img

লন্ডনে Enforcement Officer-দের কার্যক্রম: ইতিহাস, দায়িত্ব ও বাস্তবতা

প্রকাশিত :  ১৪:০৪, ২৮ জানুয়ারী ২০২৬

লন্ডনে Enforcement Officer-দের কার্যক্রম: ইতিহাস, দায়িত্ব ও বাস্তবতা

জান্নাতুল ফেরদৌস ডলি

UK-তে Enforcement Officer-দের কার্যক্রম বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে পার্কিং আইন, পরিবেশ সংরক্ষণ ও পাবলিক স্পেস ব্যবস্থাপনা—বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের দায়িত্ব সমাদৃত। এই ব্যবস্থার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা।

Enforcement ব্যবস্থার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

UK-তে আধুনিক Enforcement ব্যবস্থার বিকাশ ঘটে মূলত ১৯৯০-এর দশকে। ১৯৯১ সালের Road Traffic Act এবং পরবর্তীতে Traffic Management Act 2004–এর মাধ্যমে পার্কিং ও ট্রাফিক enforcement-এর দায়িত্ব অধিকাংশই স্থানীয় কাউন্সিলের হাতে ন্যস্ত হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল পুলিশের উপর চাপ কমানো এবং স্থানীয় পর্যায়ে শৃঙ্খলা আরও কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা।

এই আইন কার্যকর হওয়ার পর থেকেই Civil Enforcement Officer (CEO) পদ চালু হয়, যারা সরাসরি রাস্তায় ও জনসমাগমস্থলে দায়িত্ব পালন করেন।

লন্ডনসহ বড় শহরগুলোতে একসময় ভুল পার্কিংয়ের কারণে অ্যাম্বুলেন্স ও ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি চলাচলে মারাত্মক সমস্যা হতো। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, নিয়মিত Enforcement চালুর পর অনেক এলাকায় জরুরি যানবাহনের চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে সহজ হয়।

একইভাবে, স্কুল জোনে অবৈধ পার্কিং কমাতে Enforcement Officer-দের সক্রিয় উপস্থিতি শিশুদের নিরাপত্তা বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে—এমন উদাহরণ বিভিন্ন কাউন্সিল রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

ট্রাফিক ও জননিরাপত্তায় ভূমিকা

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়ম না মেনে পার্কিং ও যান চলাচল দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। Enforcement Officer-রা নিয়ম প্রয়োগের মাধ্যমে দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকাংশেই কমে গেছে। বিশেষ করে ব্যস্ত শহরাঞ্চলে তাদের উপস্থিতি পথচারীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করে।

আইন মানার সংস্কৃতি গড়ে তোলা

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, নিয়ম প্রয়োগের ধারাবাহিকতা নাগরিকদের মধ্যে আইন মানার সংস্কৃতি তৈরি করে। যখন মানুষ দেখে নিয়ম সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ হচ্ছে, তখন তারা নিজেরাই নিয়ম মানতে বেশি সচেতন হয়।

Enforcement Officer-দের কাজ শুধু ট্রাফিক বা পার্কিংয়ে সীমাবদ্ধ নয় বরং এটি অনেক কর্মকর্তা পরিবেশগত আইন প্রয়োগ, অবৈধ আবর্জনা ফেলা রোধ এবং পাবলিক স্পেস সংরক্ষণে কাজ করেন। এর ফলে শহরের পরিবেশ ও সৌন্দর্য রক্ষায় ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।

যদিও Enforcement ব্যবস্থাকে ঘিরে সমালোচনা রয়েছে, তবুও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন সঠিক নীতি, স্বচ্ছতা ও কার্যকর তদারকি থাকলে এই ব্যবস্থার মাধ্যমে জনস্বার্থ আরও ভালোভাবে রক্ষা করা সম্ভব।

ইতিহাস ও বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, Enforcement Officer-রা সমাজে শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। প্রয়োজন শুধু ন্যায্য প্রয়োগ, স্পষ্ট নিয়ম এবং জনআস্থা ধরে রাখার মতো নিয়মানুবর্তিতা। 


মতামত এর আরও খবর

img

পারস্য উপসাগরের দহন ও বিশ্ব অর্থনীতির মহাসংকট: বাংলাদেশের ঝুঁকির গতিপ্রকৃতি ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা

প্রকাশিত :  ০৯:৫১, ১০ মার্চ ২০২৬

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ

২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি তারিখটি বিশ্ব ইতিহাসের পাতায় এক রক্তাক্ত অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। ওই দিন ভোররাতে ইসরায়েল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ বিমানবাহিনী ইরানের রাজধানী তেহরানসহ গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে একযোগে ভয়াবহ বিমান হামলা চালায়। এই হামলার মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের শাসনব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন বা \'রেজিম চেঞ্জ\'। এই আকস্মিক সামরিক অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন এবং তার কম্পাউন্ড ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। এই একটি ঘটনাই মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিকে কয়েক দশকের জন্য অস্থির করে তোলার জন্য যথেষ্ট ছিল। খামেনির মৃত্যুর পর তার পুত্র মোজতবা খামেনিকে তাড়াহুড়ো করে পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ঘোষণা করা হয়, যা দেশটির অভ্যন্তরে কট্টরপন্থী শিবিরের বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। কিন্তু এই রাজনৈতিক পালাবদল কেবল ইরানের সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং এর উত্তাপ মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক নৌপথ এবং উদীয়মান দেশগুলোর অর্থনীতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশ, যারা আমদানিকৃত জ্বালানি এবং প্রবাসী আয়ের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, তাদের জন্য এই যুদ্ধ এক অস্তিত্ব রক্ষার সংকটে রূপ নিয়েছে।

ভূ-রাজনৈতিক আগ্নেয়গিরি: হরমুজ প্রণালির শ্বাসরোধ ও বিশ্ববাজারের কম্পন

যুদ্ধের সূচনালগ্নেই ইরান তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনৈতিক অস্ত্র ব্যবহার করেছে—হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া। পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত এই সরু জলপথটি বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের প্রধান ধমনী। বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। ইরানের পক্ষ থেকে এই পথ কার্যত অচল করে দেওয়ার ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে এক ভয়াবহ সরবরাহ শৃঙ্খল বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। বর্তমানে প্রায় ২০০টিরও বেশি তেল ও গ্যাসবাহী ট্যাংকার পারস্য উপসাগরের বাইরে আটকা পড়ে আছে, কারণ যুদ্ধকালীন ঝুঁকি বীমা বা \'ওয়ার রিস্ক ইন্স্যুরেন্স\' ছাড়া কোনো জাহাজই এই এলাকায় প্রবেশ করতে সাহস পাচ্ছে না।

এই অবরোধের তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছে জ্বালানি তেলের দামে। যুদ্ধ শুরুর আগে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ৬৫-৬৭ ডলার, তা মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে ১১৫ ডলারে পৌঁছেছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১১৯ ডলার পর্যন্ত স্পর্শ করেছে। জ্বালানি তেলের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি কেবল পরিবহন খাতেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি রাসায়নিক সার উৎপাদন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শিল্পকারখানার উৎপাদন খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। অর্থনীতিবিদরা একে \'জ্বালানি শক\' হিসেবে অভিহিত করছেন, যা ১৯৭০-এর দশকের বিশ্বমন্দার স্মৃতি মনে করিয়ে দিচ্ছে।

বিশ্বের প্রধান শেয়ারবাজারগুলোতেও এই যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট। নিউইয়র্কের ওয়াল স্ট্রিট থেকে শুরু করে টোকিও বা হংকং—সবখানেই সূচকের বড় পতন লক্ষ্য করা গেছে। ডাও জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজ একদিনেই ৪০০ পয়েন্টের বেশি হারিয়েছে, আর দক্ষিণ কোরিয়ার কোসপি (KOSPI) সূচক ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের পর সবচেয়ে বড় ধসের সম্মুখীন হয়েছে। বিনিয়োগকারীরা অনিশ্চয়তার ভয়ে পুঁজি সরিয়ে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের দিকে ঝুঁকছেন, যার ফলে বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে।

বাংলাদেশ অর্থনীতিতে প্রথম আঘাত: জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট

বাংলাদেশের জন্য এই যুদ্ধ কোনো দূরবর্তী সংবাদ নয়, বরং এটি সরাসরি আমাদের রান্নাঘর এবং কারখানার চাকা থামিয়ে দেওয়ার অশনিসংকেত। বাংলাদেশ তার প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেলের প্রায় ৯০ শতাংশই আমদানি করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়া এবং পারস্য উপসাগরে অস্থিরতার কারণে সৌদি আরব, কুয়েত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। যদিও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) দাবি করছে যে দেশে কয়েক সপ্তাহের মজুত রয়েছে, কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এই নিশ্চয়তা ধূলিসাৎ হয়ে যেতে পারে।

জ্বালানি তেলের এই সংকট সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতকে আঘাত করেছে। দেশে বর্তমানে গ্যাসের অভাব প্রকট, কারণ আমদানিকৃত এলএনজি সরবরাহ থমকে গেছে। কাতার থেকে আসা এলএনজি জাহাজগুলো এখন ঝুঁকিপূর্ণ পথ এড়িয়ে বিকল্প পথ খুঁজছে, যার ফলে জাহাজভাড়া ও সময়—উভয়ই বাড়ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখতে সরকার ইতিমধ্যে কঠোর সাশ্রয়ী নীতি গ্রহণ করেছে। মার্চ ২০২৬-এর শুরুতে দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং আসন্ন ঈদুল ফিতরের ছুটি এগিয়ে আনা হয়েছে। এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বড় আকারের বিদ্যুৎ ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার কমিয়ে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমানো।

শিল্প খাতেও এই প্রভাব সুদূরপ্রসারী। গ্যাস সংকটের কারণে দেশের পাঁচটি রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানার মধ্যে চারটির উৎপাদন বন্ধ করে দিতে হয়েছে। আমদানিকৃত গ্যাস এখন কৃষি ও সার কারখানার পরিবর্তে বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ করা হচ্ছে, যাতে লোডশেডিং সহনীয় পর্যায়ে রাখা যায়। কিন্তু এর ফলে কৃষি খাতে সারের তীব্র সংকট এবং খাদ্য নিরাপত্তার ওপর বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যে বসবাসরত প্রায় ১ কোটি বাংলাদেশি প্রবাসী ইতিমধ্যে যুদ্ধের প্রভাব অনুভব করতে শুরু করেছেন। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে তেল স্থাপনায় হামলা এবং অর্থনৈতিক মন্দার কারণে চাকরি হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আকাশপথ বন্ধ ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে কাতার ও ওমানেও এলএনজি সরবরাজ ও কার্গো সমস্যা এবং ভিসানীতির জটিলতা প্রবাসীদের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে।

রান্নাঘরের বাজার ও \'ওয়ার প্রিমিয়াম\'-এর দহন

সাধারণ মানুষের কাছে এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় প্রভাব অনুভূত হচ্ছে নিত্যপণ্যের বাজারে। যদিও বাংলাদেশ সরাসরি যুদ্ধে জড়িত নয়, কিন্তু আমদানিকৃত পণ্যের ওপর যুদ্ধের দোহাই দিয়ে \'ওয়ার প্রিমিয়াম\' যুক্ত হচ্ছে। ভোজ্য তেল, চিনি এবং ডাল—যা মূলত আমদানিনির্ভর—এগুলোর দাম বাজারে হুহু করে বাড়ছে। খুলনার বাজারে ইতিমধ্যে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ৪-৫ টাকা বেড়েছে, আর খোলা তেলের দাম বেড়েছে ৭ টাকা পর্যন্ত। ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করছেন যে, সরবরাহকারী কোম্পানিগুলো যুদ্ধের অজুহাতে সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে, যা বাজারে এক কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে।

রমজান মাস চলায় মুরগি ও গরুর মাংসের দামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিপ্রতি ২২০ টাকায় পৌঁছেছে, যা এক সপ্তাহ আগে ১৭০-১৮০ টাকা ছিল। গরুর মাংসের দাম কেজিপ্রতি ৮৫০ টাকা ছাড়িয়েছে। তেলের দাম বাড়ার ফলে পরিবহন খরচ বেড়েছে, যার প্রভাব পড়ছে শাকসবজি থেকে শুরু করে চাল-ডাল পর্যন্ত প্রতিটি পণ্যে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা শুকনো ফল যেমন খেজুর, এপ্রিকট এবং বাদামের দাম ২০-৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে, কারণ বিমান যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় এই পণ্যগুলোর আমদানি থমকে গেছে।

এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন ও বাংলাদেশের \'ট্যারিফ ক্লিফ\' আতঙ্ক

২০২৬ সালের নভেম্বর মাসে বাংলাদেশের \'স্বল্পোন্নত দেশ\' (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার কথা। এটি একটি দেশের জন্য গৌরবের বিষয় হলেও বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এটি বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এলডিসি স্ট্যাটাস চলে গেলে বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও কানাডার মতো বড় বাজারগুলোতে শুল্কমুক্ত সুবিধা (এভরিথিং বাট আর্মস-ইবিএ) হারাবে। বর্তমানে যুদ্ধের কারণে রপ্তানি আয় যেখানে কমছে, সেখানে ৯-১২ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপিত হলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে না।

অর্থনীতিবিদরা একে \'ট্যারিফ ক্লিফ\' বা শুল্কের পাহাড় বলে অভিহিত করছেন। গ্র্যাজুয়েশনের ফলে স্বল্প সুদে বৈদেশিক ঋণ পাওয়ার সুযোগও কমে যাবে। এখন যেখানে ১-২ শতাংশ সুদে ঋণ পাওয়া যায়, গ্র্যাজুয়েশনের পর তা ৫-৭ শতাংশ বাণিজ্যিক হারে নিতে হবে, যা দেশের ঋণের বোঝা এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাকে (ডেবট সার্ভিসিং) মারাত্মক চাপে ফেলবে। ব্যবসায়ী ও সিপিডি-র মতো গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন সরকারকে গ্র্যাজুয়েশন প্রক্রিয়া অন্তত ২০৩২ সাল পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়ার জন্য জাতিসংঘের কাছে আবেদন করার পরামর্শ দিচ্ছে।

ডলার সংকট ও ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে ডলারের সংকট নতুন কিছু নয়, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। আমদানি ব্যয় বাড়ার বিপরীতে রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স কমতে থাকায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়েছে। যদিও ২০২৫ সালের মাঝামাঝি রিজার্ভ ৩১ বিলিয়ন ডলারের ওপরে উঠেছিল, কিন্তু যুদ্ধের প্রভাবে তা আবার কমতে শুরু করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক বর্তমানে ডলারের বিনিময় হার ১২২ টাকায় স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করলেও বাজারে ডলারের তীব্র সংকট রয়েছে। অনেক ব্যাংক এখন এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) খুলতে অপরাগতা প্রকাশ করছে, বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি আমদানিকারকদের জন্য। এর ফলে শিল্পকারখানার কাঁচামাল আমদানি ব্যাহত হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন কমিয়ে বাজারে পণ্যের দাম আরও বাড়িয়ে দেবে।

যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে অর্থনীতির সম্ভাব্য রূপরেখা

যদি ইরান-ইসরায়েল-মার্কিন যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে বিশ্ব অর্থনীতি এক অন্ধকার যুগের দিকে ধাবিত হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মূলত তিনটি সম্ভাব্য প্রেক্ষাপট বিবেচনা করছেন:

 ১. সীমিত সংঘাত (১-৩ মাস): এই পরিস্থিতিতে তেলের দাম ১০০ ডলারের আশপাশে থাকবে। বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দাভাব দেখা দিলেও তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। বাংলাদেশ হয়তো কঠোর কৃচ্ছ্রসাধনের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে।

 ২. দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক যুদ্ধ (৬-৯ মাস): এটি হবে সবচেয়ে বিপর্যয়কর। তেলের দাম ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে বিশ্বজুড়ে খাদ্যাভাব এবং মুদ্রাস্ফীতি ডাবল ডিজিট ছাড়িয়ে যাবে। বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশের নিচে নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে।

 ৩. বৈশ্বিক জড়িয়ে পড়া: যদি রাশিয়া বা চীন এই যুদ্ধে পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়ে, তবে এটি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের রূপ নিতে পারে, যেখানে অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশ আর কার্যকর থাকবে না।

বাংলাদেশের জন্য করণীয় হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন কেবল জ্বালানি সাশ্রয় নয়, বরং বিকল্প উৎসের দিকে নজর দিতে হবে। ভারত বা রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি চুক্তি, অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধান ত্বরান্বিত করা এবং কৃষিতে ভর্তুকি বাড়িয়ে খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করা ছাড়া বিকল্প পথ নেই। একই সঙ্গে রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং প্রয়োজনে তাদের বিকল্প শ্রমবাজারে পাঠানোর জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে।

একটি সতর্কবার্তা

পরিশেষে বলা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত কেবল দুটি দেশের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই নয়; এটি বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর চরম আঘাত। প্রথম আলোর সাংবাদিকের ভাষায় বলতে গেলে, “তেহরানের আকাশে যখন ক্ষেপণাস্ত্রের আলো দেখা যায়, তার উত্তাপ বাংলাদেশের কৃষকের চুলার ওপরও অনুভূত হয়।” যুদ্ধের দামামা হয়তো দূরে বাজছে, কিন্তু তার ক্ষুধা ও অস্থিরতা আমাদের ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে। বাংলাদেশ এখন এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষার সম্মুখীন। দূরদর্শী নেতৃত্ব, জাতীয় ঐক্য এবং কঠোর অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা—এই তিনটিই হতে পারে এই মহাসংকট থেকে উত্তরণের চাবিকাঠি। যদি এই যুদ্ধ এখনই না থামে, তবে বিশ্বজুড়ে যে অর্থনৈতিক ধস নামবে, তার ফল ভোগ করতে হবে আগামী কয়েক প্রজন্মকে। বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য এই মেঘ কাটানোর একমাত্র উপায় নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানো এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার মাঝেও অবিচল থেকে বিকল্প পথ খুঁজে বের করা।

মতামত এর আরও খবর