকে না উঠিয়ে আনতে পারাতে দেখা দিলো খাদ্য সংকট এবং অপর দিকে জীবনের ভয়, মেয়েদের রক্ষার দায়িত্ব এবং শত্রুর হাতে নিরুপায়ভাবে মরার চেয়ে অন্যত্র পালিয়ে যেয়ে জীবন বাঁচানোর উদ্দেশ্যে লক্ষ লক্ষ পরিবার ভারতে আশ্রয় নিতে শুরু করলো। সকলের অগোচরে, নিভৃতে, বিনা অনুমতিতে। পাঞ্জাবী ও পাঠান বর্বর বাহিনীর কাছে কলেমা, পবিত্র কোরআনের সুরা এমন কি খৎনার সাক্ষী দেখিয়েও ঐ পিশাচ বর্বর পাকবাহিনীকে কোনভাবেই বিশ্বাস করানো যাচ্ছিল না যে পূর্ব পাকিস্থানের বাঙ্গালী জনগণ ও মসুলমান, তখন লাখ লাখ মুসলিম, হিন্দু, খ্রিস্টান, বুদ্ধ বাঙ্গালীরা ভারতে যখন  আশ্রয় চাইলো – কেই তাদের একবারও জিজ্ঞেস করলো না কি তাদের ধর্ম – ধর্ম যখন অমানুষের হাতে পরে প্রশ্নবিদ্ধ তখন মানবিকতার বহিঃপ্রকাশ ধর্মকে হার মানিয়েছিল বোধহয় সেদিন  ! 

বাংলাদেশের তিন দিক উত্তর – পশ্চিম ও পূর্ব ভারত দ্বারা পরিবেষ্টিত আর দক্ষিণ দিকে সাগর – সাগর এর দিক ছাড়া বাকী তিন দিক দিয়েই অনবরত প্রবেশ করতে লাগল রাত দিন ভয়ার্ত, নিরীহ মানুষ, পরিবার, বয়স্ক মা, আতুর বাবা, নবজাত শিশুদেরকে নিয়ে পঞ্চাশ থেকে একশ মাইল পায়ে হেটে। 

পৃথিবীর ইতিহাসে এক অন্যতম বড় জন সমুদ্র আশ্রয় নিয়েছিল  জীবন বাঁচানোর জন্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এমন বিশাল রীফয়ূজী ঝামেলা আর কোথাও হয়নি। ভারত সরকার – বিরোধী রাজনৈতিক দল – জনগণ হীমশিম খেতে লাগলো – আশ্রয় গ্রহণ করে জীবন বাঁচানোর জন সমুদ্রের ঢলতো আর শেষ হয় না। অন্যদিকে সম্পূর্ণ পৃথিবী নীরব মার্কিনরা ওদের পক্ষে – চীন ও ওদের দলে – পাক সেনা দের বন্ধু, মুসলিম জগত পূরটাই পাক বাহিনীর কব্জায় - কেই একটি টু শব্দও করল না বাঙ্গালী মুসলিম হত্যার ব্যাপারে যেন বাঙালী জাতি বলতে কেউ নেই এই ইহজগতে নেই। এতই দুর্ভাগা ছিল বাঙালীরা ১৯৭১ সালে। বিচ্ছিন্ন পরিবার, আহত মা, সর্বস্বান্ত কপর্দীকহীন অবস্থা, নেই ঘড়, নেই ফসল, নেই পুকুর, নেই মাছ, নেই মাংস, নেই সবজীর বাগান সব ফেলে আসা শরণার্থী প্রায় ১২ থেকে ১৫ লক্ষ শরণার্থী আশ্রিত ঐ দেশে। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ, পরিবার পশ্চিম বঙ্গ, আসাম, মেঘালয়া, ত্রিপুরায় আশ্রিত হতে থাকলো। যেন এই জন সমুদ্র এর কোন শেষ নেই । (চলবে)

দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণ

img

ইরান চুক্তি: ট্রাম্পের অতি উচ্চাশার পরিণতি যেমন হলো

প্রকাশিত :  ১৩:৩৬, ১৮ জুন ২০২৬

একটি প্রচলিত সামরিক প্রবাদে বলা হয়, ‘শত্রুর মুখোমুখি হওয়ার পর কোনো যুদ্ধপরিকল্পনাই আর আগের মতো থাকে না।’ ইরানকে ঘিরে ডোনাল্ড ট্রাম্পও উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য নিয়ে অভিযান শুরু করেছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ভেঙে দেওয়া এবং হিজবুল্লাহ ও হামাসসহ আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি তেহরানের সমর্থন বন্ধ করা।

এখন যে চুক্তির (সমঝোতা স্মারক) দোহাই দিয়ে ট্রাম্প যুদ্ধ থেকে বের হয়ে যাচ্ছেন, সেখানে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে লিখিত শর্ত নেই। ইরান কেবল পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অন্যদিকে তেহরানের চাপে চুক্তিতে লেবাননকেও যুক্ত করা হয়েছে। যেটিকে বড় জয় হিসেবে দেখছে ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ।

যুদ্ধে ইরানের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা ছিল হরমুজ প্রণালি। এই জলপথ পুনরায় খুলতে গিয়েই ট্রাম্প প্রশাসন তাদের সর্বোচ্চ পর্যায়ের লক্ষ্যগুলো থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়েছে। ট্রাম্পের ভাষায়, এটি না করলে বিশ্ববাসী মন্দার পরিণতি ভোগ করতো।

মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের ফেলো ও যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী বারবারা লিফ বলছেন, ওয়াশিংটন ইরান সম্পর্কে খুবই অবাস্তব মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করে যুদ্ধে নেমেছিল। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও মধ্যপ্রাচ্যের ঘাঁটিতে হামলার জন্য ইরান কতটুকু প্রস্তুত তা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ধারণা একেবারে ভুল ছিল।

বারবারা বলেন, যুদ্ধ শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্র দ্রুতই বিষয়টি বুঝতে পারে। আমেরিকান ভোক্তাদের পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক ক্ষতির প্রভাব ছড়িয়ে পড়ায় এই যুদ্ধ টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে গেছে।

এখন ট্রাম্প একটি জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন বলেও মন্তব্য করেন লিফ। তিনি বলেন, যুদ্ধ যদি প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহেই শেষ হতো, তাহলে ট্রাম্পের হাতে অনেক বেশি প্রভাব ও কূটনৈতিক চাপ তৈরির সুযোগ থাকতো। এখন তিনি সেগুলোর অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছেন।

বর্তমানে ট্রাম্পের নিজের রাজনৈতিক দলের নেতারাই এই চুক্তিকে মানতে পারছেন না। এরইমধ্যে লুইজিয়ানার বিদায়ী সিনেটর বিল ক্যাসিডি চুক্তিকে ‘কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বাজে কূটনীতি’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর ভাষায়, ‘কবরে শুয়ে রিগানও (রোনাল্ড রিগান) এ নিয়ে অস্বস্তিতে পড়বেন।’ রিগান যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও রিপাবলিকান পার্টির নেতা ছিলেন।

বিল ক্যাসিডি বলছেন, ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। তারা হরমুজ প্রণালির কার্যকারিতাও বুঝে গেছে। ভবিষ্যতে নিঃসন্দেহে এই কৌশল কাজে লাগাবে। পাশাপশি এই চুক্তির আওতায় ইরান নতুন অবকাঠামো নির্মাণের সুযোগ পাবে। উত্তর ক্যারোলিনার রিপাবলিকান সিনেটর থম টিলিসের কাছেও এটি ভালো চুক্তি বলে মনে হয়নি।

ট্রাম্প বহু বছর ধরে ‘জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন’ বা জেসিপিওএ নিয়ে সমালোচনা করে আসছেন। তাঁর অভিযোগ, সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি ঠেকাতে ইরানকে ঘুষ দিয়েছিলেন। কিন্তু নতুন চুক্তি দেখাচ্ছে, এতে ইরানকে আরও বেশি অর্থ দেওয়ার সম্ভাবনা আছে। 

চুক্তির বিভিন্ন দফার মধ্যে আছে- আর্থিক প্রণোদনা, লেবাননে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে যুদ্ধবিরতিতে সমর্থন এবং হরমুজ প্রণালি পরিচালনার ভবিষ্যৎ ঠিক করতে ওমান ও ইরানকে যৌথভাবে কাজের সুযোগ দেওয়া।

সমঝোতা স্মারকের নথি হাতে মাসুদ পেজেশকিয়ান (বাঁয়ে) ও ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এএফপি

সমঝোতা স্মারকের নথি হাতে মাসুদ পেজেশকিয়ান (বাঁয়ে) ও ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এএফপি

চুক্তিতে উল্লেখ থাকা ইরানের জব্দকৃত সম্পদ ছাড়ের বিষয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘এটা আমাদের অর্থ নয়, এটা তাদের অর্থ। আমরা একটি নির্দিষ্ট সময়ে এটি আটকে দিয়েছিলাম। আমাদের এটি ফিরিয়ে দিতে হবে।’ পাশাপাশি তাঁর বক্তব্যে ইরানের কথার প্রতিধ্বনিও আছে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র সৌদি আরবের কাছে যদি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র থাকতে পারে, তাহলে ইরানেরও সে দাবি করার যুক্তি আছে।

ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সম্ভাবনা নিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘অন্যদের কাছে এটি আছে, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর কাছেও এটি আছে। এ অবস্থায় তাদের (ইরান) বিদ্যুৎ উৎপাদন সংক্রান্ত কাজে এটি (ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ) ব্যবহার করতে না দিলে বিষয়টা খুব কঠোর হয়ে যায়। এখানে কিছুটা কমন সেন্স ব্যবহার করতে হবে।’

শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে এই সমঝোতা স্মারক একটি বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত। যেটির লক্ষ্য ছিল- রাজনৈতিক মূল্য দিতে হলেও সংঘাত যত দ্রুত সম্ভব শেষ করতে হবে। বারবারা লিফ বলছেন, একটি অযৌক্তিক যুদ্ধ শেষ হতে দেখাটা স্বস্তির। তবে পরে যে আবার যুদ্ধ শুরু হবে না- চুক্তিতে সে নিশ্চয়তা বেশ কম।