img

১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬: বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক দিগন্ত, নাকি অনিশ্চিত গন্তব্য?

প্রকাশিত :  ০৪:৪৭, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৫:০২, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬

১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬: বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক দিগন্ত, নাকি অনিশ্চিত গন্তব্য?

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি কেবল একটি সাধারণ নির্বাচনের তারিখ হিসেবে নয়, বরং একটি নতুন প্রজাতন্ত্রের ভ্রূণ হিসেবে চিহ্নিত হতে যাচ্ছে। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার যে মহাবিপ্লব দেড় দশকের জগদ্দল পাথরকে সরিয়ে দিয়েছিল, সেই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার চূড়ান্ত পরীক্ষা এই নির্বাচন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেছেন যে নির্বাচন নির্ধারিত দিনেই হবে; আর এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে দেশ এখন এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দীর্ঘকাল ভোটাধিকার বঞ্চিত ১২ কোটি ৭৭ লাখ মানুষের সামনে এটি কেবল সংসদ নির্বাচন নয়, বরং গণভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের প্রশ্নও জড়িত।

জুলাই বিপ্লবের উত্তরাধিকার ও নির্বাচনের প্রেক্ষাপট

এই নির্বাচনের প্রেক্ষাপট বুঝতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সেই রক্তরঞ্জিত দিনগুলোর দিকে। ছাত্র-জনতার যে অভ্যুত্থান শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য করেছিল, সেই আন্দোলনের মূল সুর ছিল 'রাষ্ট্র সংস্কার'। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই দাবি উঠেছিল যে পুরনো ঘুণে ধরা ব্যবস্থার ভেতরে নির্বাচন দিলে তা পুনরায় ফ্যাসিবাদের পথ প্রশস্ত করতে পারে। ড. ইউনূসের সরকার তাই একটি 'জুলাই সনদ' বা রাষ্ট্র সংস্কারের রোডম্যাপ তৈরি করেছে, যা এই নির্বাচনের সাথেই ভোটারদের অনুমোদনের জন্য পেশ করা হচ্ছে। এই সনদে এমন কিছু মৌলিক পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে, যা বাংলাদেশের গত পঞ্চাশ বছরের সংসদীয় সংস্কৃতিতে অনুপস্থিত ছিল—যেমন প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মেয়াদ সীমাবদ্ধ করা এবং দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠন।

নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী, ১১ ডিসেম্বর ২০২৫-এ এএমএম নাসির উদ্দীন যখন নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেন, তখন থেকেই দেশ নতুন উত্তেজনার আবর্তে প্রবেশ করে। এটি কোনো সাধারণ নির্বাচন নয়, কারণ দেশের অন্যতম প্রাচীন ও বৃহত্তম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ এই প্রক্রিয়ার বাইরে। সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় নির্বাচনী মাঠের সমীকরণ এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন। ফলে এবারের নির্বাচন মূলত একটি দ্বিমুখী লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে: একদিকে দীর্ঘদিনের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি বিএনপি, অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও নতুন প্রজন্মের ‘ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি’র (এনসিপি) অভাবনীয় জোট।

বিএনপির রূপান্তর ও তারেক রহমানের নেতৃত্ব

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এই নির্বাচনকে তাদের সতেরো বছরের রাজনৈতিক সংগ্রামের চূড়ান্ত ফসল হিসেবে দেখছে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ২২ জানুয়ারি ২০২৬-এ সিলেটের মাটি থেকে যখন নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন, তখন তা তার ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবনের এক বিশাল মাইলফলক হয়ে দাঁড়ায়। দীর্ঘ নির্বাসন কাটিয়ে দেশে ফিরে তিনি যেভাবে জনমনে সাড়া ফেলেছেন, তা নির্দেশ করে যে বিএনপির জনপ্রিয়তা এখনো আকাশচুম্বী। তবে এবারের বিএনপি পুরনো ধাঁচের নয়; তারেক রহমান সচেতনভাবে দলকে একটি উদারপন্থী ও আধুনিক গণতান্ত্রিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন।

বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফার রাষ্ট্র সংস্কার কর্মসূচি এবং ‘ভিশন-২০৩০’-এর মূল ভিত্তি হলো জনগণের সার্বভৌমত্ব। দলটির পক্ষ থেকে ‘গিভ অ্যাডভাইস টু তারেক রহমান’ বা ‘ম্যাচ মাই পলিসি’-র মতো আধুনিক ডিজিটাল প্রচারণা চালানো হচ্ছে, যার লক্ষ্য তরুণ ভোটারদের সম্পৃক্ততা বাড়ানো। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিএনপি এবার কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য নয়, বরং আওয়ামী লীগের ফেলে যাওয়া ‘উদারপন্থী ও সেকুলার’ রাজনীতির শূন্যস্থান পূরণ করতে চাইছে। তবে বিএনপির অভ্যন্তরে ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ এবং চাঁদাবাজির যে অভিযোগ উঠছে, তা দলের ভাবমূর্তি কিছুটা ম্লান করছে। বিশেষ করে ৯২ জন নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় মাঠপর্যায়ে অন্তর্কোন্দল ও সহিংসতার আশঙ্কা বেড়ে গেছে।

জামায়াতে ইসলামীর পুনরুত্থান ও এনসিপির তরুণ শক্তি

এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় চমক হচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর অভাবনীয় জনসমর্থন। একসময় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে কোণঠাসা হয়ে পড়া এই দলটি এখন নিজেদেরকে দুর্নীতিমুক্ত ও সুশৃঙ্খল বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করছে। আন্তর্জাতিক রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই)-এর জরিপ অনুযায়ী জামায়াত বর্তমানে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান অত্যন্ত কৌশলে জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করেছেন এবং তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি বা এনসিপির সাথে নির্বাচনী জোট গঠন করেছেন।

এই জোটের মূল শক্তি হলো ২০২৪ সালের আন্দোলনের মাঠ কাঁপানো ছাত্রনেতারা। নাহিদ ইসলাম বা সারজিস আলমের মতো তরুণরা যখন এনসিপির ব্যানারে জামায়াতের সাথে হাত মেলান, তখন তা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নতুন মেরুকরণ তৈরি করে। যদিও এই জোট নিয়ে নাগরিক সমাজের একাংশের মধ্যে সংশয় রয়েছে, বিশেষ করে জামায়াতের অতীত ভূমিকা নিয়ে। তবুও তরুণ ভোটাররা, যারা আওয়ামী লীগের শাসন ছাড়া অন্য কিছু দেখেনি, তারা এখন এই নতুন জোটের ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ বা দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্রের ডাককে গুরুত্বের সাথে দেখছে। জামায়াত এবার ২২৪টি আসনে প্রার্থী দিয়ে তাদের সাংগঠনিক সামর্থ্যের প্রমাণ দিচ্ছে এবং প্রবাসী ভোটের দিকেও বিশেষ নজর দিয়েছে।

জুলাই সনদ ও গণভোট: রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য

নির্বাচনের দিন ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটারদের হাতে দুটি ব্যালট পেপার থাকবে—একটি সংসদ সদস্য নির্বাচনের জন্য, অন্যটি সাংবিধানিক গণভোটের জন্য। এই গণভোট মূলত ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের আইনি ভিত্তি তৈরি করবে। ড. ইউনূসের সরকার বিশ্বাস করে যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের আমূল পরিবর্তন না করে কেবল নির্বাচন দিলে তা পুনরায় স্বৈরাচারের জন্ম দিতে পারে। জুলাই সনদের প্রধান প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে একটি উচ্চকক্ষ গঠন, যেখানে বিশেষজ্ঞ ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রতিনিধিত্ব থাকবে।

এই গণভোটের প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের লড়াই এখন রাজপথেও দৃশ্যমান। এনসিপি ও জামায়াত জোট ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে জোরালো প্রচার চালাচ্ছে। অন্যদিকে বিএনপি নীতিগতভাবে এই সংস্কারের সাথে একমত হলেও উচ্চকক্ষ গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছে। তবে সামগ্রিকভাবে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পরিবেশ রক্ষায় বিএনপি এই প্রক্রিয়ার সাথে নিজেকে যুক্ত রেখেছে। বিশ্লেষকদের মতে, গণভোটের ফলাফল যদি ‘না’ হয়, তবে পরবর্তী সরকার এই সংস্কারগুলো বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে না, যা বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে।

অর্থনীতির সংকট ও মুদ্রাস্ফীতির কষাঘাত

নির্বাচনী উত্তাপের আড়ালে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো অর্থনীতি। ২০২৫ সালের শেষভাগে মুদ্রাস্ফীতি ৮.৪৯ শতাংশে পৌঁছেছে। চাল, ডাল, পেঁয়াজ ও তেলের ঊর্ধ্বমূল্য নিয়ে জনমনে তীব্র অসন্তোষ রয়েছে। যদিও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জানুয়ারি মাসে মুদ্রাস্ফীতি সামান্য কমার দাবি করেছে, তবুও বাজারের বাস্তবতা এখনো সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।

অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুনের মতে, বৈদেশিক ঋণের বোঝা এবং অবকাঠামো প্রকল্পের উচ্চ ব্যয় অর্থনীতিকে চাপের মুখে রেখেছে। নতুন যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তাদের প্রথম চ্যালেঞ্জ হবে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখা। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে বিজয়ী দলের প্রতি জনগণের মোহভঙ্গ হতে বেশি সময় লাগবে না।

নির্বাচনী সহিংসতা ও নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ

তফসিল ঘোষণার পর থেকেই দেশে রাজনৈতিক সহিংসতার গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী। গত কয়েক সপ্তাহে অন্তত ১৬ জন রাজনৈতিক কর্মীর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। বিশেষ করে কেরানীগঞ্জ ও ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বিএনপি ও জামায়াত কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে বাধা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। দেশের অর্ধেকের বেশি ভোটকেন্দ্রকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং নিরাপত্তা বজায় রাখতে নয় লাখ সদস্য মোতায়েনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই সহিংসতার পেছনে লুণ্ঠিত অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার এবং পরাজিত শক্তির উস্কানিকেও দায়ী করা হচ্ছে।

ভূ-রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক শক্তির ভূমিকা

বাংলাদেশের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দিল্লি, ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে নতুন এক কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। দীর্ঘ পনেরো বছর আওয়ামী লীগের একনিষ্ঠ সমর্থক থাকার পর ভারত এখন বাংলাদেশে তার প্রভাব পুনরুদ্ধারে সচেষ্ট। বিএনপি ভারতের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ইঙ্গিত দিলেও দিল্লির নীতিনির্ধারকদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর উত্থান নিয়ে গভীর উদ্বেগ রয়েছে।

অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই নির্বাচনকে বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের একটি ‘লিটমাস টেস্ট’ হিসেবে দেখছে। ওয়াশিংটন চাচ্ছে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন। তবে জামায়াতের ক্ষমতার অংশীদার হওয়ার সম্ভাবনা মার্কিন প্রশাসনের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। এই ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন নির্বাচন-পরবর্তী সরকার গঠনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

তরুণ ও নারী ভোটার: গেম চেঞ্জার কারা?

২০২৬ সালের নির্বাচনে মোট ভোটারের প্রায় ৪৪ শতাংশই তরুণ প্রজন্ম (জেনারেশন জেড)। এই বিশাল ভোটার গোষ্ঠী কোনো নির্দিষ্ট দলের প্রতি অন্ধ আনুগত্যে বিশ্বাসী নয়। তারা চায় কর্মসংস্থান, বাকস্বাধীনতা ও আধুনিক জীবনযাত্রা। তবে নারীর প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে দলগুলো এখনো পিছিয়ে। বিএনপি বা জামায়াত—কেউই কাঙ্ক্ষিত সংখ্যায় নারী প্রার্থী দিতে পারেনি, যা আধুনিক নারী ভোটারদের মধ্যে প্রশ্ন তুলেছে। অথচ ভোটারদের অর্ধেকই নারী।

একটি নতুন ভোরের প্রতীক্ষা

১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ কেবল একটি ভোটের উৎসব নয়, এটি একটি জাতির আত্মপরিচয় নির্ধারণের ক্ষণ। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যে নিরপেক্ষতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তার ওপরই নির্ভর করছে আগামীর স্থিতিশীলতা। তবে কেবল নির্বাচনের ফলাফলই শেষ কথা নয়। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বিজয়ী ও বিজিত শক্তির মধ্যে সহাবস্থানের পরিবেশ বজায় রাখা না গেলে বাংলাদেশ পুনরায় সংঘাতের আবর্তে হারিয়ে যেতে পারে। ১২ ফেব্রুয়ারির ব্যালট বাক্সে সেই স্বপ্নেরই প্রতিফলন ঘটুক, যেখানে আর কোনো স্বৈরাচারের পদধ্বনি শোনা যাবে না।

img

উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত ভঙ্গুর অর্থনীতি ও আগামীর চ্যালেঞ্জ

প্রকাশিত :  ১০:৩১, ০২ মে ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১০:৩৭, ০২ মে ২০২৬

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ

ঢাকা, ২ মে ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান এবং পরবর্তী ১৮ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন শাসনের অবসান ঘটিয়ে গত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর সাধারণ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় বসেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের শপথগ্রহণের মধ্য দিয়ে দেশে একটি নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হলেও উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত ভঙ্গুর সামষ্টিক অর্থনীতি এবং উত্তাল বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক সংকট নতুন এই প্রশাসনের সামনে এক পর্বতসম চ্যালেঞ্জ দাঁড় করিয়েছে। বর্তমান বাংলাদেশের অর্থনীতির সামগ্রিক অবস্থা এবং আগামীকালের পুঁজিবাজারের গতিপথ নিয়ে একটি নিবিড় বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো।

সামষ্টিক অর্থনীতি: ভঙ্গুর উত্তরণের রূপরেখা

বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি বর্তমানে এক অত্যন্ত জটিল ও স্পর্শকাতর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মাত্র ৩.৯৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির ধাক্কা কাটিয়ে সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে এই যাত্রার পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বিনিয়োগের স্থবিরতা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে মতভেদ রয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) প্রবৃদ্ধি ৪.৭ শতাংশ প্রাক্কলন করলেও বিশ্বব্যাংক কিছুটা রক্ষণশীল অবস্থান নিয়ে ৩.৯ শতাংশের পূর্বাভাস দিয়েছে। বেসরকারি বিনিয়োগ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপির মাত্র ২২.৪৮ শতাংশে নেমে আসা এবং ব্যাংক খাতের তারল্য সংকট এই বিনিয়োগ মন্দাকে আরও ঘনীভূত করেছে।

সাধারণ মানুষের জন্য বর্তমানে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হলো জীবনযাত্রার অসহনীয় ব্যয়। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮.৭১ শতাংশে দাঁড়ালেও এটি সাধারণ ভোক্তাদের জন্য খুব বেশি স্বস্তি বয়ে আনে নি। বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮.২৪ শতাংশে নামলেও অ-খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯.০৯ শতাংশে অপরিবর্তিত রয়েছে, যা পরিবহন, গৃহায়ণ ও পরিষেবা খাতের উচ্চমূল্যকে নির্দেশ করে। আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের পরিস্থিতি সবচেয়ে নাজুক। যেখানে ভারত (২.৭%) ও শ্রীলঙ্কা (০.৬%) তাদের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশ এখনো ৯ শতাংশের কাছাকাছি সীমায় আটকে আছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় হ্রাস পেয়েছে, কারণ মজুরি বৃদ্ধির হার (৮.০৯%) এখনো জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় প্রায় ১ শতাংশ পিছিয়ে রয়েছে।

তবে সামষ্টিক অর্থনীতির অন্যতম স্বস্তির জায়গা হলো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও রেমিট্যান্স প্রবাহ। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে রিজার্ভ ৩৫.১১ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয় এবং মার্চ মাসে তা ৩৪.১২ বিলিয়ন ডলারে স্থিতিশীল রয়েছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ মার্চ মাসে ৩.৭৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোয় বহিঃখাতের ওপর চাপ কিছুটা কমেছে। মুদ্রার বিনিময় হার প্রতি ডলারে ১২২.৬২ টাকার আশপাশে স্থিতিশীল রয়েছে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের 'ক্রলিং পেগ' পদ্ধতির সুফল হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিএনপি সরকারের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার এমন এক সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে যখন দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো এক বিশাল সংস্কার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নির্বাচনের পূর্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যে সংস্কারের সূচনা করেছিল, তা এগিয়ে নেওয়া ও জনআকাঙ্ক্ষা পূরণ করাই এই সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রেখে যাওয়া ১৩৩টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনার সময় জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ক্ষমতা এবং গুমসংক্রান্ত অপরাধের সংজ্ঞাসংবলিত ২৩টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ তামাদি বা বাতিল হয়ে যাওয়া নিয়ে দেশি-বিদেশি সংস্থাগুলোর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সরকার একে আইনি অসংগতি দূর করার প্রক্রিয়া বললেও প্রধান বিরোধী দলগুলো একে গণতান্ত্রিক সংস্কারের পরিপন্থী হিসেবে অভিহিত করেছে।

রাজনৈতিক মেরুকরণের পাশাপাশি দেশের ব্যাংকিং খাতের ক্ষত এখনো অত্যন্ত গভীর। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৬.৪ ট্রিলিয়ন টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৩৫.৭৩ শতাংশ। খেলাপি ঋণ আদায় ও ব্যাংকিং সুশাসন নিশ্চিত করা না গেলে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়ানো সম্ভব হবে না, যা সরাসরি জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করবে।

১৮০ দিনের অগ্রাধিকার কর্মসূচি ও সাফল্য

ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ১৮০ দিনের একটি বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। এই কর্মসূচির আওতায় ইতিমধ্যে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে প্রায় ৩৭ হাজার ৮১৪টি নিম্ন আয়ের পরিবারকে মাসিকে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। কৃষকদের জন্য 'ফার্মার কার্ড' এবং ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ মওকুফের উদ্যোগ গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এছাড়া শিক্ষাখাতে 'ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব' এবং ৮ হাজার ২৩২টি মাদ্রাসায় ফ্রি ওয়াই-ফাই নিশ্চিত করার কাজ চলমান রয়েছে। তবে রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় পিছিয়ে থাকায় (মার্চে এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৬২.৯ শতাংশ অর্জিত) এই বিপুল ব্যয়ের সংস্থান করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জ্বালানি সংকট ও বৈশ্বিক চাপের কালো মেঘ

২০২৬ সালের বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত। হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় দেশে ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই সংকটের কারণে শিল্পকারখানাগুলোতে প্রতিদিন ৫ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে, যা তৈরি পোশাক রপ্তানিকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। সরকার জ্বালানি ভর্তুকি বাবদ মার্চ মাসে এক মাসেই ৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেছে, যা বাজেটে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।

আগামী ২৪ নভেম্বর ২০২৬-এ বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা (এলডিসি) থেকে উত্তরণ করবে। এই উত্তরণের পর বাংলাদেশ বর্তমানে প্রাপ্ত প্রায় ৭০ শতাংশ রপ্তানি সুবিধা হারাবে। নতুন সরকারকে অতি দ্রুত ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে জিএসপি+ বা সমজাতীয় চুক্তিতে পৌঁছাতে হবে; অন্যথায় টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস খাত প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা হারাবে।

আগামীকাল রোববার (৩ মে ২০২৬) পুঁজিবাজারের পূর্বাভাস

বাংলাদেশের পুঁজিবাজার দীর্ঘকাল ধরেই বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকটে ভুগছে। ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত টানা চার বছর বাজার নিম্নমুখী ছিল। আগামীকাল ৩ মে ২০২৬, সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) লেনদেন শুরু হবে। গত ৩০ এপ্রিল ডিএসই ব্রড ইনডেক্স ৫,২৮৬.৮৮ পয়েন্টে অবস্থান করছিল।

আগামীকালের বাজার মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে। প্রথমত, গত সপ্তাহের শেষ দিকে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মুনাফা সংগ্রহের (প্রফিট বুকিং) যে প্রবণতা দেখা গেছে, তা আগামীকালও অব্যাহত থাকতে পারে। দ্বিতীয়ত, ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার ১০ শতাংশের উপরে থাকায় বড় বিনিয়োগকারীরা ইক্যুইটি বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। তৃতীয়ত, জ্বালানি সংকটের খবর এবং লোডশেডিং বাড়ার আশঙ্কা উৎপাদনমুখী বড় কোম্পানিগুলোর শেয়ারে বিক্রয়চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

সেক্টরভিত্তিক সম্ভাবনা ও পূর্বাভাস:

ব্যাংকিং খাতে যমুনা ব্যাংক বা ব্র্যাক ব্যাংকের ভালো লভ্যাংশ ঘোষণার কারণে এই খাতটি স্থিতিশীল থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে, জ্বালানি সংকটের কারণে সিমেন্ট ও টেক্সটাইল খাতের শেয়ারগুলো চাপে থাকতে পারে। আগামীকালের সেশনে বাজার ৯৫ শতাংশ সম্ভাবনা সতর্কাবস্থায় (কশাস মোড) থাকবে। দিনের শেষে সূচক ২০ থেকে ৩০ পয়েন্টের সংশোধনী (কারেকশন) দেখতে পারে এবং লেনদেনের পরিমাণ ৭০০ থেকে ৮৫০ কোটি টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, ডিএসই সূচকটি চলতি প্রান্তিকের শেষে ৭,২৩৪ পয়েন্টের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এগোলেও স্বল্পমেয়াদী অস্থিরতা কাটতে সময় লাগবে। বিনিয়োগকারীদের জন্য পরামর্শ হলো, পেনাল্টি শেয়ার এড়িয়ে শক্তিশালী মৌলভিত্তিসম্পন্ন ডিভিডেন্ড-পেওয়ারি শেয়ারে নজর দেওয়া।

বাংলাদেশের অর্থনীতি এক ক্রান্তিকাল পার করছে। নতুন সরকারের সংস্কার পদক্ষেপ, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক পরিস্থিতি অনুকূলে আসার ওপরই নির্ভর করছে আগামীর টেকসই উন্নয়ন।

মতামত এর আরও খবর