img

১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬: বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক দিগন্ত, নাকি অনিশ্চিত গন্তব্য?

প্রকাশিত :  ০৪:৪৭, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৫:০২, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬

১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬: বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক দিগন্ত, নাকি অনিশ্চিত গন্তব্য?

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি কেবল একটি সাধারণ নির্বাচনের তারিখ হিসেবে নয়, বরং একটি নতুন প্রজাতন্ত্রের ভ্রূণ হিসেবে চিহ্নিত হতে যাচ্ছে। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার যে মহাবিপ্লব দেড় দশকের জগদ্দল পাথরকে সরিয়ে দিয়েছিল, সেই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার চূড়ান্ত পরীক্ষা এই নির্বাচন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেছেন যে নির্বাচন নির্ধারিত দিনেই হবে; আর এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে দেশ এখন এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দীর্ঘকাল ভোটাধিকার বঞ্চিত ১২ কোটি ৭৭ লাখ মানুষের সামনে এটি কেবল সংসদ নির্বাচন নয়, বরং গণভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের প্রশ্নও জড়িত।

জুলাই বিপ্লবের উত্তরাধিকার ও নির্বাচনের প্রেক্ষাপট

এই নির্বাচনের প্রেক্ষাপট বুঝতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সেই রক্তরঞ্জিত দিনগুলোর দিকে। ছাত্র-জনতার যে অভ্যুত্থান শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য করেছিল, সেই আন্দোলনের মূল সুর ছিল 'রাষ্ট্র সংস্কার'। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই দাবি উঠেছিল যে পুরনো ঘুণে ধরা ব্যবস্থার ভেতরে নির্বাচন দিলে তা পুনরায় ফ্যাসিবাদের পথ প্রশস্ত করতে পারে। ড. ইউনূসের সরকার তাই একটি 'জুলাই সনদ' বা রাষ্ট্র সংস্কারের রোডম্যাপ তৈরি করেছে, যা এই নির্বাচনের সাথেই ভোটারদের অনুমোদনের জন্য পেশ করা হচ্ছে। এই সনদে এমন কিছু মৌলিক পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে, যা বাংলাদেশের গত পঞ্চাশ বছরের সংসদীয় সংস্কৃতিতে অনুপস্থিত ছিল—যেমন প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মেয়াদ সীমাবদ্ধ করা এবং দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠন।

নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী, ১১ ডিসেম্বর ২০২৫-এ এএমএম নাসির উদ্দীন যখন নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেন, তখন থেকেই দেশ নতুন উত্তেজনার আবর্তে প্রবেশ করে। এটি কোনো সাধারণ নির্বাচন নয়, কারণ দেশের অন্যতম প্রাচীন ও বৃহত্তম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ এই প্রক্রিয়ার বাইরে। সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় নির্বাচনী মাঠের সমীকরণ এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন। ফলে এবারের নির্বাচন মূলত একটি দ্বিমুখী লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে: একদিকে দীর্ঘদিনের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি বিএনপি, অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও নতুন প্রজন্মের ‘ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি’র (এনসিপি) অভাবনীয় জোট।

বিএনপির রূপান্তর ও তারেক রহমানের নেতৃত্ব

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এই নির্বাচনকে তাদের সতেরো বছরের রাজনৈতিক সংগ্রামের চূড়ান্ত ফসল হিসেবে দেখছে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ২২ জানুয়ারি ২০২৬-এ সিলেটের মাটি থেকে যখন নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন, তখন তা তার ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবনের এক বিশাল মাইলফলক হয়ে দাঁড়ায়। দীর্ঘ নির্বাসন কাটিয়ে দেশে ফিরে তিনি যেভাবে জনমনে সাড়া ফেলেছেন, তা নির্দেশ করে যে বিএনপির জনপ্রিয়তা এখনো আকাশচুম্বী। তবে এবারের বিএনপি পুরনো ধাঁচের নয়; তারেক রহমান সচেতনভাবে দলকে একটি উদারপন্থী ও আধুনিক গণতান্ত্রিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন।

বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফার রাষ্ট্র সংস্কার কর্মসূচি এবং ‘ভিশন-২০৩০’-এর মূল ভিত্তি হলো জনগণের সার্বভৌমত্ব। দলটির পক্ষ থেকে ‘গিভ অ্যাডভাইস টু তারেক রহমান’ বা ‘ম্যাচ মাই পলিসি’-র মতো আধুনিক ডিজিটাল প্রচারণা চালানো হচ্ছে, যার লক্ষ্য তরুণ ভোটারদের সম্পৃক্ততা বাড়ানো। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিএনপি এবার কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য নয়, বরং আওয়ামী লীগের ফেলে যাওয়া ‘উদারপন্থী ও সেকুলার’ রাজনীতির শূন্যস্থান পূরণ করতে চাইছে। তবে বিএনপির অভ্যন্তরে ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ এবং চাঁদাবাজির যে অভিযোগ উঠছে, তা দলের ভাবমূর্তি কিছুটা ম্লান করছে। বিশেষ করে ৯২ জন নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় মাঠপর্যায়ে অন্তর্কোন্দল ও সহিংসতার আশঙ্কা বেড়ে গেছে।

জামায়াতে ইসলামীর পুনরুত্থান ও এনসিপির তরুণ শক্তি

এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় চমক হচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর অভাবনীয় জনসমর্থন। একসময় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে কোণঠাসা হয়ে পড়া এই দলটি এখন নিজেদেরকে দুর্নীতিমুক্ত ও সুশৃঙ্খল বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করছে। আন্তর্জাতিক রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই)-এর জরিপ অনুযায়ী জামায়াত বর্তমানে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান অত্যন্ত কৌশলে জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করেছেন এবং তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি বা এনসিপির সাথে নির্বাচনী জোট গঠন করেছেন।

এই জোটের মূল শক্তি হলো ২০২৪ সালের আন্দোলনের মাঠ কাঁপানো ছাত্রনেতারা। নাহিদ ইসলাম বা সারজিস আলমের মতো তরুণরা যখন এনসিপির ব্যানারে জামায়াতের সাথে হাত মেলান, তখন তা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নতুন মেরুকরণ তৈরি করে। যদিও এই জোট নিয়ে নাগরিক সমাজের একাংশের মধ্যে সংশয় রয়েছে, বিশেষ করে জামায়াতের অতীত ভূমিকা নিয়ে। তবুও তরুণ ভোটাররা, যারা আওয়ামী লীগের শাসন ছাড়া অন্য কিছু দেখেনি, তারা এখন এই নতুন জোটের ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ বা দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্রের ডাককে গুরুত্বের সাথে দেখছে। জামায়াত এবার ২২৪টি আসনে প্রার্থী দিয়ে তাদের সাংগঠনিক সামর্থ্যের প্রমাণ দিচ্ছে এবং প্রবাসী ভোটের দিকেও বিশেষ নজর দিয়েছে।

জুলাই সনদ ও গণভোট: রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য

নির্বাচনের দিন ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটারদের হাতে দুটি ব্যালট পেপার থাকবে—একটি সংসদ সদস্য নির্বাচনের জন্য, অন্যটি সাংবিধানিক গণভোটের জন্য। এই গণভোট মূলত ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের আইনি ভিত্তি তৈরি করবে। ড. ইউনূসের সরকার বিশ্বাস করে যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের আমূল পরিবর্তন না করে কেবল নির্বাচন দিলে তা পুনরায় স্বৈরাচারের জন্ম দিতে পারে। জুলাই সনদের প্রধান প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে একটি উচ্চকক্ষ গঠন, যেখানে বিশেষজ্ঞ ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রতিনিধিত্ব থাকবে।

এই গণভোটের প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের লড়াই এখন রাজপথেও দৃশ্যমান। এনসিপি ও জামায়াত জোট ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে জোরালো প্রচার চালাচ্ছে। অন্যদিকে বিএনপি নীতিগতভাবে এই সংস্কারের সাথে একমত হলেও উচ্চকক্ষ গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছে। তবে সামগ্রিকভাবে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পরিবেশ রক্ষায় বিএনপি এই প্রক্রিয়ার সাথে নিজেকে যুক্ত রেখেছে। বিশ্লেষকদের মতে, গণভোটের ফলাফল যদি ‘না’ হয়, তবে পরবর্তী সরকার এই সংস্কারগুলো বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে না, যা বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে।

অর্থনীতির সংকট ও মুদ্রাস্ফীতির কষাঘাত

নির্বাচনী উত্তাপের আড়ালে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো অর্থনীতি। ২০২৫ সালের শেষভাগে মুদ্রাস্ফীতি ৮.৪৯ শতাংশে পৌঁছেছে। চাল, ডাল, পেঁয়াজ ও তেলের ঊর্ধ্বমূল্য নিয়ে জনমনে তীব্র অসন্তোষ রয়েছে। যদিও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জানুয়ারি মাসে মুদ্রাস্ফীতি সামান্য কমার দাবি করেছে, তবুও বাজারের বাস্তবতা এখনো সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।

অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুনের মতে, বৈদেশিক ঋণের বোঝা এবং অবকাঠামো প্রকল্পের উচ্চ ব্যয় অর্থনীতিকে চাপের মুখে রেখেছে। নতুন যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তাদের প্রথম চ্যালেঞ্জ হবে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখা। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে বিজয়ী দলের প্রতি জনগণের মোহভঙ্গ হতে বেশি সময় লাগবে না।

নির্বাচনী সহিংসতা ও নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ

তফসিল ঘোষণার পর থেকেই দেশে রাজনৈতিক সহিংসতার গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী। গত কয়েক সপ্তাহে অন্তত ১৬ জন রাজনৈতিক কর্মীর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। বিশেষ করে কেরানীগঞ্জ ও ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বিএনপি ও জামায়াত কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে বাধা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। দেশের অর্ধেকের বেশি ভোটকেন্দ্রকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং নিরাপত্তা বজায় রাখতে নয় লাখ সদস্য মোতায়েনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই সহিংসতার পেছনে লুণ্ঠিত অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার এবং পরাজিত শক্তির উস্কানিকেও দায়ী করা হচ্ছে।

ভূ-রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক শক্তির ভূমিকা

বাংলাদেশের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দিল্লি, ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে নতুন এক কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। দীর্ঘ পনেরো বছর আওয়ামী লীগের একনিষ্ঠ সমর্থক থাকার পর ভারত এখন বাংলাদেশে তার প্রভাব পুনরুদ্ধারে সচেষ্ট। বিএনপি ভারতের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ইঙ্গিত দিলেও দিল্লির নীতিনির্ধারকদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর উত্থান নিয়ে গভীর উদ্বেগ রয়েছে।

অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই নির্বাচনকে বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের একটি ‘লিটমাস টেস্ট’ হিসেবে দেখছে। ওয়াশিংটন চাচ্ছে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন। তবে জামায়াতের ক্ষমতার অংশীদার হওয়ার সম্ভাবনা মার্কিন প্রশাসনের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। এই ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন নির্বাচন-পরবর্তী সরকার গঠনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

তরুণ ও নারী ভোটার: গেম চেঞ্জার কারা?

২০২৬ সালের নির্বাচনে মোট ভোটারের প্রায় ৪৪ শতাংশই তরুণ প্রজন্ম (জেনারেশন জেড)। এই বিশাল ভোটার গোষ্ঠী কোনো নির্দিষ্ট দলের প্রতি অন্ধ আনুগত্যে বিশ্বাসী নয়। তারা চায় কর্মসংস্থান, বাকস্বাধীনতা ও আধুনিক জীবনযাত্রা। তবে নারীর প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে দলগুলো এখনো পিছিয়ে। বিএনপি বা জামায়াত—কেউই কাঙ্ক্ষিত সংখ্যায় নারী প্রার্থী দিতে পারেনি, যা আধুনিক নারী ভোটারদের মধ্যে প্রশ্ন তুলেছে। অথচ ভোটারদের অর্ধেকই নারী।

একটি নতুন ভোরের প্রতীক্ষা

১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ কেবল একটি ভোটের উৎসব নয়, এটি একটি জাতির আত্মপরিচয় নির্ধারণের ক্ষণ। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যে নিরপেক্ষতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তার ওপরই নির্ভর করছে আগামীর স্থিতিশীলতা। তবে কেবল নির্বাচনের ফলাফলই শেষ কথা নয়। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বিজয়ী ও বিজিত শক্তির মধ্যে সহাবস্থানের পরিবেশ বজায় রাখা না গেলে বাংলাদেশ পুনরায় সংঘাতের আবর্তে হারিয়ে যেতে পারে। ১২ ফেব্রুয়ারির ব্যালট বাক্সে সেই স্বপ্নেরই প্রতিফলন ঘটুক, যেখানে আর কোনো স্বৈরাচারের পদধ্বনি শোনা যাবে না।

মতামত এর আরও খবর

img

আগামী কালের ব্যালট যুদ্ধে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পথে জামায়াতে ইসলামী

প্রকাশিত :  ০৫:৩২, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৫:১৬, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের পাতায় ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ তারিখটি এক অবিস্মরণীয় সন্ধিক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত হতে যাচ্ছে। দীর্ঘ ১৫ বছরের একদলীয় শাসনের অবসান, রক্তক্ষয়ী জুলাই অভ্যুত্থান এবং পরবর্তী দেড় বছরের অন্তর্বর্তীকালীন সংস্কার পর্বের পর দেশ আজ এক মহাজাগরণের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। এই নির্বাচন কেবল ৩০০ আসনের জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের লড়াই নয়, বরং এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রচরিত্র ও আগামীর রাজনৈতিক দর্শনের গতিপথ নির্ধারণের এক ঐতিহাসিক গণভোট। মাঠের লড়াইয়ে প্রধান দুই প্রতিপক্ষ হিসেবে এখন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এক সময়ের ঘনিষ্ঠ মিত্র এই দুই দলের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান, কৌশল এবং জনমতের মেরুকরণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পরিবর্তনের অঙ্গীকার নিয়ে জামায়াতে ইসলামী সরকার গঠনের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

পটভূমি: অভ্যুত্থান-পরবর্তী শূন্যতা ও নতুন মেরুকরণ

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছিল, তা মূলত বিএনপি ও জামায়াত—এই দুই প্রধান শক্তি দ্বারা পূরণ হয়েছে। আওয়ামী লীগ বর্তমানে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকায় নির্বাচনী লড়াইটি কার্যত দ্বিমুখী রূপ নিয়েছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গত দেড় বছরে রাষ্ট্র সংস্কারের যে প্রাথমিক কাজগুলো করেছে, তা জনমনে এক বিশাল প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছে। এই পটভূমিতে বিএনপি চাইছে তাদের দীর্ঘ দুই দশকের ক্ষমতার বাইরে থাকার অবসান ঘটিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিতে, অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী চাইছে তাদের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার সংকট কাটিয়ে একটি প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে।

রাজনীতির এই নয়া বিন্যাসে সবচেয়ে লক্ষণীয় পরিবর্তন হলো বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যকার দীর্ঘদিনের জোটের ভাঙন। বিএনপি নিজেকে এখন একটি উদারপন্থী, গণতান্ত্রিক ও জাতীয়তাবাদী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে, যা মূলত আওয়ামী লীগের ফেলে যাওয়া 'সেকুলার-লিবারেল' স্পেসটি দখল করার একটি সুদূরপ্রসারী কৌশল বলে মনে করা হচ্ছে। আল-জাজিরাসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে দেওয়া বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, বিএনপি সচেতনভাবেই জামায়াতের সাথে দূরত্ব বজায় রাখছে, যাতে তারা আন্তর্জাতিক মহলে এবং দেশের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির কাছে আরও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী জুলাই অভ্যুত্থানে তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সক্রিয় সফল ভূমিকাকে পুঁজি করে একটি 'বিপ্লবী ও সংস্কারপন্থী' ইমেজে আবির্ভূত হয়েছে।

বিএনপির নির্বাচনী প্রচারণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তাদের ঘোষিত '৩১ দফা' রাষ্ট্র সংস্কার পরিকল্পনা। দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, যিনি দীর্ঘ প্রবাস জীবন শেষে এক বিশাল জনআবেগের মধ্য দিয়ে দেশে ফিরেছেন, তিনি এখন দলের প্রধান চালিকাশক্তি। বিএনপির প্রচারণায় বারবার উঠে আসছে যে, তারা কেবল ক্ষমতায় যেতে চায় না, বরং ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করতে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ এবং প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সীমাবদ্ধতা নিশ্চিত করতে চায়।

বিএনপির ইশতেহারে সামাজিক সুরক্ষা তথা 'ফ্যামিলি কার্ড' এবং 'কৃষি কার্ড'-এর মতো ইতোমধ্যে বিতর্কিত কর্মসূচিগুলোর মাধ্যমে তারা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভোট নিশ্চিত করার কৌশল নিয়েছে। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে দরিদ্র পরিবারগুলোকে সরাসরি নগদ অর্থ সহায়তা এবং কৃষি কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের বীজ ও সারের ক্ষেত্রে সরাসরি ভর্তুকি,  'ফ্যামিলি কার্ড এ বাজার-সদাইয়ে অর্ধেক মূল্যছাড়ের উদ্ভট প্রতিশ্রুতি সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। এছাড়া শিক্ষিত বেকারদের জন্য বেকার ভাতা প্রদানের বিষয়টিও বিএনপির ইশতেহারে অত্যন্ত জোরালোভাবে স্থান পেয়েছে, যা তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করার একটি বড় হাতিয়া হিসেবে মনে করছে দলটি।

তবে বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের তৃণমূল নেতা-কর্মীদের একাংশের বিরুদ্ধে ওঠা চাঁদাবাজি ও দখলের অভিযোগ। আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আওয়ামী লীগের পতনের পর দেশজুড়ে বিএনপির তৃণমূল কর্মীরা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে, যা সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের শঙ্কা তৈরি করেছে যে তারা 'আওয়ামী লীগেরই বিকল্প' হয়ে উঠছে কি না। এই নেতিবাচক ধারণা কাটাতে তারেক রহমান বারবার তার কর্মীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়ার কথা বললেও এর সুফল নজরে পড়ছে না। রাজধানীসহ দেশের চাঁদাবাজির সকল স্পটে বিএনপির নেতাকর্মীরাই বহাল তবিয়তে আছেন বলে নিত্য অভিযোগ আসছে।

জামায়াতের 'বিজয়ের ন্যারেটিভ' ও ১১-দলীয় জোটের শক্তি

বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে জামায়াতে ইসলামী এতদিন চতুর্থ বা পঞ্চম শক্তির দল হিসেবে বিবেচিত হলেও, ২০২৬ সালের নির্বাচনে তারা একটি শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। দলটি এবার কেবল এককভাবে নয়, বরং ১১টি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে একটি বৃহৎ নির্বাচনী ঐক্য গড়ে তুলেছে, যার নেতৃত্বে রয়েছেন জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান। এই জোটে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র মতো ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের অন্তর্ভুক্তি জামায়াতকে এক ধরনের বাড়তি নৈতিক শক্তি যোগাচ্ছে।

জামায়াতের প্রচারণার কৌশলে একটি বিষয় অত্যন্ত স্পষ্ট—তারা সফলভাবে জনমনে এই ধারণা প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে যে, তারা এবার সরকার গঠন করতে পারে। জামায়াতের ৯০ পৃষ্ঠার বিশাল ইশতেহারে দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠন, রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে রাজনৈতিক দলগুলোকে বরাদ্দ দেওয়া এবং পর্যায়ক্রমে শরিয়াহভিত্তিক আইন প্রবর্তনের অঙ্গীকার করা হয়েছে। জামায়াতের আমীর তার বিভিন্ন বক্তব্যে বলছেন যে, এই নির্বাচন নতুন বাংলাদেশের পথে যাওয়ার এক মহাসুযোগ এবং তারা ক্ষমতায় গেলে দেশে ভয়ের কোনো সংস্কৃতি থাকবে না।  ‍দুর্নীতি, অপশাসন ও চাঁদাবাজিকে সমূলে উৎপাটন করা হবে।

তবে নারী অধিকার ও নারীর নেতৃত্ব নিয়ে জামায়াত আমীরের সাম্প্রতিক বক্তব্য দেশে-বিদেশে আলোচিত-সমালোচিত হয়েছে। আল-জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন যে, নারীরা সংসদ সদস্য হতে পারলেও দলের আমীর বা রাষ্ট্রপ্রধান হতে পারবে না। বিএনপির নেতা রুহুল কবির রিজভী এই বক্তব্যের সমালোচনা করে বলেছেন যে, জামায়াত ক্ষমতায় এলে নারী অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং নারীরা ঘরে-বাইরে তাদের সম্মান হারাবে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন বিএনপির এসব অপপ্রচার জামাতের নারী ভোটে কোন প্রভাব ফেলতে পারবে না ।

জনমত জরিপ: জামায়াত ১০৫টি আসনে এবং বিএনপি ১০১টি আসনে নিশ্চিত বিজয়ী হতে পারে

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন সংস্থা জনমত জরিপ পরিচালনা করেছে, যেগুলোর ফলাফলে ব্যাপক ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল অ্যান্ড ডিপ্লোম্যাসি (আইআইএলডি) এবং এমিনেন্স অ্যাসোসিয়েটস (ইএএসডি) প্রকাশিত জরিপ দুটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে আলোচিত। আইআইএলডি-র জরিপে দেখা যাচ্ছে যে, বিএনপি জোট ৪৪.১ শতাংশ এবং জামায়াত জোট ৪৩.৯ শতাংশ ভোট পেতে পারে—যা মূলত এক হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত দেয়। এই জরিপ অনুযায়ী, জামায়াত ১০৫টি আসনে এবং বিএনপি ১০১টি আসনে নিশ্চিত বিজয়ী হতে পারে, এবং বাকি ৭৫টি আসনে লড়াই হবে অত্যন্ত তীব্র।

অন্যদিকে, ইএএসডি-র ৪১,৫০০ মানুষের ওপর পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে যে, ৬৬.৩ শতাংশ মানুষ বিএনপিকে সমর্থন করছে এবং জামায়াতের সমর্থন ১১.৯ শতাংশ। এটাকে বিশ্লেষকরা বাস্তবতাবর্জিত ও বিএনপি প্রভাবিত বলে সমালোচনা করেছেন। এই জরিপে দাবি করা হয়েছে যে, বিএনপি ২০৮টি আসনে জয়লাভ করতে পারে। নারী ভোটারদের মধ্যে বিএনপির জনপ্রিয়তা ৭১.১ শতাংশ বলে এই জরিপে উঠে এসেছে। জরিপগুলোর এই বিস্তর ফারাক থেকে বোঝা যায় যে, জনমত অত্যন্ত চঞ্চল এবং ভোটারদের একটি বড় অংশ শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বাভাস দিয়েছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেমোক্রেসি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইডিডি)। তারা বলছে, নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির হার যদি ৬৫-৬৮ শতাংশ হয়, তবে বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে। কিন্তু যদি ভোটার উপস্থিতি ৫৩-৫৮ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে এবং কেবল সংগঠিত আদর্শিক ভোটাররা কেন্দ্রে যায়, তবে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের সরকার গঠনের সম্ভাবনা তৈরি হবে।

আওয়ামী ভোটারদের 'নীরব' ভূমিকা ও নেতিবাচক ভোট

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে সবচেয়ে বড় 'এক্স-ফ্যাক্টর' হলো আওয়ামী লীগের সেই লাখ লাখ ভোটার, যারা এখন এক ধরনের রাজনৈতিক আশ্রয়হীনতায় ভুগছেন। আওয়ামী লীগ সরাসরি নির্বাচনে না থাকলেও তাদের সমর্থক ও কর্মীরা এখনো দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে আছে। আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের মতে, এই বিপুল সংখ্যক মানুষ কাকে ভোট দেবে—যদি তারা আদৌ ভোট দেয়—তার ওপর নির্বাচনের ফলাফল অনেকাংশে নির্ভর করবে।

জরিপের উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, আওয়ামী লীগের অনেক ভোটার বিএনপিকে ভোট দিতে পারে। তারা মূলত জামায়াতের উত্থান ঠেকাতে বিএনপিকে 'মন্দের ভালো' হিসেবে বেছে নিচ্ছে। তবে স্থানীয় পর্যায়ের অনেক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বিএনপির স্থানীয় নেতাদের দ্বারা নির্যাতিত হওয়ার ভয়ে অনেক আওয়ামী সমর্থক প্রতিশোধমূলকভাবে জামায়াতকে ভোট দিয়ে বিএনপিকে হারাতে চাইবে। এই 'নেতিবাচক ভোট' বা 'শত্রুর শত্রু বন্ধু' হওয়ার এই মনস্তত্ত্ব নির্বাচনের ফলাফলে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

জেন-জি ও নতুন প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা

এবারের নির্বাচনকে বিশ্বের প্রথম 'জেন-জেড অনুপ্রাণিত' নির্বাচন বলা হচ্ছে। ১৯ জুলাই ২০২৪ থেকে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক আমূল পরিবর্তন এনেছে। নতুন ভোটাররা, বিশেষ করে যারা ২০০৮ সালের পর আর কোনো অবাধ নির্বাচনে ভোট দিতে পারেনি, তারা এখন আমূল সংস্কারের পক্ষে। তাদের কাছে দলীয় আনুগত্যের চেয়ে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

জামায়াত জোটের সাথে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র ঐক্য এই তরুণ ভোটারদের একটি অংশকে টানতে সক্ষম হয়েছে। এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলাম ও সারজিস আলমের মতো মুখগুলো তরুণদের কাছে আইকন হিসেবে পরিচিত। তবে বিএনপিও পিছিয়ে নেই; তারা তাদের প্রচারণায় তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান ও আধুনিক শিক্ষার ওপর জোর দিয়েছে। তারেক রহমান নিজে তরুণদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করছেন এবং তাদের আকাঙ্ক্ষাগুলো ইশতেহারে প্রতিফলিত করার দাবি করছেন। এই বিশাল তরুণ ভোট ব্যাংক যে দলের দিকে ঝুঁকবে, ক্ষমতার পাল্লা সেদিকেই বেশি ভারি হবে।

নির্বাচনী সহিংসতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রায় ১২ কোটি ৭০ লাখ ভোটার অংশ নেবেন এবং ১,৯৮১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। কিন্তু নির্বাচনের আগের দিন পর্যন্ত দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না। আসক-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, জানুয়ারি মাসেই রাজনৈতিক সহিংসতায় ১১ জন নিহত এবং ৬১৬ জন আহত হয়েছেন। নওগাঁ-৫ আসনে বিএনপি ও জামায়াত কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে ১৩ জন আহত হওয়ার ঘটনাটি মাঠ পর্যায়ের উত্তেজনার একটি জলজ্যান্ত উদাহরণ।

সরকার ৯ লাখেরও বেশি নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন করলেও পুলিশ বাহিনীর মনোবল এখনো তলানিতে রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। অনেক জায়গায় পুলিশ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সেনাবাহিনীর নির্লিপ্ততা এবং প্রশাসনের বিভ্রান্তিও একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে। ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড এবং সংবাদপত্রের কার্যালয়ে হামলার মতো ঘটনাগুলো জনমনে নিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

ভূ-রাজনীতি: দিল্লি ও ওয়াশিংটনের নজর

নির্বাচন বাংলাদেশে হলেও এর ওপর আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রভাব অত্যন্ত প্রবল। বিশেষ করে ভারত ও আমেরিকার ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে চলছে এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জামায়াতের সাথে বন্ধুত্ব চায় এবং তারা মনে করছে জামায়াত এবার তাদের ইতিহাসের সেরা ফল করতে পারে। এই খবরটি আসার পর বিএনপির ভেতরে এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই ধরনের হস্তক্ষেপকে 'অশনিসংকেত' হিসেবে দেখছেন।

অন্যদিকে, ভারতকে নিয়ে বাংলাদেশে একটি নেতিবাচক জনমত তৈরি হয়েছে এবং জামায়াত সেই 'ভারত-বিদ্বেষ'কে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। বিএনপিকে 'ভারতপন্থী' হিসেবে প্রমাণ করার জন্য বিভিন্ন  ভিডিও ও প্রচারণা চালানো হচ্ছে, যা বিএনপি কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। পাকিস্তান ও তুরস্কের মতো মুসলিম দেশগুলোও বাংলাদেশের নির্বাচনের গতিপ্রকৃতির ওপর কড়া নজর রাখছে। এই আন্তর্জাতিক টানাপোড়েন নির্বাচনের ফলাফলের পর স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

আঞ্চলিক সমীকরণ: কুমিল্লা, সিলেট ও নারায়ণগঞ্জের মাঠের চিত্র

সারা দেশের ৩০০ আসনের লড়াই হলেও কিছু কিছু আসন বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা-সিদ্ধিরগঞ্জ আসনে বিএনপি নেতা শামীম ওসমানের পতনের পর সেখানে জামায়াত জোটের এনসিপি প্রার্থী আব্দুল্লাহ আল আমীনের জনপ্রিয়তা চোখে পড়ার মতো। এখানে বিএনপির সাবেক তিন নেতা স্বতন্ত্র হয়ে দাঁড়ানোয় ভোট বিভক্তির সুযোগ নিতে পারে জামায়াত জোট।

কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম আসনে লড়াই হচ্ছে মূলত 'ধানের শীষ' ও 'দাঁড়িপাল্লা'র মধ্যে। এখানে ১০ জন ভোটারের মধ্যে অন্তত ৭ জনই ধানের শীষ বা দাঁড়িপাল্লা নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত। হবিগঞ্জ-১, কুমিল্লা-২ ও ৭ আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা দলটির জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া পঞ্চগড়-১ আসনে এনসিপির সারজিস আলম এবং সিলেট-১ আসনে জামায়াতের হাবিবুর রহমান হেভিওয়েট প্রার্থী হিসেবে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছেন। এই আঞ্চলিক হাড্ডাহাড্ডি লড়াইগুলোই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে কে সরকার গঠন করবে।

কার দিকে পাল্লা ভারি?

ত্রয়োদশ সংসদীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে দাঁড়িয়ে রাজনীতির যে ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে, তা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে অনিশ্চিত এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ একটি নির্বাচন হতে যাচ্ছে। বিএনপির প্রধান শক্তি হলো তাদের সুবিশাল কর্মীবাহিনী এবং আওয়ামী-বিরোধী দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। তাদের ইশতেহারের কল্যাণমুখী প্রতিশ্রুতিগুলো অতি সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষীণ আশার আলো জুগালেও দলটির সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং তৃণমূলের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড তাদের জন্য বড় বোঝা।

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর শক্তি হলো তাদের ইস্পাতকঠিন শৃঙ্খলা এবং অভ্যুত্থান পরবর্তী নৈতিক অবস্থান। তারা যেভাবে জয়ের একটি মনস্তাত্ত্বিক পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছে, তা অনেক বড় দলের জন্যও ঈর্ষণীয়। 

নির্বাচনের ফলাফল মূলত নির্ভর করবে 'সাইলেন্ট ভোটার' বা নীরব ভোটারদের ওপর, যারা এখনো তাদের মত প্রকাশ করেনি। ১২ ফেব্রুয়ারির সূর্যালোক বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য এক নতুন প্রভাত বয়ে আনবে, নাকি রাজনৈতিক অস্থিরতার এক নতুন অধ্যায় শুরু করবে—তা এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা। তবে এটা সহজে অনুমেয় যে,  ক্রমশ জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠে আসা জামায়াতে ইসলামীর আদর্শিক ভিত, সাংগঠনিক সুশৃঙ্খলা তাদের নিরঙ্কুশ বিজয়ের পথে উন্মুক্ত করছে।

মতামত এর আরও খবর