img

প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বাংলাদেশকে বেরিয়ে আসতেই হবে

প্রকাশিত :  ০৪:৫০, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৫:১৮, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬

প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বাংলাদেশকে বেরিয়ে আসতেই হবে

সংগ্রাম দত্ত

আমরা আজ লিখছি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি হিসেবে নয়, বরং উদ্বিগ্ন নাগরিক হিসেবে—যারা শোকাহত, ক্ষুব্ধ এবং গভীরভাবে শঙ্কিত। কানিজ সুবর্ণা স্বর্ণালী ও তার শিশুসন্তানের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা আমাদের নীরব থাকার সুযোগ আর দেয় না। এটি শুধু একটি পরিবারের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি আমাদের রাষ্ট্র ও রাজনীতির দীর্ঘদিনের ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।

প্রায় পাঁচ দশক ধরে বাংলাদেশ এক ধরনের অসুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভেতর দিয়ে যাচ্ছে—যেখানে প্রতিশোধমূলক রাজনীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং আমলাতান্ত্রিক নির্দয়তা ধীরে ধীরে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারকে গ্রাস করেছে। সাম্প্রতিক এই ঘটনা সেই বাস্তবতাকে নগ্নভাবে সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।

প্রায় এগারো মাস ধরে স্বর্ণালী তার স্বামীর জামিনের জন্য আইনি ও প্রশাসনিক সব পথ অনুসরণ করেছেন। প্রতিবারই তিনি প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন। তার স্বামী দোষী না নির্দোষ—তা আদালত নির্ধারণ করবে। কিন্তু বিচারের আগেই দীর্ঘকাল কারাবন্দি রাখা, এবং সেই সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পূর্ণ অনমনীয় আচরণ, একটি তরুণ পরিবারকে অসহনীয় মানসিক চাপে ঠেলে দেয়—যার পরিণতি আমরা আজ দেখছি।

মৃত্যুর পরও রাষ্ট্রের সামনে মানবিক হওয়ার একটি সুযোগ ছিল। সেটিও নেওয়া হয়নি।

স্ত্রী ও সন্তান হারানোর পরও একজন স্বামী ও পিতাকে জানাজা ও দাফনে অংশ নিতে সাময়িক মুক্তি না দেওয়া কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল না। অতীতে বহু ক্ষেত্রে এমন অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এটি ছিল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত—যা আইন নয়, বরং নিষ্ঠুরতাকেই প্রতিফলিত করেছে। যখন নিয়ম মানবিক বোধকে ছাপিয়ে যায়, তখন তা আর ন্যায়বিচার থাকে না; তা হয়ে ওঠে শাস্তি।

এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। এটি একটি ধারাবাহিকতার অংশ।

দশকের পর দশক ধরে আমরা দেখেছি—ক্ষমতায় থাকা সরকার কীভাবে বিরোধীদের দমন করতে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে; কীভাবে সাংবাদিক, মতপ্রকাশকারী ও ভিন্নমতাবলম্বীরা মামলার ভারে নুয়ে পড়ে; কীভাবে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে পরিবারগুলো ভেঙে পড়ে। সরকার বদলায়, কিন্তু প্রতিশোধের রাজনীতি বদলায় না।

এক সরকার অন্য সরকারের অন্যায়ের প্রতিশোধ নেয়। আইন হয়ে ওঠে অস্ত্র, আমলাতন্ত্র হয়ে ওঠে ঢাল, আর মানবাধিকার হয়ে পড়ে শর্তসাপেক্ষ।

এটি গণতন্ত্র নয়।

গণতন্ত্র মানে শুধু ভোট নয়। গণতন্ত্র মানে জনগণের মৌলিক অধিকার—ন্যায্য বিচার, মানবিক আচরণ, মর্যাদা এবং রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে সমান অধিকার। মানবাধিকার জনপ্রিয়তা বা ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং সবচেয়ে বেশি প্রযোজ্য হয় তখনই, যখন কেউ দুর্বল, অভিযুক্ত বা রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর।

আমাদের নিজেদেরই প্রশ্ন করা উচিত: ১৯৭১ সালে কি এই রাষ্ট্রের জন্যই মানুষ জীবন দিয়েছিল?

সাধারণ মানুষ যুদ্ধ করেছিল শান্তি, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের জন্য—কোনো একদলীয় দমনব্যবস্থা কায়েম করার জন্য নয়। তারা চেয়েছিল এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে রাষ্ট্র নাগরিককে রক্ষা করবে, নিঃশেষ করবে না; যেখানে আইন ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করবে, ক্ষমতার হাতিয়ার হবে না; যেখানে মানবিকতা দুর্বলতা নয়, রাষ্ট্রের শক্তি হিসেবে বিবেচিত হবে।

পঞ্চান্ন বছর পর সেই স্বপ্ন আজ বিপন্ন।

যে রাষ্ট্র চরম শোকের মুহূর্তেও মানবিক হতে পারে না, সে রাষ্ট্র ধীরে ধীরে তার নৈতিক বৈধতা হারায়। যে মানুষ তার পুরো পরিবার হারিয়েছে, সে রাষ্ট্রের জন্য কোনো হুমকি নয়। তাকে শেষ বিদায় জানানোর অধিকার থেকে বঞ্চিত করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা নয়—এটি অবিশ্বাস ও ক্ষত আরও গভীর করে।

আমরা সম্মিলিতভাবে আবেদন জানাই—আজকের শাসকদের কাছে এবং আগামীর শাসকদের কাছেও: প্রতিশোধের রাজনীতি বন্ধ করুন। ন্যায়বিচার ও নিষ্ঠুরতার মধ্যে পার্থক্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করুন। আমলাতান্ত্রিক কাঠামোকে মানবিক করুন। গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকার যেন নির্বাচনী সুবিধা বা রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর নির্ভরশীল না হয়—তা নিশ্চিত করুন।

এই চক্র চলতে থাকলে আজকের ভুক্তভোগীরাই হবে আগামী দিনের অজুহাত। আর দেশ হিসেবে আমরা আরও গভীর বিভাজনের দিকে এগিয়ে যাব।

বাংলাদেশ প্রতিহিংসার রাজনীতির চেয়ে অনেক ভালো কিছু পাওয়ার যোগ্য। সে যোগ্য একটি ভবিষ্যৎ—যেখানে আইন ন্যায়সঙ্গত, রাজনীতি সংযত, এবং মানবিকতা কখনো স্থগিত থাকে না।

এটি কোনো দলীয় দাবি নয়।

এটি একটি গণতান্ত্রিক প্রয়োজন।


img

ক্ষমতা নয়, জবাবদিহিতাই গণতন্ত্রের শক্তি: ব্রিটিশ সংসদীয় নৈতিকতার পাঠ

প্রকাশিত :  ১৯:০২, ০৯ জুলাই ২০২৬

নূর আলম সিদ্দিকী রাসেল

গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয় তখন, যখন একজন জনপ্রিয় নেতাকেও প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়।

কারণ প্রকৃত গণতন্ত্র শুধু জনগণের ভোটে ক্ষমতায় যাওয়ার নাম নয়; বরং ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিরা কতটা স্বচ্ছতা, নৈতিকতা এবং জবাবদিহিতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন, সেটিই একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক পরিপক্বতার প্রকৃত মাপকাঠি।

যুক্তরাজ্যের সংসদীয় সংস্কৃতি এই দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। এখানে কোনো রাজনীতিবিদ যত জনপ্রিয়ই হোন না কেন, তাঁর আর্থিক স্বচ্ছতা, আচরণ এবং দায়িত্ব পালনের ধরন নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়।

সাম্প্রতিক সময়ে নাইজেল ফারাজকে ঘিরে রাজনৈতিক অর্থায়ন ও সংসদীয় নৈতিকতা নিয়ে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, সেটি আবারও একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে।

গণতন্ত্রে জনপ্রিয়তা কি জবাবদিহির বিকল্প হতে পারে?

একজন আইনবিদ হিসেবে আমার উত্তর স্পষ্ট-না।

জনপ্রিয়তা একজন রাজনীতিবিদকে জনগণের সমর্থন দিতে পারে, কিন্তু আইনের শাসনের বাইরে কোনো বিশেষ অধিকার দিতে পারে না।

অভিযোগ, তদন্ত ও প্রমাণ: আইনের মৌলিক শিক্ষা

আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগুলোর একটি হলো-অভিযোগ এবং অপরাধ এক বিষয় নয়।

কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠতে পারে। তদন্ত হতে পারে। গণমাধ্যমে আলোচনা হতে পারে। কিন্তু প্রমাণ ছাড়া কাউকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা ন্যায়বিচারের মূলনীতির পরিপন্থী।

যুক্তরাজ্যের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির শক্তি এখানেই। এখানে তদন্ত একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার নয়।

একই সঙ্গে এটিও সত্য যে, জনআস্থা রক্ষার জন্য ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ডের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।

ব্রিটিশ সংসদীয় নৈতিকতার ভিত্তি:

যুক্তরাজ্যের হাউস অব কমন্সের সংসদ সদস্যদের জন্য “Code of Conduct for Members of Parliament” রয়েছে। এই নীতিমালার উদ্দেশ্য হলো সংসদ সদস্যদের আচরণে সততা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং জনগণের আস্থা বজায় রাখা।

এই নৈতিক কাঠামোর পেছনে রয়েছে বিখ্যাত Nolan Principles:

Selflessness (নিঃস্বার্থতা), Integrity (সততা), Objectivity (নিরপেক্ষতা),Accountability (জবাবদিহিতা), Openness (স্বচ্ছতা),Honesty (সততা),Leadership (নৈতিক নেতৃত্ব)

এই নীতিগুলো শুধু কাগজে লেখা কিছু নিয়ম নয়; এগুলো ব্রিটিশ জনজীবনের নৈতিক ভিত্তি।

সংসদ সদস্যরা কীভাবে জবাবদিহির আওতায় থাকেন?

যুক্তরাজ্যে সংসদ সদস্যদের নির্দিষ্ট আর্থিক স্বার্থ, উপহার এবং বাইরের আয়ের বিষয় প্রকাশ করতে হয়।

এর উদ্দেশ্য হলো জনগণ যেন জানতে পারেন, কোনো নির্বাচিত প্রতিনিধি এমন কোনো আর্থিক সম্পর্কের মধ্যে আছেন কি না যা তাঁর দায়িত্ব পালনে প্রভাব ফেলতে পারে।

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন-স্বচ্ছতা দাবি করা মানেই কাউকে অপরাধী বলা নয়।

বরং স্বচ্ছতা এমন একটি ব্যবস্থা, যা অপ্রয়োজনীয় সন্দেহ কমায় এবং জনগণের আস্থা বৃদ্ধি করে।

রাজনৈতিক অর্থায়ন: গণতন্ত্রের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?

রাজনৈতিক দল পরিচালনার জন্য অর্থ প্রয়োজন। কিন্তু অর্থের উৎস যদি অস্পষ্ট হয়, তাহলে জনগণের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।

এই কারণেই যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক অনুদান ও অর্থায়নের ওপর নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে।

গণতন্ত্রে জনগণের অধিকার শুধু ভোট দেওয়া নয়; বরং তারা জানার অধিকার রাখেন-তাদের প্রতিনিধিদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কীভাবে অর্থায়িত হচ্ছে।

কারণ অর্থ এবং ক্ষমতার সম্পর্ক সবসময়ই জনস্বার্থের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

গণমাধ্যম ও আইনের ভারসাম্য:

একটি স্বাধীন সংবাদমাধ্যম গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ক্ষমতাকে প্রশ্ন করে,নীতিনির্ধারকদের জবাবদিহির মধ্যে রাখে এবং জনগণের সামনে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরে।

তবে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার মূলনীতি হলো-প্রমাণের আগে রায় নয়।

একজন সাংবাদিক প্রশ্ন তুলতে পারেন, বিশ্লেষণ করতে পারেন, তথ্য প্রকাশ করতে পারেন। কিন্তু আদালতের ভূমিকা পালন করতে পারেন না।

এই ভারসাম্যই একটি সুস্থ গণতন্ত্রের পরিচয়।

বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয় বিষয়

বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে রাজনৈতিক বিতর্কে একটি সমস্যা দেখা যায়-অভিযোগ উঠলেই মানুষ রাজনৈতিক অবস্থান অনুযায়ী বিভক্ত হয়ে যায়।

এক পক্ষ অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য মনে করে।

অন্য পক্ষ কোনো যাচাই ছাড়াই সব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে। কিন্তু একটি পরিণত গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি এর চেয়ে ভিন্ন।

সেখানে ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে আবেগ নয়, প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে জনপ্রিয়তা নয়, আইনের শাসন শেষ কথা।

পরিশেষে বলতে হয়,ক্ষমতা মানুষকে সাময়িকভাবে শক্তিশালী করতে পারে, কিন্তু জবাবদিহিতাই একটি গণতন্ত্রকে দীর্ঘস্থায়ী করে।

একজন প্রধানমন্ত্রী, একজন সংসদ সদস্য কিংবা একজন জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতা কেউই জনগণের আস্থা এবং আইনের শাসনের ঊর্ধ্বে নন।

ব্রিটিশ সংসদীয় সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, গণতন্ত্র শুধু কে ক্ষমতায় যাবে সেই প্রশ্ন নয়; বরং ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিরা কতটা নৈতিকতা ও জবাবদিহিতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবেন, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ শেষ পর্যন্ত একটি দেশের প্রকৃত শক্তি তার নেতাদের জনপ্রিয়তায় নয়, বরং তার প্রতিষ্ঠানগুলোর সততা, স্বাধীনতা এবং জবাবদিহিতার সংস্কৃতিতে।


নূর আলম সিদ্দিকী রাসেল: আইনবিদ, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক