img

স্বাধীনতা দিবস - ইতিহাস সংরক্ষন প্রসঙ্গে!

প্রকাশিত :  ১২:২১, ২৮ মার্চ ২০২২

স্বাধীনতা দিবস - ইতিহাস সংরক্ষন প্রসঙ্গে!

আবার এসে গেছে আমাদের স্বাধীনতার জন্মবার্ষিকী - ৫১তে বাংলাদেশ। জাতির জীবনের অন্যতম একটি মহান দিবস। বাঙ্গালী জাতীয়তা উজ্জীবনের সেই মহান ক্রান্তিকাল। অনেক বন্ধুর পথ পরিক্রমণ করে জাতি উপস্থিত হয়েছিল সেই ২৬ সে মার্চ ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনার এক উদ্দ্যম প্রতয় নিয়ে। পৃথিবীর মাত্র হাতে গোনা কয়েকটি দেশকে আমাদের মত সংগ্রাম - যুদ্ধ - চরম ত্যাগ এর মাধ্যমে দেশকে স্বাধীন করতে হইয়েছিল। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ এই ক্রান্তিকাল ছিল সব ধরনের সময় থেকে কঠিনতম; শতকরা ৫২ শতাংশ জনবল নিয়েও ইস্ট পাকিস্তান পরিগণিত ঐ বর্বর পাকিস্তানী শাসকদের কাছে নিছক একটা সংখ্যালঘু অঞ্চলে।  প্রথমে কেড়ে নিতে চেয়েছিল আমাদের মায়ের ভাষা - বাংলাকে, তারপর শুরু করল অর্থনৈতিক উপনিবেসকিতা - বর্ণবাদ - নিগৃহতা - শোষণ এবং বৈষম্য। কেড়ে নিতে শুরু করল এক এক করে সকল গনতান্ত্রিক অধিকার - ভোটের রেজাল্ট এর প্রতি অনিহা এবং সরকার গঠন না করতে দেয়ার টালবাহানার অন্তরালে এক জেনোসাইডের নীল নকশা প্রণয়ন। 

জাতির সেই উত্তাল সময়ে জেগে উঠতে শুরু করে এক নব্য বাঙ্গালী জাতীয়তাবোধ - বাংলার শতাব্দী পুরোনো ঐতিহ্য, ইতিহাস, সংস্কৃতি অনুযায়ীই শত্রুর আগ্রাসন মোকাবেলায় যখন এগিয়ে যেতে চাইল তখন একটি অতি উৎসাহী ধর্মীয় রাজনৈতিক দল, ধর্মীয় গ্রুপ, ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত একটি শ্রেণী সবার দৃষ্টির অগোচরে গোপনে হাত মিলায় ঐ বর্বর পাকিস্তানী পাঞ্জাবীদের সাথে - নিজ জাতির ইচ্ছা - আকাক্সক্ষা, শপথের এবং স্বাধিকার আদায়ের বিরুদ্ধে।

অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে জাতির সেই দুঃসময়ে এই সম্প্রদায়ের বিশ্বাসঘাতকতা ছিল এক বিশাল অনভিপ্রেত ষড়যন্ত্র। অত্যন্ত অনুতাপের সাথে আজকের একবিংশ শতাব্দীতে এসেও ওদের সেই বিশ্বাসঘাতকতার রেশ জাতি কাটিয়ে উঠতে পারছে না। 

বাংলাদেশ আজ অর্ধশতাব্দী যাবত স্থাপিত - স্বাধীনতা অর্জনের বেদীতে বলিদান করতে হয়েছে লক্ষ লক্ষ মানুষদেরকে, যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে লক্ষ লক্ষ মা বোনদেরকে, নয় মাসব্যাপী আগ্রাসন এবং অত্যাচারে জাতির এবং দেশের  অবোকাঠামো, অর্থনীতি সব কিছুই ধুলিস্যাৎ করে দিয়েছিল সেই বর্বর পশু পাকিস্থানী পাঞ্জাবী বাহিনী এবং ওদের আমাদের দেশের দালাল এবং দোশররা । 

সেই উত্তাল সময় অতিক্রম  করে আজ ৫১টি বছরে বাঙ্গালী জাতি পদার্পণ করেছে। গর্বে এবং প্রত্যয়ে জাতি আজ এক নতুন উন্নয়নের সোপানে চড়ে হিমালয় চূড়ার দিকে আগাচ্ছে সদর্পে। কিন্তু কেন জানি বারবার হোচট খেতে হচ্ছে জাতিকে ঐ   পুরানো হেরে যাওয়া শত্রুদের ষড়যন্ত্রে। নব্য নব্য ইজম এবং নতুন নতুন দাবার চাল চালিয়ে কেমন জানি মতিভ্রস্ট করে ফেলছে যুবসমাজ, অর্ধ বয়সী যুবক যুবতীদের সহ বালক বালিকাদের। মস্তিষ্ক হনন এর মত এক ষড়যন্ত্রের মাতমে মেতে উঠেছে ঐ গোষ্ঠী অবারিত ভাবে - উঠেপড়ে লেগেছে জাতির আগামী প্রজন্মের সন্তানদেরকে ইতিহাস বিচ্ছিন্ন করতে, দেশজ ইতিহাস এর প্রতি উন্নাসিকতা সৃষ্টি করার জন্য, স্বাধীনতার সেই অমানবিক অত্যাচারের ইতিহাসকে মিথ্যা বড় গলায় আওয়াজ করে করে প্রমানিত করতে চাচ্ছে সত্যকে মিথ্যা হিসাবে, ইনিয়ে বিনিয়ে, গানে গানে, সলোক, পুথি, গান এবং কৌতুক এর মাধ্যমে পানি ঢেলে সেই গর্বের ইতিহাস কে তরলায়ন করা হচ্ছে প্রত্যহ। অবজ্ঞায় রূপান্তারিত করা হচ্ছে জাতির সূর্য সন্তানদের আত্মত্যাগকে, যুবকদেরকে, তরুণদের শিখানো হচ্ছে ভিন দেশী বিতর্কিত ব্যক্তি, জেনোসাইড সংঘটনকারীদের বীর হিসাবে ঝান্ডা বহনকারী বিশাল মানব হিসাবে। গন আয়োজিত বিশাল সব মন্ডপে রাত দিন চলছে বাঙ্গালী জাতির প্রজ্ঞা, ঐতিহ্য, সংস্কৃতিতে এবং বহু জাতি এবং বহু ধর্ম, বহু বর্ণ নিয়ে শান্তিপূর্ণ সহঅবস্থান আকাঙ্খাকে সমূলে উৎপাটনের অপচেষ্ঠা। কিশোর, কিশোরী, যুবক, যুবতী, পুরুষ এবং মহিলারা অধিকাংশই আজ কেমন জানি বিচ্ছিন্ন বাংগালীত্ব এবং বাংলা কৃষ্টির  প্রতি ক্রমশ। এই জাতির চার হাজার বছরের সবচে বিশাল মাইলফলক আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং ঐ স্বাধীনতা যুদ্ধের ত্যাগ এর গৌরব এর প্রতি নিয়ে এসেছে এক উন্নাসিকতা এবং সন্দেহ। আদৌ কি এসব সত্যি?  

অনুপ্রবেশ করানো হয়েছে ঐ কোমলমতি মস্তিকে ভিন্ন ধরনের সন্দেহ এবং বিশ্বাসযোগ্যতা। আর যার জন্য দেশে এবং বিদেশের অভিবাসী কিশোর, কিশোরী, যুবক, যুবতী, পুরুষ এবং মহিলারা বিভ্রান্ত নিজেদের পূর্বপুরুষদের ইতিহাস, শৌর্য-বীর্য, ত্যাগ এবং মহিমার ব্যাপারে। জাতির গর্বে যারা গর্বিত নয় যারা দেশের জনগণের ইচ্ছা ও আকাঙ্খার সাথে সম্পৃক্ত নয় - তারা কতটুকু দেশপ্রেমিক এবং মুখের বুলি কতটুকু বিস্বাসযোগ্য তা একটা ভাবারও বিষয়, যারা তাদের জাতির মা ও বোনদের ইজ্জৎ, সম্ভ্রম এর প্রতি উন্নাসিক এবং স্বীকার করতে উৎসুক নয় তাদের দেওয়া বক্তব্য কতটা সচ্ছল এবং সত্য এই ব্যাপারে যুবক, কিশোর, বয়স্কদের ভেবে দেখা উচিত । 

একটা প্রবাদবাক্য আছে উন্নত বিশ্বে, যে ব্যক্তি জানেনা সে কোথা থেকে এসেছে, সে কিভাবে জানবে তার জীবনে তাকে কোথায় পৌঁছুতে হবে! এটা অত্যন্ত অনভিপ্রেত হবে যদি বাঙ্গালী জাতির আগামী প্রজন্মের অব্যস্থা এক রকম হয়। ১৯৭১ আমাদের জাতির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মাইল ফলক। ১৯৭১ সাল আমাদের জাতি গোষ্ঠী এনে দিয়েছে এক নতুন পরিচয়। বাঙ্গালীরা পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম জাতিগোষ্ঠী - বাংলা ভাষা পৃথিবীর পঞ্চম ভাষা। কিন্তু, এত কিছু থেকেও আমরা জানিনা কেন  বারবার হোছট খাচ্ছি বিভিন্ন ভাবে - আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে তেমন কোন প্রকাশনা নেয় - একাডেমিক দিক থেকে; নেই তেমন থিসিস পেপার, নেই তেমন কোন অনুসন্ধান কেন্দ্রিক পেমপ্লেট  বা এছে (রচনা) । নেই তেমন কোন বই যাতে আছে উদ্ধৎিেতর সূত্র এবং বীব্লিওগ্রাফই। যেটা পড়লে নতুন প্রজন্মের পাঠক হয়ে  ঊঠবে গবেষক এবং ঐ সব সূত্র ধড়ে ধরে বেড় করতে পারবে আরও অনেক না  জানা তথ্য - উপাত্ত এবং নিজেরাও উদ্ভূত হবে স্বাধীনতা নিয়ে লেখতে - ঐ ভাবেই আগামীতে যুগে যুগে শতাব্দী পর শতাব্দী যাবত বাঙালী জাতীর প্রজন্মরা পৃথিবীর সব আনাচে কানাচে অবস্থিত বাঙ্গালী ডিয়াস্পরা এবং বাংলাদেশে বসবাসকারী আগামী জেনারেশন এর পর জেনারেশনগুলোকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস পৌঁছে দিতে পারবে। সেই সাথে আগমনী জেনারেশন তাদের পূর্বপুরুষদেরকে নিয়ে গর্ববোধ করবে। সেইদিনই  হয়ত আমাদের প্রজন্ম স্বাধীনতা দিবসকে উদযাপন করবে গর্ব নিয়ে। ঐ আগামী প্রজন্মের গর্বপ্রসূত সংরক্ষিত ইতিহাসভিত্তিক বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস পালনের প্রত্যাশায় অপেক্ষায় থাকবে জাতি এটাই প্রত্যাশা ।

ইমরান চৌধুরী: লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক


img

পুঁজিবাজারে বড় চমক কি সময়ের ব্যাপার মাত্র?

প্রকাশিত :  ১৬:৫২, ১৭ এপ্রিল ২০২৬

২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের এই সময়টি বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের ইতিহাসে এক বিশেষ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা ও যুদ্ধের মেঘ কাটিয়ে বিশ্ব আজ এক নতুন স্থিতিশীলতার সুপ্রভাতের অপেক্ষায় রয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার পারদ নিম্নমুখী হওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যের উল্লেখযোগ্য পতন বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য এক বিশেষ স্বস্তির বার্তা বয়ে এনেছে। অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ নিশ্চিত করতে একের পর এক তেল ও গ্যাসবাহী জাহাজের আগমন এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও রেমিট্যান্স প্রবাহের শক্তিশালী অবস্থান আগামী রবিবারের পুঁজিবাজারে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই বিশ্লেষণটি মূলত বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও দেশীয় সামষ্টিক অর্থনীতির নিরিখে আমাদের পুঁজিবাজারের সম্ভাব্য গতিপথকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের পরিবর্তন ও তেলের মূল্যপ্রবণতা

বিশ্ব অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত জ্বালানি তেলের বাজার গত কয়েক মাস ধরে যে অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে এসে তা নাটকীয়ভাবে স্তিমিত হতে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের (ক্রুড অয়েল) দামে এখন নিম্নমুখী প্রবণতা স্পষ্ট। সাম্প্রতিক লেনদেনগুলোতে দেখা গেছে, ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারের মূল্য ব্যারেলপ্রতি ৯৭.৯৯ ডলারে নেমে এসেছে, যা আগের সেশনের তুলনায় প্রায় ২ শতাংশ কম। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটি ৯৫ ডলারের মনস্তাত্ত্বিক সীমার নিচেও অবস্থান করছে। জেপি মরগানের মতো বিশ্বখ্যাত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো পূর্বাভাস দিচ্ছে যে, ২০২৬ সাল জুড়ে তেলের গড় মূল্য ব্যারেলপ্রতি ৬০ থেকে ৯০ ডলারের মধ্যে ওঠানামা করতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি চমৎকার সংকেত।

এই দরপতনের প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্পাদিত দুই সপ্তাহের প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি চুক্তি আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য একটি \'গেম চেঞ্জার\' হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এর ফলে হরমুজ প্রণালী—যা বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের প্রধান ধমনী—পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিনিয়োগকারীরা এখন তেলের বাজারদর থেকে \'যুদ্ধ ঝুঁকি প্রিমিয়াম\' বা \'ওয়ার প্রিমিয়াম\' সরিয়ে নিতে শুরু করেছেন, যার ফলশ্রুতিতে দামের এই স্থিতিশীলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা: সংকট থেকে সম্ভাবনার দ্বারে

বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমে আসার এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি ব্যবস্থাপনায়ও এক অভাবনীয় গতিশীলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দেশের শিল্প উৎপাদন ও বিদ্যুৎ খাতের দুশ্চিন্তা লাঘব করে একের পর এক জ্বালানি তেল ও এলএনজিবাহী জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দর এবং মহেশখালী টার্মিনালে পৌঁছাতে শুরু করেছে। এটি শুধুমাত্র কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং সরকারের সুপরিকল্পিত আমদানি কৌশলেরই অংশ।

৯ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে মালয়েশিয়া থেকে আসা দুটি বৃহৎ মাদার ট্যাংকার \'সেন্ট্রাল স্টার\' এবং \'ইস্টার্ন কুইন্স\' চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করেছে। তারা মোট ৫১,০০০ মেট্রিক টন জ্বালানি (২৫,০০০ টন ফার্নেস অয়েল ও ২৬,০০০ টন অকটেন) বহন করে এনেছে। এছাড়া সিঙ্গাপুর থেকে আসা আরেকটি জাহাজ ২৭,০০০ টন ডিজেল খালাস করেছে। তরল প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি সরবরাহের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। ১৫ এপ্রিল অস্ট্রেলিয়া থেকে ৬৪,৬৭৮ মেট্রিক টন এলএনজি নিয়ে \'মারান গ্যাস হাইড্রা\' মহেশখালীতে পৌঁছেছে এবং ১৮ এপ্রিল অ্যাঙ্গোলা থেকে আরও ৬৯,০১৫ মেট্রিক টন এলএনজি নিয়ে \'লোবিটো\' আসার কথা রয়েছে। মার্চ মাস থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৩৩টি জ্বালানিবাহী জাহাজ দেশে পৌঁছেছে, যা দেশের শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতের জন্য এক বিরাট স্বস্তি।

সামষ্টিক অর্থনীতির শক্তিশালী ভিত্তি ও বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সূচকগুলো ২০২৬ সালের শুরুতেই ক্রমান্বয়ে উন্নতির শিখরে আরোহণ করছে। বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে যে প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, তা অর্থনীতির অন্তর্নিহিত শক্তিরই পরিচায়ক। ৭ এপ্রিলের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৪.৩৫ বিলিয়ন ডলারে। এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়ন (এসিইউ) ও অন্যান্য বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের পরেও রিজার্ভের এই অবস্থান অত্যন্ত সন্তোষজনক।

রেমিট্যান্স প্রবাহের ক্ষেত্রেও চলতি বছর নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। মার্চ মাসে প্রবাসীরা রেকর্ড ৩.৭৭৫ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠিয়েছেন, যা একক মাস হিসেবে এ যাবতকালের সর্বোচ্চ। এপ্রিলের প্রথমার্ধেও এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। ১ থেকে ১৫ এপ্রিলের মধ্যে ১,৭৮৮ মিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২১.৫ শতাংশ বেশি। এই শক্তিশালী রিজার্ভ ও রেকর্ড রেমিট্যান্সের ফলে ব্যাংকিং খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য বেড়ে ৩.৯ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। একইসাথে খাদ্য মুদ্রাস্ফীতি (যা সেপ্টেম্বর মাসে ছিল ১৪.২৪ শতাংশ) নাটকীয়ভাবে কমে ফেব্রুয়ারিতে ২.৩৯ শতাংশে নেমে আসায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও বাজার স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।

পুঁজিবাজারের গতিপ্রকৃতি ও রবিবারের পূর্বাভাস

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) বিগত কয়েক সপ্তাহের সংশোধন প্রক্রিয়ার পর এখন একটি শক্তিশালী ঘুরে দাঁড়ানোর (রিবাউন্ড) উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ডিএসই সূচক ৫,৬০০ পয়েন্টের ঘর স্পর্শ করার পর মুনাফা শিকারিদের চাপে কিছুটা কমলেও গড় দৈনিক লেনদেন ১,০০০ কোটি টাকার ওপরে থাকা নির্দেশ করে যে বাজারে পর্যাপ্ত তারল্য ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ রয়েছে।

আগামী রবিবার পুঁজিবাজার ইতিবাচক থাকার পেছনে তিনটি প্রধান প্রভাবক কাজ করবে বলে আমি মনে করি:

প্রথমত, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমে যাওয়ায় তালিকাভুক্ত উৎপাদনশীল ও বিদ্যুৎ খাতের কোম্পানিগুলোর পরিচালন ব্যয় কমে আসবে, যা সরাসরি তাদের কর্পোরেট মুনাফায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে সিমেন্ট, সিরামিক ও ওষুধ খাতের কোম্পানিগুলো এই জ্বালানি স্বস্তির বড় সুবিধাভোগী হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, বিশ্বজুড়ে শান্তি আলোচনার অগ্রগতি বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা কমিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে \'রিস্ক-অন\' মেজাজ ফিরিয়ে এনেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারগুলোতে ইতিবাচক ধারা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

তৃতীয়ত, দেশের শক্তিশালী সামষ্টিক অর্থনৈতিক ভিত্তি বিনিয়োগকারীদের মনে এই বিশ্বাস জন্মাবে যে দেশের অর্থনীতি বড় কোনো ঝুঁকির মুখে নেই।

পরিশেষে বলা যায়, ২০২৬ সালের এপ্রিলের এই সময়টি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এক বিশেষ মাহেন্দ্রক্ষণ। একদিকে বৈশ্বিক জ্বালানি ও ভূ-রাজনৈতিক স্বস্তি, অন্যদিকে দেশীয় শক্তিশালী অর্থনৈতিক সূচক—সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাবে পুঁজিবাজার তার স্বাভাবিক ছন্দে ফেরার জন্য প্রস্তুত। বিনিয়োগকারীদের ভয় কাটিয়ে যৌক্তিক ও তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে বাজারে অংশ নেওয়ার এখনই সময়। আশা করা যায়, আগামী রবিবারের লেনদেন বিনিয়োগকারীদের জন্য এক নতুন আশার আলো বয়ে আনবে এবং দেশের পুঁজিবাজার তার ইতিবাচক অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখবে।

মতামত এর আরও খবর