১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬: বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক দিগন্ত, নাকি অনিশ্চিত গন্তব্য?
✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি কেবল একটি সাধারণ নির্বাচনের তারিখ হিসেবে নয়, বরং একটি নতুন প্রজাতন্ত্রের ভ্রূণ হিসেবে চিহ্নিত হতে যাচ্ছে। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার যে মহাবিপ্লব দেড় দশকের জগদ্দল পাথরকে সরিয়ে দিয়েছিল, সেই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার চূড়ান্ত পরীক্ষা এই নির্বাচন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেছেন যে নির্বাচন নির্ধারিত দিনেই হবে; আর এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে দেশ এখন এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দীর্ঘকাল ভোটাধিকার বঞ্চিত ১২ কোটি ৭৭ লাখ মানুষের সামনে এটি কেবল সংসদ নির্বাচন নয়, বরং গণভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের প্রশ্নও জড়িত।
জুলাই বিপ্লবের উত্তরাধিকার ও নির্বাচনের প্রেক্ষাপট
এই নির্বাচনের প্রেক্ষাপট বুঝতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সেই রক্তরঞ্জিত দিনগুলোর দিকে। ছাত্র-জনতার যে অভ্যুত্থান শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য করেছিল, সেই আন্দোলনের মূল সুর ছিল 'রাষ্ট্র সংস্কার'। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই দাবি উঠেছিল যে পুরনো ঘুণে ধরা ব্যবস্থার ভেতরে নির্বাচন দিলে তা পুনরায় ফ্যাসিবাদের পথ প্রশস্ত করতে পারে। ড. ইউনূসের সরকার তাই একটি 'জুলাই সনদ' বা রাষ্ট্র সংস্কারের রোডম্যাপ তৈরি করেছে, যা এই নির্বাচনের সাথেই ভোটারদের অনুমোদনের জন্য পেশ করা হচ্ছে। এই সনদে এমন কিছু মৌলিক পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে, যা বাংলাদেশের গত পঞ্চাশ বছরের সংসদীয় সংস্কৃতিতে অনুপস্থিত ছিল—যেমন প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মেয়াদ সীমাবদ্ধ করা এবং দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠন।
নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী, ১১ ডিসেম্বর ২০২৫-এ এএমএম নাসির উদ্দীন যখন নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেন, তখন থেকেই দেশ নতুন উত্তেজনার আবর্তে প্রবেশ করে। এটি কোনো সাধারণ নির্বাচন নয়, কারণ দেশের অন্যতম প্রাচীন ও বৃহত্তম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ এই প্রক্রিয়ার বাইরে। সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় নির্বাচনী মাঠের সমীকরণ এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন। ফলে এবারের নির্বাচন মূলত একটি দ্বিমুখী লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে: একদিকে দীর্ঘদিনের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি বিএনপি, অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও নতুন প্রজন্মের ‘ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি’র (এনসিপি) অভাবনীয় জোট।
বিএনপির রূপান্তর ও তারেক রহমানের নেতৃত্ব
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এই নির্বাচনকে তাদের সতেরো বছরের রাজনৈতিক সংগ্রামের চূড়ান্ত ফসল হিসেবে দেখছে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ২২ জানুয়ারি ২০২৬-এ সিলেটের মাটি থেকে যখন নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন, তখন তা তার ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবনের এক বিশাল মাইলফলক হয়ে দাঁড়ায়। দীর্ঘ নির্বাসন কাটিয়ে দেশে ফিরে তিনি যেভাবে জনমনে সাড়া ফেলেছেন, তা নির্দেশ করে যে বিএনপির জনপ্রিয়তা এখনো আকাশচুম্বী। তবে এবারের বিএনপি পুরনো ধাঁচের নয়; তারেক রহমান সচেতনভাবে দলকে একটি উদারপন্থী ও আধুনিক গণতান্ত্রিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন।
বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফার রাষ্ট্র সংস্কার কর্মসূচি এবং ‘ভিশন-২০৩০’-এর মূল ভিত্তি হলো জনগণের সার্বভৌমত্ব। দলটির পক্ষ থেকে ‘গিভ অ্যাডভাইস টু তারেক রহমান’ বা ‘ম্যাচ মাই পলিসি’-র মতো আধুনিক ডিজিটাল প্রচারণা চালানো হচ্ছে, যার লক্ষ্য তরুণ ভোটারদের সম্পৃক্ততা বাড়ানো। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিএনপি এবার কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য নয়, বরং আওয়ামী লীগের ফেলে যাওয়া ‘উদারপন্থী ও সেকুলার’ রাজনীতির শূন্যস্থান পূরণ করতে চাইছে। তবে বিএনপির অভ্যন্তরে ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ এবং চাঁদাবাজির যে অভিযোগ উঠছে, তা দলের ভাবমূর্তি কিছুটা ম্লান করছে। বিশেষ করে ৯২ জন নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় মাঠপর্যায়ে অন্তর্কোন্দল ও সহিংসতার আশঙ্কা বেড়ে গেছে।
জামায়াতে ইসলামীর পুনরুত্থান ও এনসিপির তরুণ শক্তি
এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় চমক হচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর অভাবনীয় জনসমর্থন। একসময় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে কোণঠাসা হয়ে পড়া এই দলটি এখন নিজেদেরকে দুর্নীতিমুক্ত ও সুশৃঙ্খল বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করছে। আন্তর্জাতিক রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই)-এর জরিপ অনুযায়ী জামায়াত বর্তমানে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান অত্যন্ত কৌশলে জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করেছেন এবং তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি বা এনসিপির সাথে নির্বাচনী জোট গঠন করেছেন।
এই জোটের মূল শক্তি হলো ২০২৪ সালের আন্দোলনের মাঠ কাঁপানো ছাত্রনেতারা। নাহিদ ইসলাম বা সারজিস আলমের মতো তরুণরা যখন এনসিপির ব্যানারে জামায়াতের সাথে হাত মেলান, তখন তা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নতুন মেরুকরণ তৈরি করে। যদিও এই জোট নিয়ে নাগরিক সমাজের একাংশের মধ্যে সংশয় রয়েছে, বিশেষ করে জামায়াতের অতীত ভূমিকা নিয়ে। তবুও তরুণ ভোটাররা, যারা আওয়ামী লীগের শাসন ছাড়া অন্য কিছু দেখেনি, তারা এখন এই নতুন জোটের ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ বা দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্রের ডাককে গুরুত্বের সাথে দেখছে। জামায়াত এবার ২২৪টি আসনে প্রার্থী দিয়ে তাদের সাংগঠনিক সামর্থ্যের প্রমাণ দিচ্ছে এবং প্রবাসী ভোটের দিকেও বিশেষ নজর দিয়েছে।
জুলাই সনদ ও গণভোট: রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য
নির্বাচনের দিন ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটারদের হাতে দুটি ব্যালট পেপার থাকবে—একটি সংসদ সদস্য নির্বাচনের জন্য, অন্যটি সাংবিধানিক গণভোটের জন্য। এই গণভোট মূলত ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের আইনি ভিত্তি তৈরি করবে। ড. ইউনূসের সরকার বিশ্বাস করে যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের আমূল পরিবর্তন না করে কেবল নির্বাচন দিলে তা পুনরায় স্বৈরাচারের জন্ম দিতে পারে। জুলাই সনদের প্রধান প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে একটি উচ্চকক্ষ গঠন, যেখানে বিশেষজ্ঞ ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রতিনিধিত্ব থাকবে।
এই গণভোটের প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের লড়াই এখন রাজপথেও দৃশ্যমান। এনসিপি ও জামায়াত জোট ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে জোরালো প্রচার চালাচ্ছে। অন্যদিকে বিএনপি নীতিগতভাবে এই সংস্কারের সাথে একমত হলেও উচ্চকক্ষ গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছে। তবে সামগ্রিকভাবে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পরিবেশ রক্ষায় বিএনপি এই প্রক্রিয়ার সাথে নিজেকে যুক্ত রেখেছে। বিশ্লেষকদের মতে, গণভোটের ফলাফল যদি ‘না’ হয়, তবে পরবর্তী সরকার এই সংস্কারগুলো বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে না, যা বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে।
অর্থনীতির সংকট ও মুদ্রাস্ফীতির কষাঘাত
নির্বাচনী উত্তাপের আড়ালে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো অর্থনীতি। ২০২৫ সালের শেষভাগে মুদ্রাস্ফীতি ৮.৪৯ শতাংশে পৌঁছেছে। চাল, ডাল, পেঁয়াজ ও তেলের ঊর্ধ্বমূল্য নিয়ে জনমনে তীব্র অসন্তোষ রয়েছে। যদিও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জানুয়ারি মাসে মুদ্রাস্ফীতি সামান্য কমার দাবি করেছে, তবুও বাজারের বাস্তবতা এখনো সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।
অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুনের মতে, বৈদেশিক ঋণের বোঝা এবং অবকাঠামো প্রকল্পের উচ্চ ব্যয় অর্থনীতিকে চাপের মুখে রেখেছে। নতুন যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তাদের প্রথম চ্যালেঞ্জ হবে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখা। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে বিজয়ী দলের প্রতি জনগণের মোহভঙ্গ হতে বেশি সময় লাগবে না।
নির্বাচনী সহিংসতা ও নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ
তফসিল ঘোষণার পর থেকেই দেশে রাজনৈতিক সহিংসতার গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী। গত কয়েক সপ্তাহে অন্তত ১৬ জন রাজনৈতিক কর্মীর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। বিশেষ করে কেরানীগঞ্জ ও ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বিএনপি ও জামায়াত কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে বাধা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। দেশের অর্ধেকের বেশি ভোটকেন্দ্রকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং নিরাপত্তা বজায় রাখতে নয় লাখ সদস্য মোতায়েনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই সহিংসতার পেছনে লুণ্ঠিত অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার এবং পরাজিত শক্তির উস্কানিকেও দায়ী করা হচ্ছে।
ভূ-রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক শক্তির ভূমিকা
বাংলাদেশের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দিল্লি, ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে নতুন এক কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। দীর্ঘ পনেরো বছর আওয়ামী লীগের একনিষ্ঠ সমর্থক থাকার পর ভারত এখন বাংলাদেশে তার প্রভাব পুনরুদ্ধারে সচেষ্ট। বিএনপি ভারতের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ইঙ্গিত দিলেও দিল্লির নীতিনির্ধারকদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর উত্থান নিয়ে গভীর উদ্বেগ রয়েছে।
অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই নির্বাচনকে বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের একটি ‘লিটমাস টেস্ট’ হিসেবে দেখছে। ওয়াশিংটন চাচ্ছে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন। তবে জামায়াতের ক্ষমতার অংশীদার হওয়ার সম্ভাবনা মার্কিন প্রশাসনের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। এই ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন নির্বাচন-পরবর্তী সরকার গঠনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
তরুণ ও নারী ভোটার: গেম চেঞ্জার কারা?
২০২৬ সালের নির্বাচনে মোট ভোটারের প্রায় ৪৪ শতাংশই তরুণ প্রজন্ম (জেনারেশন জেড)। এই বিশাল ভোটার গোষ্ঠী কোনো নির্দিষ্ট দলের প্রতি অন্ধ আনুগত্যে বিশ্বাসী নয়। তারা চায় কর্মসংস্থান, বাকস্বাধীনতা ও আধুনিক জীবনযাত্রা। তবে নারীর প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে দলগুলো এখনো পিছিয়ে। বিএনপি বা জামায়াত—কেউই কাঙ্ক্ষিত সংখ্যায় নারী প্রার্থী দিতে পারেনি, যা আধুনিক নারী ভোটারদের মধ্যে প্রশ্ন তুলেছে। অথচ ভোটারদের অর্ধেকই নারী।
একটি নতুন ভোরের প্রতীক্ষা
১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ কেবল একটি ভোটের উৎসব নয়, এটি একটি জাতির আত্মপরিচয় নির্ধারণের ক্ষণ। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যে নিরপেক্ষতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তার ওপরই নির্ভর করছে আগামীর স্থিতিশীলতা। তবে কেবল নির্বাচনের ফলাফলই শেষ কথা নয়। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বিজয়ী ও বিজিত শক্তির মধ্যে সহাবস্থানের পরিবেশ বজায় রাখা না গেলে বাংলাদেশ পুনরায় সংঘাতের আবর্তে হারিয়ে যেতে পারে। ১২ ফেব্রুয়ারির ব্যালট বাক্সে সেই স্বপ্নেরই প্রতিফলন ঘটুক, যেখানে আর কোনো স্বৈরাচারের পদধ্বনি শোনা যাবে না।


















